(জুলাই রেকর্ডস) খুনিরা সব দেশেই আছে, টাকা খেয়ে পুলিশ ওদের ছেড়ে দিছে – শহিদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের বাবা
- [জুলাই রেকর্ডস] ওরা (ছাত্রলিগ) ডাইরেক আমাদের টার্গেট করে মারসে… ওরা আমাদের মেরে ফেলতেই চাইসে
- (জুলাই রেকর্ডস) খুনিরা সব দেশেই আছে, টাকা খেয়ে পুলিশ ওদের ছেড়ে দিছে – শহিদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের বাবা
[জুলাই রেকর্ডসের পক্ষ থিকা সারাদেশে জুলাই আপ-রাইজিংয়ে আহত ও নিহতদের আত্মীয়-স্বজনদের অডিও ও ভিডিও ইন্টারভিউ নিতেছেন কয়েকজন; উনাদের ইন্টারভিউ’র কয়েকটা আমরা বাছবিচারে ছাপাবো… এইখানে ১৬ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে নেয়া শহিদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের বাবার ইন্টারভিউ’র ট্রান্সক্রিপ্ট পাবলিশ করা হইলো, যিনি ঢাকার উত্তরায় ৪ই আগস্ট সকালে রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের সামনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলিতে মাহিন শহিদ হন …]
…
শহিদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের জন্ম ২০০৮ সালে। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ, সদর। পরিবারের সাথে থাকতেন ঢাকার উত্তরায়। এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হইছিলেন তখন মাত্রই, এনআইইটিতে। উত্তরার আন্দোলনে জুলাইয়ের শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। ৪ই আগস্ট সকালে রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের সামনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলিতে মাহিন শহিদ হন।
ছেলের আন্দোলনের ব্যাপারে মা সামিরা মনির দুইটা কথা কোট করা যায়, মাহিন নিজের ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে আন্দোলনে যাইত না, তারা তার মাকে বলে দিবে বলে। আন্দোলনের মধ্যখানে সামিরা মনি একদিন ফোন দেন, মাহিন জানান, ‘বন্ধুর বাসায় গেইম খেলতেছি আম্মু। শেষ হইলেই চলে আসব।’
জুলাই রেকর্ডসের পক্ষ থেকে মাহিনের বাবার এই ইন্টারভিউটা নেওয়া হয় ১৬ আগস্ট, ২০২৫ তারিখ সকাল ১২টায়, মাহিনের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। ছেলের মৃত্যুর পর মাহিনের বাবা মা ঢাকা ছেড়ে চলে আসছেন। ইন্টারভিউ নিছেন কাজী ওয়ালী উল্লাহ, আকরাম ফারুক এবং জুবাইর পারভেজ।
…
জামিল সোহেল: ৮-২০-২৪ তারিখে উত্তরা পূর্ব থানায় আমি যাই আমার ছেলে মাহিনের খুনের মামলা করতে। সাথে আমি সকল ডকুমেন্টস নিয়ে যাই। কাদের হাতে কাটা রাইফেল ছিলো, কাদের হাতে চাপাতি ছিলো সব ছবি নামসহ ভিডিও ডকুমেন্টস নিয়ে ওসিকে দেখাই।
ওসি জিজ্ঞেস করে, ঘটনাটা কোথায় ঘটছে?
আমি বলি, এটা উত্তরা আজমপুর রাজউক কমার্শিয়াল এলাকায় ঘটে।
তখন ওসি বলে, এটা তো আমার এরিয়ায় না। আমি একটু ডিসি সাহেবের সাথে কথা বলি।
পরে উনি ডিসিকে ফোন দিয়ে বলে আমার কথা, যে পশ্চিম থানায় একটা খুন হইছিলো ৪রা আগষ্ট, ওই নিহতের বাবা এখন আসছে মামলা করতে। আমরা কি করতে পারি স্যার।
পরে ডিসি বলে যে, উনাকে প্রটোকল দিয়ে আমার কাছে পাঠায় দাও, আমি দেখতেছি বিষয়টা।
তারপর ওসি আমাকে তিনজন পুলিশ সিকিউরিটি দিয়ে পাঠায় ডিসির কার্যালয়ে। পিছনে ওসিও যায় ডিসির কার্যালয়ে। আমি সেখানে পৌঁছলে ওসি রিসিভ করে বসতে বলে। এরপর ডিসি আমাকে জিজ্ঞেস করে সব। আমি আমার বাচ্চার সব ডকুমেন্টস ও আসামিদের তালিকা দেই। সেদিনই পশ্চিম থানায় নতুন একজন ওসি জয়েন করে।
ডিসি তার হাতে আমার মামলাটা দিয়ে বলে এটা আপনার প্রথম মামলা, ইমিডিয়েটলি এটা দেখবেন। এবং উনার সব ডকুমেন্টসগুলা জব্দ করবেন।
তারপর সিকিউরিটি দিয়ে আমাকে পশ্চিম থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অফিস ইনচার্জের কাছে সিকিউরিটিরা আমাকে দিয়ে আসে, বলে আসে যে ডিসি সাহেব পাঠাইছে উনাকে। তারপর সেই নতুন ওসি আসে।
এসে বলে, আজকে তো আমাদের সার্ভার সমস্যা করতেছে, আপনি কালকে ১০টার মধ্যে আসেন।
আর আগে পূর্ব থানা থেকেই আমার সব ডকুমেন্টস, মামলার এজাহার ঠিকঠাক করে দিছিলো পূর্ব থানার ওসি, এবং উনি বলছিলো পশ্চিম থানায় মামলা না নিলে আমি নিবো।

শহিদ আবদুল্লাহ আল মাহিন
আমি এজাহারে আসামি হিসেবে এমপি হাবিব, তার ছোটভাই সোহেল, একে 47 হাতে থাকা স্বাধীন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর যুবরাজ এদেরকে উল্লেখ করি, এবং সব ছবি ভিডিওসহ ডকুমেন্টস আলামতগুলা জমা দেই।
আমার মামলার তদন্ত অফিসার পড়ে আমাদের গৌরীপুরে। আমি বাড়ি যাওয়ার আগে তার সাথে দেখা করে মামলা সম্পর্কে জানতে চাই, সে বলে, মামলার তেমন উন্নতি হয় নাই।
আমি বলি, উত্তরা ১৪ নাম্বার সেক্টরের পুলিশ ফাঁড়ির উপরে একটা সিসিটিভি ছিলো, ওটার ফুটেজ দেখলেই হবে।
সেই অফিসার বলে, সিসিটিভি তো ভেঙে ফেলছে।
আমি বললাম, ফুটেজ তো আর ভাঙে নাই…
জুলাই রেকর্ডস: এটা কয় তারিখ?
জামিল: এটা সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ। যখন তাদের এই গড়িমসি ভাব দেখি, আমি আমার মোবাইলটা টেবিলে ছুঁড়ে মারি, এবং একটা খারাপ গালি দেই।
বলি যে, একসপ্তাহর জন্য এই মামলা আমার হাতে দেন, আমি তদন্ত করবো। আপনারা শুধু আমারে সরকারি সিকিউরিটি দিবেন।
অনেক রাগারাগি হয়। পরে ওই অফিসার আমার মামলাটা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে। এরমানে সে এই মামলা থেকে টাকা খাইছে।
আমার আসামীগুলা সব ঢাকায়, উত্তরা দলিপাড়া, দিয়াবাড়ি, কামারপাড়া। আমি বাড়িঘর পর্যন্ত স্পট করে দিছি। কিন্তু ওরা গ্রেফতার করেনাই।
তারপর সিআইডির তদন্ত অফিসার ৫-৬ বার ফোন দেয়, আমি রাগ করে ধরিনাই। কারণ তারা টাকা খেয়ে মামলা শেষ করে দেয়ার একটা ধান্দায় ছিলো। পরে যখন ধরি অনেকবার কল করার পর, তারা বলে দেখা করতে।
আমি সেই পরেরদিন ফজরের পর ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিয়ে সাড়ে ৮ টায় ঢাকা পৌঁছাই। এই অফিসার আমার সাথে মিট করে ১১.৩০ টায়।
জুলাই রেকর্ডস: সিআইডির কাছে মামলা গেলে কি হয়?
জামিল: মামলা দীর্ঘ হয়।
তারপর আমাকে নিয়ে রাজউক কমার্শিয়াল মার্কেটে যায়, ওখানে মার্কেটের সেক্রেটারি সভাপতি সবাই ছিলো। তারা বলে যে, এটাই সেই স্পট এবং তাদের কাছে ওইদিনের সব ভিডিও আছে, তারা ভিডিও দিতে পারবে কিন্তু সাক্ষী দিবেনা। কারণ আসামিরা প্রভাবশালী, সাক্ষ্য দিলে ওরা ব্যবসা করতে দিবেনা।
সেখান থেকে সব ভিসিও ডকুমেন্টস সেই তদন্ত অফিসারকে দেওয়া হয়। তারপর ওরা বলে যে, আমাদেরও সন্তান আছে, আমরা সেই ব্যথা বুঝি। আপনার সন্তানকে আমরা হাদিস মোতাবেক কবর থেকে তুলে পোস্টমর্টেম করাবো, তারপর জানাজা দিবো আবার। তো এসব করে। এরমাঝে ৩ মাস ১০ দিন পার হয়ে যায়।
জুলাই রেকর্ডস: তারপর কোন অগ্রগতি হয় না? রাজউকের সেই ফুটেজগুলা নেওয়ার পর তারা কি করে?
জামিল: তারা আর কোন আপডেট দেয়না। আমিই খোঁজ নেই কল দিয়ে। তারা বলে, কাজ করতেছে। আমি যেন ঢাকা গেলে ওদের সাথে এক কাপ চা খাই। মানে আমার ছেলের মামলার জন্য লড়াই করতেছি আমি ওরা আমাকে এসব ডিশমিশ করার জন্য চা অফার করে। তারপর ওদের কাছে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চাই।
ওরা বলে, ৩ জন আসামি আটক করছে।
আমি বলি, আসামি আটক করছেন, কোর্টে তুললে তো আমাকে লাগবে আমি বাদী যেহেতু। কিন্তু ওরা আমাকে কিছু না জানায়ে এরমধ্যে আসামির জামিনও করে দেয়।
জুলাই রেকর্ডস: এরা কি আপনার এজাহারভুক্ত আসামি?
জামিল: হ্যাঁ।

মামলার এজহারের কপি
জুলাই রেকর্ডস: এদের কবে গ্রেফতার করে?
জামিল: আমি তো জানিনা কবে। তবে অক্টোবর আমি জানতে পারি এদের গ্রেফতার করছে। আমি বলি যে কোর্টে কখন তুলবেন আমাকে জানাবেন। এরা আমাকে কিছু জানায় না। গ্রেফতারের ২০-২৫ দিন পর জামিন দিয়ে দেয়। এই আসামিগুলা বর্তমানে বিএনপির ছত্রছায়ায় আছে।
জুলাই রেকর্ডস: আপনি কবে জানছেন জামিনের কথা?
জামিল: জামিন হবার ২০-২৫ দিন পর।
এই আসামিরা বিএনপির সাথে মিটিং করে যেটার ছবি ভিডিও আমি পাই। সিআইডিকেও জানাই। কিন্তু তারা কোনো একশন নেয় না।
প্রথমে মামলার টাকা খায় পুলিশ। এরপর এখন সিআইডি। আমার মামলাটা নিয়া তারা শুধু গড়িমসি করে। তারপর আমার ভাইয়ের নাম দিয়ে কে যেন মামলা করে। আমি সেই খবরও সিআইডির কাছে দেই। সিআইডির কোন খবর নাই।
জুলাই রেকর্ডস: এখন পর্যন্ত মামলার আপডেট কি?
জামিল: ঐ আগের মতোই। এরা আমাকে চা খাইতে ডাকে। আমি ইনফরমেশন দিলে বলে ভুয়া। আমি সিআইডিকে বলছি, আপনার তদন্তে আমার কোন হেল্প লাগলে বইলেন আমি হেল্প করবো। তাদের কোন ইচ্ছাই নাই মামলা তদন্ত করার।

শহিদ মাহিনের কবর
জুলাই রেকর্ডস: বিএনপির কোন নেতার ছায়ায় আসামিরা আছে বলতে পারেন?
জামিল: না। আমি অনেকদিন বাড়িতে। আজকে একবছর ওদিকে যাওয়া হয় না। সেটা বলতে পারবো না। তবে এটা শিওর যে তারা বিএনপির ভেতরেই আছে।
জুলাই রেকর্ডস: আপনার কাছে সব ডকুমেন্টস আছে এবং আসামি দেশে থাকার পরও পুলিশ গ্রেফতার করতেছে না?
জামিল: হ্যাঁ। সব ডকুমেন্টস আছে। যারা স্পটে খুন করছে ওরা সবাই দেশে আছে। পালাইতে পারেনাই ওরা। শুধু বড় মাথাগুলা, যারা অর্ডার দিছে খুনের, ওরা নাই। যেমন এমপি হাবিব আহসান, ওর ভাই সোহেল, যুবরাজ। ওরা পলায়ে গেছে। কিন্তু ভাড়াটে খুনিরা সব দেশেই আছে। টাকা খেয়ে পুলিশ ওদের ছেড়ে দিছে।
…
জুলাই রেকর্ডসের নেয়া
শেফায়েত কাদের সাজ্জাদের ইন্টারভিউ
বাছবিচার
Latest posts by বাছবিচার (see all)
- (বই থেকে) বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ – কামরুদ্দীন আহমদ (এক) - মার্চ 14, 2026
- বাংলাদেশি ফিকশন: জমিদারি উচ্ছেদ – আবুল মনসুর আহমদ (১৯৪৫) - জানুয়ারি 30, 2026
- ‘সুভাষ দত্ত কৌন হ্যায়?’ - ডিসেম্বর 3, 2025