সিনেমায় পরিচিত আবেগের পুনর্ব্যবহার Featured
বাংলা সিনেমার একটা বড় অংশ এখন নস্টালজিয়াকে শর্টকাট হিসাবে ব্যবহার করতেছে এবং সেই শর্টকাটকে “সাংস্কৃতিক স্মৃতি” নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করতেছে।
স্মৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হইল যখন শিল্প স্মৃতিকে অনুসন্ধান না কইরা সরাসরি আবেগ-ট্রিগার হিসাবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ দর্শকের চিন্তাকে না, তার রিফ্লেক্সকে টার্গেট করে।
অনেক সিনেমা এখন পুরোনো টিভি নাটকের আবহ, পরিচিত অভিনেতা, হুমায়ূনীয় সংলাপের ছায়া, পরিচিত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা ভাইরাল ডায়লগ ব্যবহার কইরা দ্রুত আবেগ তৈরি করতে চায়। এখানে অনেক সময় গল্পের প্রয়োজনের চাইতে “ফিলিং” উৎপাদনের আগ্রহ বেশি কাজ করে।
বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্তের ঈদ-নস্টালজিয়া, বিটিভি-স্মৃতি, পরিবারকেন্দ্রিক আবহ—এইসবকেই প্রায় “জাতীয় স্মৃতি” হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ এই অভিজ্ঞতাগুলি নিজেই একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির অভিজ্ঞতা। গ্রামের মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক মানুষের স্মৃতি একইভাবে দৃশ্যমান না।
ফলে “আমাদের শৈশব” কথাটাও আসলে খুব নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান থিকা বলা। এই সিনেমাগুলি অতীতকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতেছে না। অতীতকে আরামদায়কভাবে রিপ্যাকেজ করতেছে।
অতীতের জটিলতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক পরিবর্তন—এইসব বাদ পইড়া যায়। শুধু “উষ্ণ অনুভূতি” টিকা থাকে। ফলে দর্শক একটা স্যানিটাইজড অতীতের ভিতরে আশ্রয় খুঁইজা পায়।
নস্টালজিয়ার সবচাইতে কার্যকর দিক সম্ভবত এইখানেই। এইটা ইতিহাসকে প্রায়ই রাজনীতিহীন করে। বাস্তব সংকটের বদলে আবেগগত নিরাপত্তা সামনে নিয়া আসে।
হুমায়ূন আহমেদ অবশ্যই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিশাল অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন “হুমায়ূনীয় আবহ” নিজেই কমফোর্ট-কমোডিটিতে পরিণত হয়।
একটা নির্দিষ্ট টাইপের নরম হাস্যরস, পরিচিত চরিত্র, হালকা বিষণ্নতা, পরিচিত সংলাপ—ব্যস, দর্শকের আবেগ অ্যাক্টিভেটেড। তখন সাহিত্য বা সিনেমা নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি না কইরা পুরোনো অনুভূতির পুনর্ব্যবহার শুরু করে।
মানুষ দ্রুত বদলাইতেছে, শহর বদলাইতেছে, সম্পর্ক বদলাইতেছে, মিডিয়া বদলাইতেছে। এই অবস্থায় পরিচিত আবহ সহজেই নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। নির্মাতারাও জানেন, পরিচিত আবেগ ব্যবহার করলে দর্শকের সাথে দ্রুত সংযোগ তৈরি হবে।
সমস্যা নস্টালজিয়াতে না। সমস্যা তখন, যখন নস্টালজিয়া শিল্পের জায়গা দখল কইরা ফেলে। যখন পরিচিত আবেগের শক্তি সিনেমার শিল্পগুণের বিকল্প হয়া দাঁড়ায়।
তখন সিনেমা নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে না, শুধু পুরোনো অনুভূতির নিরাপদ পুনর্ব্যবহার চালায়।
গৌতম কর্মকার
Latest posts by গৌতম কর্মকার (see all)
- সিনেমায় পরিচিত আবেগের পুনর্ব্যবহার - মে 30, 2026
- গৌতম কর্মকারের কবিতা - জুন 15, 2022