‘সুভাষ দত্ত কৌন হ্যায়?’
[সুভাষ দত্ত’র অটোবায়োগ্রাফির একটা অংশ]
‘৭১-এ আমি লারমনি স্ট্রীটে থাকতাম। ২৫ মার্চের রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। সকাল বেলায় জানা গেল ওটা ছিল পাকিস্তানিদের হামলা। তারা বহু লোকজন মেরেছে। ভার্সিটিতে হামলা চালিয়েছে, হত্যা করেছে ড. জি সি দেবকে। তখন আমার মনে পড়ল এই গোবিন্দ দেব আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তখন আমি দিনাজপুর কলেজে পড়তাম। ইউনিভার্সিটিতে, তার বাড়িতে আমার দেখাও হয়েছিল ডঃ জি সি দেবের সঙ্গে। উনি আমাকে দেখে বলেছিলেন, ‘কি সুভাষ? তোমার নাকি এখন খুব নামটাম হয়ে গেছে?’
আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, স্যার। আপনার আশীর্বাদে চলচ্চিত্র জগতে মোটামুটি পরিচিতি লাভ করেছি।
যাহোক, যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেল। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল হিংসা। বিহারীরা পাকিস্তানিদের পক্ষ নিল। খুঁজে খুঁজে বের করতে লাগল কোথায় হিন্দুরা থাকে। কে কি করে। আমার বাসা ছিল ৪নং লারমনি স্ট্রীটে। পাড়ার ছেলেরা অবস্থার ভয়াবহতা টের পেয়ে একদিন বলল, ‘দাদা, আপনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। মিরপুর থেকে বিহারীরা আসছে আপনার বাসার দিকে। আমরা খবর পেয়েছি।
তখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি চলে আসলাম ৩নং ওয়ারী স্ট্রীটে। কিছুক্ষণ পরে খবর এল আমার বাসায় লুটপাট শুরু হয়ে গেছে। বিহারীরা যা কিছু পাচ্ছে সব নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম, যাক, নিচ্ছে নিক। আমি প্রতিবাদ করি নি, প্রতিরোধও করি নি।
এভাবে কেটে গেল কয়েকটা দিন। তারপর ১ এপ্রিলের দুপুর বেলা একটি খবর এল। সেদিন ঘরে শুয়ে রেডিওতে কম ভল্যুমে শুনছি কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সে খবর। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। শুনলাম বুটের শব্দ। তারপরই প্রবল লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল পাকিস্তানি মিলিটারি। দ্রুত আমাদের বাড়িটাকে ঘেরাও করে ফেলল ওরা। তারপর আমাকে, আমার ভাইকে এবং অরুণা গোস্বামী বলে একটি ছেলে ছিল, তবলা বাজাত, এই তিনজনকে নিয়ে বাসার সামনের উঠোনে দাঁড় করাল। আমার পরিবারের সবাই ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ছোট ছেলেটা প্রাচীর টপকে পালিয়ে গিয়েছিল। আমাকে প্রাচীরের সামনে দাঁড় করাল। হাত উঠিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ছয়জন মিলিটারি তাদের বন্দুক উঁচিয়ে রেডি হয়ে থাকল। ক্যাপ্টেনের অর্ডারের অপেক্ষায়। গোটা এলাকা ফাঁকা। বিহারীরা মিলিটারির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই। হঠাৎ এক ক্যাপ্টেন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যায়া নাম হ্যায় তোমারা।’ আমি বললাম, ‘সুভাষ দত্ত।’
ক্যাপ্টেন বলল, ‘তুম সুভাষ দত্ত। তুম ফিলিম মে কাম করতা হ্যায়?’
আমি বললাম, ‘জি!’
তখন ওদের মধ্যে যারা বন্দুক উঁচিয়ে ছিল তাদেরকে ইশারা করল। ওরা বন্দুক নামিয়ে ফেলল। তারপর একটি গাড়ি ডাকল। গাড়িটিতে আমাদের উঠতে বলল, ‘আমরা উঠলাম। সবাই ভাবল বাইরে নিয়ে গিয়ে আমাদের মেরে ফেলবে।
তখন এই গাড়িটি বনগ্রাম, নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড হয়ে গভর্নর হাউজে ঢুকল। গভর্নর হাউজে একটি বিশেষ কক্ষে আমাদেরকে রাখা হলো। এ রকম বহু লোককে এনে এখানে রাখা হয়েছে। এদের সবার ধারণা সন্ধ্যার পরে সবাইকে মেরে ফেলা হবে। তখন একজন এসে ডাকল, ‘সুভাষ দত্ত কৌন হ্যায়? ও বাহার নিকালো। আমি তখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম। আমি ভাবলাম কোথায় নিয়ে যায়। কিন্তু না দেখলাম ওখানেই একটা রুমে টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করাল। তখন একজন আমাকে বলছে, ‘তোমহারা মালুম হ্যায় ইহাছে কোন মন্দির মে ইন্ডিয়ামে খবর যাতা?’
আমি বললাম, নেহি।
‘তুম তো হিন্দু হ্যায়?’
আমি বললাম, জ্বি।’
‘মন্দির মে মে নেহি যাতা হ্যায়?’
‘নেহি। হাম মন্দির মে নেহি যাতা হ্যায়।’
‘ত তুম ক্যায়সা হিন্দু হ্যায়?’
আমি বললাম, ‘হাম রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকা ফলোয়ার হ্যায়। হামরা মন্দির মে নেহি জানা। হামরা ঘরমে কাম হো যায়।’
তখন ওরা বলে ঠিক হ্যায়। তুম উধার যাও।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে বলছে সুভাষ দত্তের সাথে যত লোক সবাইকে বাইরে বের কর। তখন আমরা কান্না শুরু করে দিলাম। কারণ আমরা বাইরে গুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। এর মধ্যে পরিচিত লোক যারা আছে তাদেরকে বললাম, ভাই আসি। হয়তো এই শেষ দেখা। বাইরে যখন বের হলাম, আগের সেই ক্যাপ্টেনটা দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে আমাকে বলল-শুন ইধার আও। তখন আমাকে যে সুন্দর কথাটা বলল- সেই কথাটিই পরবর্তীতে আমি ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে লাগিয়েছিলাম। আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিল। Continue reading