বুদ্ধিজীবীর মুখে ছাই – মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮ – ১৯৮১)
বাংলাদেশের লিটারেচারের যেই ল্যান্ডস্কেপ সেইখানে মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮ – ১৯৮১) এর নাম অনেকেরই জানার কথা না; যারা জানেন তারা মনে করতে পারবেন উনার “পল্টন জীবনের স্মৃতি” নামের বইটার কথা, যেইটা উনি যখন পয়লা বিশ্বযুদ্ধে মেসোপটেমিয়াতে ছিলেন, সেই সময়ের কথা, ১৯৪০ সালে ছাপা হইছিল, পরে “মো’মেনের জবানবন্দী” (১৯৪৬) নামে একটা অটোবায়োগ্রাফিকাল বই লেখছিলেন যেইটা পপুলার হইছিল এবং ইংলিশে ও উর্দুতে ট্রান্সলেট হইছিল
কিনতু উনি মেইনলি স্টোরি-টেলার, সৈয়দ মুজতবা আলী’র ঘরানার রাইটার অনেকটা, খুবই উইটি-মেজাজের, কিনতু উনার দুনিয়া খুবই আলাদা এবং বাংলাদেশি; উনি ইতিহাসের বইও লেখছেন – চট্টগ্রামের ইতিহাস ৩ খন্ডে, বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত লেখছেন ৪ খন্ডে, স্বাধিনতার পর পরে… ১৯৭৮ সালে একুশে পুরষ্কারও পাইছিলেন, পাকিস্তান পিরিয়ডে আইয়ুব খাঁ’র সময়েও প্রাইজ-টাইজ পাইছিলেন; সরকারি চাকরি থিকা রিটায়ার করার পরে জামানা নামে একটা পত্রিকা ছাপাইতেন চিটাগাং থিকা…
এই লেখাটা উনার জীবনের শেষ লেখা, উনি মারা যাওয়ার পরে ১৯৮৪ সালে “মাহবুব-আলম স্মৃতি স্যুভেনির” নামে একটা বইয়ে ছাপা হইছিল; উনার আরগুমেন্ট’টা খুবই ইন্টারেস্টিং, যে, বুদ্ধিজীবীরা খালি ধ্বনি করেন, মানে, কথাই বলেন, কোন কাজ করতে চান না, জানেন না, এমনকি কাজ করাটারে খুবই খারাপ কাজ বইলা মনে করেন!
এবং এই বুদ্ধিজীবীরা একটা কলোনিয়াল লিগাসির ভিতর দিয়া ক্ষমতার সাথে একটা ক্লোজ রিলেশন মেইনটেইন কইরা এন্টি-পিপল পজিশন হিসাবে সমাজে রোল প্লে করেন!
এবং উনি ১৯৮১ সালে প্রেডিক্ট করতেছেন যে, এর ফলে দেশে এক ধরনের “পার্টিজান” পদ্ধতি চালু হবে, যেইটারে বাতিল না করতে পারলে সত্যিকারে স্বাধিনতা আসতে পারবে না! হলি কাউ! মানে, এই লেখার সাথে অনেক জায়গাতেই অন্যমত থাকতে পারে আমাদের, কিনতু কেমনে আন-নোটিশড থাকতে পারে!
মেবি, খালি পলিটিকাল-ই কালচারালি একটা “পার্টিজান” সিসটেমের কারনেই এইটা পসিবল হইতে পারছে! তো, উনার লেখা-পত্রগুলা আমাদের আবারো রিভিউ করতে পারাটা উচিত, এই লেখাটা দিয়া সেইটা শুরু করতে চাইলাম আমরা
ই.হা.
…
বুদ্ধিজীবী কথাটা এ দেশেই খুব চোখা হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর আর কোন দেশেই এ কথাটার উপর এত বেশী জোর দেওয়া হয় না।
মানুষ মাত্রেই বুদ্ধিজীবী। বস্তুতঃ বুদ্ধি আছে বলেই সে মানুষ, প্রাণীজগতের শ্রেষ্ঠ। নতুবা, ইতর-প্রাণী বা জন্তু-জানোয়ারের সাথে তার কোন পার্থক্য থাকতো না।
কিন্তু, বঙ্গে তথা বাংলাদেশে ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটা এক বিশেষ অর্থে’ ব্যবহার হয়ে আসছে। ‘বুদ্ধিজীবী’ সাধারণতঃ লেখা-পড়া জানা মানুষ।
এই লেখা-পড়াকে ‘কোরাণ’-এ কোন দ্বীকৃতি দেওয়া হয় নি। দেখান হয়েছে যে বনি-ইস্রাইল যখন ঠিক পথে চলছিল তাদের পথ-ভ্রষ্ট করেছিলেন যিনি তিনি হচ্ছেন পণ্ডিত সামেরী – এক বুদ্ধিজীবী – লেখা-পড়া জানা।
মুসা বনি-ইস্রাইলকে রওয়ানা করিয়ে দিয়েছিলেন নিরাকার একেশ্বরের উপাসক রূপে। এখন পণ্ডিত সামেরী বল্লেনঃ চলো হে, আমরা একটা সোনার গো-বৎস বানাই এবং তাকে পূজা করি।
মুসা ছোট ভাই হারুণকে সঙ্গে দিয়েছিলেন বনি-ইস্রায়েলের রক্ষক ও পথি প্রদর্শক রূপে। হারুণ কাজে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেনঃ বনি ইস্রায়েল একেশ্বরবাদ ছেড়ে প্রতিমা-পূজক হয়ে গেছে। বেপথু হয়ে গেছে।
পটিয়া রেল ষ্টেশনে একদিন ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলুম। এক ব্যক্তি এসে সালাম কর্লেন। দেখিঃ আমার এক দূর সম্পর্কে’র ভাগ্নে। জিগ্যেস কর্লমঃ বাবা, ভাল আছ? তোমার কয়টি ছেলে-মেয়ে?
বল্লে: একটি মাত্র মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললে।
আমি প্রশ্ন কলম: বাবা, দীর্ঘশ্বাস ফেললে কেন? উত্তর কর্লে: মেয়েটিকে বেশী লেখা পড়া করাতে পারি নি!
আমি বললুমঃ ও, এ ব্যাপার! আচ্ছা, বলো দেখি, আমার গাঁয়ে গেলে যে দয়া-মায়া পাই – আমাদের মা-মাসীদের হাতে যাঁরা সকলকে সুখী করার জন্যে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন-তাঁরা কি লেখা পড়া জানা লোক?
ভাগ্নে বল্লে: না, তাঁরা লেখা পড়া জানা নন।
আমি বললুম: বাবা কলমের আগায় এর জিনিস ওকে দেয় মামলা মোকদ্দমা লাগিয়ে দিয়ে সমাজকে শোষণ করে, সত্যকে মিথ্যা করে মিথ্যারে সত্য করে তারা কি রকম লোক, তারা কি নিরক্ষর অশিক্ষিত?
ভাগ্নে উত্তর কলে: তারা লেখা পড়া জানা লোক।
আমি বললুম, তবে? তুমি কেন আফসোস কচ্ছ যে তোমার মেয়েকে বেশী লেখা পড়া করাতে পার নি? আসল প্রশ্ন হলো লোকের ভাল হওয়া, লোকের লেখা পড়া জানা নয়। জান? ‘কোরাণ’-এ কেউ যদি ভাল কাজ করে তার পুরষ্কার বলা হয়েছে: তাকে ভাল লোকদের বৈঠকে আসন দেওয়া হবে – যে বৈঠকে প্রধান আসন হচ্ছে রসুলে আকরমের – আর কে না জানে যে রসূলে আকরম নিরক্ষর ছিলেন।
ইহার তাৎপর্য এইযে ইসলাম শরীয়ৎ (শাস্ত্র), মারেফৎ (অধ্যাত্ম), তরীকৎ (গুরু প্রদর্শিত পথ) ও হকীকৎ (সত্য স্বয়ং সমুদ্ভাসিত) – সাধনার এই চারি মার্গই স্বীকার করে। এর কোন মার্গের জন্যই লেখা-পড়া জানা অপরিহার্য নহে। Continue reading