আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (৫)
——————
বিনোদিনী দাসী প্রেম, বিয়া বা অন্যান্য সোশ্যাল রিলেশনের চাইতে উনার প্রফেশন’রে প্রায়োরিটি দিতে চাইছিলেন; অ্যাকট্রেস হওয়াতেই থাইমা থাকতে চান নাই, থিয়েটারের মালিকানা চাইছিলেন। প্রেমের প্রতারণাগুলিরে ইগনোর করতে পারলেও সোশ্যাল রিলেশনের প্যাঁচগুলি পার হইতে পারেন নাই। উনারে নিয়া বানানো নাটক-সিনেমাগুলিতে উনারে এতো বড় অ্যাকট্রেস বানানো হয় যে মনে হইতে পারে – এইগুলি উনি চান নাই! বা পরে হয়তো একভাবে নেগোশিয়েনও করতে চাইছেন এইভাবে যে, এইগুলি চাওয়া উনার ঠিক হয় নাই। কিন্তু সারভাইভ করা সম্ভব হয় নাই আর। গিরিশবাবুরে গুরু মানলেও গুরু লালন-ভক্ত না হইলেও মেবি জানতেন সাধন-সিদ্ধির মতো মাইয়াদের মালিকানাও হইতে নাই। 🙂
ই. হা.।
——————
ষ্টার থিয়েটার সম্বন্ধে নানা কথা
পত্র
মহাশয়!
এই সময় আমায় অতিশয় সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পড়িতে হইয়াছিল। আমাদের ন্যায় পতিতা ভাগ্যহীনা বারনারীদের টাল বেটাল তো সর্বদাই সহিতে হয় তবুও তাহাদের সীমা আছে; কিন্তু আমার ভাগ্য চিরদিনই বিরূপ ছিল। একে আমি জ্ঞানহীনা অধম স্ত্রী লোক, তাহাতে সুপথ কুপথ অপরিচিতা। আমাদের গন্তব্যপথ সততই দোষণীয়, আমরা ভাল পথ দিয়া যাইতে চাহিলে, মন্দ আসিয়া পড়ে – ইহা যেন আমাদের জীবনের সহিত গাঁথা। লোকে বলেন আত্মরক্ষা সতত উচিত, কিন্তু আমাদের আত্মরক্ষাও নিন্দনীয়! অথচ আমাদের প্রতি স্নেহ চক্ষে দেখিবার বা অসময় সাহায্য করিবার কেহ নাই! যাহা হোক; আমার মর্ম্ম ব্যাথা শুনুন। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]
আমিও এই সময় প্রতাপবাবু মহাশয়ের থিয়েটার ত্যাগ করিব মনে মনে করিয়াছিলাম। ইহার আগে আরেকটি ঘটনার দ্বারা আমায় কত ব্যথিত হইতে হইয়াছিল। আমি যে সম্ভ্রান্ত যুবকের আশ্রয়ে ছিলাম, তিনি তখন অবিবাহিত ছিলেন, ইহার কয়েকমাস আগে তিনি বিবাহ করেন ও ধনবান যুবকবৃন্দের চঞ্চলতা বশতঃ আমার প্রতি কতক অসৎ ব্যবহার করেন। তাহাতে আমাকে অতিশয় মনঃক্ষুন্ন হইতে হয়। সেই কারণে আমি মনে করি যে ঈশ্বর তো আমার জীবিকা নির্বাহের জন্য সামর্থ্য দিয়াছেন, এই রূপ শারিরীক মেহনত দ্বারা নিজের ও পরিবার বর্গের ভরণপোষন নির্বাহ করিতে যদি সক্ষম হই, তবে আর দেহ বিক্রয় দ্বারা পাপ সঞ্চয় করিব না ও নিজেকেও উৎপীড়িত করিব না। আমা হইতে যদি একটি থিয়েটার ঘর প্রস্তুত হয় তাহা হইলে আমি চিরদিন অন্ন সংস্থান করিতে পারিব। আমার মনের যখন এই রকম অবস্থা তখনই ঐ “ষ্টার থিয়েটার” করিবার জন্য গুম্মূর্খ রায় ব্যস্ত। ইহা আমি আমাদের এক্টারদের নিকট শুনিলাম এবং ঘটনা চক্রে এই সময় আমার আশ্রয় দাতা সম্ভ্রান্ত যুবক ও কার্য্যানুরোধে দূরদেষে অবস্থিতি করিতেছিলেন। এই দিকে অভিনেতারা আমাকে অতিশয় জেদের সহিত অনুরোধ করিতে লাগিলেন যে, “তুমি যে প্রকারে পার একটি থিয়েটার করিবার সাহায্য কর!” থিয়েটার করিতে আমার অনিচ্ছা ছিল না, তবে একজনের আশ্রয় ত্যাগ করিয়া অন্যায়রূপে আর একজনের আশ্রয় গ্রহণ করিতে আমার প্রবৃত্তি বাধা দিতে লাগিল। এদিকে থিয়েটারের বন্ধুগণের কাতর অনুরোধ! আমি উভয় সঙ্কটে পড়িলাম। গিরিশবাবু বলিলেন থিয়েটারই আমার উন্নতির সোপান। তাঁহার শিক্ষা সাফল্য আমার দ্বারাই সম্ভব। থিয়েটার হইতে মান সম্ভ্রম জগদ্বিখ্যাত হয়। এইরূপ উত্তেজনায় আমার কল্পনা স্ফীত হইতে লাগিল। থিয়েটারের বন্ধুবর্গেরাও দিন দিন অনুরোধ করিতেছেন, আমি মনে করিলেই একটি নূতন থিয়েটার সৃষ্টি হয় তাহাও বুঝিলাম। কিন্তু যে যুবকের আশ্রয়ে ছিলাম, তাঁহাকেও স্মরণ হইতে লাগিল! ক্রমে সেই যুবা অনুপস্থিত, উপস্থিত বন্ধুবর্গের কাতরোক্তি, মন থিয়েটারের দিকেই টলিল। তখন ভাবিতে লাগিলাম যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, তিনি আমার সহিত যে সত্যে আবদ্ধ ছিলেন, তাহা ভঙ্গ করিয়াছেন, অপর পুরুষে যেরূপ প্রতারণার বাক্য প্রয়োগ করে, তাঁহারও সেইরূপ। তিনি পুনঃ পুনঃ ধর্ম্ম সাক্ষ্য করিয়া বলিয়া ছিলেন যে আমিই তাঁহার কেবল একমাত্র ভালবাসার বস্তু, আজীবন সে ভালবাসা থাকিবে। কিন্তু কই তাহা তো নয়! তিনি বিষয় কার্য্যরে ছল করিয়া দেশে গিয়াছেন, কিন্তু সে বিষয় কার্য্য নয়, তিনি বিবাহ করিতে গিয়াছেন। তবে তাঁহার ভালবাসা কোথায়? এতো প্রতারণা! আমি কি নিমিত্তে বাধ্য থাকিব? এরূপ নানা যুক্তি হৃদয়ে উঠিতে লাগিল! কিন্তু মধ্যে মধ্যে আবার মনে হইতে লাগিল, যে সেই যুবার দোষ নাই, আত্মীয় স্বজনের অনুরোধে বিবাহ করিতে বাধ্য হইয়াছেন। আমি তাঁহার একমাত্র ভালবাসার পাত্রী তবে একি করিতেছি। রাত্রে এ ভাব উদয় হইলে অনিদ্রায় যাইত, কিন্তু প্রাতে বন্ধুবর্গ আসিলে অনুরোধ তরঙ্গ ছুটিত ও রাত্রের মনোভাব একেবারে ঠেলিয়া ফেলিত! থিয়েটার করিব সংকল্প করিলাম! কিন্তু এখন দেখিতেছি আমার মন আমার সহিত প্রতারণা করে নাই। ইহা যতদূর প্রমাণ পাওয়া সম্ভব তাহা পাইয়াছিলাম। কিন্তু দিন ফিরিবার নয়, দিন ফিরিল না। এ প্রমাণের কথা মহাশয়কে সংক্ষেপে পশ্চাৎ জানাইব! Continue reading
