(বই থেকে) স্বাধীনতার ঘোষণা – বদরুদ্দীন উমর
[বদরুদ্দীন উমরের এই লেখাটা উনার “”বাংলাদেশের অভ্যুদয় (পূর্ব পাকিস্কানের ইতিহাস): দ্বিতীয় খন্ড (১৯৫৮-১৯৭১)” বইয়ের লাস্ট চ্যাপ্টার। মূল লেখা ইংরেজিতে, সেইটা বাংলায় ট্রান্সলেট করছেন মুঈদ্দীন আহমদ, সামিউল আলম রিচি। বইটা ছাপাইছেন বাতিঘর, ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে। বইয়ের ৪১১- ৪২৪ পেইজে এই লেখাটা আছে।]
…
স্বাধীনতার ঘোষণা
পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের সাংবিধানিক আন্দোলনকে শেখ মুজিবুর রহমান একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ যে ভাবে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন দেখেছিল এবং সে অনুযায়ী দাবী তুলেছিল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে তা প্রকৃতপক্ষে অর্জন করা যেত না। আন্দোলন মার্চ মাস নাগাদ এমন একটা পর্যায়ে পৌছায় যে সাংবিধানিক পথে থেকে তা আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো ক্রমেই সম্ভব ছিল না। কিংবা অন্য ভাবে বললে, আওয়ামী লীগের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসনের সাংবিধানিক আন্দোলন অকার্যকর হয়ে ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু আন্দোলন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সমস্ত বাধা ভেঙে প্রবলভাবে এগিয়ে চলছিল। এই ঝোঁক আরও জোরালো হয়ে ওঠে যখন ইয়াহিয়া খান ১৯৭১-এর পয়লা মার্চ এক ঘোষণায় ৩ তারিখে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পিছিয়ে দিলেন।
৭ মার্চের পর আওয়ামী লীগ নিয়ম মাফিক প্রাদেশিক পরিষদের কোনো অধিবেশন আহ্বান করা ছাড়াই, পুলিশ, জেল প্রশাসনসহ, সমগ্র প্রাদেশিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। এ কাজ করা হয় গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে এবং এমন ভাবে যে এর আর কোনো সাংবিধানিক চরিত্র থাকেনি। এই পদক্ষেপের ফলে সাংবিধানিক পথের এই আন্দোলন সাংবিধানিকতার সীমানার বাইরে সম্প্রসারিত হয় পড়ে। একটি সাংবিধানিক রাজনৈতিক দলের জন্য এ ছিল এক ব্যতিক্রমী অর্জন।
আওয়ামী লীগ কোনো সাংবিধানিক রাজনৈতিক দল না হলে এবং যার কর্মসূচি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্বায়ত্তশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকলে বিপুল জনসমর্থনের ন্যায্যতার ওপর দাঁড়িয়ে ৭ মার্চ তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারত। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে বাঙালীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং বাঙালি অফিসার আর জওয়ানরা পাকিস্তান রাষ্ট্র আর পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্রস্তুত ছিল। তাদের শুধু প্রয়োজন ছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের কাছ থেকে একটি আহ্বান।
আওয়ামী লীগ সেই পথে যায়নি, কেননা সে রকম কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না। বরং তারা অসহযোগ আন্দোলনের সাংবিধানিক পথেই চলছিল এমন একটা সময়ে, যখন পুরো দেশ পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে চরম ক্রোধে ফুঁসছিল এবং আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাঙলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দিলে তাকে রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে উঠে দাঁড়াত। তবে আওয়ামী লীগ, বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমান, হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন, সমস্ত বুলি ও বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও একই জায়গায় আটকে ছিলেন এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপটি গ্রহণে অসমর্থ ছিলেন।
পুরো পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকার পরও দৃঢ়তার এই সংকটের কারণে আওয়ামী লীগের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। জনগণের মধ্যে প্রবল অস্থিরতা, যার মধ্যে ছাত্ররাও ছিল, যারা খোলাখুলিভাবে স্বাধীনতার আওয়াজ তুলছিল, যা লক্ষ্য করছিল পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং ভুট্টোও। ফলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে আলোচনার ফাঁদে আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়নি, যার সুযোগে তারা যত দ্রুত সম্ভব পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি জোরদার করতে থাকে।
আলোচনার গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যতই দিন যাচ্ছিল আওয়ামী লীগের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে আসছিল এবং আলোচনায় সরকার পক্ষ আওয়ামী লীগকে ক্রমেই এঁটে ধরছিল। ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় আলোচনা ভেঙে পড়ে।
২৫ মার্চ রাতে সামরিক হামলা শুরু হয় যার জন্য কোনো রকম প্রস্তুতিই আওয়ামী লীগের ছিল না এবং সে কারণে, এর জন্য কোনো নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
পূর্ব বাঙলার জনগণের উপর যে যুদ্ধ পাকিস্তানী সরকার চাপিয়ে দিয়েছিল জনগণের দিক থেকে তার প্রতিরোধ শুরু হল। বস্তুত সেই অবস্থায় কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা বা স্বাধীনতার ঘোষণার প্রয়োজন ছিল না। ২৫ মার্চ রাতের আক্রমণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও অনিবার্যভাবে জনগণকে এমন এক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে গেল যা স্বাধীনতা যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু ছিল না।
যুদ্ধের শুরুতেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁর দলের লোক ও অনুসারীদের এক অংশ ‘পড়িমড়ি করে’ ভারতে পালিয়ে যায়।
আওয়ামী লীগ নেতাদের এই কাপুরুষোচিত ভূমিকা স্পষ্টতই দেখায় যে আলোচনা ব্যর্থ হলে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের ঘোষণা প্রদান বা তা সংগঠিত করার কোনো পরিকল্পনাই তাদের ছিল না। Continue reading