Main menu

জুলাই-আশুরা

১.
ঢাবি যেদিন বন্ধ কইরা দেয়া হয় (২০২৪ সালের জুলাই মাসে) ঐদিন ছিল আশুরা। অর্ক ভাই, আমি, মানজুর আর জাওয়াদ আমরা দাড়ায়ে আছি নীলক্ষেত তোরনের সামনে, ভেতরে ঢুকার ট্রাই করতেছি। কিন্তু পুলিশ এর কারনে ভেতরে ঢোকা যাইতেছে না।

তুহিন খান আর নিয়ামুল করিম নিলয়রে রিচ করতে চাইতেছিলাম আমরা। দুইজনই টুথপেস্ট চাইতেছিল আমাদের কাছে। ভেতরে পুলিশের টিয়ার গ্যাসে সবার নাকি দম বন্ধ অবস্থা।

পোলাপান পিপড়ার মত হল ছাড়তেছে। পুলিশের এত এত টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর মারমুখীতার একপর্যায়ে হাসনাত আর সালমানরে দেখলাম দৌড়ায়ে গিয়ে পুলিশরে থামতে বলল। অবস্থা আমাদের অনুকূলে ভাইবা আমরা গেট দিয়া ভুয়া ভুয়া বলতে বলতে ভেতরে ঢুইকা গেলাম। এইবার নীলক্ষেত আর ভিসি চত্বর দুই দিক থিকাই পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ারশেল মারা শুরু করল। সাথে সাথে সবাই যে যার মত দৌড়াইতে শুরু করলো।

ওই পরিস্থিতিতে রাস্তা খোলা দুইটা। একটা পলাশীর গলি, আরেকটা কাটাবনের গলি। আমি সঙ্গে থাকা সবাইরে চোখের পলকে হারায় ফেললাম। কাটাবনের দিকে দৌড় দিলাম। ২-৩ সেকেন্ডের ভিতর কাটাবন সাইড থিকা যুবলীগ আর ছাত্রলীগের গুন্ডারা এটাক করলো। আমি হঠাৎ জাওয়াদরে খুইজা পাইলাম। রিকশায় বসা, তার কনুই থিকা ফিনকি দিয়া রক্ত পড়তেছে।

ঐ অবস্থায়ও জাওয়াদরে নিয়া মজা নিতেছিলাম আমি। জাওয়াদ যেহেতু হাসতেছিলো আমি তার কাটা হাতরে সিরিয়াসলি নেই নাই। অরেও দেখলাম ভাই ব্রাদারদের গ্রুপে কাটা হাতের রক্ত লাগা ছবি শেয়ার দিছে। কিন্তু ঘটনা হঠাৎ অন্যদিকে টার্ন করে। অইদিন ফার্স্ট হাফ রোজা ছিলো সে। একটু পরই হাসিখুশি কাউসার মিয়া প্রায় অজ্ঞান হইয়া মাটিতে বইসা পড়ে। চোখ উল্টায় আসতেছিল ওর। আমি মারাত্মক ভয় পায়া যাই। দুইটা কারনে ভয় পাইতেছিলাম। ১) যদি আমাদের উপর কেউ এটাক করে, ২) জাওয়াদের যদি সিরিয়াস কিছু হইয়া যায়। অরে তো আমিই বাসা থিকা বাইর হইতে কইছিলাম।

তখন একটা ভ্যানওয়ালারে পাই। বলি মামা একটু দেখেন অরে, আমি পানি আর স্যালাইন লয়া আসি। ভ্যানওয়ালার জিম্মায় জাওয়াদরে রাইখা আমি একটা ফার্মেসিতে ঢুকি। স্যালাইন,পানি, স্যাভ্লন আর গজ কিনে আইসা দেখি আধামরা জাওয়াদ মাটিতে বইসা আছে। অরে পানি দেই, ও কোন মতে সেই পানি খাইয়া আস্তে আস্তে উইঠা দাঁড়ায়। সৈয়দ ফরহাদ ভাইরে ফোন করি। উনি বাটা সিগন্যালে, উনাদের ব্যান্ড প্র্যাকটিস হয় যেখানে সেখানে আমাদের আসতে বলেন। জাওয়াদরে নিয়া রিকশায় উঠি। ফরহাদ ভাই আমাদের রিসিভ করেন আর একটা পুরানা বনেদি বাড়িতে ঢুকায় দেন।

একটু পর অর্ক ভাই আর মানজুর আসে। জাওয়াদ এর হাত ওয়াশ কইরা ব্যান্ডেজ লাগানো হয়। মনে পড়ে আমরা যখন বাটা সিগন্যাল থিকা মোহাম্মদপুরের দিকে ব্যাক করতেছিলাম, আমি আর জাওয়াদ, আমরা দুইজনই ভয় পাইতেছিলাম হালকা। যদি লীগ বা পুলিশ ধরে কি বলবো এইগুলা সাজাইতেছিলাম মনে মনে। শেষে নিরাপদভাবেই মোহাম্মদপুর ফিরি।

July 14, 2024. File Photo/AFP

২.
ইন্টারনেট বন্ধ। সবার সাথে মেসেজে যোগাযোগ হইতেছে। জিম ভাই, মানজুর সহ অনেকেই একটু পর পর টেক্সট দিয়া আপডেট জানাইতেছে এদিক সেদিকের। ধরপাকড় চলতেছে। গুলি করে মানুষ মারতেছে। যার তার বাসায় রেইড পড়তেছে। পরিচিত অনেকরেই তুলে নিয়ে যাওয়া হইতেছে যখন তখন। রাত আটটা কি নয়টা বাজে, হালকা বৃষ্টি হইতেছে মোহাম্মদপুরে। সাডেনলি মানজুর মিয়ার নাম্বার থিকা টেক্সট আসল। টেক্সটে লেখা – ‘পুলিশ’। এই টেক্সট দেইখা আমার সব কান্ধে উইঠা গেল। ফোনের সব টেক্সট আর বিকালে ছাদে দাড়ায়ে করা হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার ফুটেজ ডিলিট দিলাম। মানজুরকে নগদে কল দিলাম। ফোন বিজি ওর। প্যানিক এটাক শুরু হইলো আমার। আমি দৌড়াইয়া ছাদে গেলাম। ছাদের উপরে পানির ট্যাঙ্কি, পাশেই লাগোয়া অন্য বাড়ির ছাদ। ভাবলাম পুলিশ রেইড দিলে ছাদ টপকামু। মোটামুটি সব প্রিপারেশন ডান এমন সময় মানজুর কল দিলো। জিগাইলো কল দিছিলাম কেন। আমি উত্তর না দিয়া পাল্টা জিগাইলাম পুলিশ লেইখা টেক্সট দিলো কেন? পুলিশ রেইড দিছে নাকি? মানজুর বললো ভুলে ঐ টেক্সট চলে গেছে। টেক্সট পায়া আমি কি ভাবছি আর ভাইবা কি ডিসিশন নিতে যাইতেছিলাম এই কথা মানজুরকে জানাইতেই ও হাসতে হাসতে শেষ। দুইজন দুইজনরে নিয়া মজা নিতেছিলাম এমন সময় মানজুর বলল তিন রাস্তার দিকে নাকি গোলাগুলি হইতেছে। বেশ কয়েকজন মারা গেছে এইটা শুইনা হাসি আর আগাইলো না।

এরপর সারারাত থাইমা থাইমা গুলি আর বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমায় গেছি টেরই পাইলাম না।

৩.
জুলাই এর সময় আমি প্রতিদিন ডায়েরি লেখার ট্রাই করছি। প্রায়ই ভাবি ডায়েরিটা দ্রুতই পিডিএফ বানায়া ছাইড়া দেয়া উচিত। এই ভাবতে ভাবতে আজকে এক বছর হয়া গেল।

জুলাই নিয়া চোখ বন্ধ করলে খালি একটা জিনিসই মনে পড়ে। হাসান রোবায়েতের লেখা চার লাইনের কবিতা ।

তোমরা হয়তো যাইবা ভুলে
খুনি হাসিনার ইতিহাস
সেই মায়ে রাখবো মনে
যে ছুইছে পোলার লাশ

/জুলাই ০১, ২০২৫

The following two tabs change content below.
Avatar photo

রায়হান রহমান রাহিম

জন্ম ১১ ই এপ্রিল, হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৷ বাংলাদেশি ফোক মিউজিক নিয়া গ্র্যাজুয়েশন শেষ করছি ৷ ফিল্ম আর ফিকশন — কমফোর্ট জোন ৷ তার পাশাপাশি সলো ট্যুর দেই, গান বানাই আর ছবি তুলি ৷ নিজের সাথে আর মানুষের সাথে মজা নিতে ভাল্লাগে!
Avatar photo

Latest posts by রায়হান রহমান রাহিম (see all)

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →