হিস্ট্রি, কালচার ও পলিটিকসে ‘বাংলাদেশ-ধারনা’ কেন এখনো একটা মিসিং ঘটনা?
[সিলেটে, ফকিরি’র পোগরামে এই আলাপ’টা করা হইছিল…]
আমি যেই জিনিসটা প্রপোজ করতে চাইতেছি, সেইটা লম্বা একটা আলাপ-ই হবে; কিনতু আমি আশা করি, অল্প-কথায় কিছুদূর পর্যন্ত আমার কথাগুলা আমি ক্লিয়ার করতে পারবো…
শুরুতে, আলাপের ব্যাক-গ্রাউন্ড হিসাবে ৩টা জিনিস বইলা রাখাটা দরকার –
১. যে কোন ‘ধারনা’-ই এবসুলেট বা শাশ্বত কোন জিনিস না, সময়ের সাথে সাথে কোন ধারনা তৈরি হয়, বদলায় এবং মারাও যায়; আর সমাজের কনটেক্সট অনুযায়িও এর মিনিং নানান রকমের হয়… তো, এইটা মাথায় রাখতে পারলে ভালো যে, কোন স্ট্যাটিক ধারনার কথা এইখানে আমরা বলতেছি না
যেমন ধরেন, ‘এলিট’-ধারনাটা একটা সময়ে সভ্রান্ত বা sophisticated জিনিস বুঝাইতো, কিনতু এখন অই পজিটিভ মিনিং’টা নাই পুরাপুরি, অনেক বেশি নাক-উঁচা, snobby লোকজনরেই বুঝায়, যারা কমন-পিপলের এগেনেস্টে থাকে, এইরকম… মানে, এই ধারনার একটা মিনিং তো আছেই, কিনতু সব সময়ে এবং সব সমাজে সেইটা একইরকম জিনিস না, এইটা হইতেছে আমার কথা
২. সেকেন্ড হইতেছে, হিস্ট্রি, কালচার ও পলিটিকস – এই ৩টা এলিমেন্ট আমি বাছাই করতেছি, এইটারে আরো এক্সপান্ড করার সুযোগ আছে – ইকোনমি, ফিলোসফি, রিলিজিওন বরং আরো স্ট্রং কেটাগরি… মানে, চিন্তার জায়গাগুলা এতোটা আলাদা আলাদা কিছু না, কিনতু আমি এই ৩টা কেটাগরি ধইরা কিছু জিনিস সামনে আনতে চাইতেছি, তার মানে এইটা না যে, এর বাইরে আলাপের কোন স্কোপ নাই, বরং এইটা একটা সিলেকশনের ঘটনাই…
৩. থার্ড, যেই জিনিসটা ক্রুশিয়াল, সেইটা হইতেছে একটা চিন্তার সিলসিলা ও কিছু রেফারেন্সের জায়গা থিকাই আমি দেখতেছি বা কথাগুলা বলতেছি; এইখানে আরো কিছু চিন্তার সিলসিলা আছে বা থাকতে পারে, এবং রেফারেন্সের জায়গাগুলাও যদি চেইঞ্জ হয় বা আরো ব্রডার হয় তাইলে আলাপের জায়গাগুলাও তো বদলাবে আসলে…
কিনতু ঝামেলার জিনিস যেইটা হইতেছে, আমি তো এইসব বিষয়ে সাবজেক্ট-ম্যাটার এক্সপার্ট না! মানে, একাডেমিক* লাইনের লোক আমি না, তারপরেও কথা বলতেছি, কারন আমি লিটারেচারের লোক – কবিতা লেখি, সাহিত্য করি, এবং এইসব বিষয়ে ভাবতে গিয়া দেখছি যে, ঘটনাগুলা খুবই ইন্টার-রিলেটেড, এবং বিচ্ছিন্ন জিনিস না!
মানে, হিস্ট্রির কোন নেরেটিভ’টারে আপনি মানেন এবং কোন কালচারাল সিলসিলারে আপনার নিজস্ব জিনিস বইলা মনেহয় তার উপরে আপনার সাহিত্যের টেস্ট ডিপেন্ড করে তো… এবং দেখবেন, সাহিত্য-মেটেরিয়ালগুলার এনালাইসিস ঠিকঠাক মতো না করতে পারলে হিস্ট্রি ও কালচারের জায়গাগুলারেও লোকেট করতে পারবেন না (এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম দিয়া বুঝতে পারবেন অনেকটা জিনিসটা…)
(*একাডেমিক পদ্ধতি তো জরুরি জিনিসই, কিনতু আপনি সার্টেন ডিসিপ্লিনের লোক না হইলে সেইটা নিয়া কথা কইতে পারবেন না – এইটাও একটা ঝামেলার জিনিসই)
তো, বিসমিল্লাহ্ বইলা শুরু করি!
…
আলাপ’টা ২টা পার্টে করবো আমি – এক হইতেছে, ‘বাংলাদেশ-ধারনা’ বইলা কিছু আছে কিনা বা থাকা উচিত কিনা, আর সেইটা আসলেই মিসিং ঘটনা কিনা? বা কিভাবে মিসিং থাকতেছে?…
সেকেন্ড হইতেছে, তাইলে কিভাবে বাংলাদেশ-সেন্ট্রিক চিন্তা-ভাবনা করতে হবে আমাদেরকে, বা কেমনে পসিবল সেইটা?…
…
পার্ট ১
আমার একটা ইচ্ছা ছিল ২-৩ বছর আগে (এখনো কিছুটা আছে) যে, বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়া লেখা বইগুলা আমি পড়বো, মানে, যেইগুলার কথা লোকজন পাবলিকলি বলে বা একাডেমিয়াতেও পড়ানো হয় এইরকম… তো, কিছু লিস্ট করছিলাম, কমপ্লিট করতে পারলে তো ভালো হইতো, আমার অনেক কাজের মতোই এইটাও ঠিকমতো শুরুই করতে পারি নাই 🙁
তারপরও কয়েকটা বই পড়ছিলাম, এর মধ্যে একটা বই হইতেছে ‘বাঙালির নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস’ অতুল সুরের – ভয়াবহ একটা বই! হিন্দু মহাসভা থিকা ছাপানো হইছিল ১৯৪২/৪৩ সালে, এখনো দেখবেন লোকজন এইটার প্রশংসা করে! অথচ খুবই রেসিয়াল একটা বই, যে কেউ এইটা পড়লে টের পাওয়ার কথা… তারপরে, ইটনের The rise of Islam and the Bengal frontier, ভালো একটা বই, অইটা নিয়া কিছু কথা আসবে এই আলাপে…
কিনতু যেই বই-পত্র বা লেখালেখি-ই আমি ব্রাউজ করছি, সেইখানে ইতিহাসের… মগধ > মৌর্য > গুপ্ত > পাল > সেন > সুলতানি আমল > মোগল আমল > ব্রিটিশ শাসন… এইরকম যে একটা ক্রনোলজি আছে টাইমের, সেইখানে খেয়াল করছি যে, জিওগ্রাফিকাল লোকেশনগুলারে ইগনোর করা হয়; একেকটা টাইমে দেখবেন একেকটা লোকেশন জেগে উঠতেছে, এবং অইটারেই পুরা ‘বাংলা’ বইলা কন্সিডার করা হইতেছে!
২-১টা উদাহারন দিলে জিনিসটা বোঝা যাবে, যখন ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি গৌড় থিকা লক্ষন সেনরে হটায়া দিলেন, তখন গৌড় হইতেছে ‘বাংলা’; চিটাগাং, বরিশাল, সিলেট, এমনকি ঢাকাও বাংলা না! অথচ লক্ষন সেন তো পালায়া আসছিলেন বিক্রমপুরের দিকেই… অইটা আর ‘বাংলা’ না যেন!
তার চাইতে আরো ঝামেলার জিনিস হইতেছে, হিস্ট্রি’রে দেখা হইতেছে ইনভেডরদের জায়গা থিকা, যেন একটা সাম্রাজ্য তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত এইখানে কোন মানুশ ছিল না! এবং যেহেতু বেশিরভাগ হিস্ট্রি লেখা হইছে ব্রিটিশ পিরিয়ডে ও কলকাতা’তে, অই লিগাসি-ই কম-বেশি কন্টিনিউ হইতে থাকতেছে, এখনো, লার্জ স্কেলে…
আর সেইখানে, ইন্টারনাল কোন হিস্ট্রি নাই না, এক্সারনাল দখলগুলাই মেইন ফিচার হয়া আছে, আর যেহেতু অই ঘটনাগুলা মোগলদের আগ পর্যন্ত পদ্মার অই পাড় পর্যন্ত ঘটছে, অইগুলাই মেইন-হিস্ট্রি, যেইখানে আজকের যেই বাংলাদেশ জিওগ্রাফিকালি, সেইটারে সেন্টার করা আলাপ কমই পাইবেন…
মানে, আমার কথা হইতেছে, ‘বাংলার ইতিহাসে’ বাংলাদেশ অঞ্চলের জিওগ্রাফি খুব কমই আছে, আর যতটুকই আছে, খুব বিচ্ছিন্নভাবে এবং পেরিফেরির ঘটনা হয়া আছে
আমার অনুমান হইতেছে, এইখানে ল্যান্ড ফর্মেশনটা যেমন ধিরে ধিরে হইছে, সমাজও ধিরে ধিরেই তৈরি হইছে; কিনতু অই রিকগনিশনের জায়গাগুলাও মিসিং-ই কম-বেশি
(আমি আশা করি পয়েন্ট’টা কিছুদূর পর্যন্ত মেইক করতে পারছি আমি, যেইটা নিয়া আরো অনেক ডিটেইল আলাপ-ই হওয়া পসিবল)
…
তো, যেহেতু হিস্ট্রির নেরেটিভ’টাতে আলাদা কইরা কোন রিকগনিশন নাই, এই অঞ্চলের কালচার’রে আলাদা কইরা নোটিশ করার ঘটনাও অইভাবে ঘটে নাই! এবং এর কন্সিকোয়েন্স খুবই fatal একটা জিনিস হইছে! সবসময় একটা ‘আদারিং’ করার ঘটনা ঘটছে, এবং ‘আঞ্চলিক’ হিসাবে ট্রিট করা হইছে…
আপনি আলাদা কইরা চিটাগাংয়ের ইতিহাস পাইবেন, সিলেটের ইতিহাস পাইবেন, রংপুর ও রাজশাহীর ইতিহাস পাইবেন, এবং এইসব কিছু মিলায়া ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ইতিহাস’ পাইবেন, কিনতু একসাথে করলে পাইবেন – ‘বাংলার ইতিহাস’, নট ‘বাংলাদেশ!’ কারন, এইখানে যেন কোন সেন্টার-পয়েন্ট নাই! কারন সেন্টার-পয়েন্ট হইতেছে কলকাতা!
যেহেতু ব্রিটিশ-আমলের হিস্ট্রিকাল রিডিংয়ের ভিতরে আমরা আছি, এর কালচারাল-সেন্টার হইতেছে কলকাতা, এবং এইভাবে ডাবল-কলোনাইজেশনের ঘটনা’টা বাংলাদেশের বেপারে ঘটতেছে! কলকাতা শহরের বাইরে বিশাল একটা বাংলাদেশ আছে, যার পুরাটাই হইতেছে ‘গ্রাম-বাংলা’!
যেইসব কালচারাল উপাদানগুলা আছে, যেমন গান, কবিতা, গল্প, সিনেমা… অইখানে ‘বাংলা-গান’ ‘বাংলা-কবিতা’ ‘বাংলা-গল্প’ ও ‘বাংলা-সিনেমা’ পাইবেন, কিনতু ‘বাংলাদেশি-গান’, ‘বাংলাদেশি-কবিতা’ বাংলাদেশি-গল্প’ ‘বাংলাদেশি-সিনেমা’ ইউটিউবে বা যে কোন প্লাটফর্মেই কেটাগরি হিসাবে পাইবেন না, বা পাইলে পাইবেন এক ধরনের সাব-কেটাগরি হিসাবে…
যে, মূল বা সেন্টার হইতেছে ‘বাংলা’! আর ‘বাংলাদেশি’ হইতেছে আলাদা কোন কালচারাল ঘটনা না, বরং ১৯৭১ সালের পরে যেহেতু আরেকটা দেশ হইছে, এই কারনে আলাদা কইরা বলা লাগতেছে, এমনিতে আলাদা কিছু না! 🙂
এই যে, একটা কালচারাল ইন-সিগনিফিকেন্স – এই জায়গা থিকা আলাদা কইরা ‘বাংলাদেশি’ বানানোর একটা পলিটিকাল চাহিদাও তৈরি হইতেছে ইদানিং, যেইটা আরেক দফা ঝামেলার একটা ঘটনা…
আমার কথা হইতেছে, আমাদের চিন্তার মধ্যে আলাদা কইরা ‘বাংলাদেশি’ বইলা কোন কালচারাল সিগনিফেকন্স এগজিস্ট করে না, যৎ-সামান্য যা আছে, সেইটা হইতেছে একটা সাব-কেটাগরির ঘটনা! ইনফিরিয়রিটির ঘটনা!
(বাংলাদেশি সিনেমা নিয়া আমি একটা বই লেখছি, সেইখানে এই কালচারাল ডিফরেন্সের জায়গাটা নিয়া আমি বলছি যে, যেহেতু সিনেমা একটা নতুন ফর্ম এবং এর শুরু হইছিল মোস্টলি আফটার ১৯৪৭ সেইখানে ‘বাংলাদেশি সিনেমার’ সিগনেচারগুলা খুব প্রমিনেন্ট, কিনতু অইগুলারে মিউজিকাল-ড্রামা হিসাবে আপগ্রেড না কইরা ‘যাত্রা-সিনেমা’ বা ‘ফোক-সিনেমা’ বইলা ঘৃনা করতে শিখছি আমরা…)
…
তো, এই হিস্ট্রিকাল ও কালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং না-থাকার কারনে বাংলাদেশের পলিটিকাল ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭১ সাল থিকা (১৯৪৭-ও না ইভেন), যেহেতু এই সময়ে থিকা পলিটিকাল এনটিটি’টা তৈরি হইছে; কিনতু যেহেতু এর কোন আলাদা হিস্ট্রি নাই, এবং কালচারাল সিগনিফেকন্সও নাই, পলিটিকাল বাংলাদেশও তৈরি হইতে পারে নাই আসলে! বরং জোর-জবরদস্তি কইরা, গোঁজামিল দিয়া কিছু ইতিহাস বানানোর ট্রাই করা হয়…
হিস্ট্রিকাল নেরেটিভ একটা গোড়া বা বেইজ হিসাবে কাজ করে, আবার পলিটিকাল প্রয়োজনেই অনেক সময় হিস্ট্রি ও কালচার’রে ইনভেন্ট করা হয়… কিনতু সারফেইস লেভেলে যা আছে, সেইগুলারে যদি আমরা কন্সিডার করি, সেইখানে ব্রিটিশ-আমলের যেই বেঙ্গল প্রভিন্স সেইটা এখনো আমাদের হিস্ট্রি, কালচার ও পলিটিকসের বেইজ হয়া আছে
তবে, বাংলাদেশের রাজনীতি’র শুরু মেবি ১৮৭১ সালের আদম-শুমারি থিকা, তখন দেখা গেলো যে, আরে, এই অঞ্চলে তো অনেক মানুশ! এবং এর পলিটিকাল রিকগনিশন আসছে ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গে’র ভিতর দিয়া… কিনতু এস্টাবলিশড হিস্ট্রি ও কালচারের সাথে এক ধরনের ডিজ-এসোশিয়েশনের শুরুয়াতও তখনই… যেইটা এখনো কন্টিনিউ হইতেছে, এবং অই পাজলটারে আমরা সলভ করতে পারতেছি না বইলাই আমার কাছে মনে হইছে
…
এখন, আমি যদি আমার কথাগুলারে একটু সামারাইজ করি, তাইলে ঘটনাগুলা এইরকম হবে –
১. একটা এগজিসটিং হিস্ট্রি’র নেরেটিভে বাংলাদেশ বইলা আলাদা কিছু নাই, রিসেন্ট কিছু পলিটিকাল ডেভোলাপমেন্ট আছে
২. ‘বাংলাদেশি’ বইলা আলাদা কোন কালচারাল সিগনিফেকন্সও নাই তেমন বরং একটা সাব-কেটাগরি হিসােবে দেখার ঘটনা আছে
৩. যার ফলে, পলিটিকালি বাংলাদেশের দিশাও খু্ব একটা স্পষ্ট হইতে পারে নাই
কিনতু ক্রুশিয়াল প্রশ্নটা হইতেছে এইরকম কোন ‘বাংলাদেশ-ধারনা’র দরকার আছে কিনা!
পলিটিকাল কারনে তো দরকার আছেই, কারন যদি পলিটিকালি ‘বাংলাদেশি’ আইডেন্টিটিতে আপনি বিলিভ না করেন তাইলে আলাদা রাষ্ট্র হয়া কেন থাকবেন! আর যেহেতু পলিটিকাল একটা রাষ্ট্র তৈরি হইছে, এর পিছনে কালচারাল ও হিস্ট্রিকাল কোন ইচ্ছা বা ট্রেন্ড না থাকলে সেইটা তৈরি হওয়াটা তো কঠিনই হওয়ার কথা, তাই না? তো, সেই এলিমেন্টগুলা কি? আমি মনে করি, অই জায়গাগুলাতে কোন ডিসিশানে পৌঁছানোর আগে আমাদেরকে প্রশ্নগুলা করতে পারাটাই জরুরি বেশি…
আমি বলতে চাইতেছি, বাংলাদেশ বইলা একটা রাষ্ট্র তৈরি হইছে বইলা এখন ‘বাংলাদেশি’ বইলা আইডেন্টিটি তৈরি করতে হবে বা জাগায়া তুলতে হবে – এইরকম পলিটিকাল নিডের জায়গা থিকা দেইখেন না! বরং এই যে পলিটিকাল জায়গাটাতে আইসা আমরা পৌঁছাইছি, কোন হিস্ট্রিকাল ও কালচারাল কনটেক্সটের ভিতর দিয়া আমরা আসছি? আর সেইটা যদি এগজিসটিং নেরেটিভের লগে কম্পিটেবল না হয়, তাইলে অই জায়গাগুলারে নতুন কইরা দেখা দরকার না আমাদের?
এই জায়গা থিকা আমি বলতে চাইতেছি, ‘বাংলাদেশ-ধারনা’র জায়গাটারে আমাদের এগজামিন করাটা উচিত…
পার্ট ২
শুরুতে একাডেমিক নলেজের একটা জায়গা নিয়া বলতেছিলাম; তো, আমি মনে করি, একটা জিনিস তথ্য-প্রমানসহ একাডেমিক-ট্রুথ হিসাবে এস্টাবলিশ হওয়ার আগেও নলেজের কিছু ধাপ আছে; যেমন, আমাদেরকে তো আসলে স্ট্রং হাইপোথিসিস বা অনুমান তৈরি করতে পারতে হয়, যেইগুলারে লজিক ও রেফারেন্সের বেসিসে যাচাই-বাছাই কইরা ভুল বা ঠিক বলবো আমরা… এমনকি তারও আগে, হাইপোথিসিস’টারে ইমাজিন করতে পারতে হয়… এইরকম ৩টা স্টেইজ আমি দেখি ইমাজিনেশন > হাইপোথিসিস > নলেজ
তো, এইখানে আমার পরস্তাবগুলা মোটামুটি ইমাজিনেশন ও হাইপোথিসিসের মাঝামাঝি ঘটনাই, যেইখান থিকা একটা হাইপোথিসিস তৈরি করতে চাই বা সেই সম্ভাবনার কথাটা বলতে চাইতেছি আমি
…
আনফরচুনেটলি, প্রি-হিস্ট্রি তো নাই অইরকম, বাংলাদেশ অঞ্চলের; তারপরে যা আছে, সেইখানে ডাইবারসিটি’র চাইতে একটা লিনিয়ারিটি ক্রিয়েট করার উপরেই জোরটা বেশি দেয়া হইছে, আর এইসবের পলিটিকাল মোটিভ তো আছেই… এবং এই মোটিভগুলা সবসময় একটা সেন্টার পাওয়ারের ফর-এ কাজ করছে, যার ফলে ডাইভারসিটির জায়গাগুলা একসেপশন হিসাবে ইগনোর করা হইছে
আমি দেখি যে, এইখানে সময়ের সাথে সাথে অনেকগুলা লেয়ারে ভূমি-গঠনই হয় নাই খালি, বরং বিভিন্ন জায়গাতে মানুশের বসবাস এবং সমাজও তৈরি হইছে নানান সময়ে… এইটা হইতেছে আমার ফার্স্ট হাইপোথিসিস, যে, চিটাগাংয়ে যখন ঘটনাগুলা ঘটতেছে, সিলেটে, কুমিল্লায়, বিক্রমপুরে, রাজশাহীতে একই সময়ে একই রকমের সমাজ ছিল না… এখন অবশ্যই একটা সিনক্রোনাইজেশন তো খেয়াল করা যাইতেই পারে
এখন যেইটারে বাংলাদেশ বইলা দেখি আমরা, সেই জায়গাটা সুলতানি আমলের সময় থিকা কিছুটা দেখতে পাইলেও হিস্ট্রিতে স্পষ্ট হইতে শুরু করছে মোগল-আমলেই, এরপরে ব্রিটিশদের বেঙ্গল-প্রভিন্স হিসাবে; তো, কিনতু কিভাবে এই জায়গাগুলা একটা লিনিয়ার ফর্মেশনে আইসা এন্ড-আপ করলো? বা কোন কন্ট্রাডিকশনগুলা এইখানে মেইন ফেনোমেনা ছিল?
এইখানে আসে রিলিজিওনের প্রসঙ্গ’টা, যেইভাবে ব্রিটিশ-আমলের (এবং তার কন্টিনিউড লিগাসি) হিস্ট্রিকাল বয়ানগুলা আমাদেরকে শিখাইতে চায় যে, এইখানে হিন্দুরা থাকতো, তারপরে মুসলমান’রা আসছে, এই-সেই… খুবই ভুল এবং ভয়ংকর আলাপ বইলা মনে করি আমি!
ধর্মের বেপারে এটলিস্ট ৩টা জিনিস আমাদের খেয়াল করতে পারা উচিত –
১. এখনকার যেইরকম ইউনিভার্সাল ধর্ম আমরা দেখি, এর শুরু তো আসলে কৃষি-সমাজের সময় থিকা; শিকার ও পশু-পালনের সমাজে ধর্ম জিনিস’টা বরং অনেক বেশি লোকালাইজ ঘটনা ছিল, এবং আমাদের এইখানেও যখন মাছ-ধরা ও অন্যসব প্রডাকশন-সিসটেমের বাইরে গিয়া কৃষি-কাজ শুরু হইছে তখন ধর্মের জায়গাগুলা চেইঞ্জ হইছে
২. সেকেন্ড হইতেছে, ধর্মের একটা পলিটিকাল ইমপ্লিকেশন আছে, যেইখানে রাজার একটা ধর্ম থাকতে হইতো, যে ঐশ্বরিক কারনে উনি শাসন করতে পারেন… হিন্দু বা বৌদ্ধ হওয়াটা রাজা’র জন্য জরুরি ছিল, ব্যক্তির পর্যায়ে বরং নানান ধরনের লোকাল ঘটনাই থাকার কথা; মানে, ধর্ম শুরু থিকাই ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঘটনা ছিল না এতোটা
৩. লাস্টলি, এইখানে যখন ল্যান্ড তৈরি হইছে, আবাদের ঘটনা ঘটছে, মানুশ বাড়ছে এবং কমিউনিটি তৈরি হইছে নতুন কইরা ধর্মও আসছে নানান ফর্মে…
তো, আমার কথা হইতেছে, যখন সমাজের প্রডাকশন সিসটেম’টা বদলাইছে, ধর্ম-পরিচয়রের জায়গাটা জরুরি হইতে শুরু করছে, তখন ব্যক্তির ধর্ম কি – এই প্রশ্নটা আসছে; এবং তখন জাত-প্রথার সাথে ইসলাম-ধর্মের কনফ্লিক্টের ঘটনাটা ঘটছে… খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের সমাজে কৃষকদের বেশিরভাগই মুসলমান, অন্য পেশা – কামার, কুমার, নাপিত, তাঁতী, জেলে… উনারা হিন্দু না, বরং আপনি মুসলিম জেলে পাইবেন, হিন্দু জেলেও পাইবেন… একটা কমিউনিটি থিকা ব্যক্তি-ধর্মে ট্রান্সফার হওয়ার ঘটনাগুলা ঘটছে
আমি বলতে চাইতেছি, হিস্ট্রির আলাপে ধর্মের রোল নাই না, কিনতু এইটারে একটা ডিসাইডিং ফ্যাক্টর কইরা তোলাটা খালি প্রবলেমেটিকই না, পলিটিকালি মোটিভেটেড কোশ্চেনও, এবং অই জায়গা থিকাই কোশ্চেনটারে ডিল করা-ই লাগবে আমাদের…
এইখানে সেন্টার হইতেছে ভূমির পরিবর্তন, প্রডাকশন সিসটেম ও কমিউনিটির এক্টিভিটি; শিকার ও পশু-পালনের সমাজের যেই কমিউনিটি সেইটারে কৃষি-ভিত্তিক সমাজে আইসাও আমরা পুরাপুরি ডিজ-অউন করি নাই, অইটা বরং জরুরি সূত্রগুলা, এইখানে হিস্ট্রির আলোচনায়…
আর এই আলাপগুলা যদি আমরা করি, তাইলে দেখতে পাবো যে, এইখানে অনেকগুলা কমিউনিটির আলাদা আলাদা হয়াও একসাথে থাকার একটা ঘটনা ঘটতেছে…
যেই কারনে ইউনিফাইড কালচারের পরিবর্তে সিমিলার ও কাছাকাছি রকমের অনেকগুলা জিনিস আমরা পাইতেছি; যেমন ধরেন, বাউল-গান, হরে-দরে সবগুলা গানরে ‘বাউল-গান’ বানায়া দেয়া হইছে, ভাটিয়ালি তো বাউল-গান না, মুর্শিদা-গানও আলাদা, মারফতি, মাইজভান্ডারি… এইরকম না হইলেও ১০-১২টা কেটাগরি আছে বাংলাদেশি ‘ফোক-সং’র, সুরগুলা ফিলিংগুলা কাছাকাছি রকমেরই, কিনতু একই তো না!
কিনতু কালচারাল ডিফরেন্সগুলা আবার পাশাপাশি থাকতে পারতেছে… এক ধরনের লেনদেনও চলতেছে, এবং জরুরি জিনিস হইতেছে এইখানে একটা কোহেরিয়েন্স (coherence) তৈরি হইতেছে; ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা, দেখেন, সিলঅটি আর চিটাগাইঙ্গয়া তো একই ভাষা না, বরিশাইল্লা ও নোয়াখাইল্লা, রাজশাহী ও খুলনারও – খুবই আলাদা আলাদা ধরনের, তারপরেও একেকটা জায়গার কিছু শব্দ আমরা না বললেও জানি, কানেক্ট করতে পারি… সেইটাও বড় কথা না, শব্দের আসলে আলাদা কোন মিনিং নাই, মিনিং তৈরি হয় স্ট্রাকচারে, এটিটুডে … আর সেইখানে ভিন্নতাগুলাও একটা স্ট্রাকচার ও এটিটুড তৈরি করতে পারে, যেইখানে মিনিংফুল মিল তৈরি হইতে পারে…
তো, এইটা হইতেছে আমার সেকেন্ড পয়েন্ট’টা – ডিফরেন্স এবং কোহেরিয়েন্সের ঘটনা এইখানে আছে, এই টুল দিয়া আমাদেরকে এক্সপ্লোর করতে পারতে হবে, তাইলে কালচারাল জায়গাগুলারে লোকেট করতে পারাটা সহজ হবে
আর এই হিস্ট্রির লেয়ারগুলা এবং কালচারাল কোহেরিয়েন্সের জায়গাগুলারে যদি আমরা সামনে নিয়া আসতে পারি নতুন পলিটিকসের জায়গাটারেও ভালো-ভাবে বুঝতে পারবো আমরা; যে, বাঙালি-জাতিয়তাবাদ আমাদের রাজনীতি হইতে পারে না, বরং এইটা একটা বড় ধরনের অবস্টেকল!
এমনকি আমাদেরকে আলাদা কইরা মুসলমান হওয়ারও দরকার নাই তেমন, আপনি যদি কোহেরিয়েন্সের জায়গাটারে বেইজ কইরা বাংলাদেশ-ধারনা’র কাছাকাছি যাইতে পারেন, দেখবেন সেইটা পলিটিকাল আইডিয়া হিসাবে মুসলমান হওয়ার সাথে কনফ্লিক্টিং তো না-ই, বরং খুব কাছাকাছি ঘটনাই… যেই কারনে দেখবেন, বাংলাদেশ-ধারনার কথা কইলেই ট্যাগ লাগায়া দেয়া হয় যে, আপনি ‘ডানপন্থি’ হয়া গেছেন! জিগানো হয় – আপনি কি বাঙালি? নাকি মুসলমান? 🙂
অথচ এই কোশ্চেনটাই পলিটিকালি প্রবলেমেটিক! ‘বাঙালি’ হওয়াটা যেইরকম একটা লিনিয়ারিটি যেন একইরকমের একটা ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলমান’ হওয়ার একটা লিনিয়ারিটি আমাদেরকে ক্রিয়েট করা লাগবে! বরং অই পলিটিকাল প্রভোকেশনের এবং সেট কইরা দেয়া হিস্ট্রি ও কালচারের বেইজ থিকা আমাদেরকে বাইর হইতে হবে, যদি আমরা প্রো-বাংলাদেশি রাজনীতির জায়গাটারে শুরু করতে চাই!
আর নতুন রাজনীতির বেইজ একটা সেন্ট্রাল-রাষ্ট্র কাঠামো তেরি করার ঘটনা না, বরং পিপলস-পাওয়ার ও কালেক্টিভ-কনশাসনেসের জায়গাগুলা থিকা আসতে হবে… এবং এই জায়গাগুলা যাতে সবসময় এক্টিভ থাকতে পারে সেইজন্য একটা ট্রান্সপারেন্ট কমিউনিটি তৈরি করতে হবে যেইটা ইন্ডিভিজুয়াল ফ্রিডমের জায়গাটারে আপহোল্ড করবে!
…
কনক্লোশন
তো, আমার কথা যদি কনক্লোড করতে চাই, বেপারটা এইরকম –
১. এইখানে হিস্ট্রি ও সমাজ মাল্টি-লেয়ারড একটা ঘটনা, একেকটা সময়ে সমাজের যেই ট্রান্সফর্মেশনের ঘটনাগুলা ঘটছে, তার বেসিসে হিস্ট্রির ফ্লো’টারে দেখতে পারতে হবে আমাদেরকে, কোন পলিটিকাল উদ্দেশ্য-কেন্দ্রিকতা থিকা থিকা না, আর সেইটাই ‘বাংলাদেশ-ধারনা’র জায়গাটারে তৈরি করতে পারবে, হিস্ট্রিকালি…
২. আর অই হিস্ট্রিকাল বেইজ থিকা যদি দেখি, তাইলে আমি মনে করি (মুসলমান-কালচার বা হিন্দু-কালচারের মতো কিছু বাইনারি কিছু জিনিস না, বরং) কালচারাল কিছু ডিফরেন্স ও কোহেরিয়েন্সের জায়গাগুলারে আমরা দেখতে পাবো
৩. আর সেই হিস্ট্রিকাল-নেরেটিভ ও কালচারাল-ডাইবারসিটির বেসিসে কোন ‘শক্তিশালি রাষ্টিয়-কাঠামো’ না, বরং ফ্লেক্সিবল ও ট্রান্সপারেন্ট কমিউনিটি তৈরি করার রাজনীতি’টা আমাদেরকে তৈরি করতে হবে, যেইখানে পিপলের ইন্ডিভিজুয়াল ফ্রিডমের জায়গাটা ম্যাক্সিমাইজ করা যাবে…
এইখানে, আমাদেরকে নতুন একটা ইন্টেলেকচুয়াল বেইজ তৈরি করতে হবে আসলে, যেইটা কমপ্লিটলি মিসিং একটা ঘটনা বইলা আমি মনে করি
তো, আমি সরি যে, অনেক বেশি আবছা বা এবস্ট্রাক্ট-ভাবে জিনিসগুলারে টাচ করে গেছি 🙁 কিনতু আমি মনে করি কিছু রেলিভেন্ট উদাহারনের (যেইটা আমি বাদ দিয়া গেছি…) আর আলাপের ভিতর দিয়া জায়গাগুলারে আরো স্পষ্ট কইরা তোলা যাবে!
Latest posts by ইমরুল হাসান (see all)
- কবিতা – ২০২৫ - সেপ্টেম্বর 23, 2025
- হিস্ট্রি, কালচার ও পলিটিকসে ‘বাংলাদেশ-ধারনা’ কেন এখনো একটা মিসিং ঘটনা? - আগস্ট 6, 2025
- নেভার ফরগেট, নেভার ফরগিভ! (১) - জুলাই 1, 2025