আমাদের ভাষা ।। আবুল মনসুর আহমেদ ।। ১৯৫৮ ।।
এই লেখাটা আবুল মনসুর আহমদের বাংলাদেশের কালচার বইটা থিকা নেয়া হইছে। বইটা আহমদ পাবলিশিং হাউস পয়লা ছাপাইছিল ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে, এখন বাজারে সপ্তম মুদ্রণের কপি পাওয়া যায়, যেইটা ২০১১ সালে ছাপা হইছে। বইয়ের ১২৮ থিকা ১৩৯ পেইজে এই লেখাটা আছে।
আগের দিনে পলিটিক্যাল পার্টিগুলাতে খালি অ্যাক্টিভিস্টই না, থিওরিস্টরাও থাকতেন, আবুল মনসুর আহমেদ পাকিস্তান আমলে আওয়ামী মুসলিম পার্টির পলিটিক্যাল থিওরিস্ট ছিলেন। পলিটিক্যাল জায়গা থিকা বাংলা ভাষা কি রকম হওযা দরকার, সেইটার কিছু সাজেশন উনি রাখছেন, এই লেখায়। উনার সাহিত্যিক বিকাশ কলকাতাতেই, এই কারণে কলকাতার ভাষাচিন্তা বা ভাষা ইউজ করার যেই প্যাটার্ন সেইখান থিকা উনি কমই সরতে পারছেন। উনার সাজেশন মেইনলি ৩টা –
১. কলকাতা আগে যেহেতু রাজধানী ছিল, কলকাতার আশেপাশের অঞ্চলের ভাষা আর কলকাতার মধ্যবিত্তের ভাষাই স্ট্যান্ডার্ড বাংলাভাষা ছিল। এখন ঢাকা যেহেতু রাজধানী, ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলের ভাষা আর ঢাকাইয়া মধ্যবিত্তের ভাষাই হবে স্ট্যার্ন্ডাড বাংলা ভাষা। যদিও পরে জনগণের ভাষার কথা উনি বলতেছিলেন, সেইটার জন্য কোন গ্রাউন্ড উনি সাজেস্ট করতে পারেন নাই।
২. সেক্যুলার ঝামেলাটাও উনার ছিল, যে শব্দের কোন ধর্ম নাই। বরং শব্দের ব্যবহারে যে ধর্ম প্রকাশ পায়, এই জায়গাটা থিকা উনি দেখছেন। অথচ দুইটা জায়গাই ভাষার ভিতরে আছে। ধর্মঅভ্যাসের কারণেই অনেক শব্দ আসছে ভাষাতে, এইটাও মিথ্যা না। তখনকার পলিটিক্যাল সিচুয়েশনে একইসাথে মুসলমান হওয়ার রাষ্ট্রীয় চাপ আর সেক্যুলার হওয়ার যেই কালচারাল চাপ আছিলো ঢাকা শহরে, উনি পলিটিক্যালি এই জায়গা দুইটারে আপহোল্ড করার ট্রাই করছেন আসলে। কিন্তু আমাদের জীবনযাপন বা লাইফস্টাইল যে খালি সাহিত্যে রিফ্লেক্টেড হয় – তা তো না, কলকাতার সাহিত্যের যেই এফেক্ট আমাদের লাইফস্টাইলে, রুচিতে, সাহিত্যে রইয়া গেছে আর থাকতেছে, সেইটা খুবই কনশাসলি লোকেট করতে না পারলে সেইটা থিকা বাইর হইতে পারাটা বা নতুন ক্রিয়েশনের জায়গাগুলারে স্পেইস দিতে পারাটা খুবই মুশকিলের হওয়ার কথা।
৩. যেই জায়গাটাতে উনি অনেক বেশি ওপেন-আপ হইতে পারছেন, সেইটা হইতেছে, যেই বিদেশি শব্দগুলা অলরেডি বাংলাভাষায় চইলা আসছে, সেইগুলার বাংলা করার দরকার নাই। অথচ উনার সাগরেদরা এইটাই মানতে পারেন নাই, যার ফলে মোবাইল ফোনরে মুঠোফোন বলার মিডলক্লাস প্রাইড উনারা রাখতেই চান এখনো, বাংলাভাষায়।
তো, ভাষা এই নিয়া এই লেখা ১৯৫৮ সনের পলিটিক্যাল সিচুয়েশনটারে মাথায় রাইখা পড়ার একটা সাজেশন থাকলো। আর ভাষা যে পলিটিক্যাল এইকটা ইন্সট্রুমেন্ট এইটা নতুন কইরা বলার তো কোন দরকার আছে বইলা মনেহয় না।
ই.হা.
…………………………………………………………
আমাদের বাংলা
আমাদের নিজস্ব কালচার বিকাশের ও নিজস্ব সাহিত্য সৃষ্টির জন্য চাই আমাদের নিজস্ব ভাষা। আমাদের নিজস্ব ভাষা বাংলা, এ কথা আজ যথেষ্ট নয়। যথেষ্ট নয় দুই কারণে। এক কারণ ঐতিহাসিক। অপর কারণ রাজনৈতিক।
ঐতিহাসিক কারণ বাংলা ভাষার ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলা ভাষার স্রষ্টা ও বাংলা সাহিত্যের পিতা আসলে বাংলার নবাব-বাদশারাই। সে হিসাবে বাংলা বাংগালী মুসলমানদের নিজস্ব ভাষা। কিন্তু প্রায় দুইশ বছরের ইংরেজি শাসনে বাংলা ভাষার ও সাহিত্যের বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়াছে। সে পরিবর্তন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যেমন উন্নত করিয়াছে, তেমনি মুসলমানদের নিকট হইতে অনেক – অনেক দূরে নিয়াও গিয়াছে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষা একটি আধুনিক উন্নতশীল ভাষাও হইয়াছে। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]
অন্যান্য আধুনিক ভাষার মতো বাংলাও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ভাষা। কাজেই অনবরত তার প্রসার বৃদ্ধি ও পরিবর্তন ঘটিতেছে এবং ঘটিতে থাকিবে।
ঊনিশ শতকের হইতে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বাংলা ভাষা ছিল পণ্ডিতী ভাষা। ঊনিশ শতকের শেষদিক হইতে টেকচাঁদ ঠাকুর দ্বিজেনঠাকুর ও রবিঠাকুরের শক্তিশালী কলমের জোরে ভদ্রলোকের পণ্ডিতী বাংলা জনগনের ভাষায় রূপান্তরিত হয়। হইবার চেষ্টা করে। এমন কি স্বয়ং বংকিমচন্দ্রের লেখাতেও এ চেষ্টা প্রতিফলিত হয়। বংকিমচন্দ্রের প্রথম জীবনের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র ভাষা এবং শেষ দিককার ‘দেবী চৌধুরানী’র ভাষার পার্থক্যই এর প্রমাণ।
পশ্চিম বাংলার বাংলা
যা হউক দ্বিজেনঠাকুর রবিঠাকুর ও শরৎচন্দ্রের চেষ্টায় বাংলা ভাষা বড় জোর পশ্চিম–বাংলার মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভাষা হইতে পারিয়াছিল। প্রকৃত জনগনের ভাষা হইতে পারে নাই। কারণ বাংলার আসল জনগন যে মুসলমানরাও এবং তাদের ভাষাও যে জনগনের ভাষা, এ সত্য হয়তো ঐ মনীষীদের নিকট ধরাই পড়ে নাই।
তারপর নযরুল ইসলাম তাঁর অসাধারন প্রতিভা নিয়া ধুমকেতুর মতো বাংলা সাহিত্য ও ভাষার আকাশে উদিত হন এবং মুসলিম-বাংলার ভাষাকে বাংলা সাহিত্যের ভাষা করিবার সফল চেষ্টা করেন। নযরুলের এই চেষ্টার যে বিরুদ্ধতা আসে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা হইতে, তাতে শুধু সাম্প্রদায়িক তিক্ততাই বাড়ে না, হিন্দু-বাংলা ও মুসলিম বাংলার কালচারের পার্থক্যও তাতে সুস্পষ্ট হইয়া উঠে। বাংলা ভাগ হইয়া দুই দেশ না হইলে অতঃপত বাংলা কি রূপ নিত, আজ সে আলোচনা করিয়া লাভ নাই।
কিন্তু তাঁর ইশারা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
বিপ্লবী পরিবর্তন
রাজনৈতিক কারণ একেবারে আধুনিক। আজ বাংলা ভাগ হইয়াছে। এক বাংলা দুইটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের রূপ নিয়াছে। এতে বাংলা সাহিত্য ও ভাষার কি পরিবর্তন হইয়াছে, এইটাই আমাদের ভাল করিয়া বিচার করিতে হইবে। এ বিচার সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে করিতে গেলে আমাদের আগে বিবেচনা করিতে হইবে দুইটা কথাঃ
এক, বংলা ভাগ হওয়ার আগেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে মুসলিম-বাংলার ভাষা ও হিন্দু-বাংলার ভাষার একটা পার্থক্য ছিল। মুসলিম লেখকরা সামাজিক ও সাহিত্যিক খাতিরে প্রচলিত বহুসংখ্যক মুসলমানী শব্দ সাহিত্যে চালু করিয়াছিলেন। হিন্দু লেখকরা তা মানিয়া লন নাই।
দুই, বাটোয়ারার আগে বাংলার রাজধানী সুতরাং সাহিত্যিক কেন্দ্র ছিল কলিকাতা। এখন সে জায়গা দখল করিয়াছে ঢাকা।
Continue reading