আসকর আলী পন্ডিত
আসকর আলী পন্ডিতের (১৮৪৬/৫৫ – ১৯২৭) নাম অনেকে না জানলেও উনার গান অনেকেই শোনার কথা; আর যেইভাবে উনারে পরিচয় করায়া দেয়া হয় – লোক-কবি, চিটাগাংয়ের আঞ্চলিক কবি, বা বাউল, পুথি-রচয়িতা… এইসব পরিচয়ের ভিতর দিয়া ‘আদার’ কইরা রাখার ঘটনা’টাই বেশি ঘটে, যার ফলে উনি এবং উনাদের (কানু শাহ > আসকর আলী পন্ডিত > গফুর হালি…) ট্রেডিশন যেন ‘বিস্মৃত’ একটা ঘটনা – এইভাবে আরো ধামাচাপা দেয়ার কাজটাই বেশি করা হয়
মানে, আসকর আলী পন্ডিত যখন সাহিত্য করতেছেন তখন মীর মোশাররফ হোসেন’রা সাহিত্য করতেছেন, কিনতু আসকর আলী পন্ডিত যেহেতু ওরাল ফরম্যাটে আছেন, এবং রিটেন ফরম্যাটে এভেইলেবল না – উনার আর্ট-ওয়ার্কগুলা যেন ‘সাহিত্য’ না! এমনকি বব ডিলানও নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পরে উনার লেকচারের হেডলাইন দিছিলেন, “আমার গান কি সাহিত্য?” এবং একভাবে বলার চেষ্টা করছেন যে, উপন্যাস-কবিতার যেই সাহিত্য সেইটার লগে উনার গানের লিরিকসের হয়তো একটা রিলেশন থাকতে পারে কোন না কোনভাবে; তো, একইভাবে, প্রি-কলোনিয়াল পিরিয়ডের সাহিত্য-উপাদানগুলারে আমরা যেইভাবে আধুনিকতার নামে ভূতের মতো তাড়াইছি, এইটা একটা সমস্যার জিনিস তো!
তো, আসকর আলী পন্ডিতের গানগুলার বেশিরভাগই ইউটিউবের নানান গান থিকা নেয়া হইছে (আমাদের জন্য কাজটা করে দিছেন হুসাইন হানিফ), এবং একেক জন তো একেকভাবে গাইছেন উনার গানগুলা, যার ফলে খুব বেশি অথেনটিক না লিরিকসগুলা, এমনকি কিছু জায়গায়, শব্দে ভুলও থাকতে পারে কিছু, কেউ জানাইলে, অই ভুলগুলা আমরা ঠিক কইরা নিবো…
আর উনার দুই-একশ গান এখনো কোথাও থাকার কথা, অইগুলা একসাথে কইরা গানগুলা ছাপাইলে একটা ভালো কাজ হবে বইলা আমরা মনে করি
এইখানে উনার ১০-১২টা গান পড়তে পারেন!
এডিটর, বাছবিচার
…
কি জ্বালা দি গেলা মোরে ।। ডালেতে লড়ি চরি বইও চাতকী ময়নারে ।। মাধব বৈরাগীর ভাবে প্রাণ জ্বলে ।। বাড়ির পিছে শঙ্খ নদী ।। গনার দিন তো যারগোই ফুরায় ।। সন্ধ্যাকালে আইলাম বাজারে ।। একসের পাবি দেড়সের খাবি ।। নিত্য দেখি কুস্বপন ।। মধু আছে কন ফুলে ।। বসে রইলিরে মন কার আশে ।। কেউওরে ন বুঝাইম রে পরান বন্ধু কালা ।। রসের যৌবন আমার শেষ করি ।। রসের মালিনী ।।
…
কি জ্বালা দি গেলা মোরে
কি জ্বালা দি গেলা মোরে
নয়নের কাজল পরানের বন্ধুরে,
ন দেখিলে পরান পুড়ে।
না রাখি মাটিতে, না রাখি পাটিতে,
না রাখি পালঙ্কর উপরে
শিরেরও উপরে রাখিব বন্ধুরে,
বেড়িয়া রেশম ডোরে।
বন্ধু পরবাসী, পরের ঘরে আসি,
এত ঘুমে কেনে ধরে
কোয়েলা হর ধ্বনি, পোহাইল রজনী,
না ডাকি ননদিনীর ডরে।
চন্দন গাছের কাষ্ঠ
বেকতুন করিলাম নষ্ট
কলসি ঘামি ঘামি পড়ে
কলসি ঘামিয়া চুলা গেইল ভিজিয়া
ফু দিলে আগুন নাহি ধরে
মুরালি দিপ দিয়া যারগই শাম বন্ধুয়া
আমি রইলাম রান্ধন ঘরে
কিসেরও রান্ধনও কিসেরও বাড়নও
পরানে ধড়ফড় ধড়ফড় করে
নারীর প্রেম গাছে, কি টোনা কইরাছে,
বস্ত্র খসি খসি পড়ে
কহে আসকর আলী, সাধু শত জনে,
বৈরাগী বানালি আমারে।
ডালেতে লড়ি চরি বইও চাতকী ময়নারে
ডালেতে লড়ি চরি বইও চাতকী ময়নারে
গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও।
ওরে ও চাতকীর ময়না, অঙ্গ তর কালা
তর মনে আর আর মনে এক্কই প্রেমের জ্বালা।
গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও
মনে হইলে চাতকিনি নদীর ফানি খাইও
ফুলো মধু খাইত চাইলে, ফুলও বনে যাইও
চাতকী ময়নারে, গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও
উত্তর মুখী হইলেরে ময়না
জরত ভিজি যায়
পশ্চিম মুখী বইলেরে ময়না
রইদে জ্বলি যায়রে, রইদে জ্বলি যায়
দকখিন মুখী বইলেরে ময়না
শীতে খাইবো চাইও
পুব দি আইবো পরান বন্ধু
আগে মোরে কইও।
গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও
অষ্ট অলংকারও বন্ধু তুলিয়া দিয়ুম গায় রে বন্ধু
পাটের শাড়ি পিন্দিরে চাইয়ুম অঙ্গ না জুড়ায়
কয় হীন আসকর আলী, একদিন দুইদিন পরে
মাধব বৈরাগীর সনে, পরাণ বন্ধুয়ার সনে
মিলায় দিয়াম তোরে, চাতকী ময়না রে
গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও
মাধব বৈরাগীর ভাবে প্রাণ জ্বলে
মাধব বৈরাগীর ভাবে প্রাণ জ্বলে
দেখিম কন ছলে।
মাধব বৈরাগী যদি তনাগির হইতো
আমার আশা ফুরাইতো।
মোহন মধুর সুরে কুলবতীর মন টলে
দেখিম কন ছলে।
বন্ধু আছে দূর দেশে
মুই থাকিম ঘরে, একলা পালঙ্কের পরে
মনে হয় বন্ধুয়ার সনে বসি থাকিম তাল তলে
দেখিম কন ছলে।
আড়া পাড়া ছাড়ি রে বন্ধু কদম তলে রয়
হীন আসকর আলী হয়
চোখ থাকিতে পন্থ চিনো
কি করিবা দিন গেলে।
মাধব বৈরাগীর ভাবে প্রাণ জ্বলে
দেখিম কন ছলে।
বাড়ির পিছে শঙ্খ নদী
বাড়ির পিছে শঙ্খ নদী
গুরাব জল ভরিত যাইও
কলসি ফুরায় আইবার সময়
আছাড় খাইবার চাইও
সন্ধাবেলা তোরে হোনে দিলো চম্পা ফুল
বাড়ির পাছে শাকেরই খেত
গুরাব শাক তুলিত যাইও
শাকের ভিতর বাঘর বাচ্চা
ঝাপটা দি বুঝাইও
জাপটা দিবো চাইও
বাড়ির রাম কলার গাছ
গুরাব পথ চিত্তো যাইও
পাতা ধরি টান মারিলে
চিত হই পড়বার চাইও
গনার দিন তো যারগোই ফুরায়
গনার দিন তো যারগোই ফুরায়
আর তো ফিরি ন আইবো
অসময়ে হাদিলে আর কী হইবো।
হালত যেন আইয়ের জোয়ার আবার ভাডা পরে
মানুষ তো ভাই এই দুনিয়াত জনমে আবার মরে।
চিরস্থায়ী হলোকিয়া এই দুনিয়াত নত আইবো
অসময়ে হাদিলে আর কী হইবো।
দুনিয়া মুসাফিরহানা রাকিস মনোত ডর
একদিন ছাড়ি যাইতে হইবো সুখর বাড়িঘর।
ফোয়া মাইয়া ভাই বেরাদর কোনো কামত ন আইবো।
অসময়ে হাদিলে আর কী হইবো।
সময় থাকতে কয় রে আস্কর, জপো আল্লার নাম
পরহালে শান্তি পাইবা, পাইবা রে আরাম।
টিয়া পয়সা ধন সম্পত্তি সঙ্গে ও ভাই ন যাইবো
অসময়ে হাদিলে আর কী হইবো।
সন্ধ্যাকালে আইলাম বাজারে
কি লইয়া যাইওম ঘরে
সন্ধাকালে আইলাম বাজারে
বেচাকেনা কইত্তাম গেলে আসল টাকা লাগব রে
সন্ধাকালে আইলাম বাজারে।
রঙের বাজার কেহ বেচে কেহ কিনে কেহই ঘরে যায়
কেহ হাসে কেহই কান্দে আসল টাকার নাশ করে।
হিসাব না করি আমি অল্প দরে রঙ বাজারে মাল দিলাম ছাড়ি
বেপারিয়ে পাই কি ন পাই মূলধন নিয়ে ন ছাড়ে।
আসকর আলী কয় রে ও মন
রঙ বাজারে লাভের বেচা ভাগ্য কোণ্ঠে পাই।
আসল টাকা হানি করি
দেশো যাইতে ডর করে।
একসের পাবি দেড়সের খাবি
এক সের পাবি দেড় সের খাবি ঘরোত নিবি কি
প্রাণের ফকিরা রে।
ইল্লাল্লাহ ইল্লাল্লাহ করি আন্দার বাড়ি যায় ফকিরা ভেতর বাড়ি যায়,
মুরুব্বীরা না থাকিলে বৌদের খুসলায়
বোনও ডাকো মা’ও ডাকো আরো ডাক ও খালা
তার পরেতে খুলে বল আস্তে আস্তে খুলে বল মনের যত জালা
যার বাড়ি যাস ফকিরা তার বাড়ির গম
বিদেশি ফকিরাগুলি ভিক্ষা দিল কম।
হাতত রাখোস তছবি ছড়া
গলাত রাইক্কোস মালা,
ঘরত পিন্দোস শাল দো শালা
বাইরে পিন্দোস ছালা.
রঙের ফকিরা রে।
ফকিরার পদতলে আসকর আলী হয়
যার বাড়ি যাবি বিধি তার বাড়ির জয়।
নিত্য দেখি কুস্বপন
আমি নিত্য দেখি কুস্বপন
প্রেমানলে নারীর দহিল যৌবন।
এ রাজ্য ছাড়ি কোন দেশে গেল বন্ধুয়া
হান্দিয়া মরি
কোন কামিনী ধরে গেলে রে
আমায় কে করিবে এই যতন
যুগিনীর বেশেতে
যথা রইল বন্ধু আমার যাবো সেই দেশে
অষ্টগিরি অর্ধচারি রে বন্ধু
আমি জিজ্ঞাসিব জনে জন
প্রেমানলে নারীর দহিল যৌবন।
শোভনদন্ডি ঘর রে আমার
এই দুকখো ভাবিয়া কয় রে অধীন আসকর
আজ নিশিতে সপনে আসি দিও আমায় একবার দরশন
প্রেমানলে নারীর দহিল যৌবন।
মধু আছে কন ফুলে
মধু আছে হোন ফুলে
ওলি হইয়া বসুম হোন ডালে।
যৌবনের রসে আমার বন্ধু
সর্ব অঙ্গ টলটলে।
মধু লোভে মত্ত হইয়া ভ্রমরা আকুল
মনের আশা না পুড়িল পাইয়া মাথার ফুল।
খাইতে না পারি মধু অপমানে গা জলে
ওলি হইয়া বসুম হোন ডালে।
সব ফুলে বসিয়া ভ্রমরা মধু খায়
বসিতে না দিলো মোরে তাহার সীমায়।
কয় হীন আসকর আলী আমার যৌবন গেল বিফলে
ওলি হইয়া বসুম হোন ডালে।
বসে রইলিরে মন কার আশে
বসি রইলি ও মন কার আশে
রঙের বাজার ভাঙ্গি যাইব একদিন চোখের নিমিষে
তেল থাকিতে বাত্তি নিভে কাল তুফানের বাতাসে ॥
গুরু কেমন ধনরে ও ভাই গুরু কেমন ধন
সময় থাকতে না চিনিলি ওরে অবুঝ মন
ভবের খেলা বিষম জ্বালা দুধের সনে বিষ মিশে ॥
বাণিজ্যে পাঠাইল তোরে বহু ধন দি
লাভে মূলে সব হারালি সঙ্গে নিবি কী
তোরে গ্রেফতারী করি নিব লুকাই থাকবি কার পাশে ॥
গুরুর পদ ধরি হীন আস্কর আলী কয়
সময়ে না করলে সাধন অসময় কি হয়
নাইয়রুত্তুন নাস্তা নিলে স্বামীয়ে ভালবাসে ॥
কেউওরে ন বুঝাইম রে পরান বন্ধু কালা
কেউরে ন-বুঝাইয়ুম রে আঁর পরাণ বন্ধু কালা
কেউরে ন-বুঝাইয়ুম রে আঁর পরাণ বন্ধু কালা ॥
সবে বলে কালা রে কালা আঁত্তে লাগে গোড়া
সবে ফুলের মধু খাইব রসিক ভোমরা রে ॥
যে বলিবে বলুক কালা কেউরে নদ্যুম কইয়া
বৈদেশত ন-যাইওরে কালা ঘরে থাকো বইয়া রে ॥
কালা মুখের মিঠা হাসি দিনে রাইতে চাইব
বাহিরে ন-যাইও রে কালা ভিক্ষা মাগি খাইব রে ॥
কহে গুরু আসকর আলী কালা গলার মালা
কালার সনে পিরিত করি মরি গেলে ভালা রে ॥
রসের যৌবন আমার শেষ করি
রসের যৌবন আমার শেষ করি
বন্ধু যারগোই আমার যোগীর বেশ ধরি
কারো বুঝাইওম রে দুকখো
বান্ধব নাই মোর দেশ ভরি।
ব্যধি কর্ম যোগ
বৈদ্য ধরি খাইলাম বড়ি
নাখুন দিলো রোগ।
টাকা মরি গেল করি রাশ
প্রেম রোগ খান ভ্যাশ ধরি
আস্কর আলী কয়
ফুলের মধু পাইলে সাধু ছাড়ি যাইত ন
উড়ি যাইবো কাল ভ্রমরা ফুলের মধু শ্যাষ করি
রসের মালিনী
রসের মালিনী
কানে দিলি কর্ণফুলা
খোপায় দিলি ফুল
রসের মালিনী রে
তনে করে গড়াগড়ি
মনে বলে কি
রসের মালিনী রে
অলির মালিনী ও তোর গায়ে নাই রে সুর
কলি গেল কমল কলি শুকায় গেল কই
রঙের মালিনিও তুই, তোর গালে দিলি পান
হাসি মুখে কথা বলি করিলি পরান
রসের মালিনী রে
আলা ভোলা মালিনী তোর মনে নাই রে লাজ
বুড়া হালে গায়ে দিলি নতুন কইন্যার সাজ
রসের মালিনী রে
রসেরও ফসলি নাই তোর দন্ত গেল ঝরি
অনুমানে বুঝি নাই তোর মাইঝা গেল ভরি
বাছবিচার
Latest posts by বাছবিচার (see all)
- (বই থেকে) বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ – কামরুদ্দীন আহমদ (এক) - মার্চ 14, 2026
- বাংলাদেশি ফিকশন: জমিদারি উচ্ছেদ – আবুল মনসুর আহমদ (১৯৪৫) - জানুয়ারি 30, 2026
- ‘সুভাষ দত্ত কৌন হ্যায়?’ - ডিসেম্বর 3, 2025