সিলেক্টেড টেক্সট: আত্মস্মৃতি – আবু জাফর শামসুদ্দীন (২)
—————————————————-
এই টেক্সটগুলি আবুল জাফর শামসুদ্দীনের কলকাতা থাকার টাইমের, বিফোর পাকিস্তান পিরিয়ড। নিউ স্কীম মাদ্রাসা থিকা পাশ কইরা কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে পড়াশোনা কনটিনিউ করেন নাই উনি। চিটাগাংয়ে গিয়া রেলওয়েতে চাকরি নেয়ার ট্রাই করছিলেন, পারেন নাই। কলকাতা গিয়া কয়েকটা পত্রিকায় কাজ করছিলেন। মাঝখানে একটা সরকারি চাকরি নিয়া খুলনায় আসছিলেন বছরখানেকের লাইগা। পরে পাকিস্তান হওয়ার আগে পারমানেন্টলি কলকাতাতেই ছিলেন। এই ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানা থাকলে উনার কথাগুলি রিলেট করতে সুবিধা হইতে পারে। এমনিতেও মনেহয় বোঝা-ই যায়।
ই.হা.
———————————————————-
কাজী নজরুল ইসলাম
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটির কথা এখনও মনে পড়ে। তখন পত্র পত্রিকায় আমার কয়েকটি গল্প ছাপা হয়েছে। কাঁচা হাতের প্রথম উপন্যাস ‘পরিত্যাক্ত স্বামী’ সম্ভবত লিখছি, কবি তখন সঙ্গীতের জগতে। রেকর্ড কোম্পানির জন্য সঙ্গীত রচনা করেন, সুর দেন। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]উত্তর কলকাতার একটা গলিতে তাঁর বাসা। কবি আবদুল কাদির সাহেব একদিন সকালে তাঁর নিজ কাজেই নজরুলের কাছে যাচ্ছিলেন। কেমন করে যেন তাঁর সঙ্গী হয়ে গেলাম। আমাকে বসার ঘরে রেখে তিনি চলে গেলেন কবির স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে। কবির স্ত্রীকে তিনি বৌদি ডাকতেন। বিদ্রোহী কবি তখন রেকর্ড কোম্পানির অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। কবি তখন একটি গাড়ি কিনেছিলেন, গাড়িটি সম্ভবত লাল রঙের ছিল। নিচে সেটি অপেক্ষা করছিল।
আবদুল কাদির সাহেবের সঙ্গে কবির সেদিন কি কথাবার্তা হয়েছিল আজ আর তার কিছুই মনে নেই।
শুধু এটুকু মনে আছে, আমার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এই নাম, গল্প-উপন্যাস লিখছে। কবি স্নেহমাখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। উৎসাহ দিয়ে দু’চার কথা বলেছিলেনও। আমাদের দু’জনের সন্দেশ-রসগোল্লা এলো, রেকাবিতে এলো কাচের গেলাস ভরা জল। আমরা খেলাম। কবি তাঁর ঘরে গেলেন, একটু পরে সেজেগুজে বেরিয়ে এলেন। যতোদূর মনে পড়ছে, তাঁর পরনে ছিল ফকফকে সাদা খদ্দরের ধুতির ওপরে সিল্কের পাঞ্জাবি এবং গলায় ঝুলানো সাদা উড়ানি, মাথায় খদ্দরের টুপি। পায়ে বোধ করি ছিল নাগরা জাতের জুতো। তিনি গায়ে দামি সেন্ট এবং পাউডার মাখতেন। তার সুগন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো। আমার মনে হলো, সত্য সত্যই সাধারণ মানুষের সমাজ হতে আগত একজন অসাধারণ মানুষ দেখছি। অসাধারণতা তাঁর চোখেমুখে পোশাকে-পরিচ্ছদে দেহের প্রতিটি অঙ্গে এবং বাচনভঙ্গিতে। নজরুলের মতো এমন সুপুরুষ সিংহপুরুষ আমি কখনও দেখি নি। আমাদের বললেন, চলো। গাড়িতে চড়ার সময় বললেন, তোমরাও ওঠো। আমরা খুশি হলাম। রেকর্ড কোম্পানির অফিসের কাছাকাছি একটা জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাদের অসুবিধে হবে না তো? আমরা হেসে বললাম, না। আমরা কিছুটা হেঁটে এবং বাকি পথটা ট্রাম ধরে যার যার বাসায় চলে এলাম। তারপর কবিকে বহু জায়গায় দেখেছি, তাঁর সঙ্গীতের জলসায় উপস্থিত হয়েছি, কিন্তু কবির সঙ্গে এক গাড়িতে আর কখনও ভ্রমণ করি নি। নজরুল চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি উঠতি লেখকদের উৎসাহ দিতেন। ছোট-বড় কোনো লেখককে নজরুল ঈর্ষার চোখে দেখতেন না। উচ্চমন্যতা প্রকৃতপক্ষে হীনম্মন্যতারই নামান্তর। নজরুলের মধ্যে কোনোরকম কমপ্লেক্সবোধ ছিল না। ধনী দরিদ্র উঁচু নিচু নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে তিনি স্বাভাবিকভাবে মিশতেন, সমান আচরণ করতেন। তিনি যখন খ্যাতির শিখরে তখনও খ্যাতির আলাদা পরিমণ্ডল তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠে নি; হতে দেন নি সে সুযোগ। তাঁকে খোঁচালে অবশ্য তিনি তার জবাব দিতেন।
(প. ১৩১ – ১৩২) Continue reading
