মনু যখন আমারে বঙ্কিমের এই গদ্য কবিতাগুলার কথা বললেন তখন আমিও চমকাইলাম; ‘ও’ লিখার মানে হইলো যে, আরো অনেকেই চমকাইবেন বইলা আমার ধারণা। এখন পর্যন্ত বাংলা কবিতার হিস্ট্রি যেইভাবে আছে, সেইখানে প্রথম আধুনিক গদ্য কবিতা লিখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অথচ উনি এই কাম করার অনেক আগেই বঙ্কিম গদ্য কবিতা লিখছেন, আর পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে (এরচে কম টাইম গ্যাপ হওয়ার কথা না) বই ছাপানোর সময় জিনিসটা নিয়া স্পষ্টভাবে বইলা গেছেন।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]
তারপরও উনার গদ্য কবিতা এবং গদ্য কবিতা বিষয়ে উনার কথাগুলারে যে ইগনোর করা যাইতেছে, এর একটা কারণ হইলো কবি না হয়া আপনি কখনোই কবিতা লিখতে পারেন না; ফার্স্টে কবি হওয়াটা জরুরি। কবি কেমনে হইবেন? দুয়েকটা কবিতা তো ধরেন লিখলেনই, এইটা সবাই-ই লেখে, সবাই বলতে যারা কলেজ-ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। কবিতা লেখাটাই কবি হওয়ার ঘটনা না। তাইলে বঙ্কিম’রে নিতে কোন সমস্যা হইতো না। সমস্যাটা হইলো যে, উনি তো কবি না!
কবি হইলো এমন একটা অথরিটি যিনি কবিতা লেখার বাইরেও সার্টেন নলেজ অ্যাচিভ করছেন থ্রু উনার লাইফ-স্টাইল এবং উনি যা বলেন সেই বলাটা এক ধরণের ইনটিউটিভ নলেজ হিসাবে রেসপেক্ট করা যায়, করতে পারেন উনার ভক্ত বা অ্যাডমায়ারার যারা। এইভাবে কবি একটা সোশ্যাল আইডেন্টিটি হিসাবে অ্যাক্ট করেন। আপনি একজন এন্টারপ্রেনার, সাংবাদিক, ব্যাংকের ম্যানেজার, আইটি কনসালটেন্ট, ইউনিভার্সিটি বা কলেজের টিচার – এইরকম পেশায় থাকতেই পারেন, আবার একইসাথে কবিও হইতে পারেন; কিন্তু গল্প-লেখক, নভেল-রাইটার, কলামিস্ট, অনুবাদক হওয়ার সাথে সাথে যদি কবি না হইতে পারেন, তাইলে আপনার কবিতা নিয়া যে কোন আলাপরেই পাত্তা দেয়ার কিছু নাই। বঙ্কিমের গদ্য কবিতা নিয়া এই জিনিস ঘটছে।
এই অ্যাটিটুড কতোটা ঠিক বা ভুল তার চাইতে বড় জিনিস হইলো এইটা এগজিস্টিং রিয়ালিটি। আর এই রিয়ালিটি’র সেন্টার পয়েন্ট খালি ‘মানুষ’ না, বরং মানুষ হিসাবে একটা আইডেন্টিটিরে অ্যাচিভ করা; যে এই এই জিনিস না থাকলে আপনি ‘মানুষ’ না এবং একইভাবে এই এই জিনিস না থাকলে আপনি ‘কবি’ না; যেই কারণে মানবতা বলেন আর কবিতা-ই বলেন খুবই লিমিটেড একটা এরিয়ার ভিতর ফাংশন করতে থাকে। আর এই লিমিটগুলা এমনভাবে এমবেডেড যে, বলাও লাগে না।
এখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’রে কবি বইলা মাইনা নিলে এইসব ঝামেলা হওয়ার কথা না। জাস্ট ভাবতেছিলাম, উনারে কবি না মাইনাও উনার গদ্য কবিতা’রে নেয়াটা পসিবল কিনা?
কবিতাগুলি ‘কবিতাপুস্তক’ বই থিকা নেয়া হইছে। বইটার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। প্রথমে বিজ্ঞাপনের লেখা ও পরে কবিতা তিনটা রাখা হইলো।
ই. হা.
____________________________
বিজ্ঞাপন
যে কয়টি ক্ষুদ্র কবিতা, এই কবিতাপুস্তকে সন্নিবেশিত হইল, প্রায় সকল গুলিই বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল। একটি – “জলে ফুল” ভ্রমরে প্রকাশিত হয়। বাল্যরচনা দুইটি কবিতা, বাল্যকালেই পুস্তকাকারে প্রচারিত হইয়াছিল।
বাঙ্গালা সাহিত্যের আর যে কিছু অভাব থাকুক, গীতিকাব্যরে অভাব নাই। বিদ্যাপতির সময় হইতে আজি পর্য্যন্ত, বাঙ্গালি কবিরা গীতকাব্যের বৃষ্টি করিয়া আসিতেছেন। এমনস্থলে, এই কয় খানি সামান্য গীতিকাব্য পুনর্মুদ্রিত করিয়া বোধ হয় জনসাধারণের কেবল বিরক্তিই জন্মাইতেছি। এ মহাসমুদ্র শিশিরবিন্দুনিষেকের প্রয়োজন ছিল না। আমারও ইচ্ছা ছিল না। ইচ্ছা ছিল না বলিয়াই এত দিন এ সকল পুনর্মুদ্রিত করি নাই।
তবে কেন এখন এ দুষ্কর্মে প্রবৃত্ত হইলাম? একদা বঙ্গদর্শন আপিসে এক পত্র আসিল – তাহাতে কোন মহাত্মা লিখিতেছেন যে, বঙ্গদর্শনে যে সকল কবিতা প্রকাশ হইয়াছিল, তাহার মধ্যে কতকগুলি পুনর্মুদ্রিত হয় নাই। তিনি সেই সকল পুনর্মুদ্রিত করিতে চাহেন। অন্যে মনে করিবেন, যে রহস্য মন্দ নহে। আমি ভাবিলাম, এই বেলা আপনার পথ দেখা ভাল, নহিলে কোন দিন কাহার হাতে মারা পড়িব। সেই জন্য পাঠককে এ যন্ত্রণা দিলাম। বিশেষ, যাহা প্রচারিত হইয়াছে, ভাল হউক মন্দ হউক, তাহার পুনঃপ্রচারে নূতন পাপ কিছুই নাই। অনেক প্রকার রচনা সাধারণসমীপস্থ করিয়া আমি অনেক অপরাধে অপরাধী হইয়াছি; শত অপরাধের যদি মার্জ্জনা হইয়া থাকে তবে আর একটি অপরাধেরও মার্জ্জনা হইতে পারে।
কবিতাপুস্তকের ভিতর তিনটা গদ্য প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হইয়াছে। কেন হইল, আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে আমি ভাল করিয়া বুঝাইতে পারিব না। তবে, এক্ষণে যে রীতি প্রচলিত আছে, যে কবিতা পদ্যেই লিখিতে হইবে, তাহা সঙ্গত কি না, আমার সন্দেহ আছে। ভরসা করি অনেকেই জানেন যে কেবল পদ্যই কবিতা নহে। আমার বিশ্বাস আছে, যে অনেক স্থানে পদ্যের অপেক্ষা গদ্য কবিতার উপযোগী। বিষয় বিশেষে পদ্য, কবিতার উপযোগী হইতে পারে, কিন্তু অনেকস্থানে গদ্যের ব্যবহারই ভাল। যে স্থানে ভাষা ভাবের গৌরবে আপনা আপনি ছন্দে বিন্যস্থ হইতে চাহে, কেবল সেই স্থানেই পদ্য ব্যবহার্য্য। নহিলে কেবল কবিনাম কিনিবার জন্য ছন্দ মিলাইত বসা এক প্রকার সং সাজিতে বসা। কবিতার গদ্যের উপযোগিতার উদাহারণ স্বরূপ তিনটি গদ্য কবিতা এই পুস্তকে সন্নিবেশিত করিলাম। অনেকে বলিবেন, এই গদ্যে কোন কবিত্ব নাই – ইহা কবিতাই নহে। সে কথায় আমার আপত্তি নাই। আমার উত্তর যে এই গদ্য যেরূপ কবিত্বশূন্য আমার পদ্যও তদ্রূপ। অতএব তুলনায় কোন ব্যাঘাত হইবে না। Continue reading →