‘অদ্ভুত আঁধার এক’: জীবনানন্দ দাশ ।। বিনয় মজুমদার (১৯৬৬)
ভালো রাইটাররা যে সবসময় ভালো ক্রিটিক হইতে পারেন বা হইতেই হবে – তা না, ভাইস-ভার্সাও; কিন্তু বিনয় মজুমদারের এই ক্রিটিকটা পইড়া মনে হইছে, উনি আসলে ক্রিটিক হইতে চান নাই। এইরকম আছে তো, উনার সময়েও ছিলো সাহিত্য-সমাজের নর্মস, যে, একবার ক্রিটিক বানায়া দিতে পারলে কবি হওয়াটা তখন টাফ হয়া যাবে! আমার অনুমান, বিনয় মজুমদার ক্রিটিক হওয়ার ফাঁদে পা দিতে চান নাই, কবিই হইতে চাইছেন। কিন্তু এই যে একটা কবিতা নিয়া কথা কইছেন বা ক্রিটিক করছেন, এইটাত বুঝা যায়, উনি ঠিক ‘কবিতার শহীদ’ বা ‘আধ্যাত্মিক’ কোন কবি ছিলেন না, কবিতার টেকনিকের জায়গাগুলারে কনশাসলিই লোকেট করতেন!
এমনকি উদাহারণ যে ইর্ম্পটেন্ট একটা জিনিস, এইরকম জায়গাতও ‘উদাস’ ছিলেন না! উদাহারণে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাথে নিজের কবিতারেই রাখছেন। 🙂
উনি হয়তো অইভাবে কইতে চান নাই, কিন্তু কিছু জিনিস বইলা ফেলছেন আসলে। যেমন, কবিতাতে রহস্যময়তা একটা দরকারি জিনিস। 🙂 আর বলার সময় কিছু জিনিস বাদ দিয়া, বাদ দিয়া কইলে ভালো ‘রহস্যময়তা’ ক্রিয়েট করতে পারবেন! তো, খুব বেশি যে উনি বলছেন, তা না। ‘গভীরতা আছে’ বইলা এড়াইয়াও গেছেন। কিন্তু না বলতে চাইয়াও যট্টুকই উনি বলছেন, বিউটিই হইছে একটা, জিনিসটা। পড়তে পারেন!
ই. হা.
………………………………………………………………..
‘অদ্ভুত আঁধার এক’: জীবনানন্দ দাশ
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই –
করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
কবিতাটিতে সৌন্দর্যতত্ত্বর কয়েকটি ব্যাপার অনুপস্থিত। উপস্থিতির সুযোগের অভাবহেতু এ-প্রকার ঘটেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা উচিত নিম্নলিখিত ব্যাপারগুলি নেইঃ
১। এতে elimination নেই। যে-কোনো রচনা সঠিক পরম্পরাবদ্ধ এবং ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ-সংবলিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা থেকে কোনো অংশ (স্তবক ইত্যাদি) কিংবা বাক্য সুপরিকল্পিতিরূপে বাদ দিলে এই বাদ দেওয়ার ব্যাপারটিকে যদি elimination – যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘পুজারিনি’ কবিতাটির শেষ স্তবক এবং ঠিক তার আগের স্তবক-এই দুইয়ের মাঝখানে ঘটনার বিবরণ মহাকবি স্বেচ্ছায় সুপরিকল্পিতরূপে বাদ দিয়েছেন। শেষ স্তবকের ঠিক আগের স্তবকে কবি লিখেছেন যে প্রাসাদের প্রহরীরা দেখতে পেল রাজার বিজন কাননে স্তূপপদমূলে প্রদীপমালা জ্বলছে। তারপরেই শেষ স্তবক – শেষ স্তবকে শুধু লিখেছেন যে সেদিন শুভ্র পাষাণফলক রক্তচিহ্নিত হল এবং শেষ আরতির শিখা চকিতে নিভে গেল। এতে রচনা অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো রচনার কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ বাদ দেওয়ার উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি বর্তমান প্রবন্ধের রচয়িতারই একটি কবিতা। ‘আমার ঈশ্বরীকে’ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণে ছিল; ‘যে গেছে সে চ’লে গেছে, দেশলাইয়ে বিস্ফোরণ হয়ে/বারুদ ফুরায় যেন, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/আপন অন্তরলোকে’; ইত্যাদি। পরে ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’র সংস্করণে পরিমার্জনার পর লিখি, ‘যে গেছে সে চ’লে গেছে, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/ আপন আন্তরলোকে’; ইত্যাদি। এতে কবিতাটি অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে ব’লে আমার ধারণা। চিত্রশিল্পীদেরও এই ধরণের elimination ব্যবহার করা ভিন্ন গত্যন্তর নেই। পিকাসোর চিত্রে (একটি উদাহরণ ‘মা ও ছেলে’), মাতিসের চিত্রে (একটি উদাহরণ, সেই দীর্ঘ গ্রীবাবিশিষ্টা তরুনী মহিলা) দেখা যায় বিশদরূপে আঁকতে গেলে যত রাখা ব্যবহার করতে হয় তত রেখা তাঁরা ব্যবহার করেননি, বহু রেখাই বাদ দিয়ে দিয়েছেন। দিয়েছেন সংক্ষেপে কাজ সারার জন্য, চিত্রকে অধিকতর শ্রীমণ্ডিত করার জন্য। Elimination – এর ফল রহস্যময়তা এবং দুর্বোধ্যতা। এতক্ষণে জীবনানন্দের নিজের রচনায় elimination – এর অত্যন্ত সুন্দর একটি উদাহরণ মনে পড়লঃ ‘বিবর্ণ প্রাসাদ তার ছায়া ফেলে জলে।/ ও-প্রাসাদে কারা থাকে? কেউ নেই – সোনালি আগুন চুপে জলের শরীরে/ নড়িতেছে জ্বলিতেছে – মায়াবীর মতো জাদুবলে’ ইত্যাদি। এখানে এই আগুন কি কোনো আলেযার, না কি ওই প্রাসাদ থেকে আসা আলোর প্রতিফলন, না কি অন্য কোনো স্থান থেকে আসা আলোর প্রতিফলনও হতে পারে। কবি সে-কথাটি বাদ দিয়ে দিয়েছেন।’ যেন বিষয়টি অত্যন্ত গোপন কথা। ফলে কবিতাটির এ-স্থানটি রহস্যময় হয়ে উঠেছে, পাঠক উপরি-উক্ত বিকল্প সম্ভাবনাগুলির কোনটি হতে পারে ভাবতে শুরু করেন; পথ চলতে-চলতে রহস্যের ঘ্রান পেয়ে থেমে পড়ার মতো, থেমে প’ড়ে চতুষ্পার্শ একটু খতিয়ে দেখার মতো। এর ফলে সেই খতিয়ে-দেখা স্থানটি পথিকের মনে গেথে যায় অনুরূপভাবে কবিতাটির পঙক্তিগুলিও। এই যে প্রয়োজনমতো পাঠক্কে বিশেষ-বিশেষ স্থানে থামিয়ে দেওয়া, থামিয়ে দিয়ে ভাবানো – এ-কাজ কবির করতে হয় সুপরিকল্পিতরূপে। ফলে দেখা যাচ্ছে elimination কবিদের মস্ত সহায়, প্রায়শই ভরসা। Elimination – এর ফলে রহস্যময়তা বাড়ে, দুর্বোধ্যতা বাড়ে – মাঝে মাঝে কবিতার অর্থ ‘কোনদিন-বোঝা-যাবে-না’ অবস্থায়ও এসে দাঁড়ায়। কিন্তু কবির চরম উদ্দেশ্য পাঠককে ভালো লাগানো, বোঝানো নয়, এবং দেখা গেছে আমাদের সর্বাপেক্ষা প্রিয় বাস্তব বস্তুগুলি – চাঁদ, তারা, ফুল, লতা, নানাবিধ পাখি, পাখিদের গতিভঙ্গি ইত্যাদি কখনোই আমরা সম্পূর্ণ বুঝি না। বুঝি না ব’লে যে ভালো লাগে তা হয়তো নয়, হয়তো ভালো লাগাতে গিয়ে রহস্যময় ও দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। কলামূলক বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্টবোধ্য হচ্ছে অভিধান। কিন্তু অভিধানের চেয়ে সার্থক কবিতার হৃদয়গ্রাহিতা অনেক বেশিই হয়। ফলে দেখা গেছে elimination কবিদের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বন্ধু।
