“মুসলমানী বাঙ্গালা” কি? – আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ
১৯২০/৩০ এর দিকে (আগে বা পরেও) এই তর্কগুলা খুব চলতো যে, মুসলমানরাও বাঙালি কিনা বা কেমনে তাদেরও কন্ট্রিবিউশন আছে বাংলাভাষায়। এইটা আরো জোরদার হইছিল দীনেশচন্দ্র সেনের পুরান পুঁথিগুলা আবিষ্কারের পরে। দেখা গেল, আরে, মুসলমানরাও তো বাংলাভাষায় লিখছে আগে! নতুন নতুন লিখতে আইছে – এইরকম তো না! চিটাগাংয়ের আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এই জায়গাটাতে আরো জোরদার কিছু তথ্য প্রমাণ হাজির করছিলেন যে, মুসলমানরাও বাংলাভাষায় লিখছেন![pullquote][AWD_comments][/pullquote]
তো, তখন রিলিভেন্ট তর্ক হাজির হইছিল যে, বাংলা-ভাষা কি হিন্দুয়ানি নাকি? বা মুসলমানী বাংলা তাইলে কি জিনিস? এখনকার সেক্যুলার দুনিয়ায় এইসব কোশ্চেন যতো ফানি-ই মনে হোক, এইসবকিছু নিয়া আলাপ হইতো বা হইছিল। এইটা এইরকমের একটা লেখা।
যেইখানে আবদুল করিম সাহেব এনকাউন্টার করতেছেন এই কোশ্চেনটারে। মাসিক সওগাতে কেউ একজন আলাওলদের লেখারে মুসলমানী বাংলা বানায়া বলতে চাইতেছিলেন যে উনাদেরকে ইগনোর করা হইতেছে। এই জায়গাতে আবদুল করিম বলতেছেন, অইগুলা মুসলমানী বাংলা না! ‘মুসলমানী বাংলা’ হইতেছে পশ্চিম-বাংলার আবিষ্কার। (খুবই ইর্ম্পটেন্ট কথা এইটা।) এই মুসলমানী বাংলায় বাংলাদেশের লোকজন তো দূর কি বাত, পশ্চিম-বাংলার মুসলমানরাও বাতচিত করে না। তাইলে এইটা আইলো কই থিকা? সাহিত্যবিশারদের দাবি, এইটা আসছে বটতলা থিকা। আর বটতলার বইয়ের পুপলারিটি ভাষার কারণে না, কাহিনির কারণে। এই ভাষার যেহেতু কোন সাহিত্যিক ভ্যালু নাই আর সোসাইটিতে কোন চল নাই, এই সো-কল্ড মুসলমানী ভাষা টিইকা থাকার কোন কারণ নাই।
আমার ধারণা, এইখানে সংস্কৃত কলেজের বাইরে মাদ্রাসায় পড়া মৌলবীদের টেনডেন্সিটারে উনি পলিটিক্যালি সংস্কৃত-পন্ডিতদের কাউন্টার হিসাবে দেখতে রাজি হন নাই। মানে, মেনশন করছেন মুসলমানরে হিন্দু বানায়া দেয়ার ব্যাপারটা, কিন্তু অই জায়গাতে কোন কনফ্রনটেশনে যান নাই। ভাষারে শুদ্ধ বা সহি রূপেই এবং হিস্ট্রিক্যালিও একটা লিনিয়ার ফর্ম হিসাবেই দেখতে চাইছেন। যার ফলে ভাষার নানান রকমের টেনডেন্সিগুলারে এক রকমের ডিস্টরশন বইলাই ভাবছেন। তখনকার সেক্যুলার আইডিয়ায় ইউনিফর্মিটিরেই তো পূজা করা হইতো আসলে, একটা ডেফিনেশন দিতে পারাটারে, তো, সেই জায়গা থিকা স্পেশাল কোন সম্মান বা টিটকারি নিতে যে রাজি হন নাই সাহিত্যবিশারদ, সেইটাও পজিটিভ একটা ঘটনাই।
ভাষার হিস্ট্রিক্যাল জায়গাগুলারে নজরে রাখার লাইগা এই রকমের ইস্যুগুলারে মনে না রাখতে চাওয়াটা দরকারি কোন জিনিস বইলা মনেহয় না। এই কারণে, আবার মনে করাইতে চাইলাম।
এই লেখাটা আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি থিকা ১৯৯৭ সালে ছাপানো আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলী ১ম খন্ড বই থিকা নেয়া হইছে। ৫৩০ টু ৫৩৫ নাম্বার পেইজে আছে।
/ই.হা.
… কলোনিয়াল কোলকাতায় কম্যুনাল এবং রেসিয়াল এজেন্ডা থিকা আজব একটা বাংলা পয়দা করছিল পণ্ডিত-মুন্সিরা, আমজনতার বাংলারে যেই বাংলায় ধরা হইছে ভালগার বা বিদেশি! আসল বাংলা আসলে যেন সংস্কৃত, সংস্কৃত না জাইনা বাংলা জানতে পারেন না আপনে! পরে আরেক দল ঐ ঘটনার কম্যুনাল জবাব দিছেন, সংস্কৃতরে ফার্সি পিছায় খেদাইয়া! সেই ফ্যাসাদের আখেরি ফল এখন ফলতেছে, আরো সহি হইতে চাইয়া এখন ফার্সি খেদাইয়া দিতে চাইতেছে আরবীঅলারা!
এইটারে আমি কইতেছি কলোনিয়াল লিগেসি; এইটা এতোই পোক্ত যে, ঐ দুই-তিন দল তো যায়ই নাই, এমনকি মার্ক্সের তরিকার লোকেরাও বাংলার কম্যুনাল-রেসিয়াল বোঝাবুঝি উতরাইয়া আমজনতার কাছে যাইতে পারে নাই! বাংলা যে বাংলাই, সংস্কৃত বা ফার্সি বা ইংরাজি না জাইনাই তো আপনের বাংলা পারার কথা! ঐ কম্যুনাল-রেসিয়াল এজেন্ডার দখলে আপনের মন গেলে আপনে হয় সংস্কৃতরে ভাববেন দুশমন, বা ফার্সিরে বা ইংরাজিরে, ঘেন্নার চাষ হইতে থাকবে মনে! অথচ আপনে যদি আমজনতার বাংলা লন, গণতান্ত্রিক হন, দেখবেন, মানুষ আর আদম, পিছার লগে সাফ, নদী-আসমান-আকাশ-মেঘ-বিষ্টি-সাগর-মাছ-দরিয়া-তুফান-টেবিল-লেবার-আনারস-কুলা-হুদাই-ডিজিটাল-ঘাড়ত্যাড়া… এমন কত কত সোর্সের কত কত শব্দেরা বাংলার কানুনে নিজেদের সুরত বদলাইয়া পাশাপাশি শুইয়া আছে!
সো, আপনে যদি ঐ লিগেসিতে থাকেন, আমজনতার কাছে যাইতেই পারবেন না, আপনের গণতন্ত্রের খায়েশ স্রেফ নিজেরে ভুলাবার মায়া হইয়াই থাকবে!
ঐ লিগেসি আপনারে আরো একটা প্রিজুডিসের দিকে লইয়া যায় প্রায়ই, হামবড়া হইয়া উঠতে পারেন আপনে! এমন হামবড়া ভাবের আসল লসটা হইলো, সমাজের ভিতর থিকা কোন এলেম লইতেই পারবেন না আপনে!…
/৭জুন ২০১৮, রক মনু
…………………………………………………………….
বাঙ্গালার প্রাচীন মুসলমান সাহিত্যের এক সুবৃহৎ অংশ “মুসলমানী বাঙ্গালা” (সাহিত্য) নামে অভিহিত হইয়া থাকে। হিন্দু কি মুসলমান — যিনিই এই নাম করুন না কেন – ভাষার দিক দিয়া বলতে গেলে, এই নামের অন্বর্থতা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই “মুসলমানীবাঙ্গালা” কি জিনিস, সে সম্বন্ধে আমাদের শিক্ষিত সমাজের অনেকেরই সুস্পষ্ট ধারণা আছে বলিয়া বোধ হয় না। একটা দৃষ্টান্ত দিয়া পাঠকবর্গের নিকট কথাটা খোলসা করিতেছি। ১৩৪৭ সনে ফাল্গুন মাসে্র “সওগাতে” জনৈক মুসলমান লেখক “মর্সিয়া সাহিত্য” নামক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন —“শেখ ফয়জুল্লাহ … শমসের আলী প্রমুখ প্রখ্যাত নামা কবিগণের অক্লান্ত সাধনায় বাঙ্গালা সাহিত্যের ভাণ্ডার হইয়াছে সমৃদ্ধ। তাঁহাদের রচিত সাহিত্যকে কোনো স্বতন্ত্র নামে অভিহিত করা সঙ্গত নহে। * * * * কিন্তু বিশুদ্ধ ভাষা ও সুঠাম বর্ণনা-ভঙ্গীর দিক দিয়া কাজী দৌলৎ, সৈয়দ আলাওল প্রভৃতি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের হিন্দু কবিগণ হইতে কোন অংশে ন্যূন নহেন। একটু নমুনা দেই –
‘যৌবনকালেতে কন্যা বড় চিন্তা পায়।
অনঙ্গ-ভুজঙ্গ-বিষ সর্বাঙ্গে বেড়ায়।।
সে বিষ নামাতে নাহি ওঝার শক্তি।
স্বামী সে চিকিৎসা – হেতু ঔষধ সুরতি।।’
(দৌলতকাজী—‘লোরচন্দ্রানী)
‘দ্বিতীয়ার চন্দ্র জিনি ললাট শ্রীখণ্ড।
ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম ভুরু কামেরকো দণ্ড।।
সুকোমল করতল পদ্মনাল-তুল।
চম্পক-কলিকা যিনি সুন্দর আঙ্গুল।।’
(ছৈয়দআলাওল—‘পদ্মাবতী)
এই ভাষাকে ‘মুসলমানী বাঙলা’ বলিয়া সাহিত্যের আসর হইতে দূরে ঠেকাইয়া রাখিবার প্রচেষ্টা কোনোদিন সমর্থনীয় হইতে পারে না।”
আধুনিক সাহিত্য উজাড় করিয়া কিছুদিন হইতে এই লেখক প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি সুনজর দিয়াছেন এবং নিত্য নূতন নূতন অথ্যাবিষ্কার করিয়া পাঠকসমাজে পরিবেশন করিতেছেন। আলাওল ও দৌলত কাজীর ভাষাকে “মুসলমানী বাঙলা”র নমুনারূপে প্রচারও যে একটা নূতন আবিষ্কার, সে বিষয়ে সন্দেহ করিবে কে?
এইত গেল এক পক্ষের কথা। অপর পক্ষে বটতলার পণ্ডিতেরা বিজ্ঞাপন দিয়া প্রচার করিতেছেন, “শ্রীযুক্ত ছৈয়েদ আলাওল সাহার কৃত এই পদ্মাবতি পুস্তক পারশি অক্ষরে চট্টগ্রামি ভাষায় ছিল।” এরকম দুইপক্ষের হেঁচকা টানে বেচারী বাঙ্গালা সাহিত্য একবারে লবে-জান! Continue reading