আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (৪)
বেঙ্গল থিয়েটারে
কৈশোরে পদার্পণ করিয়া বেঙ্গল থিয়েটারের অধ্যক্ষ পূজনীয় শরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের অধীনে কার্য্যে নিযুক্ত হই। ঠিক মনে পড়ে না, কি কারণ বশতঃ আমি “গ্রেট ন্যাশনাল” থিয়েটার ত্যাগ করি। এই বেঙ্গল থিয়েটারই আমার কার্য্যরে উন্নতির মূল; এই স্থানে শরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের কর্তৃত্বাধীন অতি অল্প দিনের মধ্যে প্রধান প্রধান ভূমিকা অভিনয় করিতে আরম্ভ করি। মাননীয় শরৎবাবু আমায় কন্যার ন্যায় স্নেহ করিতেন, তাঁহার অসীম স্নেহ ও গুণের কথা আমি এক মুখে বলিতে পারি না। প্রসিদ্ধা গায়িকা বর্ণবিহারীনি (ভুনি), শুকুমারী দত্ত (গোলাপী) ও এলোকেশী সেই সময় “বেঙ্গল”-এ অভিনেত্রী ছিলেন। তখন মাইকেল মধুসুদন দত্তের “মেঘনাধ বধ” কাব্য নাটকাকারে পরিবর্তিত হইয়া অভিনয়ার্থে প্রস্তুত হইতে ছিল। আমি উক্ত “মেঘনাথবধ” কাব্য সাতটি পার্ট এক সঙ্গে অভিনয় করিয়া ছিলাম। প্রথম চিত্রাঙ্গদা, ২য় প্রমিলা, ৩য় বারুনী, ৪র্থ রতি, ৫ম মায়া ৬ষ্ঠ মহামায়া, ৭ম সীতা।১ বঙ্কিম বাবুর “মৃনালীনি” তে মনোরমা অভিনয়ই করিতাম এবং “দূর্গেশনন্দিনী”তে আয়েষা ও তিলোত্তমা এই দুইটী ভূমিকা প্রয়োজন হইলে দুইটীই এক রাত্রি একসঙ্গে অভিনয় করিয়াছি। কারাগারের ভিতর ব্যতিত আয়েষা ও তিলোত্তমার দেখা নাই! কারাগারে তিলোত্তমার কথা ও ছিল না অন্য একজন তিলোত্তমার কাপড় পরিয়া কারাগারে গিয়া “কে-ও- বীরেন্দ্র সিংহের কন্যা?” জগৎ সিংহের মুখে এই মাত্র কথা শুনিয়া মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িত। আর সেই সময়েই আয়েষার ভূমিকার শ্রেষ্ঠ অংশ ওসমানের সহিত অভিনয়! [pullquote][AWD_comments][/pullquote] এই অতি সঙ্কুচিতা ভীরু-স্বভাবা রাজকন্যা তিলোত্তমা, তখন ই আবার উন্নত-হৃদয়া-গর্ব্বিণী অপরিসিম হৃদয়-বলশালীনি প্রেম পরিপূর্ণা নবাব পুত্রী আয়েষা! এই রূপ দুই ভাগে নিজেকে বিভক্ত করিতে কত যে উদ্দ্যম প্রয়োজন তাহা বরিবার নহে। ইহা যে প্রত্যহ গঠিত তাহা নহে, কার্য্য কালিন আকস্মিক অভাবে এই রূপে কয়েকবার অভিনয় করিতে হইয়াছিল। একদিন অভিনয় রাত্রিতে আয়েষা সাজিবার জন্য গৃহ হইতে সুন্দর পোষাক – পরিচ্ছদ পরিয়া অভিনয় স্থানে উপস্থিত হইয়া শুনিলাম, যিনি ‘আসমানি’-র ভ’মিকা অভিনয় করিবেন তিনি উপস্থিত নাই। রঙ্গালয় জনপূর্ণ! কর্ত্তৃপক্ষগণের ভিতর চুপি চুপি কথা হইতেছে – “কে বিনোদনকে ‘আসমানি’ -র পার্ট অভিনয় করিতে বলিবে? উপস্থিত বিনোদ ব্যতিত অন্য কেহই পারিবে না!” আমি বাটী হইতে একেবারে আয়েষার পোশাকে সজ্জিত হইয়া আসিয়াছি বলিয়া ভরসা করিয়া কেহই বলিতেছেন না। এমন সময় বাবু অমৃতলাল বসু আসিয়া অতি আদর করিয়া বলিলেন, “বিনোদ! লক্ষী ভগ্নিটী আমার! আসমানী যে সাজিবে তাহার অসুখ করিয়াছে, তোমায় আজ চালাইয়া দিতে হইবে, নতুবা বড়ই মুশকিল দেখিতেছি।” যদিও মুখে অনেকবার “না – পারিব না” বলিয়া ছিলাম বটে, আর বাস্তবিক সেই নবাব পুত্রীর সাজ ছাড়িয়া তখন দাসীর পোশাক পড়িতে হইবে, আবার “আয়েষা” সাজিতে অনেক খুঁত হইবে বলিয়া মনে মনে বড় রাগ ও হইয়াছিল, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজন বুঝিয়া তাঁহাদের কথা মত কার্য্য করিতে বাধ্য হইলাম। বেঙ্গল থিয়েটারে অভিনয় করিবার সময় “ইংলিস ম্যান”, “ষ্টেটসম্যান” ইত্যাদি কাগজে আমায় কেহ “সাইনোরা” কেহ কেহ বা “ফ্লাওয়ার অফ দি নেটিভ ষ্টেজ” বলিয়া উল্লেখ করিতেন। এখনও আমার পূর্ব্ব বন্ধুদের সহিত সাক্ষাৎ হইলে তাঁহারা বলেন যে, “সাইনোরা” ভাল আছ তো!
পূর্ব্বেই বলিয়াছি এই থিয়েটারে বঙ্কিম বাবুর “মৃণালীনি” অভিনীত হইত। তাহার অভিনয় যেরূপ হইয়াছিল তাহা বর্ণনাতীত। তখনকার বা এখনকার কোন রঙ্গালয়ে এ পুস্তকের এরূপ অভিনয় বোধ হয় কোথাও হয় নাই। এই মৃণালীনিতে হরি বৈষ্ণব – হেমচন্দ্র, কিরণ বাঁডুয্যে -পশুপতি, গোলাপ (সুকুমারী দত্ত)- গিরিজায়া, ভূনি – মৃণালীনি এবং আমি – মনোরমা! Continue reading