ফারুকীর টেলিভিশন, দূর-দর্শনের মিডিয়া এবং ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’
এই লেখাটা ‘যোগাযোগ’ পত্রিকার জুলাই ১২, ২০১৬’তেও ছাপা হইছে।
——————–
“…every people in whose soul an inferiority complex has been created by the death and burial of its local cultural originality—finds itself face to face with the language of the civilizing nation”. ফ্রান্স ফানো (১৯৬৭: ৯)
[১]
এ লেখার উসকানি এসেছে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর টেলিভিশন সিনেমা থেকে, এবং এসেছে গুরুতর এক প্রশ্নের আকারে। টেলিভিশন সিনেমা যে দুইভাবে সপ্রশ্ন কৌতুহল জাগিয়ে তুলেছে সতর্ক পাঠক শিরোনাম দেখে নিশ্চয়তা আন্দাজ করতে পারবেন। সেই কৌতুহল মেটাতেই, ফারুকীর টেলিভিশন সিনেমার বিচার এ লেখায় থাকবে, তবে লেখাটি পল্লবিত হয়ে উঠবে অন্য এক লক্ষ্য পূরণের তাগিদে। ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সমালোচনা বলে যে বর্গকে আমরা সাধারণভাবে চিনি এ লেখা তার অন্তর্ভুক্ত হবার নয়, সেরকম কোনো উদ্দেশ্যে লিখছিও না আমি।
[২]
পরিপ্রেক্ষিত
টেলিভিশন নিয়ে লেখার একটা গুরুতর তাগিদ আছে বটে। ৯/১১ পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইসলাম ও মুসলমান, ‘ধর্মীয়’ সন্ত্রাস ও রক্ষণশীলতা নিয়ে জগৎ জুড়ে এমনই এক প্রতাপশালী‘ ডিসকার্সিভ ফর্মেশান’ ঘটেছে যে তার অভিঘাতে, আবশ্যিকভাবেই, টেলিভিস্যুয়াল জগৎও সরব হয়ে উঠেছে। এরকম সময় আগে কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিতরে ‘ধর্মীয়’ জঙ্গিপনা, ‘ধর্মীয়’ কুসংস্কার ও ‘ধর্মীয়’ রক্ষণশীলতার প্রসঙ্গ ধরে মাত্র দুই-আড়াই বছরের মধ্যেই (২০১০-২০১২) বাংলা ভাষায় চারটি ফিচার ফিল্ম এবং দুইটি টেলিভিশন নাটক তৈরি হয়েছে। কতগুলো ডক্যুমেন্টারি তৈরি হয়েছে তা অবশ্য আমি জানি না,তবে অডিও-ভিস্যুয়াল-মূদ্রণ মাধ্যমগুলোতে নিউজ-রিপোর্ট ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা এবং একাডেমিক গবেষণা, নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বেশুমার। যা হোক, ফিচার ফিল্মগুলো হলো: অপেক্ষা (আবু সাইয়ীদ ২০১০), রানওয়ে (তারেক মাসুদ ২০১০), জ্বী হুজুর (জাকির হোসেন রাজু ২০১২) টেলিভিশন (মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী ২০১২)। দুইটা টেলিভিশন নাটক: মায়া ম্যাডাম (সৈয়দ আওলাদ ২০১০), ফেরার পথ নাই, থাকে না কোনো কালে (মেজবাউর রহমান সুমন ২০১০)।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]
বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে সেকুলারবাদ ও ধর্মীয়চর্চার রাজনীতি বুঝতে বিশেষভাবে আগ্রহী বিধায় আমি তিনটা সিনেমা – অপেক্ষা, রানওয়ে এবং জী হুজুরের একটা বিচার হাজির করেছিলাম ‘বোমা-জঙ্গি-মাদ্রাসা-ইসলাম এবং বাংলাদেশ’ (যোগাযোগ, ২০১৩) প্রবন্ধে। তখন দেখতে পেয়েছিলাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে‘ইসলামী’ জঙ্গিপনার যে ন্যারেটিভ সর্বজনমান্য হয়ে উঠেছে, এবং আমাদের দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাও যে ন্যারেটিভের উৎসাহী গ্রহক হয়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অনন্ত যুদ্ধে’ সামিল, সেই একই ন্যারেটিভ এই সিনেমাগুলোর পাটাতন হিসেবে কাজ করেছে। এনলাইটেনমেন্টের ‘মহান’ সকল অঙ্গীকার নিয়ে গড়ে-ওঠা বর্তমানের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আধুনিকতা এবং যুক্তিবাদিতা চর্চায় কোনো সমস্যা আছে কিনা; কিংবা বর্তমান উদারবাদী অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতাবিস্তার এবং অস্ত্র ও অন্যান্য ব্যবসার স্বার্থ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কিনা তা সিনেমাগুলোতে পুরোপুরিই অনুপস্থিত। প্রতিটি সিনেমাতেই সমস্যা খোঁজা হয়েছে ধর্মের ভিতরেই – যেন স্থান-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ শাশ্বত কোনো বিধানমাত্র হলো ধর্ম; এবং দায়ীও করা হয়েছে কেবলই এই ধর্মাচারী মানুষগুলোকেই – এই মানুষগুলোও যেন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটশূন্য চিন্তাশূন্য অন্ধ অনুসরণকারী এবং জন্মগতভাবেই উন্মত্ত সন্ত্রাসপ্রবণ। আর আবশ্যিকভাবেই এই মানুষগুলো রাজনৈতিক সত্ত্বাশূন্যও বটে – ‘অপরাধ’ গল্পের আড়ালে হারিয়ে যায় তাদের সকল রাজনৈতিকতা। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, যে কোনো মনোযোগী দর্শক এই তিনটা সিনেমায়, বিশেষভাবে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি, এবং মৃত্যুদন্ডে নিহত এর প্রধান দুই সিপাহসালার শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভায়ের স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাবেন। তবে, আমি দেখতে পেয়েছিলাম আরও ইন্টারেস্টিং একটা ডাইমেনশান: তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গল্প, তিনটি ভিন্ন কাহিনী নিয়ে স্বতন্ত্র তিনজন পরিচালক কাছাকাছি সময়ে সিনেমা বানিয়েছেন। অথচ, নাড়ি বুঝে সময়ের ক্রমানুসারে এই তিনটি কাহিনীর মূলকথা বা মাস্টার ন্যারেটিভ একই সুতায় গাঁথলে একটা অতি-কাহিনী, একটা মিথ বা পুরানকথা দাঁড়িয়ে যায় – যাকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় মিথ বলাই শ্রেয়।
আধিপত্যকারী ডিসকোর্সের অধীনে থাকার করণেই মূলত,স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও, অন্তর্নিহিত বিধানগুলোর সুবাদে এই তিনটি গল্প একসাথে যুক্ত হয়ে একটা মহা-গল্প তৈরি করে ফেলে। মহাগল্পের অবয়ব সবসময়ই মিথিক্যাল। আর এও বোধহয় বলাই বাহুল্য যে পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর সর্ববিনাশী অভিযাত্রায় রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের (ভায়োলেন্স) ন্যায্যতা তৈরি করতেই অহরহ এরকম মিথের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়ে। Continue reading
