Main menu

১৯৪৭ এর ঘটনাগুলি – আবুল হাশিমের “In Retrospective” বইয়ের লাস্ট চ্যাপ্টারের কিছু অংশ

[অই সময়ের বাংলার মুসলিম লীগ পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি (১৯৪১-১৯৪৭) আবুল হাশিম (১৯০৫ – ১৯৭৪) উনার অটোবায়োগ্রাফিকাল বই “In Retrospective” ১৯৭৪ সালে পাবলিশ করেন, যেইটা পরে উনার ছেলে শাহাবুদ্দীন মহম্মদ আলী ১৯৮৮ সালে “আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি” নামে অনুবাদ করেন ১৯৭৮ সালে; এইখানে অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের ২০১৮ সালের বইটার টেক্সট ফলো করা হইছে…

তো, আবুল হাশিম যেহেতু অটোবায়োগ্রাফিকাল বই লিখছেন সেইখানে উনি উনার রোল’টারেই সেন্ট্রার পজিশনে রাখছেন, এইখানের বাছাইয়ে, অই সময়ের ঘটনাগুলারেই হাইলাইট করা হইছে, ফুল-টেক্সট তো উনার পাইবেন-ই… ]


শরৎ বোস

১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে শরৎচন্দ্র বোসকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বাদ দেওয়ার পর আমি তাঁর কলকাতার বাসভবন ১নং উডবার্ন পার্কে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম।

আমার সঙ্গে ছিল মুন্সীগঞ্জের শামসুদ্দীন আহমেদ এবং আমার পুত্র বদরুদ্দীন মহাম্মদ উমর। তখন সে ছিল স্কুলের ছাত্র। এই প্রথম সাক্ষাতে শরৎচন্দ্র বোস স্বীকার করেছিলেন যে ভারত একটি দেশ নয়; একটি উপমহাদেশ এবং ভারতীয়রা এক জাতি নয় এবং ভারত যথার্থভাবে তখনই স্বাধীন হবে যখন ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলি ও জাতিসমূহ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

শরৎ বোসের রাজনৈতিক চিন্তাধারার এই মৌলিক পরিবর্তন তাঁর ভারতীয়তাবাদের তিক্ত অভিজ্ঞতারই ফল এবং এর জন্য মূলত সরদার বল্লভভাই প্যাটেলই দায়ী ছিলেন। আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। যে ব্যক্তি মনে করতেন যে, পাকিস্তান একটি অর্থহীন আজগবি ব্যাপার তিনি ভারত বিভক্তিতে এবং বাংলাকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করতে একমত হলেন। শরৎ বোসের সঙ্গে আমার আলাপের কিছুদিন পর সুভাষ ইন্সটিটিউটে সুভাষ চন্দ্র বোসের ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি আজাদ হিন্দ ফৌজের বার্ষিক ভোজসভা ছিল। শরৎ বোস সেই ভোজসভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন।…

আমি ভোজসভায় যোগদান করলাম এবং আইএনএ’র নেতৃবর্গের পূর্ণ সমর্থন লাভে কৃতকার্য হলাম। ভোজের শুরুতে উপস্থিত ভদ্রলোকদের আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাঁরা কি চান আমি আহার করি অথবা আলাপ করি। তাঁরা বললেন, তাঁরা আমার কথা শুনতে চান। আমি বললাম, ‘তাহলে অনুগ্রহ করে আমাকে এক পেয়ালা গরম সুপ দিন, আমি ধীরে ধীরে পান করব এবং কথা বলে যাব।’ পরিশেষে আমি বললাম, ‘ভদ্র *মহোদয়গণ, আমার বক্তব্যে যদি কোনো সত্যতা থাকে তাহলে নিশ্চিতরূপে পৃথিবী যেমন তার কেন্দ্রস্থলে সবকিছুকে আকর্ষণ করে, যতই একটি পরমাণুর ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা থাকুক, আপনাদের উচিত আমার মতবাদকে সেইভাবে নিশ্চিতরূপে গ্রহণ করে নেওয়া।’ সকলে একস্বরে বললেন, ‘আমরা গ্রহণ করলাম।’


কমিউনিস্টদের ‘বৃহত্তর বাংলা’র মিথ্যাচার

শরৎ বোসের সঙ্গে তাঁর বাসভবনে আমার প্রথম সাক্ষাতের ঠিক পরেই মুন্সীগঞ্জের শামসুদ্দীন আহমেদ কম্যুনিস্ট পার্টির দৈনিক পত্রিকা স্বাধীনতাতে শরৎ বোসের সঙ্গে আমার যে আলোচনা হয়েছিল তার খরব দিলেন। আমার সঙ্গে শরৎ বোসের আলোচনা স্বাধীনতা বিস্তৃতভাবে বড় অক্ষরের শিরোনামে ছাপল। রিপোর্টে বলা হলো যে, আমি বৃহত্তর ‘বাংলা’ সৃষ্টির কথা চিন্তা করছি যেখানে মুসলমানরা হবে সংখ্যালঘু। এটা ছিল সত্যের বিকৃতি। আমরা বৃহত্তর বাংলা সৃষ্টির বিষয় নিয়ে কখনও আলোচনা করিনি। বৃহত্তর বাংলা কথাটি, কম্যুনিস্ট পার্টি উদ্ভাবন করেছিল।

যাই হোক, স্বাধীনতার এই রিপোর্ট আমার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারকার্য চালাতে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কম্যুনিস্ট পার্টি বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন এবং আসাম থেকে সিলেটকে বিচ্ছিন্ন করার বিরোধিতা করেছিল। তাঁদের এই সিদ্ধান্ত বাংলা এবং আসামে তাঁদের জনপ্রিয়তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল।

শামসুদ্দীন আহমেদ যে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন একথা তিনি শরৎ বোসের সঙ্গে আমার আলোচ্য বিষয় কম্যুনিস্ট পার্টিকে জানিয়ে দেওয়ার পূর্বে আমার অজ্ঞাত ছিল। পরবর্তী কালে একথা প্রকাশ পেল যে, কম্যুনিস্ট পার্টি তাঁদের কিছুসংখ্যক সদস্যকে মুসলিম লীগে উপদলীয় কাজের (factional work) জন্য নিয়োজিত করেছিল।


ভারত বিভাগের পরিকল্পনা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির ব্যাপারে কতকগুলি সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করত। যখন তারা কোনো কিছু করতে চাইত তখন সেই বিষয়টি জননন্দিত কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে তুলে ধরে জনগণের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করত। প্রতিক্রিয়া যদি অনুকূল হতো তাহলে শান্তভাবে সে কাজ সমাধান করত। প্রতিক্রিয়া যদি অনুকূল না হতো তাহলে তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করত যার ফলে তাদের পরিকল্পনা সহজেই গৃহীত হতো। ব্রিটিশরা এভাবেই ভারত বিভাগের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতকে যেভাবে বিভক্ত করা হয় সেটা প্রস্তাবিত হয়েছিল রাজা গোপাল আচারীর মাধ্যমে।

রাজাজীর ভারত বিভাগ পরিকল্পনা কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েই প্রত্যাখ্যান করেছিল। রাজাজীর পরিকল্পিত পাকিস্তান জিন্নাহ খণ্ড-বিখণ্ড পোকায়কাটা পাকিস্তান হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ কূটনীতিজ্ঞরা মনোযোগসহকারে রাজাজীর পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগল। প্রতিক্রিয়া অনুকূল না হওয়ায় তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করল।

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের অভিজ্ঞতার আলোকে কংগ্রেস এবং সরদার বল্লভভাই প্যাটেল স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে, অবিভক্ত ভারতে তাঁরা ইচ্ছেমতো কোনো কিছু করতে পারবেন না। ফলে কংগ্রেস ভারত বিভক্তিতে মানসিকভাবে দলকে প্রস্তুত রাখল। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল যার ফলশ্রুতিতে রাজা গোপাল আচারীর ভারত বিভক্তি পরিকল্পনা কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ সহজেই গ্রহণ করে নিল।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বাংলা এবং পাঞ্জাবকে বিভক্ত করার এক পরিকল্পনা তৈরি করলেন। ব্রিটিশ ভারতের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক শেষে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তৈরি করলেন যেটা ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন কংগ্রেস এবং মুসলিম ভারত অথবা পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সম্মতির ব্যাপারে এবং তাঁরা প্রদেশকে বিভক্ত লীগ গ্রহণ করে নিল।…

উভয় ব্যবস্থাপক সভায় তাঁরা ভারতে কিংবা পাকিস্তানে যোগ দেবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এক যুক্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো। যেহেতু উভয় সভায় মুসলিম লীগ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সেহেতু তাঁরা পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর পূর্ববঙ্গের জেলাসমূহের আইনসভার সদস্যরা পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মিলিত হলেন যে, তাঁরা যুক্ত বাংলা চান অথবা প্রদেশকে বিভক্ত করতে চান। আইনসভায় পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ সদস্যবৃন্দ মুসলিম লীগের নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করলেন এবং যেহেতু সেই সভায় মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেলো। তারপর পশ্চিমবঙ্গের আইনসভার সদস্যরা পৃথকভাবে মিলিত হলেন এবং তাঁদেরও একই বিষয় সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হলো। এ বিষয়ে পুনরায় মুসলিম লীগের নির্দেশ অনুযায়ী বিধানসভার মুসলিম লীগ সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন। কিন্তু এই সভায় হিন্দুরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাঁরা বঙ্গভঙ্গের স্বপক্ষে ভোট প্রদান করলেন। পূর্ববঙ্গের সভায় সভাপতিত্ব করেন নূরুল আমিন এবং পশ্চিমবঙ্গ দলের সভায় সভাপতিত্ব করেন বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ উদয়চাঁদ মাহতাব। পাঞ্জাবেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।

সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে মুসলমানরা নয়, হিন্দুরা ধর্মকে ভিত্তি করে কংগ্রেসের নির্দেশ অনুযায়ী ভারত বাংলা এবং পাঞ্জাবকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য দায়ী। একথা মনে রাখা দরকার যে, ১৯৪০ সালের বহু পূর্বে গান্ধী রাজনীতিতে ধর্মের প্রবর্তন এবং ভারতে তাঁর ‘রামরাজ’ তত্ত্ব ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, সরদার প্যাটেল ও কংগ্রেসের উপর তাঁর প্রভাব বিস্তার করে পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তকে কার্যে পরিণত করার জন্য তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন।


শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ১৯৪৭ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি বাংলার গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারোজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। গভর্নরের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে ২৩শে ফেব্রুয়ারি সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গের দাবি জানিয়ে এক বিবৃতি প্রদান করলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি আচার্য কপালিনী, হিন্দু মহাসভার সভাপতি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর দাবি সমর্থন করলেন। তাঁরা বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন শুরু করলেন।

২৭শে এপ্রিল দেবেন দে’র নেতৃত্বে শরৎ বোসের দলভুক্ত এবং কংগ্রেসের কিছুসংখ্যক যুবনেতা জিপে করে বর্ধমানে এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তাঁরা তাড়াতাড়ি কলকাতা আসার জন্য আমাকে অনুরোধ জানালেন। তাঁরা বললেন, বাংলা বিভক্ত হতে চলেছে। আমি তাঁদের কথা বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে বাংলা বিভক্ত করবে? ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং আজকের মুসলিম লীগ বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে।’ আমি তখন নির্বোধের মতো এইভাবে চিন্তা করেছিলাম। আমি ভারতীয় এবং ব্রিটিশ কূটনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলী বিবেচনার মধ্যে আনতে পারিনি।


মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসর যুক্ত কমিটি

এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় সুহরাওয়ার্দীর ৪০নং থিয়েটার রোডের বাসভবনে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের এক সভা আহ্বান করা হয়। সার্বভৌম বাংলার সংবিধানের মুখ্য বিষয়ের খসড়া তৈরির জন্য সেই সভায় একটি যুক্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটিতে মুসলিম লীগের প্রতিনিধিত্ব করেন এইচ. এস. সুহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন, বগুড়ার মহাম্মদ আলী, ডা. এ. এম. মালেক, ঢাকার ফজলুর রহমান এবং আমি নিজে। হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করেন শরৎচন্দ্র বোস, কিরণ শংকর রায়, নলিনী রঞ্জন সরকার এবং সত্যরঞ্জন বক্সী।

কমিটির প্রথম সভায় খাজা নাজিমুদ্দীন যোগদান করেন এবং সভাশেষে তিনি বলেন, ‘আমি যেকোনো সংবিধান মেনে নেব যদি তাতে বিশুদ্ধ যুক্ত নির্বাচন অথবা পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকে।’ ২৩শে এপ্রিল প্রকাশিত স্টেটসম্যান-এর সংবাদদাতার সঙ্গে আলোচনায় নাজিমুদ্দীন বলেন, ‘আমার সুচিন্তিত অভিমত এই যে স্বাধীন এবং সার্বভৌম বাংলা, তার জনসাধারণ মুসলমান অথবা অমুসলমান যেই হউক, তাঁদের স্বার্থের পক্ষে সব থেকে অনুকূল এবং আমি একইভাবে সুনিশ্চিত যে প্রদেশের বিভক্তি বাঙালির স্বার্থে চরম আঘাত হানবে।’ এভাবে কেন্দ্রীয় সংবিধান সভার ডেপুটি লিডার এবং লীগের উচ্চতম পর্যায়ের নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন ঐ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময়েই মনে করেছি যে, এই প্রদেশের ও তার অধিবাসীদের উন্নয়ন এবং বিকাশসাধনের অপরিসীম সম্ভাবনা রয়েছে যদি তাঁরা তাঁদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করার তেমন সুযোগ পান। বাংলা কেন্দ্রের কাছ থেকে সব সময়েই বিমাতৃসুলভ আচরণ পেয়ে এসেছে। যখনই আমি আমার হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেছি, তাঁদের একমাত্র দাবি, বাংলার উচিত তার নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করা। এ দাবির যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় বাংলাকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। তখন এবং কেবল তখনই বাঙালিরা তাঁদের সমস্যার সমাধান করতে পারেন।’

১৯শে এপ্রিল এক প্রেস বিবৃতিতে মৌলানা আকরাম খাঁ বলেন, ‘মুসলিম বাংলা অবশ্যই বঙ্গভঙ্গের বিরোধী। বঙ্গভঙ্গ হতে পারে কেবলমাত্র বাংলার মুসলমানদের মৃতদেহের উপর। লাহোর প্রস্তাবে যে খসড়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যবিহীন কোনো প্রস্তাবই আমি সমর্থন করব না।’

১৯৪৭ সালের ৭ই মে গান্ধী কলকাতার উদ্দেশে পাটনা ত্যাগ করলেন এবং ৯ই মে কলকাতা পৌছলেন। গান্ধী যেদিন সোদপুর আশ্রমে পৌঁছলেন ঐদিন শরৎচন্দ্র বোস তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং ১০ই মে শরৎ বোস আমাকে সঙ্গে নিয়ে গান্ধীর কাছে গেলেন। গান্ধীর সঙ্গে আমার আলাপের রিপোর্ট পেয়ারেলালের বই মহাত্মাগান্ধী: শেষ অধ্যায়-এর দ্বিতীয় খণ্ডে দেওয়া হয়েছে।

শরৎচন্দ্র বসুর বাসভবন ১নং উডবার্ন পার্কে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের যুক্ত কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। শরৎ বসুর রোজনামচা থেকে মনে হয় দিনের বেলা তিনি প্রায়ই তাঁর হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কমিটির কাজ শেষ হলো ১৯৪৭ সালের ১৯শে মে। ২০শে মে শরৎ বসু তাঁর বাসভবনে এক সম্মেলন আহ্বান করলেন এবং সম্মেলনের সদস্যদের রাত্রিতে এক প্রীতিভোজে আপ্যায়িত করেন। এই সম্মেলনে সার্বভৌম বাংলার অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য তৈরি খসড়া সংবিধান প্রীতিভোজের পর স্বাক্ষরিত হলো। ২৩শে মে দেবেন দে-র মাধ্যমে শরৎ বসু গান্ধীকে একটি চিঠি পাঠালেন।

….


চিঠি চালাচালি

২৩শে মে শরৎ বসু-লিখিত পত্রের জবাবে গান্ধী পাটনা থেকে ২৪শে মে লিখলেন:

‘প্রিয় শরৎ,

তোমার পত্র পেয়েছি। খসড়াটিতে এমন কিছু নেই যার থেকে মনে করা যেতে পারে যে নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিছু করা যাবে না। প্রত্যেক আইনের জন্য কার্যনির্বাহীদের এবং আইনসভার হিন্দু সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন থাকতে হবে। খসড়া চুক্তিটিতে স্বীকৃতি থাকতে হবে যে, বাংলার একটি সাধারণ সংস্কৃতি আছে এবং তার মাতৃভাষা হচ্ছে বাংলা। প্রস্তাবটি সম্পর্কে বিরুদ্ধ সংবাদ সত্ত্বেও যাতে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ প্রস্তাবটি সমর্থন করে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দিল্লিতে তোমার উপস্থিতি যদি প্রয়োজন হয় আমি টেলিফোন অথবা টেলিগ্রাফ করব। কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে খসড়াটি নিয়ে আলাপ করা উচিত বলে মনে করি।

তোমাদের
বাপু’

গান্ধীর চিঠির জবাবে ২৬শে মে, ১৯৪৭ সালে শরৎচন্দ্র বসু লিখলেন:

‘প্রিয় মহাত্মাজী,

আপনার ২৪ তারিখের চিঠি গতকাল দেবেন আমাকে দিয়েছেন। তাতে উল্লিখিত প্রস্তাবের জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ। প্রায় প্রতিদিনই আমরা শর্তগুলি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি এবং সেগুলি আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি। গত পরশু কিরণ এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের কিছু সদস্যদের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।

শর্তের এক ও দুই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করেছি এবং আজ সকালে গত রাত্রে আবুল হাশিম ও সত্য বসুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। আলোচনার ফলে শহীদের কাছে পাঠিয়েছি। আপনার বিবেচনার জন্য এক অনুচ্ছেদের নূতন খসড়াটির কপি সংযোজিত করলাম।

সরকারের প্রতিটি বিধিবদ্ধ আইনে কার্যনির্বাহী পরিষদ ও আইনসভার দুই-ততীয়াংশ হিন্দু-সদস্যদের সহযোগিতা থাকতে হবে আপনার এই প্রস্তাব সম্বন্ধে শহীদের সঙ্গে আমি আলাপ করতে পারিনি। তিনি আজ বৈকালে বিমানযোগে দিল্লি রওয়ানা হচ্ছেন। আমি যদি দিল্লিতে যাই তাহলে সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ করব। যদি এর মধ্যে তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করেন তাহলে এ বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন এবং তাঁর প্রতিক্রিয়ার বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

বাংলার একটি সাধারণ সংস্কৃতি আছে এবং বাংলা তার সাধারণ মাতৃভাষা-চুক্তিতে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, সে বিষয়ে গত জানুয়ারি মাসে আমি আলোচনার সূত্রপাত করেছিলাম এবং তখন থেকেই আলোচনা করে চলেছি। সে আলোচনার ভিত্তি ছিল এই যে, বাংলার সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা এক এবং আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সকলেই সে ভিত্তির ব্যাপারে একমত। গত মাসে শহীদের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি সে কথা স্বীকার করেছিলেন। সুতরাং শর্তগুলির মধ্যে এ বিষয়গুলি সংযুক্তিকরণে কোনো অসুবিধা হওয়া উচিত নয়।

আজকের মতো এখানে শেষ করছি, প্রণামসহ।

আপনার স্নেহের,
শরৎচন্দ্র বোস (স্বাক্ষরিত)

পুনশ্চ: শহীদ এবং ফজলুর রহমান জিন্নাহর সঙ্গে ও কার্যনির্বাহী কমিটিতে শর্তের বিষয় আলোচনা করবেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে আমার মনে হয়েছে যে, বাংলার কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ যদি চুক্তিতে উপনীত হতে পারে, জিন্নাহ তাতে বাধা প্রদান নাও করতে পারেন।’

১৯৪৭ সালের ৯ই জুন শরৎচন্দ্র বসু জিন্নাহকে এক চিঠি লিখলেন।…জিন্নাহ মুসলিম বিধায়কদের পাকিস্তানের পক্ষে এবং বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে দৃঢ়ভাবে ভোট প্রদান করার জন্য নির্দেশ প্রেরণ করলেন। জিন্নাহ সারা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন এবং কংগ্রেস বাংলার অর্ধেক অংশ ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়ে তদনুসারে কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা হিন্দু বিধায়কদের বঙ্গভঙ্গের স্বপক্ষে ভোট প্রদান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন।

গান্ধী ১৯৪৭ সালের ৮ই জুন শরৎচন্দ্র বসুকে লিখলেন:

‘প্রিয় শরৎ,

তোমার খসড়া পড়লাম। আমি এখন পরিকল্পনাটি মোটামুটিভাবে পণ্ডিত নেহরু এবং সরদারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। দু’জনেই প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অনড় এবং তাঁরা মনে করেন এটা কেবল তফসিলি সম্প্রদায়ের এবং হিন্দু নেতাদের দ্বিধাবিভক্ত করার ফন্দী। তাঁদের কাছে এটা সন্দেহ নয় বরং প্রায় দৃঢ় বিশ্বাস। তাঁরা আরও মনে করেন যে, তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোট সংগ্রহের জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। তাই যদি হয় তাহলে তোমার উচিত আপাতত সংগ্রাম থেকে বিরত থাকা। কারণ,খোলাখুলিভাবে বঙ্গভঙ্গের চেয়ে দুর্নীতিকে আশ্রয় করে অখণ্ডতা ক্রয় হবে অনেক বেশি খারাপ। এটা হচ্ছে বর্তমানের বিভক্ত হৃদয় এবং হিন্দুদের দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতারই স্বীকৃতি। আমি আরও মনে করি যে, ভারতের দুই অংশের বাইরে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক সেটা নিতে হবে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী। এটা আমার যতদূর মনে হয় অর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না। যাই হোক, আমি তোমার বিশ্বাসকে দুর্বল করতে চাই না যদি না সেটা উপরোল্লিখিত চালাকি ও দুর্নীতিকে আশ্রয় করে চোরাবালির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তুমি যদি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত থাকো যে সন্দেহের কোনো কারণ নেই, তবুও কেন্দ্র কর্তৃক সমর্থিত স্থানীয় মুসলিম লীগের লিখিত নিশ্চয়তা যদি না পাও তাহলে তোমার উচিত হবে বাংলার অখণ্ডতার জন্য সংগ্রাম পরিত্যাগ করা এবং বঙ্গভঙ্গের জন্য যে পরিবেশ রচিত হয়েছে তাতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না করা।

ভালোবাসাসহ
বাপু


নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির কাউন্সিল অধিবেশন

লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত, বাংলা এবং পাঞ্জাব বিভক্তির চূড়ান্ত রোয়েদাদ বিবেচনা করার জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির কাউন্সিল অধিবেশনের দিন ধার্য করা হলো ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন। অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বেলা দশটায় দিল্লির ইম্পিরিয়াল হোটেলে।

দিল্লির উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলে বাংলার প্রতিনিধিরা সুহরাওয়ার্দীর বাসভবনে মিলিত হলেন। তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলিম লীগ যদি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের রোয়েদাদ গ্রহণ করেন তাহলে তাঁরা সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করবেন। সভাশেষে সুহরাওয়ার্দী সমস্যাটি নিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং জিন্নাহর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য দিল্লিউদ্দেশে বিমানযোগে কলকাতা ত্যাগ করলেন। বাংলার প্রতিনিধিরা ট্রেনযোগে কলকাতা থেকে দিল্লি রওয়ানা হলেন। আমি ২রা জুন বিমানযোগে দিল্লির উদ্দেশে কলকাতা ত্যাগ করেছিলাম।

পালাম বিমানবন্দরে নোয়াখালীর আবদুল জব্বার খদ্দর আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং সংবাদ দিলেন যে সুহরাওয়ার্দী যেখানে ছিলেন সেখানে তিনি একটি সভা আহ্বান করে বাংলার প্রতিনিধিদের জিন্নাহর প্রস্তাব সমর্থন করার জন্য প্ররোচিত করেছেন। যখন খদ্দরের নিকট থেকে একথা আমি শুনলাম তখন আমার চোখের সামনে বাঙালির ট্র্যাজেডি ভেসে উঠল। পরের দিন সকালে কাউন্সিলের অধিবেশনে যোগদান করার জন্য ইম্পিরিয়াল হোটেলের উদ্দেশে আমি আমার হোটেল ত্যাগ করলাম।

আমাদের পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশ, এমনকি জিন্নাহর প্রদেশ বম্বে, বাংলাকে সমর্থনদানে রাজি হয়েছিল। ইম্পিরিয়াল হোটেলের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁরা আমাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ওঁরা সবাই ভারতের বিভিন্ন সংখ্যালঘু প্রদেশের কয়েক হাজার মুসলিম যুবক সারিবদ্ধভাবে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এখন আপনিই আমাদের ভরসা।’ আমি তাদের বিলাপ শুনলাম, কিন্তু আমার কিছুই করার উপায় ছিল না।

সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হোটেলের উপরতলায়। হলের দ্বারদেশে আমি সুহরাওয়ার্দীকে দেখতে পেলাম। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি প্রস্তাবটি উত্থাপন করছেন?’ তিনি বললেন, ‘না হাশিম, তাঁরা প্রস্তাবটি উত্থাপন করার জন্য আমাকে বলেননি, তবে এর পক্ষে আমাকে কিছু বলতে হতে পারে কারণ এর বিকল্প এক ভয়ানক ব্যাপার।’

জিন্নাহ মাইক্রোফোনের কাছে এসে তাঁর প্রস্তাব পাঠ করা মাত্র খাকসাররা বেলচার (Belchas) সজ্জিত হয়ে হোটেলের রান্নাঘরের মধ্যে থেকে বের হয়ে সামনে ও পিছনে দুই দিক দিয়ে সভাকক্ষ আক্রমণ করল। চেয়ারে বসে আমি নির্বিঘ্নে ধূমপান করতে করতে সব সময় মাথায় বেলচার মারাত্মক আঘাতের আশঙ্কা করছিলাম। সভাকক্ষের সম্মুখভাগে বাংলার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও বালুচ এবং পশ্চাৎভাগে পাঞ্জাবি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পাহারায় নিযুক্ত ছিল। খাকসারদের সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করা হয়েছিল, কিন্তু ইম্পিরিয়াল হোটেলের মেঝে খাকসারদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ যখন আমরা পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করি তখন স্যার সিকান্দার হায়াৎ খানের পুলিশবাহিনী খাকসারদের বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের উপর গুলি চালিয়েছিল। এভাবে তথাকথিত পাকিস্তান প্রস্তাবের শুরু ও শেষ খাকসারদের রক্তে চিহ্নিত হয়েছিল।

জিন্নাহ তাঁর প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। মৌলানা হসরত মোহানী এবং আমি প্রস্তাবের উপর বক্তব্য রাখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু জিন্নাহ আমাদের মঞ্চে আহ্বান করলেন না। এরপর সভা আমাদের বক্তব্য শুনতে চাইল। জিন্নাহ বললেন, ‘আমি যদি আবুল হাশিমকে বক্তৃতা দিতে অনুমতি প্রদান করি তাহলে তিনি যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবেন তার প্রভাব খর্ব করতে আমাকে দশজন প্রথম শ্রেণীর বক্তাকে দাঁড় করাতে হবে, আমার ততটা সময় নেই। আলোচনা করার কী আছে, বাংলা এবং পাঞ্জাব বিভাগ? এ বিষয়ের মীমাংসা হয়ে গেছে বলে ধরে নিতে হবে। আপনাদের মাউন্টব্যাটেনের রোয়েদাদ হয় সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে হবে, নয়ত সম্পূর্ণভাবে নাকচ করতে হবে। বলুন, হ্যাঁ কি না?’

হাত উঠিয়ে ভোট নেওয়া হলো। সুহরাওয়াদী ভোট গণনা করলেন এবং বিজয়ীর সুরে বললেন, ‘কায়েদে আজম, কেবলমাত্র এগারোজন আমাদের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করেছেন।’ প্রস্তাব পাশ হয়ে গেলো এবং ৭ই জুন সুহরাওয়ার্দী এক প্রেস বিবৃতির মাধ্যমে বললেন, ‘ঢাকা এখন পাকিস্তানে।

৩রা জুনের সন্ধ্যায় আমি এক প্রেস বিবৃতি প্রদান করলাম। আমি বলেছিলাম মসলিম লীগ কাউন্সিল সদস্যদের সিদ্ধান্ত তিন প্রকার ভীতির পরিণাম। প্রথমত, জিন্নাহর প্রতি অভ্যাসগত ভীতি, দ্বিতীয়ত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ততীয়ত, জিন্নাহ অসন্তুষ্ট হলে পাকিস্তানে তাঁদের পদমর্যাদার অনিশ্চয়তা। আমার বিবৃতির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে ডন পত্রিকা এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ ‘ঘাসের মধ্যে সাপ’ এই শিরোনামে প্রকাশ করল। ডন পত্রিকা আমাকে ঘাসের মধ্যে সাপ বলে উল্লেখ করেছিল

এভাবে ১৯৪০ সালের বিখ্যাত প্রস্তাবকে অনাড়ম্বরভাবে আরব সাগরে নিক্ষেপ করা হলো এবং জিন্নাহ একসময় যাকে ছিন্নভিন্ন পোকায় কাটা আখ্যায়িত করেছিলেন সেই পাকিস্তানকে দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ করে নিলেন। যে নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেস দৃঢ়ভাবে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেছিল, তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত, বাংলা এবং পাঞ্জাব বিভাগে সম্মত হলেন।

বঙ্গীয় বিধানসভার ভোট

সংসদ কক্ষে ২৯শে জুন বঙ্গীয় বিধানসভার সদস্যদের এক যুগ্ম সভা অনুষ্ঠিত হলো। যুগ্ম সভা পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ভোট প্রদান করল। এর পনেরো মিনিট পর দুটি সভা অনুষ্ঠিত হলো। একটি বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং অন্যটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের অঞ্চলের। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট প্রদান করলেন। বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হলো। কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট প্রদান করেন।

কম্যুনিস্ট পার্টি বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট প্রদান করেছিলেন, কিন্তু সিলেটের গণভোটে তাঁরা আসাম থেকে সিলেটকে বিচ্ছিন্ন করার বিপক্ষে ভোট দেন। যখন গণভোট আসাম থেকে সিলেটকে বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে রায় প্রদান করল তখন কম্যুনিস্ট পার্টি দাবি জানালেন যে, সিলেটের হিন্দু অধ্যুষিত থানাগুলিকে সিলেট থেকে যেন আলাদা করে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হলো। রাজা গোপাল আচারী পশ্চিমবেঙ্গর প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হলেন। ১৫ই আগস্টে সকালে গভর্নমেন্ট হাউসে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো এবং রাজা গোপাল আচারীকে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদাভিষিক্ত করা হলো। আমরা অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলাম।

পরাজয়

গান্ধী কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। বিকেলে সোদপুর আশ্রমে আমি গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। দেবেন দে আমার সঙ্গে ছিলেন। আমরা যখন গান্ধীর কামরায় প্রবেশ করলাম তখন তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করার জন্য তাঁর দীর্ঘ হস্ত প্রসারিত করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তিনি বললেন, ‘হাশিম, তুমি পরাজিত হয়েছো।’ আমি মনে করলাম তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্বের জন্য সুহরাওয়ার্দীর পরাজয়ের ব্যাপারটি উল্লেখ করেছেন। গান্ধী বললেন, ‘না, না, ওটা একটা তুচ্ছ ব্যাপার। তুমি বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে পারলে না। এটাই তোমার পরাজয়। কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চয় করে বলতে পারি যে তুমি যদি তোমার দৃষ্টিশক্তি না হারাতে তাহলে তুমি জয়লাভ করতে পারতে।’ ১৯৪৭ সালের মধ্যেই আমি প্রায় সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখানে তিনি আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার বিষয়টিই উল্লেখ করেছিলেন।

গান্ধী যথারীতি সাধারণ বেতের মাদুরে বসেছিলেন। দুনিয়া মনে করল দিনটি স্বাধীনতার জন্য গান্ধীর সারাজীবনের সংগ্রামের বিজয় দিবস। কিন্তু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি তাঁর গভীর হতাশা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘পৃথিবী জানে সরদার প্যাটেল ‘আমার আজ্ঞাবহ ব্যক্তি’, কিন্তু ইদানীং আমি যা কিছু বলি তিনি তাতেই ‘না’ বলেন। বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রাতভ্রমণে আমার সঙ্গে থাকেন, কিন্তু যখনই আমি আশ্রমে ফিরে আসি আমার মনে হয় যেন আর আমাদের দেখা হবে না। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু সত্যই জওহার, কিন্তু আবেগ-উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে কখনো কখনো এমন কথাবার্তা বলেন যেটা তাঁর বলা উচিত নয়। কিন্তু তাঁর ভুল যদি তাঁকে দেখিয়ে দেওয়া যায় তাহলে তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করে নেওয়ার সাহস রাখেন। ‘এসব দেখার জন্য আর কতদিন আমি জীবিত থাকব।’ তিনি বেশিদিন জীবিত থাকেননি। ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি শুক্রবার তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেল, বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রভৃতি গান্ধীর সহকর্মীরা গান্ধীর আদর্শকে কখনই গ্রহণ করতে পারেননি এবং তাঁরা তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে নেতা হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। একথা গান্ধী খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং এখানেই তাঁর সারা জীবনের যে সংগ্রাম তার পরাজয় হয়েছিল। আমাদের কথাবার্তার শেষ পর্যায়ে আমি গান্ধীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পাকিস্তানের বদলে আজ জিন্নাহ যদি তাঁকে তাঁর চোদ্দ দফার প্রস্তাব দেন তাহলে তাঁর মনোভাব কী হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘হাশিম, আমি খুব সাগ্রহে তা গ্রহণ করব।’ শ্রদ্ধার সঙ্গে ও বিনম্র স্বরে আমি মন্তব্য করলাম, ‘মহাত্মাজী, আপনাকে তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, আপনি যখন জিন্নাহর চোদ্দ দফা অগ্রাহ্য করেছিলেন সে সময় ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ আপনার দৃষ্টিগোচর হয়নি।

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →