[pullquote][AWD_comments][/pullquote] যদিও ১৯৫৩ সালে (জিব্রাইলের ডানা বইটাতে) ছাপা হইছিল গল্পটা, তারপরও শাহেদ আলীর গল্প পড়লে আপনার এখনকার কাসেম বিন আবুবকর-এর উপন্যাসের কথা মনে হইতে পারবে; কারণ এই গল্পে নায়িকা নামাজ পড়ে এবং পড়ার আগে ও পরে দেবরের লগে ফ্লার্ট করে। নায়কও খুশি হইলে ভাবীরে পায়ে ধইরা সালাম করার কথা ভাবে। আমাদের বাংলা-গল্পের যে সাহিত্যিক রিয়ালিটি সেইখানে এইটা একদিক দিয়া ত ‘সাম্প্রদায়িক’, আরেকদিক দিয়া খুবই ফানি এবং নৈতিকভাবে খুবই ‘অসৎ’ একটা জিনিস যে, যে নামাজ পড়ে সে/শে আবার কেমনে ফ্লার্ট করে!
তারপরও ভাবীরে মরা-ই লাগে কারণ তিনি সুন্দরী অনেক এবং বুদ্ধিও খারাপ না, ফিউচার প্রেডিক্ট করতে পারেন। এইটা তারে লোনলি কইরা রাখে, সিজোফ্রেনিয়াক বানায়া ফেলে; কারণ আমাদের অ্যাভারেজ পোয়েটিক মেন্টালিটি কখনোই জাগতিক বিউটিরে নিতে রাজি হইতে পারে না; তারে মরা লাগেই। তবে নষ্টনীড়ের বৌদি’র চাইতে ভাবী’র মরাটা মেবি একদিক দিয়া বেটার। বাঁইচা থাকা বা মইরা যাওয়ার লাইগা জামাই বা দেবরের প্রেমের উপ্রে তারে ডিপেন্ড করতে হয় নাই।
আর ভাষা তো একটা পলিটিক্যাল জিনিস। অনেক অনেক ‘ইসলামী’ শব্দ থাকার পরেও শাহেদ আলীর ‘জিব্রাইলের ডানা’রে বাংলাভাষায় নেয়া গেছিলো গরিব-টাইপ ব্যাপার ছিলো বইলা, যেইটারে সমাজতন্ত্রের ড্রিমে কনভার্ট কইরা পড়া যাইতো। এখন এই খামাখা রোমাণ্টিকতারেও প্রগতি প্রকাশনের চেঙ্গিস আইতমাকভের ‘জমিলা’র সতীন ভাইবা পড়তে পারেন, কিন্তু ‘বর্তন’ ‘কু’কাফ’ ‘মউৎ’ ‘পুশিদা’ শব্দগুলা একরকম ডির্স্টাবই করবো আপনারে।
——————
ইস্কুল ছিলো ফুফুদের গাঁয়- আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে। হেমন্তে আমরা ইস্কুলে যাই হেঁটে- বন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে ছোটাছুটি করে ইস্কুলে যেতে কী ভালই না লাগতো। বর্ষায় মাঠ-ঘাট ডুবে যেতো, বড় বড় ঢেউ উঠতো দু-গায়েঁর মাঝে। ঢেউ-এ আছাড় খেতে খেতে এগোতে আমাদের ছোট নৌকায় ক্লাস শেষে প্রাইয় ফুফুদের বাড়ি হয়ে আসি। মাঝে মাঝে ফুফুর কাছে থেকে যাই।
একদিন ফুফুদের বাড়ি গিয়ে আটকা পড়ে গেলাম, ফুফু কিছুতেই ছাড়লেন না। শেলেট পেন্সিল আর বর্ণবোধের বইখানি যত্ন করে তাকের উপর রেখে দিলেন, তারপর চীনামাটির বর্তনে দুধ-দই দিয়ে আমাকে খেতে দিলেন।
রাতটা ছিল ভারী চমৎকার-পুঞ্জ পুঞ্জ মোলায়েম জোছনায় ঝলোমলো ! বাইরে অনেকক্ষণ ছুটাছুটি করে শুতে গেছি- হঠাাৎ নীল রঙ্গের শাড়ী আর নীল রেশমী চুড়ি পরা একটি মেয়ে এসে আমার কাছে দাঁড়ালো। ওর মুখের দিকে চেয়েই আমি শরমে চোখ ফিরিয়ে নিলাম- অতো সুন্দর অথচ অতো অপরিচিত!
মেয়েটি একবার ফুফুকে বলল- চাচী আম্মা, ও আজ আমার কাছেই থাকবে! তারপর একটু নুয়ে সে আমার হাত দুটি ধরে টানতে শুরু করে। ভয়ে বুক আমার দুরু দুরু করে উঠলো আমি আরো সেঁধিয়ে যেতে থাকি ফুফুকে বুকের ভেতর।
ফুফু মৃদু হেসে বললেন- না গো বউ, সিদু আমার ভীতু। ও তোমার কাছে যাবে না। মেয়েটি কেমন এক ধরনের মিষ্টি হাসিতে কলকল করে উঠলো-মনে হলো, পাথরের উপর দিয়ে ঝরনার পানি যেন ঝরে পড়ল ঝর ঝর করে। বলল- আমি কি রাক্ষস- খোক্ষস যে আমাকে ভয় পাবে?- বলে সে নীল শাড়ীর ভেতর থেকে শুভ্র গোলগাল হাত দুটি বার করে টেনে আমাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
ফুফুও হেসে ফেললেন এবার – যা না সিদু, ভয়ের কি আছে? ও তো তোর ভাবী!
আমার লজ্জা ভয় ও সংকোচ খানিকটা কেটে গেছে এরিমধ্যে। মেয়েটি তাহলে পর নয়- আমার ভাবী; আর ভাবীই যখন, লজ্জা- সংকোচ কিসের? ভাবী তার হাত দুটি এগিয়ে দিয়েছিলো আমাকে কোলে নেবার জন্যে। আমি কিন্তু হেঁটেই চল্লাম। রোজ দেড় মাইল হেঁটে এসে ইস্কুলে পড়ি- আমার কি কোলে ওঠা সাজে? ভাবী আমাকে হাত ধরে তার ঘরে নিয়ে গেল।
ঝকঝকে তকতকে একখানি ঘর। দামি দামি আসবাবপত্র সাজানো- গোছানো। একদিক একটা পালঙ্কের উপর বিছানা পাতা- তাতে দুটি বালিশ। ভাবী বলল- যাও ঘুমাও গিয়ে- আমি নামাজটা সেরে নিই।
দ’চোখ ঘুমে এমনিতেই ভরে আসছিল। ভাবীর নির্দেশ পেয়ে যেন বেঁচে গেলাম। কুচিমুচি হয়ে শুয়ে পড়লাম পালঙ্কের উপর।
হঠাৎ একবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মাথার কাছে লন্ঠনটা তখনো জ্বলছে। দেখলাম, অদ্ভুত চোখ দুটি চেয়ে মেলে আছে আমার দিকে- ঠোঁটে অর্ধস্ফুট হাসির কচি কচি কুঁড়ি। আমার চোখ মুখে ভাবি হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কী মধুর মেলায়েত তার পাশে! সেই স্পর্শের ভেতর দিয়ে তার অগাধ মমতা যেন গলে পড়েছে আমার সর্বাঙ্গে।
আমাকে চোখ খুলতে দেখেই ভাবী হেসে ফেলে- কী গো সিধু ভাইয়া, তোমার ভাই নেই বাড়িতে- তোমাকে আনলাম পাহারা দেবে বলে! আর তুমি কিনা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছ- ভাবী একটু মৃদু ধাক্কা দেয় আমাকে- উঠে বসোতো সিধু ভাইয়া; দোরে বসে বসে দুটো আম খাও, আর ওই লাঠি নিয়ে আমাকে পাহারা দাও। ভাবী বেড়ার সাথে দাঁড় করানো বাঁশের লাঠিটা দেখিয়ে দেয়। কিন্তু ভাবী তো একটা জ্যান্ত মানুষ। আম খেতে খেতে ভাবীকে পাহারা দেবো এ কেমন কথা? তবু আমাকে উঠে বসতে হলো। সাহস সঞ্চয় করে বেশ গম্ভীর ভাবেই একবার জিজ্ঞেস করে বসলাম- চোর বুঝি আপনাকে চুরি করতে আসে ভাবী?
হাসতে হাসতে ভাবী এবার ভেঙ্গে পড়ে- আমার মুখ টিপে দিয়ে বলে- আপনি না গো সিদু ভাইয়া, ‘আপনি’ না! আমাকে ‘তুমি’ করেই বলবে। তারপর একটু প্রেমে রসিকতায় মুগ্ধ হয়ে উঠে- যা হোক তোমার সোনা- মুখের কথাতো একটা শুনলাম! চোর এলেও আর ভয় নেই। চলো ঘুমাই গিয়ে- তোমার গন্ধ পেলেই ওরা জান নিয়ে পালাবে। Continue reading →