স্বাধীন জাতির, স্বাধীন উপলব্ধি – জিয়াউর রহমান
[২০২০ সালে ছাপানো “আমার রাজনীতির রূপরখো” বইয়ের ১০২-১১৫ নাম্বার পেইজ থিকা লেখাটা নেয়া হইছে।]
আপনারা বাংলাদেশের ইতিহাস পড়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস, যদি না পড়ে থাকেন তাহলে এর সূত্রটা পাবেন না। গত দুই বাংলা, বঙ্গ। বঙ্গ বুঝতে বর্তমানে যে বাংলাদেশের এলাকা সেটাই বোঝাত।
কিন্তু আপনারা যারা ইতিহাস পড়েছেন তাঁরা জানেন। গত দু’হাজার বছরের ইতিহাস পড়তে হবে। বঙ্গ, বাঙ্গাল, বাংলাদেশ। দুনিয়ার অন্যান্য দেশে এই বাঙ্গাল কথাটার উল্লেখ আছে, আরব দেশে আছে, মধ্যপ্রাচ্যে আছে। বাঙ্গাল এমনকি ইন্দোনেশিয়াতেও আমি এই শব্দটি শুনেছি। যখন সূত্র খুঁজবেন তখন বাংলাদেশের সাথে এর সূত্র খুঁজে পাবেন। পশ্চিমবঙ্গের সাথে নয়। ওরা অন্য নামে পরিচিত। আমাদের জাতীয় সত্তা আলাদা এবং আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা। আমাদের এখানকার বাংলা ভাষা হলো মূল বাংলা ভাষা। যেটা বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম এবং পূর্বেও গেছে, আসামেও। যদি আসামী কথা শুনেন, আসাম রেডিও কিংবা গৌহাটি রেডিও যখন শুনবেন তখন আপনি অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন। দেখবেন বাংলা ভাষার একটি ভগ্ন রূপ বা খণ্ডিত রূপ। তেমনিভাবে যখন পশ্চিম দিকে যাবেন বাংলা ভাষার রূপ বদলে যেতে থাকবে। বাংলাদেশ হলো বাংলা ভাষা, বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও কৃষ্টির হেড কোয়ার্টার। এটা বুঝতে হবে। অনেকেই আপনারা বুঝেন না এবং শান্তি নিকেতনের কথা বললে আপনাদের আমাদের মনে-প্রাণে অনেক রকম অনুভূতি হয়। ওখানে যা কিছু নিয়ে গেছে, এখান থেকে নিয়ে সেটাকে আর একটা রূপ দিয়েছে। জিনিসটা বুঝতে হবে। তখন বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল। আপনি অতীতে চলে যান হাজার বছর তারও বেশি, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় ৯/১০ সেঞ্চুরী থেকে। আমি আগেই বলেছি রাজনীতিতে ধর্মটা সবচেয়ে বড় কথা নয় কিন্তু ধর্ম একটা কথা হতে পারে। জাতিগতভাবে আমরা ভিন্ন। যেমন আপনারা দেখবেন মোঙ্গলীয় জাতি আছে। তাদের হেডকোয়ার্টার বলা যেতে পারে চীন দেশের যে কোন একটা মূল বিন্দু থেকে ধরে নিতে পারেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন দিকে এটা ছড়িয়েছে। যেমন করে দূরে ছড়িয়ে পড়ে জিনিসটা লঘু থেকে লঘু হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এটা ক্রমশঃ বিস্তার লাভ করছে। বার্মাতে যে জাতি দেখা যায় তারা মোঙ্গলয়েড। মোটামুটি তাদের মধ্যে এবং চীনাদের মধ্যে পার্থক্য দেখবেন। আসামে তারা কিন্তু জাতিগতভাবে মোঙ্গলয়েড কিন্তু চীনাদের থেকে পার্থক্য দেখবেন। যদি আপনি বিভিন্ন জায়গা থেকে মোঙ্গলয়েড সব এক সাথে এক কামরার মধ্যে ভরে দেন তাহলে হঠাৎ মনে হবে যে- আরে এরাই তো সব একই লোক। আসলে কিন্তু এক লোক নয়। কেউ বার্মা, কেউ থাইল্যান্ড, কেউ মালয়েশিয়া, কেউ চীনা, কেউ মোঙ্গলীয়া, কেউ ভূটান, কেউ নেপাল, কেউ সীকিম, কেউ ভারতের পূর্বপ্রান্ত অর্থাৎ আসাম এলাকার। তেমনিভাবে কতকটা আমাদেরও অবস্থা। এটাই হলো আমাদের জাতি, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল অবস্থান। বাংলাদেশ এবং এখান থেকে চারপাশ আমাদেরই মাল-মশলা বিভিন্ন সময়-ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে আমরা বলতে পারি যে কোন এলাকার উপর আমাদের দাবি আছে। আমরা হয়তবা এটা বলতে পারব না। কিন্তু তারাও আমাদের উপর দাবি করতে পারে না। সেই জন্য এপার বাংলা ওপার বাংলা কথাটায় কোন বাস্তবতা নেই।
১৯৭১ সালে আমি কোন রাজনীতিবিদ ছিলাম না। ১৯৭১ সালে আমরা যে যুদ্ধ করলাম, কোন ক্ষমতার লোভ করি নাই। আমরা টাকা-পয়সার লোভ করি নাই। আমি জানিনা যে আমি যুদ্ধে নেমেছিলাম, আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলাম, ভালই ছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ যার আদর্শ আমি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলাম। আমি দেখলাম যে বাংলাদেশকে কিভাবে শোষণ করা হচ্ছিল এবং হচ্ছে। সেই সময় ১৯৭১ সালের আগে বর্তমানের বাংলাদেশকে কিভাবে শোষণ করা হয়েছে। কলকাতা কেন্দ্রিক শোষণ, দিল্লী কেন্দ্রিক শোষণ, লন্ডন কেন্দ্রিক শোষণ এবং অন্যান্য কেন্দ্রিক শোষণ। তার কারণ এই ছিল যে, আমাদের মধ্যে এই ভাবধারার চেতনা সম্পূর্ণভাবে বিকাশ করতে পারেনি, যে পর্যায়ে এটাকে একটা স্বাধীনতা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আপনারা যদি ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনা আজকের নয়, শত শত বছর আগেকার। ইতিহাসের পাতায় পাতায় এগুলোর প্রমাণ পাবেন বিভিন্নভাবে এবং এটা গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। এটা জাতীয় সত্তা গড়ে উঠতে শত শত বছর লাগে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনা গড়ে উঠেছে শত সহস্র বছর ধরে এবং সেই যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে বিভিন্নভাবে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন যেটাকে বলা যেতে পারে আমাদের জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে এটা একটা সঠিক রূপ নিয়েছে।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় অবশ্য ভারত আমাদেরকে সাহায্য করেছিল কিন্তু তার সাথে তারা জুড়ে দিয়েছিল এপার বাংলা ওপার বাংলা তারপর আপনারা জানেন যে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শাসন চালাবার জন্যে তারা অভিজ্ঞ দল পাঠিয়েছিল কয়েক শত। এমন হাবভাব যে আমরা কিছুই জানি না। কিছুই করতে পারি না এবং তাদের সেই চেষ্টার উল্টো ফল হয়েছে। তার কারণ যদিও বাকশালীরা, তখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতি ছিল না। সেখানে তারা মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আসল কথা হলো যে আওয়ামী লীগ কেবলমাত্র পাকিস্তানের ক্ষমতার গদিতে বসতে চেয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্রগোষ্ঠি তারা স্বাধীনতা চেয়েছিল। নেতারা যারা ছিলেন তারা এই অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতে চাইছিলেন না- এটা করতে গিয়ে যদি আমরা ক্ষমতা না পাই। কারণ আমরা তো অনেক দিন ধরে রাজনীতি করলাম, অনেক কাজ করলাম, আমাদের ক্ষমতায় যেতেই হবে। সেখানে তাদের একটা আত্মসংঘাত লেগে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালে আমি যেটা লক্ষ্য করলাম মার্চ মাস থেকে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটো ডিভিশন হয়ে গিয়েছিল। যারা যুবসমাজের প্রতিনিধি তারা বলেছিল স্বাধীনতার কথা, বিভিন্নভাবে বলেছিল। অনেকে কিন্তু বুঝতো না স্বাধীনতার কথা, কেউ কেউ অটোনমির কথা বলেছে, কেউ স্বাধীনতার কথা। কিন্তু জনগণের মানসিকতা স্বাধীনতার জন্য ছিল। তারা বুঝে ফেলেছিল যে পাকিস্তান দিয়ে আমাদের কিছুই হবে না। আওয়ামী লীগ নেতারা চেয়েছিলেন ক্ষমতার আসন। যার ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কি করল? তারা চিন্তা করে দেখল আমাদেরকে এখানে ঝুঁকি নিতে হবে। আমাদেরকে এমন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে হয় আগামী ১০/২০ বছর বাংলাদেশকে আমরা চালায়ে যাব গোলামের মত অথবা যেটাকে আমরা বলি এসপার-ওসপার। এদিক-ওদিক এবং সেভাবেই তারা পরিকল্পনা গ্রহণ করল এবং সেখানেই আবার তারা মস্ত বড় ভুল করলো। তাদের বোঝা উচিত ছিল যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে আর কিছু করা যাবে না। এটার সমাধান হলো বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয়া একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। যেহেতু তারা সবসময় স্বল্প মেয়াদে কাজ করে থাকে সেজন্য তারা এটার দীর্ঘ মেয়াদের গুরুত্ব বুঝতে পারল না এবং সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলো। আমরা যারা ছিলাম আমরা নিজেদের মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, এভাবে যদি তারা হরতাল করে আমরা হরতাল ভঙ্গ করবো এবং সেটা চরম অবস্থায় চলে যাবে এবং চরম অবস্থা মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। আমরা কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম তার জন্য। ২৫ মার্চের পরে আমাদের তরফ থেকে যে প্রতিক্রিয়া হলো এগুলো যদি পরীক্ষামূলকভাবে দেখেন তাহলে এটার সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। তারপরে যুদ্ধকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বারবার চেষ্টা হয়েছিল পাকিস্তানীদের সঙ্গে একটা সমঝোতা করে ক্ষমতায় আসা এবং ভারতও সেটাই চেয়েছিল। ভারতের চেষ্টাও ছিল অন্ততঃপক্ষে আমি যতদূর জানি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যে, পাকিস্তানের সাথে একটি সমঝোতা করে একটা কনফেডারেশনের মত করা যার মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং তাদেরই একজন যিনি আজকে ইসলামকে বগল দাবা করে চলছেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত এর মধ্যে ছিলেন। Continue reading