Main menu

আমীর খুসরো’র ছাপ তিলাক Featured

হজরত আমীর খুসরো রহ. এমন কিছু বিষয়ের প্রবক্তা, যেগুলোর যে কোনও একটির আবিষ্কার-ই যে কাউকে বিখ্যাত ও অমর করে রাখতে সক্ষম। তিনি যে যে বিষয়ের প্রবক্তা:

১. সেতারের বর্তমান রূপ।
২. তবলার বর্তমান রূপ।
৩. অনেক রাগের জনক।
৪. কাওয়ালি।

ফারসি ও হিন্দাভি উভয় ভাষায় তিনি বিপুল পরিমাণ কবিতা, গজল ও গান রেখে গেছেন।
যে গানটি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি সেটি হলো, ‘ছাপ তিলাক’। সুফি তত্ত্বে এই ধরনের গানকে বলা হয় ‘কালাম’।
কালামটি হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রা. এর দরগাহের সামা মজলিস তথা কাওয়ালি বৈঠকের জন্য রচিত।
কালামটি রচিত হয়েছে ৭০০ বছর আগে।

বলা হয়ে থাকে যে, আমীর খুসরো প্রথমবার নিজামুদ্দীন আউলিয়ার মজলিসে এসে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে সেই রাতেই এই গানটি রচনা করেন। এই বর্ণনাটি মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ।

যেখানে তিনি হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়াকে প্রিয়তম হিসেবে এবং নিজেকে তাঁর ভক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন।

কালামটির গভীর অর্থ নিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয়, এটি মূলত একটি বিচ্ছেদ বা দূরত্বের প্রেক্ষাপটে লেখা। গুরু থেকে শিষ্যের আত্মিক দূরত্বের যন্ত্রণা এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা-ই এখানে মূল বিষয়বস্তু। অর্থগুলো বোঝা গেলে আরও ভালোভাবে এর আবেগ ও আবেদনটা বোঝা যাবে।

অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করছি।

ছাপ তিলাক সাব ছিনি রে মোসে ন্যায়না মিলায়কে

তুমি একবার চোখ মিলিয়ে আমার সব কেড়ে নিয়েছো। ‘ছাপ’ হল সিলমোহর। যা সরকারি বা ধর্মীয় পরিচয়চিহ্ন। আবার মুসলমানের কপালে নামাজের চিহ্ন। আর, ‘তিলক’ হলো, কপালের টিপ, হিন্দু ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের চিহ্ন। অর্থাৎ, শুধু দৃষ্টিসংযোগে আমার যাবতীয় পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে গেল। যা আমি ছিলাম। আমার ধর্ম, আমার বর্ণ, আমার সামাজিক মর্যাদা, সব এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে পড়ল। ছাপ ও তিলক, এই দু’টি ভিন্ন ধর্মের পরিচয়চিহ্ন একসাথে উল্লেখ করাটা ইন্টারেস্টিং। খুসরো বলছেন না যে শুধু হিন্দুর তিলক বা শুধু মুসলিমের ছাপ গেছে, দুটোই গেছে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিভাজনের যে কাঠামো সমাজ তৈরি করে, প্রেমের সামনে সেই কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সুফি দর্শনে ফানা হলো আত্মবিলোপ। যা, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থা। নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে ঐশ্বরিক সত্তায় মিলিত হওয়া। এই লাইনে সেই ফানার মুহূর্তটি আছে। শুধু চোখের মিলনে, পরিচয়ের সমস্ত আবরণ খুলে পড়ে গেছে।

আমরা যাকে ‘আত্মপরিচয়’ বলি, সেটি মূলত একটি নির্মাণ। সমাজ, পরিবার, ধর্ম, শ্রেণী মিলিয়ে তৈরি। গভীর প্রেম বা তীব্র আবেগের মুখোমুখি হলে এই নির্মাণটি সাময়িকভাবে ভেঙে যায়। মনোবিশ্লেষণের ভাষায় এটি ‘ego dissolution’। যেখানে নিজের সীমারেখা আর থাকে না। যারা প্রেমে পড়েছেন সকলেই জানেন, কারো চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হয় ‘আমি আর আমি নেই’। আমার পূর্বের সত্তার মৃত্যু ঘটেছে। এর মানে হলো, সেই মুহুর্তে এক নতুন আমি’র জন্ম হলো, এবং আমার পুরনো যে ‘আমি’, তাকে হত্যা করেছে আমার প্রেমিক বা প্রেমিকা। সেই মুহুর্তে নতুন আমার জন্ম। এজন্যই হিন্দাভি বা উর্দু সাহিত্যে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে বলা হয় ‘ক্বাতিল’ বা হত্যাকারী। সেই মুহূর্তে সমস্ত পরিচয়, ইমেজ, আইডেন্টিটি, সব বিগলিত হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে এত বড় রূপান্তর ঘটানো, এটাই খুসরোর কবিত্বের শক্তি। গোটা একটি দার্শনিক সংকট তিনি একটি মাত্র দৃশ্যে তুলে ধরেছেন। কেবল দু’টো চোখের মিলন।

 

বাত আঘাম কেহ দিনি রে মোহসে ন্যায়না মিলায়কে

যে কথা বোঝার অতীত, যা সাধারণ ভাষায় বলা যায় না, সেই অগম্য কথাটি তুমি আমাকে বলে দিলে, শুধু চোখে চোখ মিলিয়েই। ভাষার মাধ্যমে যা ধরা যায় না, যুক্তিতে যেখানে পৌঁছানো যায় না, সেই মহাসত্যে একটিমাত্র দৃষ্টির মাধ্যমেই পৌঁছা সম্ভব। ভাষার সীমা পেরিয়ে যোগাযোগের সর্বোচ্চ রূপ এটাই। চোখে চোখ মেলানো। ‘আঘাম’ শব্দটি এই লাইনের কেন্দ্র। যা বলা যায় না, লেখা যায় না, শেখানো যায় না, সেই জ্ঞান। প্লেটো যাকে বলতেন ‘Ineffable’, উপনিষদ যাকে বলে ‘নেতি নেতি’। অর্থাৎ, এই নয়, এই নয়। সেই সত্য শুধু সরাসরি অনুভবেই পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক গুরু সেটি দিলেন। তবে, কথায় নয়, চোখে। সুফি চিশতিয়া তরিকায় গুরু থেকে শিষ্যে জ্ঞান সঞ্চারের যে ধারণা হলো, ‘তাওয়াজ্জুহ’। এটাই সেই তাওয়াজ্জুহ। মুখের কথায় নয়, দৃষ্টির মাধ্যমে সেই সত্য প্রবাহিত হয়, আত্মা থেকে আত্মায়। গুরুর চোখে যা আছে, সেই জ্ঞান, সেই বিদ্যা, সেই প্রজ্ঞা, সেই রুহানিয়ত না আছে কোনও কিতাবে, না আছে অন্য কোথাও।

এমন কিছু অনুভূতি আছে যা ভাষায় প্রকাশ করলেই এর অর্থ ছোট হয়ে যায়। শোকের গভীরতম মুহূর্তে বা অসীম আনন্দের মুহূর্তে কথা বলতে গেলে মনে হয় যেন সবই আরোপিত।

‘আঘাম’ সেটাই। যা বললে আর সত্য থাকে না, কিন্তু চোখে চোখ রাখলে পৌঁছে যাওয়া যায় সেই অদৃশ্য গন্তব্যে। পুরো কালামের সবচেয়ে দার্শনিকভাবে ভারী লাইন এটা। প্রথম লাইনে পরিচয় গেছে, এই লাইনে তার জায়গায় কী এলো সেটা বলা হচ্ছে। এলো সেই জ্ঞান, যা ভাষার বোধগম্যের বাইরে।

 

বাল বাল জাউঁ মেঁ তোরে রাঙ রেজওয়া
আপনি সি রাঙ দিনি রে মোহসে ন্যায়না মিলায়কে

হে রঙওয়ালা, তোমার উপর বারবার অত্যন্ত মুগ্ধ, বিস্মিত ও অভিভূত হয়ে যাই। তুমি চোখে চোখ মিলিয়ে, তোমার নিজের রঙে রাঙিয়ে দিলে।

‘বাল বাল জাউঁ’ হলো, বারবার কুরবান হয়ে যাই।
‘রাঙ রেজওয়া’ হলো রঙ দেওয়ার কারিগর, রঞ্জক।

‘অপনি সি রাঙ দিনি’ হলো, নিজের মতো রঙ দিলে, নিজের রঙে রাঙিয়ে দিলে। রঞ্জক যখন কাপড় রাঙায়, কাপড়ের আর নিজস্ব রঙ থাকে না। সে পুরোপুরি রঞ্জকের রঙ গ্রহণ করে। এখানে কবি নিজেকে সেই কাপড় বলছেন। প্রিয়জনের সংস্পর্শে এসে নিজের আগের যে রঙ আগের স্বভাব, আগের পরিচয়, আগের চিন্তা সব একাকার হয়ে গেছে। এখন সব রঙ-ই শুধু তাঁরই রঙ।

শব্দটি কিন্তু সাধারণ পেশাদার রঞ্জকের কথা বলছে না। একটা রূপক। যিনি গোটা অস্তিত্বকেও রাঙাতে পারেন। আমার যে ‘নিজস্ব রঙ’ ছিল, সেটা কি আসলেই আমার ছিল, নাকি সেটাও আগের কারো দেওয়া রঙ? সমাজ, পরিবার, ধর্ম, তারাও তো রঞ্জক। খুসরো বলছেন, এতদিন যে রঙ গায়ে ছিল সেটা ছিলো চাপিয়ে দেওয়া, আরোপিত। আর এই রঙটা প্রেমের, এই রঙটা সত্যিকারের।

সুফি পরিভাষায় এই ‘রঙ’ হলো ‘সিবগাতুল্লাহ’। অর্থাৎ খোদায়ী রঙ। কোরআনে সুরা বাকারায় এই শব্দ আছে। “আল্লাহর রঙে রঙিন হও।” খুসরো সেই কোরআনি ধারণাটিকেই হিন্দাভির লোকজ দৃশ্যপটে এনেছেন, রঞ্জকের দোকান, রঙিন কাপড়, চোখের মিলনের মাধ্যমে। ধর্মতত্ত্বকে জীবনের ভেতরে নিয়ে আসার এই ক্ষমতাই খুসরোকে অনন্য করে।

বাল বাল জাউঁ তথা বারবার কুরবান হওয়া যাওয়া, এটা সহজ কথা না। সরলভাবে বললে, কৃতজ্ঞতার চরম প্রকাশ বলা যায়। কিন্তু কীসের জন্য কৃতজ্ঞতা? ব্যপারটা একটু অদ্ভুৎ ও জটিল। কৃতজ্ঞতাটা মূলত নিজেকে হারানোর জন্য কৃতজ্ঞতা। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয় রক্ষার জন্য লড়াই করে, পরিচয় হারালে কষ্ট পায়। কিন্তু এখানে পরিচয় হারানোটাই আনন্দের উৎস। কারণ, যে পরিচয় গেছে সেটা ছিল বোঝা ও সমাজ কর্তৃক আরোপিত। আর যে রঙটা এসেছে, সেটা মুক্তির প্রতীক, সেটা নির্বাণ।

দীর্ঘ সম্পর্কে থাকা মানুষ একসময় টের পান, তার হাসির ধরন বদলে গেছে, রাগের ভাষা বদলে গেছে, এমনকি কোন জিনিসে আনন্দ পান সেটাও বদলে গেছে। প্রিয়জনের রঙ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সেটা টের পাওয়া যায় না, কিন্তু একদিন আয়নায় তাকিয়ে বোঝা যায়। ‘আপনি সি রঙ দিনি’ মূলত অনুভূতিটাই। প্রিয়তমের গুণে গুণান্বিত হওয়া। গুরুর সংস্পর্শে শিষ্য তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো ধীরে ধীরে আত্মস্থ করেন। নিজের মতো করে নেওয়া। আমি আর আলাদা নই, আমি তোমার মতো হয়ে গেছি।

গভীর সম্পর্কে মানুষ পরস্পরের অভ্যাস, ভাষা, এমনকি চিন্তার ধরন গ্রহণ করে। মনোবিজ্ঞানে যাকে mirroring বা identification বলে। এইযে পরিচয়ের চূড়ান্ত রূপান্তর। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে থাকা মানুষ টের পান, কখন থেকে যেন প্রিয়জনের কিছু কথা, কিছু অভ্যাস নিজের ভেতরে ঢুকে গেছে। সেটাই ‘রঙ লাগা’।

পুরো গানে এটিই একমাত্র লাইন যেখানে কবি সরাসরি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন এবং সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তিনি যে পেশাটি বেছে নিয়েছেন সেটি ইন্টারেস্টিং। রাজা নয়, ধর্মগুরু নয়, দার্শনিক নয়, বরং, একজন সাধারণ রঞ্জক। দিল্লির বাজারে যাকে প্রতিদিন দেখা যেত। খুসরো ঐশ্বরিক রূপান্তরকে নিয়ে এলেন পাড়ার রঞ্জকের দোকানে!


গোরি গোরি বাইয়াঁ, হারি হারি চুড়িয়াঁ,
বাইয়াঁ পাকাড় হার লিনি রে মোহসে ন্যায়না মিলায়কে।

ফরসা ফরসা ফরসা বাহুতে সবুজ সবুজ চুড়ি, সেই বাহু ধরে টেনে নিলে আমাকে, চোখে চোখ মিলিয়ে।

গোরি অর্থ ফর্সা। কিন্তু ঠিক য়্যুরোপীয় সাদা ফর্সা না। ভারতীয় অঞ্চলের গৌরবর্ণ। ‘বাইয়াঁ’ হলো বাহু। ‘হারি’ হলো সবুজ। যেমন হাড়িয়ালি চিকেন কাবাব খান, সবুজ বর্ণ, সেই সবুজ। সংস্কৃত ‘হরিত’ থেকে আসা। ‘চুড়িয়াঁ’ মানে চুড়ি। ‘পাহাড় হার লিনি’ অর্থ, ধরে নিলে বা আঁকড়ে নিলে।

পুরো কালামে এটাই একমাত্র সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্য। বাকি সব লাইনগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, সবই অনুভূতির কথা। পরিচয় বিলীন হওয়া, অগম্য কথা শোনা, মাতাল হওয়া, রঙ লাগা। এগুলো সবই ভেতরের ঘটনা। কিন্তু এই লাইনে হঠাৎ বাইরের একটি দৃশ্য আসে। সব মিলিয়ে কালামটিতে এখন পর্যন্ত, রঙ আছে, স্পর্শও আছে। খুসরো বলছেন, এই আধ্যাত্মিক যাত্রা কোনো বিমূর্ত মানসিক ঘটনা না। এটা দেহেও ঘটে, দৃশ্যমান জগতেও ঘটে। তিনি দেহ ও আত্মাকে আলাদা করেননি। আবার, খুসরো যখন ব্রজভাষায় লিখছেন, তখন তিনি জানতেন এই ভাষার প্রতিটি শব্দে কৃষ্ণের কথাও আছে। এমনটাও মনে করেন অনেক ব্যাখ্যাকার। এই দ্বৈততা খুসরো ইচ্ছাকৃত রেখেছেন কিনা নিশ্চিত বলা কঠিন, কিন্তু ব্রজভাষার সাহিত্যিক ঐতিহ্যটিই ছিল মূলত বৈষ্ণব কাব্যের ভাষা।

ভারতীয় দর্শনের মূলধারায়, বিশেষত চিশতিয়া সুফি ঐতিহ্যে, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। পাশ্চাত্য ধর্মতত্ত্বের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে যেখানে দেহকে আত্মার শত্রু ভাবা হয়, সৌন্দর্যকে প্রলোভন ভাবা হয়। খুসরো সেই ঐতিহ্যে বিশ্বাসী নন। তাঁর কাছে ফর্সা বাহু ও সবুজ চুড়ির সৌন্দর্য খোদায়ী সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে না। বরং, সৌন্দর্য-ই খোদার ভাষা। মানুষের যেমন প্রতীকী জিনিসের প্রয়োজন আছে, সৌন্দর্যেরও প্রয়োজন আছে। শুধু আধ্যাত্মিকতা নিয়ে চিন্তা করা-ই যথেষ্ট না। মানুষ আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে শুধু শুনতে চায়না, দেখতেও চায়। ইবরাহীম আলাইহিসসালামের সুন্নতও এটাই।

হযরত ইব্রাহীম আ. আল্লাহর নবী ও খালিল হওয়া সত্ত্বেও, আল্লাহ প্রশ্ন করে বলেন,
হে প্রভু, তুমি আমাকে দেখাও, তুমি কিভাবে মৃতকে জীবিত করো।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইব্রাহীম আ. কে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি বিশ্বাস করো না? ইব্রাহীম আ. বলেন, অবশ্যই বিশ্বাস করি, কিন্তু জানতে চাই। আমার অন্তর যেন প্রশান্তি পায় এই জন্য জিজ্ঞাসা করছি।

যাই হোক, প্রসঙ্গ থেকে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি।

তো যা বলছিলাম।

দেহের মধ্য দিয়েই আত্মার যাত্রা সম্ভব, দেহকে অস্বীকার করে সম্ভব না। তেরো শতকের দিল্লিতে যখন কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী সঙ্গীত ও সৌন্দর্যকে নিষিদ্ধ বলছে, তখন খুসরো একটি আধ্যাত্মিক কালামের মাঝখানে একটি সুন্দর বাহুর বর্ণনা রাখছেন, এই অবস্থান অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সুক্ষ্ম।

‘বাইয়াঁ পকড় হর লিনি’ হলো, বাহু ধরে নেওয়া। মুরিদ হওয়ার নিয়ম হলো গুরুর হাত ধরা বা পাগড়ি বা অন্য কিছুর এক প্রান্তে গুরু ধরে থাকবেন, অন্য প্রান্তে ভক্ত, যিনি মুরিদ হত্ব চলেছেন, তিনি ধরবেন। তবে, সরাসরি হাতে ধরে মুরিদ হওয়া ভক্তের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যপার। এই স্পর্শে একটি অদৃশ্য সংযোগ স্থাপিত হয়. যাকে বলে ‘বাইয়াত’। খুসরো সেই মুহূর্তটিকে একটি বাহু ধরার ছবিতে রূপান্তরিত করলেন। পবিত্রতম ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মুহূর্তটি তিনি কত দারুণভাবেই না কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করলেন।

এখানে আরেকটি স্তর আছে। সবুজ চুড়ি তেরো-চোদ্দ শতকে বিবাহিত হওয়ার পরিচায়ক। বিশ্বাস করা হয় হতো স্বামীর মঙ্গল। অর্থাৎ চুড়ি কিন্তু শুধু অলঙ্কার হিসেবে আটকে নেই। তৎকালীন জীবনব্যবস্থায় এটা মূলত সংযোগের এক ধরনের প্রতীক। আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীনতম সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই কাচের ও পাথরের চুড়ির প্রচলন ছিল। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর খননকার্যে অন্ধ্রপ্রদেশের সিরপুরে উন্নত কাচের চুড়ির নমুনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ তেরো শতকের দিল্লিতে কাচের চুড়ি একটি প্রাচীন ও সর্বজনীন পরিচিত জিনিস ছিল। শুধু রাজকীয় না, সাধারণ মানুষের।

বিশেষত বর্ষার মৌসুমে এবং হোলির সময়ে সবুজ চুড়ি পরার রেওয়াজ ছিল ব্যাপক। এই দৃশ্যটি দিল্লির যেকোনো বাজারে, যেকোনো ঘাটে দেখা যেত। খুসরো সুফি দর্শনকে নিয়ে এলেন সেই চেনা দৃশ্যের ভেতরে। যেন বলছেন, খোদা দূরে নয়, তিনি এই চুড়ির রঙেও আছেন। তবে আমার মনে হয়, এই চুড়ি যে বিষয়ের পরিচায়ক, অর্থাৎ, এই মানুষটা আমার। অন্য কারোর না।

আধুনিক জেন-জির হিসেবে যদি বলি, যদি এর অর্থ হলো, Booked, Engaged. শায়খ-মুরিদ বা গুরু-শিষ্যর মধ্যে যে সম্পর্ক, সেখানে ভক্ত মনে করে, গুরু শুধু তার। এটা যে শুধু মুখে বলে, তা না। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, ধারণ করে।

চট্টগ্রামের হজরত সৈয়দ সুলেমান শাহ রা. এর একটা কালাম আছে। নয়নে নয়নে রাখিবো। সেখানে এমন কিছু লাইন আছে, যেখানে বলা হয়, গুরু শুধু আমার। আর কারও না। এটাকে শুধু জেলাসি বললে ভুল হবে। এটা আদতেই তারা মনে করেন। যেমন কিছু লাইন আছে।

হৃদাসন সাজাইয়া রাখবো তোরে শুয়াইয়া
আর কারো রে চাইতে দিতাম নারে দয়াল
তোরে পাইলে, নয়নে নয়নে রাখিবো

কলিজার খুন দিয়া রাঙাচরণ ধোয়াইয়া
মাথার চুলে মুছাইয়া লইবো রে দয়াল
তোরে পাইলে, নয়নে নয়নে রাখিবো

গোপন কথা তোরে কইবো মনের দুঃখ বুঝাইব
আর কারোরে শুনতে দিতাম নারে দয়াল
তোরে পাইলে, নয়নে নয়নে রাখিবো

এ যে আমি সিন্দুক হবো, তালা কুড়ি লাগাইবো
অন্যকাউরে দেখতে না দিবো
বাবা তোরে পাইলে, নয়নে নয়নে রাখিবো

এ যে আমি শিকল হবো, পায়ে বেড়ি লাগাইবো
অন্যদিকে যাইতে না দিবো,
বাবা তোরে পাইলে নয়নে নয়নে রাখিবো

 

এরকম করেই, তিনি শুধুই আমার। অথবা, তিনি আমার জন্য যেরকম, অন্য কারও জন্য এমন নন, এই প্রবল ধারণার প্রকট প্রকাশ এটা। খুসরো সেই চিরপরিচিত দৃশ্যটি নিলেন এবং আধ্যাত্মিক কবিতার ভেতরে স্থাপন করলেন।

এখানে একটি সূক্ষ্ম মনোবৈজ্ঞানিক সত্য আছে। বাহু ধরেছে কে? প্রিয়জন। কবি নিজে ধরেননি। তিনি ধরা পড়েছেন। এই নিষ্ক্রিয়তা ইচ্ছাকৃত। কারণ, গভীর রূপান্তর কখনোই নিজের চেষ্টায় আসে না, সেটা ঘটে যায়। ব্যাস।

আপনার সাথে কখনও কি এমন হয়েছে? কেউ হঠাৎ হাত ধরেছে এবং সেই মুহূর্তে সমস্ত চিন্তা থেমে গেছে? কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কোনো অতীত নেই। শুধুই বর্তমান। আর বাকিসব চিন্তা অমূলক সবই অর্থহীন। রএকমাত্র সত্য হলো সেই উষ্ণতা। এই লাইনটি সেই মুহূর্তের কথা বলছে এবং সেই মুহূর্তে চোখে চোখ মিলানোর বিষয়টাকে গভীর করে দেয়। স্পর্শ ও দৃষ্টি একসাথে। মানুষের পক্ষে বেশিমাত্রায় উপস্থিত থাকা সম্ভব না।

গানের কাঠামোর দিক থেকে এই লাইনটি একটি অপরিহার্য মুহূর্ত। এতক্ষণ সব অদৃশ্য ঘটনার কথা ছিল। মানে, সবই ভেতরের জগতে। এখানে হঠাৎ বাইরের জগত আসে, রঙ আসে, স্পর্শ আসে, শরীর আসে। এই দৃশ্যটি না থাকলে গানটি সম্পূর্ণ বিমূর্ত হয়ে থাকতো। তাতে কোনও অসুবিধাও হতো না। কিন্তু এই বিষয়ের উল্লেখ না থাকলে, সাধারণ পাঠকের কাছে এটা অধরা-ই থেকে যেত। খুসরো জানতেন, যে সত্য শুধু দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে সে সত্য সাধারণত মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায় না।

হাড়ি হাড়ি চুড়িয়া লাইনটার একটা হাইপোথিটিকাল ব্যাখ্যা হলো, আব্বাসীয় আমলে আহলে বাইতের রঙ ছিল সবুজ। সেই রঙকে আপন করার একটা চেষ্টাও ছিল হজরত আমীর খুসরোর। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।

আর, ‘বাইয়াঁ পকড় হর লিনি’ অর্থাৎ বাহু ধরে নেওয়া হলো একটি উপমা। সুফি ধারায়, গুরুর দৃষ্টিকে বলা হয় ‘তাওয়াজ্জুহ’। সে এক রহস্য। একজন গুরুর দৃষ্টিপাত, শিষ্যের হৃদয়ে এক বিশেষ আত্মিক সখ্যতার জন্ম দেয় ।যাকে বলে ‘নিসবত’।
ফার্সি একটা শের মনে পড়ছে।

এক জামানা সুহবতে বা আউলিয়া
বেহতারাজ সাদ সালে তাওয়াত বেরিয়া

অহংকারবিহীন হাজার ইবাদতের রাত থেকেও,
কোনও ওলীর সাথে এক মুহুর্ত থাকা উত্তম।

অর্থাৎ, ধ্যানমগ্নতার চেয়েও গুরুর একটি দৃষ্টি বেশি মূল্যবান।

খুসরু নিজাম কে বাল বাল জাইয়ে
মোহে সুহাগান কিনি রে মোহসে ন্যায়না মিলায়কে

হজর‍ত আমীর খুসরু বারবার তাঁর শায়খ হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার জন্য বারবার কুরবান হয়ে যান। আর খুসরোকে নিজের করে নিলেন, ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে নিলেন। আপন করে নিয়ে, এমনভাবে গ্রহণ করলেন যেন খুসরো নিজামেরই হয়ে গেলো!

‘বাল বাল জাইয়ে’ হলো, বারবার কুরবান যাই।
‘সুহাগান’ হলো, সধবা নারী, সৌভাগ্যবতী, পরিপূর্ণা।
‘কিনি’ অর্থ, কিনে নিলেন, অধিকার করে নিলেন।

একজন পুরুষ কবি নিজেকে ‘সুহাগান’ অর্থাৎ সধবা নারী বলছেন। ব্যপারটা ইন্টারেস্টিং। আবার ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। এটা পড়ে অনেকে থমকে যান। কেউ মনে করেন এটি লিঙ্গ-বিভ্রান্তি, কেউ মনে করেন এটি রূপকথার অতিরঞ্জন, কেউ আবার এতে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু এই বিভ্রান্তিটি তৈরি হয় কারণ আমরা শব্দটিকে সেই যুগের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে না পড়ে আধুনিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে পড়ি।

মূলত ‘সুহাগান’ এখানে লিঙ্গের কথা বলছে না।
এক ধরনের আধ্যাত্মিক অবস্থানের কথা বলছে।

কেন ‘সুহাগন’?
এই প্রশ্নের উত্তর আগে দরকার।
প্রথম কথা হলো, কবির ইচ্ছা। ব্যাস।
এরপর আমাদের ব্যাখ্যা আছে।

ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনে এবং চিশতিয়া সিলসিলায়, একটি সুপ্রাচীন ধারণা আছে। গুরুর সামনে সাধকের কোনো ‘পুরুষ’ বা ‘স্বামী’ খোলসের কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ, প্রভুত্ব, অহংকার, এসব থাকে না।

‘আমি খুব জানি, খুব পারি’ এসব ভাব হলো, আধ্যাত্মিক সমর্পণের পথে বাধা। সেই সমর্পণ প্রকাশ করার জন্য সাধকরা নিজেকে অন্য রূপে ভেবে নিতেন। কারণ সেই সংস্কৃতিতে নারীত্বের সাথে যুক্ত ছিল কোমলতা, নিরহংকার ইত্যাদি বিশেষণ।

আমি ভাবতাম এই বুঝি খুসরোর একক আবিষ্কার। কিন্তু, একটু পড়ালেখা করে দেখলাম তা না। ভারতীয় সাহিত্যের দিকে তাকালে মীরাবাই, কবীর সহ অনেকেই এই ধারণা নিয়ে লিখেছেন। তুকারাম, জ্ঞানেশ্বর সহ মারাঠি ভক্তি সন্তরাও এই ঐতিহ্য অনুসরণ করেছেন। ফার্সি সুফি কবিতায় রুমি থেকে শুরু করে বহু কবি নিজেকে প্রিয়তমের সামনে ‘প্রেমিকা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

আর, শায়খুল আকবর ইবনুল আরাবী খোদার ধারণাকে যেরূপে ব্যাখ্যা করেন, তা এখন আর না বলি।

তো যা বলছিলাম।

এটা মূলত একটা দীর্ঘ, সুপ্রতিষ্ঠিত, গভীরভাবে সুচিন্তিত আধ্যাত্মিক কাব্যিক ঐতিহ্য।
‘সুহাগন’ কিন্তু শুধু ‘সধবা নারী’ না।
এই শব্দে কয়েকটি অর্থ একসাথে বাস করে।

প্রথমত, সুহাগন মানে যাকে কেউ বেছে নিয়েছে। বিধবা বা অবিবাহিতার বিপরীতে সুহাগন সেই নারী, যে প্রেমপ্রাপ্ত, যাকে কেউ চেয়েছে, যাকে কেউ গ্রহণ করেছে। খুসরো বলছেন, হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া আমাকে বেছে নিয়েছেন, আমি মনোনীত।

দ্বিতীয়ত, সুহাগন মানে যার জীবনে পূর্ণতা আছে। মানে, এক ধরনের সম্পূর্ণতার প্রতীক। খুসরো বলছেন, নিজামুদ্দীনের সংস্পর্শে আসার আগে আমি অসম্পূর্ণ ছিলাম, এখন পূর্ণ।

তৃতীয়ত, সুহাগন মানে, যে সমর্পিত। যার জীবনে একটি কেন্দ্র আছে, যার চারদিকে সমস্ত জীবন আবর্তিত হয়। সেখানে সবসময় বসন্ত। খুসরোর জীবনে, সেই কেন্দ্র নিজামুদ্দীন আউলিয়া।

চতুর্থত, সুহাগন শব্দে একটি সামাজিক সম্মান আছে। মানে এটা কোনও লুকানো বা লজ্জার সম্পর্ক না। একইসাথে প্রকাশ্য, স্বীকৃত ও সম্মানিত। খুসরো বলছেন, আমার এই সম্পর্ক লুকানোর নয়, এটি ঘোষণা দেওয়ার মতোই সম্পর্ক।

‘কিনি’ হলো, কিনে নেওয়া।
এই শব্দটি নিয়ে আলাদাভাবে ভাবা দরকার।

লেখাটা বড় হয়ে গেছে। তবুও ভালোভাবে ভেবে, লিখেই শেষ করা দরকার।

ক্রয়-বিক্রয়ের ধারণায় একজন সক্রিয়, অন্যজন নিষ্ক্রিয়। যে কেনে, সে বেছে নেয়, মূল্য দেয় ও অধিকার নেয়। যাকে কেনা হয়, সে সমর্পিত হয়। আধুনিক ইগোয়িস্টিক ইন্ডিভিজুয়ালিজমের জগতের দৃষ্টিতে, এটা হয়তো অস্বস্তিকর শোনাতে পারে। কারণ, ‘কেনা’ শব্দের সাথে দাসত্বের ইতিহাস জড়িত।

কিন্তু, এখানে ‘কিনি’ শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এটা মোটেই দাসত্বের ভাষা তো নয়-ই বরং, ভক্তির ভাষা বলা যায়। ‘আমাকে কিনে নাও’ মানে, ‘এই আমিটাকে গ্রহণ করে সম্পূর্ণ করো’। আমার আর নিজের কাছে ফেরার পথ না থাকুক। এই স্বেচ্ছায় নিজেকে বিকিয়ে দেওয়ার বিষয়টা আমাদের কলোনিয়াল মাইন্ডসেটে ঢোকানো কঠিন। অথচ এটাই আনন্দময় এবং মুক্তিদায়ক।

এই বিকিয়ে দেওয়ার দর্শনটা বলতে গিয়ে একটা কবিতা মনে পড়ে গেলো। কিন্তু সেই কবিতা বলার একটা প্রেক্ষাপট আছে, একটা ঘটনা আছে। আগে সেটা বলি।
হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানক্বাহতে এক বড় লঙ্গরখানা ছিলো। হাজারো মানুষ সেখানে খাবার খেতে পেতেন। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গভেদে সকলে খাবার খেতে পেতেন। কোনও খাবার আগামীদিনের জন্য রাখা হতো না। সবাইকে দিয়ে দেওয়া হতো।

একদিন অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো এবং ইতোমধ্যে সব খাবার সবাইকে বন্টন করা হয়ে গিয়েছিলো। এক গরীব লোক খাবারের আশায় যখন হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানক্বাহে এসে পৌঁছালেন, যখন হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সামনে আসলেন, তখন হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া নিজের চোখ লজ্জায় নিচে নামিয়ে ফেললেন!

নিচের দিকে হাতড়ে এক জোড়া ছেড়া জুতা পেলেন। হঠাৎ করে তিনি বললেন, ‘এটা যদি তোমার কোনো কাজে লাগে, তাহলে নিয়ে যাও।’
সেই লোক মনে মনে বললেন, আমি রুটি খেতে এসেছিলাম, আমাকে দুটো জুতা ধরিয়ে দিয়েছেন! তবুও কিছু করার ছিলো না। তিনি সেই জুতা নিয়েই উলটো পথে হাটা শুরু করলেন।

বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক হোটেল দেখলেন। সবাই খাচ্ছে। যদিও তিনি অতিরিক্ত ক্ষুধার্ত ছিলেন, তবু কিছু করার ছিলো না। সেদিকে তাকিয়ে ‘হা’ করে তাকিয়েছিলেন!

অন্যদিকে হজরত আমির খসরু। যিনি দরবারের শায়ের ছিলেন৷ তখন কবিরা ছিলেন অভিজাত শ্রেণির। কবিতা লিখতেন, বেতন পেতেন। সুলতানের নিকট চাকুরী করতেন। যেখানে যেখানে সুলতান যেতেন, সেখানে সেখানে সুলতানের পেছনে পেছনে যেতেন। কোনো জায়গা জয় করার পর, মালামাল ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন।

তো, এরকম কোনো রাজভভ্রমণ থেকে তিনি ফিরছিলেন এবং আমির খসরু’র কাফেলায় ১০ টি ঘোড়া সামনে এবং ১০ টি উট পেছনে ছিলো। এবং প্রত্যেক টা ঘোড়া ও প্রত্যেকটা উটের মধ্যে স্বর্ণ, হিরা, মুক্তা, জহরত সব দামী দামী জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো।

যখন আমীর খসরুর কাফেলা ঐ হোটেল এর কাছে দিয়ে যাচ্ছিলো, আমীর খসরু হঠাৎ লম্বা নিঃশ্বাস নিলেন। একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন।
বুয়ে শেইখ মি আয়াদ।
আমার হজরতের সুঘ্রাণ আসছে!

আমীর খসরু আশপাশে তাকিয়ে সেই সুঘ্রাণ তথা সেই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যান, যার কাছে সেই ছেঁড়া জুতা ছিলো। ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করছেন, তোমার কাছে আমার শেইখ এর কোনও জিনিস আছে?

ঐ লোক ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, কী গারীব নেওয়াজ, গারীব নেওয়াজ বলা শুরু করছো! গিয়েছিলাম দুটো রুটির খোঁজে, তোমার হজরত আমাকে দু’টো জুতা হাতে ধরিয়ে দিলো!

খসরু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, বাহিরে আমার কিছু উট আর ঘোড়া দাঁড় করানো আছে, সেগুলোতে কিছু স্বর্ণ টর্ণ, হিরা টিরা, মুক্তা টুক্তা জহরত আছে, ঐসব নিয়ে যাও, আমার হজরত এর জিনিস আমাকে দিয়ে দাও!

ঐ লোক হা করে তাকিয়ে থাকলো। সাথে সাথেই খসরুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে জুতাজোড়া দিয়ে দিলেন। আর, আমীর খসরু এখন সেই ছেড়া জুতাজোড়া নিয়ে নিজের মাথায় রেখে, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারের দিকে দৌড়াতে থাকে!

আচ্ছা, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া ভালোবেসে আমীর খসরুকে ‘তুরকাল্লা’ বলে ডাকতেন। তুরকাল্লা অর্থ আল্লাহর সিপাহি, আল্লাহ’র সৈনিক।

তো, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া খানক্বাহ থেকে দেখছেন, খসরু দৌড়তে দৌড়তে আসছে। খসরুকে আসতে দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘ওওও তুরকাল্লা, তোমার যাত্রা থেকে আমার জন্য কী নিয়ে এসেছো?

খসরু তাড়াতাড়ি আসলো এবং তাঁর নিজের পাগড়ী খুলে, ঐ জুতাজোড়া নিজের শেইখ এর কদমে, হজরত এর পায়ে রেখে দেন। হজরত অবাক হয়ে বলছেন, ‘আরে! এগুলো তুমি কোথায় পেলে?

তারপর খসরু, সেই গরীব লোকের সাথে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা খুলে বলেন। যা শুনে হজরত এর চোখে পানি চলে আসে এবং তিনি খসরুকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, ভালোই সস্তায় পেয়ে গেছো!

এতোকিছু দিয়েও সস্তায় পেয়ে গেছে কেন বললো?

এখন সেই কবিতাটা বলছি, যেটার জন্য এই গল্পটা বললাম।

‘সিস দিয়ে আগার গুরু মিলে,
তো ভি সাস্তা জান!’

জীবন দিয়েও যদি আমি গুরু পাই,
তাহলেও এই জীবনটা সস্তা।

বাংলায় আমরা বলি ‘তোমার কাছে বিকিয়ে গেছি’, এই কথাটা কেউ জোর করে বললে অপমান হবে। কিন্তু, প্রেমে পড়ে বললে, এই একই কথাই হয়ে যায়, সর্বোচ্চ আত্মনিবেদনের ঘোষণা। খুসরো সেই অর্থেই বলছেন।

এই কালামের গানের সমাপ্তিতে একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হয়। প্রথম লাইনে যে পরিচয় গিয়েছিল, অর্থাৎ, ছাপ ও তিলক, সেই শূন্যতা এখানে পূর্ণ হলো। কিন্তু নতুন পরিচয়টা আর আগেরটার মতো বাইরে থেকে আরোপিত না। আগেরটা ছিল সমাজের দেওয়া, শ্রেণীর দেওয়া। আর এটা প্রেমের ভেতর দিয়ে খুঁজে পাওয়া।
“আমি নিজামের, আমি সুহাগন।”

এই নতুন পরিচয়টায় কোনও হারানোর ভয় নেই। কারণ এটা তো কোনও বাহ্যিক চিহ্নের উপর নির্ভরশীল না যে, কেউ ছাপ কেড়ে নিতে পারে বা তিলক মুছে দিতে পারে। প্রেমের ভেতরে যে পরিচয় সেটা অপ্রকাশ্য, অনির্বাণ।

খেয়াল করলে দেখবেন, পুরো গানটি আসলে একটি দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর।

“আমি কে?”

প্রথম লাইনে সমাজের উত্তরটা কিন্তু মুছে গেছে।
দ্বিতীয় লাইনে ভাষার উত্তর অপ্রতুল বলে প্রমাণ হয়েছে।
তৃতীয় লাইনে বিচারবুদ্ধির উত্তর মাতালতায় ডুবে গেছে।
চতুর্থ লাইনে রঙওয়ালার রঙে পুরনো রঙ ঢেকে গেছে।
পঞ্চম লাইনে স্পর্শে সীমারেখা মুছেছে।
এবং এই শেষ লাইনে অবশেষে উত্তর এলো।
আমি সে-ই, যাকে প্রেম বেছে নিয়েছে।

ব্যক্তিসত্তার দার্শনিক সংকটের কী অসাধারণ সমাধান! পশ্চিমা দর্শনে দেকার্তে বললেন “আমি ভাবি, তাই আমি আছি।” খুসরো বললেন, “আমাকে ভালোবাসা হয়েছে, তাই আমি আছি।”
অর্থাৎ, এখানে অস্তিত্বের প্রমাণ চিন্তায় নয়, প্রেমে।

চিশতিয়া তরিকায় দীক্ষা বা বায়াতের সম্পর্কটা বিবাহের রূপকে বোঝানো হয়। গুরু শিষ্যকে গ্রহণ করেন, মানে, একটা আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। শিষ্য, গুরুর কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত। আর, গুরু, শিষ্যের দায়িত্ব নেন।

‘মোহে সুহাগন কিনি রে’, এই একটি লাইনে দীক্ষার পুরো রহস্যটা আছে। নিজামুদ্দীন খুসরোকে কিনে নিয়েছেন, অর্থাৎ গ্রহণ করেছেন, দায়িত্ব নিয়েছেন, পথ দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এবং খুসরো সুহাগন হয়েছেন অর্থাৎ সমর্পিত হয়েছেন, পূর্ণ হয়েছেন, সেই সম্পর্কে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন।

এখানে আরেকটি সুফি স্তর আছে। নিজামুদ্দীন আউলিয়া নিজে আল্লাহর ওলী। আল্লাহর বন্ধু। তাঁকে পাওয়া মানে খোদার কাছাকাছি যাওয়া। ‘সুহাগন’ হওয়া মানে খোদার সাথে সম্পর্কে পূর্ণতা পাওয়া। ফলে, এটা সেই আত্মা পরমাত্মার বিষয়। কেবল শুধু গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক না।

কালামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি মনোবৈজ্ঞানিক যাত্রা আছে, যা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। শুরুতে পরিচয় হারানো, এটা যেকোনো মানুষের কাছে ভয়ের। পরিচয় হারালে মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়, বিপর্যস্ত হয়। কিন্তু এই গানে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি হারানোর পরে একটি গভীরতর লাভ আছে। পরিচয় গেছে, কিন্তু অগম্য সত্য এসেছে। রঙ গেছে, কিন্তু নতুন রঙ এসেছে। নিজের কথা বলার সুযোগ গেছে, কিন্তু মাধুর্য এসেছে। বিচারবুদ্ধি গেছে, কিন্তু মাতালতার স্বাধীনতা এসেছে।
এবং শেষে, সমস্ত কিছু হারানোর পর, একটি নতুন, অটল পরিচয় এলো। ‘আমি সুহাগন।’

মনোবিজ্ঞানে এই যাত্রাটিকে বলা যায় ‘ego death and rebirth’। অহংকারের মৃত্যু এবং নতুন সত্তার জন্ম। প্রক্রিয়াটা ভয়ের, কিন্তু যেখানে পৌঁছানো যায়, সেই স্থিরতা আগের চেয়ে অনেক গভীর।কারণ, আগের পরিচয় ছিল বাইরের, এই পরিচয় ভেতরের।

কালামটিকে শুধু প্রেম, বিরহ বা ভক্তিগীত বললে কম হয়ে যাবে। এটা এক ধরনের আত্মজীবনী। সাত শো বছর পরেও যখন কেউ এই কালাম গায়, তখন খুসরোর সেই চরম রূপান্তরের মুহূর্তটি আবার জীবিত হয়ে ওঠে এবং শ্রোতার নিজের জীবনের কোনো না কোনো ‘সুহাগন হওয়ার মুহূর্ত’টাও জেগে ওঠে। এটাই এই কালামের বড় শক্তি।
এই কালামের কোনও নির্দিষ্ট ব্যকরণ নাই। কোনও মোড়লপনা নাই। স্বাধীন ভাবে যে কেউ, যেভাবে ইচ্ছা গাইতে পারে, গেয়েছে। আমরা গাচ্ছি এবং কেয়ামত পর্যন্ত লোকে গাইতেই থাকবে।

The following two tabs change content below.
Avatar photo

শেখ ফাহিম ফয়সাল

ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা, সংখ্যাতত্ত্ব, সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি করি। 'সুফি সংস্কৃতি' নামে একটা বই লিখেছিলাম। এর বাইরে গান গাই।
Avatar photo

Latest posts by শেখ ফাহিম ফয়সাল (see all)

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →