Main menu

আবুল হাসানের কয়েকটা জনপ্রিয় কবিতা

বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে খ্রিষ্টীয় গত শতকের সেভেনটিইসে যাঁরা কবিতা লিখছেন, অ্যাজ অ্যা টেনডেন্সি তাদের কবিতা সমাজ-রাজনীতির নিচে চাপা পইড়া গেছে বইলা অভিযোগ আছে। অবশ্য সমাজ-রাজনীতি ত প্রায় সবসময়ই আছে কবিতার ভিত্রে, কিন্তু সমাজ-রাজনীতি যেইভাবে চেইঞ্জ হইছে, কবিতাগুলা যেহেতু লেখা হয়া গেছে চেইঞ্জ আর হইতে পারে নাই – এইরকমের একটা ঘটনা ঘটছে। ব্যাড লাক অবশ্যই!

তবে উনাদের মধ্যে মইরা গিয়া অনেকটাই বাঁইচা আছেন কবি আবুল হাসান। উনি লাকি; কম-বয়স উনার কবিতারে অনেকদিক দিয়াই সেভ কইরা গেছে; পঁচিশ বছর বয়সে এইরকম কবিতাই ত লেখার কথা! আনফরচুনেটলি নির্মলেন্দু গুণ’রে ঊনসত্তর বছর বয়সে এখনো একইরকমের কাজ কইরা যাইতে হইতেছে। মানে, মরার আগ পর্যন্ত উনারা পঁচিশেই থাকবেন, অথবা সত্যিকার অর্থে পঁচিশ বছর বয়সেই উনাদের ক্রিয়েটিভ মৃত্যু সম্ভব হইছে।

মিড এইটিইসে আবৃত্তিচর্চার পেশায় কাঁচামাল হিসাবে অন্যান্য কবিদের পাশাপাশি আবুল হাসানের কবিতার ব্যবহারও সম্ভব হয়; যেই কারণে সাহিত্যসমাজের বাইরে কলেজ-ভার্সিটি’তে পড়া শিক্ষিত সমাজে উনার একটা পরিচিতি তৈরি হয়, কিছু কবিতা সেই  পারসপেক্টিভে জনপ্রিয় হয়।

এমনিতে উনার কবিতা ইনটেন্স, গভীর আবেগের মামলা; ইথিক্যালি প্রগতিশীল মধ্যবিত্তের কালচারাল মেনিফেস্টো এবং এসথেটিক্যালি ছিল বা আছে এক ধরণের আউটস্পোকেননেস-এর চর্চা হিসাবে, যেইটা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তসলিমা নাসরীন  হইয়া আর্লি এইটিইস পর্যন্ত কনটিনিউ হইছে। এরপরে বাংলাকবিতা যে কম-কথা-বলা এবং জীবনের-গূঢ়-রহস্য-আবিষ্কারে নামলো সেইটা এই টেনডেন্সির অ্যাবাউট টার্ন হিসাবেও দেখা যাইতে পারে। উনার ইনটেন্সিটির চর্চা এখনো এক ধরণের পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেই আছে।

এইরকম জায়গায় দাঁড়াইয়া, বাংলা-কবিতার একটা প্রবণতা হিসাবে আবুল হাসানের কবিতা আবার পড়ার রিকোয়েস্ট ত করা যাইতেই পারে।

 

ই. হা.

 

______________________________________________

আবুল হাসান ।। চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ ।। জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন ।। উচ্চারণগুলি শোকের ।। অসভ্য দর্শন ।। মিসট্রেসঃ ফ্রি স্কুল স্ট্রীট ।। উদিত দুঃখের দেশ ।। নিঃসঙ্গতা ।। গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর ।। যুগলসন্ধি ।। বিচ্ছেদ ।। ঝিনুক নীরবে সহো ।।  এপিটাফ ।। তোমার মৃত্যুর জন্য ।। জ্যোস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন ।। অপরিচিতি ।।

______________________________________________

 

আবুল হাসান

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?
মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ্ম তমোহর
কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর?

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,
যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়
সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী
তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে –
এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,
একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,
তুই যার অনিচ্ছুক দাস!

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,
নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!
সত্যিই কি মানুষের?

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত চিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?

Continue reading

তর্ক: চমস্কি এবং ফুকো (পার্ট টু)

This entry is part 2 of 5 in the series তর্ক: চমস্কি এবং ফুকো

প্রথম পার্টে চমস্কি’র পরিচয় প্রচার করা হইছিল। এই পার্টের আলাপ ফুকো’রে নিয়া।

__________________________________

 

তিন

মিশেল ফুকো (১৯২৬ – ১৯৮৪) কাঠামোবাদ ও উত্তরকাঠামোবাদের সাথে জড়িত ফরাসি দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ। ১৯৬৯ সালে ফ্রান্সের সবচে সম্মানিত কলেজ ডি ফ্রান্সে ‘হিস্ট্রি অব সিস্টেম অব থট’ এর প্রফেসর নির্বাচিত হওয়ার পূর্বেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে বিদ্যাজগতে ফুকো নিজের আসন পাকা করে নিয়েছিলেন। সত্তরের দশকের শুরু থেকে ফুকোর রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেড়ে যায়। তিনি কয়েদীদের অধিকার আদায়ের জন্য একটা সংগঠন গড়ে তোলেন এবং সমকামী ও অন্যান্য প্রান্তীক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ হয়ে নিয়মিত প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। এই সময়েই তিনি এইডস আক্রান্ত হন এবং ১৯৮৪ সালের জুন মাসে অকালমৃত্যু বরণ করেন।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

প্রাদেশিক একটা প্রভাবশালী পরিবারে পল মিশেল ফুকোর জন্ম। শল্যচিকিৎসক বাবা পল ফুকো চেয়েছিলেন মিশেল বড় হয়ে তার পেশা গ্রহণ করবেন, কিন্তু ফুকো হয়ে উঠলেন দর্শন-জগতের বাসিন্দা। খ্যাতিমান ইকোল নর্মাল সুপিরিয়র-এ ১৯৪৬ সালে ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত ফুকোর শিক্ষাজীবন বিশেষ উজ্জ্বল ছিল না। ইকোল নর্মালে পড়ার সময় তিনি এতোটাই বিষন্নতায় ভুগতেন যে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। তখন তাকে একজন মনঃচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্ভবত এসময় থেকেই তিনি মনস্তত্ত্বে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাই, ইকোল নর্মাল সুপিরিয়র থেকে দর্শনে ডিগ্রি অর্জনের সাথে সাথে তিনি, ফ্রান্সে তখন পর্যন্ত নতুন জ্ঞানকান্ড, মনস্তত্ত্বেও একটা ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। শিক্ষা-উপদেষ্টা কাঠামোবাদী মার্কসবাদী লুই আলথুসারের পরামর্শে ফুকো ১৯৫০ সালে ফরাসী কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই ১৯৫৩ সালে তিনি দল ত্যাগ করেন; বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের স্বৈরতান্ত্রিক নীতির কারণে তার মোহভঙ্গ হয়। এরপর ১৯৬৮ সালের আগে আর তার মধ্যে রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখা যায়নি। Continue reading

তর্ক: রবীন্দ্রনাথের বোঝা রিয়ালিজম

বাছবিচারে প্রচারিত সাহিত্যে রিয়ালিজম বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশগুপ্ত’র পোস্টটার লিংক ফেসবুকে শেয়ার কইরা একটা আলাপের শুরু করেন নাজমুল সুলতান; যেইখানে রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজম নিয়া চিন্তাটা কিভাবে আরো স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব সেই বিষয়ে উনার মতামত দেন। যার প্রেক্ষিতে আমি আমার ভূমিকার জায়গাটা ফারদার ক্ল্যারিফাই করার চেষ্টা করি। নাজমুল সুলতান যে রবীন্দ্র-রিয়ালিজমরে হাজির করেন তার অ্যানালাইসিস করেন রেজাউল করিম। পুরা আলাপটাই আগের পোস্টের একটা এক্সটেনশন হিসাবে এইখানে রাখা হইলো।

–    ইমরুল হাসান।

______________________________

 

নাজমুল সুলতান:

এই  তর্কখানি  পুনর্বার  পরিবেশনের  জন্য  দায়ী  ব্যক্তিদের  অশেষ  ধন্যবাদ।  কৃতজ্ঞতা  স্বীকার  করে, রিয়েলিজম-বিতর্কের  ভূমিকাদাতা  ও  ভাষ্যকারের ঠাকুরপাঠের সাথে একটু  দ্বিমত  পোষণ  করতে হচ্ছে। ইমরুল হাসানের পাঠানুসারে ঠাকুরের বাস্তবতাবাদ-সমালোচনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে  (১) সমাজে  যা  বিদ্যমান  নাই তা  সাহিত্যে  আনা  অর্থহীন  (২) ঠাকুরমতে সমাজে যা ঘটমান তা যতোটুকু ন্যারেশনের সম্ভাবনা পয়দা করে, সাহিত্যর কাজ হচ্ছে তাকে পুনরোৎপাদন করা। সমান্তরালে, তিনি সম্ভবত এ-ও দাবি করলেন যে ঠাকুরে সাহিত্যের সত্য সমাজের সত্যকে প্রতিস্থাপন করে দেয়। প্রথম দুইটা দাবি ক্লাসিকাল রিয়েলিজমের দাবির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেমন, সাহিত্য  সমাজের  আসল  সত্যকে  উপস্থাপন  করব  খালি  এই  দাবি  সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদীদের  ছিল না-  সাথে  সাথে  তারা  এটাও  দাবি  করতেন  যে  সাহিত্য  গাঠনিকভাবে  সমাজের বাস্তবতাকে  অতিক্রম করতে  পারে  না।  তা  যদি  “বুর্জোয়াপক্ষের” ভাবতরঙ্গ হাজির করে, সেই ভাবও সমাজের “বর্ণনা-সম্ভাব্যতার” ভিতরে পড়ে, কেবল সমাজের যে “আসল সত্য”— শ্রমিকশ্রেণির ভাব— তাকে ধরতে পারে না। সে যাই হোক।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

জগদীশ গুপ্তের বইটা আমি পড়ি নাই। তাই ঠাকুরের বয়ান ধরেই কথা বলা যাক। ঠাকুরের গুণের মধ্যে মহত্তর একটা হল তার চিন্তার সচেতন কাঠামোবদ্ধ সমগ্রতা। রিয়েলিজম নিয়ে তার অসন্তুষ্টি আমাদের একেবারে তার দর্শনের গোড়ার কথায় নিয়ে যায়– ঠাকুর ছিলেন যাকে ইংরাজিতে বলে ট্রান্সেডেন্টাল রোমান্টিসিস্ট, অর্থাৎ বিষয় ও বিষয়ীর তুমুল ঐক্য তার চিন্তায় (সত্য এক– সেই একের নানা আবির্ভাব), আর সেই ঐক্যজ্ঞান ট্রান্সেডেন্টাল তরিকায় ন্যায্যকৃত। এই কারণে আধুনিক রিয়েলিজমের জন্য সত্য যদি সমাজ-নির্ভর হয়, ঠাকুরের জন্য তা সমাজ-অতিক্রমী ভাবে সত্য। Continue reading

ফররুখ আহমদের কয়েকটা কবিতা

ফররুখ আহমদ বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে বেশ অস্বস্তিকর একটা ঘটনা। প্রথমে উনি আধুনিক কবি আছিলেন; শনিবারের চিঠি’তে উনার কবিতার সমালোচনা করা হইছে, কলকাতার অনেক পত্রিকায় উনার কবিতা ছাপা হইছে এবং উনার লেখালেখির শুরুর সময়টাতে শিখা গোষ্ঠীও উনারে মারাত্মক রকমের প্রেইজ করছেন, আধুনিক কবি বইলা।

কিন্তু ১৯৪৬ এ ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ নামে ছোট কবিতার বই ছাপাইয়া উনি এমন একটা জায়াগাতে রিচ করলেন, যেইটারে কলকাতাভিত্তিক বাংলাকবিতাপন্ডিতদের পক্ষে ‘আধুনিক কবিতা’ বইলা মাইনা নেয়াটা একটু মুশকিলেরই হওয়ার কথা। অবশ্য উনি মরার পরে উনার প্রথমজীবনের কবিতা নিয়া বেশ কয়েকটা কবিতার বই ছাপানো হইছে যেইখানে সম্ভবত তার ‘আধুনিক কবি’ ইমেজ আবার কিছুটা রিগেইন করা গেছে।  

আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রথমে তারে ‘ইসলামসচেতন’ কইলেও পরে ‘স্বতন্ত্রসংস্কৃতিসচেতন’ বলছেন। বাংলা-কবিতার ধারায় ফররুখ আহমদ  এখনো একজন ‘স্বতন্ত্র’ বইলাই আল মাহমুদরে অনেকবেশি ‘এসটোনেসিং’ এবং জসীমউদ্দীন’রে (নন-আধুনিক হওয়ার পরেও) ‘জাতীয়’ ধারার কবি মনে হইতে থাকে।

আল মাহমুদের কবিতায় যেইটা ‘পূর্ববঙ্গীয়’ উচ্চারণ/উপাদান/সাহস/ড্রিম, সেইটা ফররুখ আহমদের উপস্থিতি থিকাই ডিরাইভ করা যায়; কিন্তু তারপরও উনারে ‘আধুনিক’ বলতে গেলে অস্বস্তি লাগার মূল কারণ হইলো তিনি ইসলামের পুনরুজ্জীবন চাইছেন, ইকবালের মতো মর্ডান-ইসলামের একটা এসথেটিকস তৈরির চেষ্টা তিনি করছেন বাংলাকবিতায়। নজরুল ইসলাম’রে উনি কখনোই আদর্শ হিসাবে নেন নাই। ধারণা করা যায়, রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ার পরে মোর বাঙালি এবং লেস মুসলমানদের কাছে উনার কবিতার চিত্রকল্পগুলি সময়ের সাথে সাথে দূরবর্তী হইতে হইতে একটা সময় ‘স্বতন্ত্র’ হয়া ওঠে! জসীমউদ্দিনের বাংলা-আবিষ্কারে অবশ্য এইসব নিয়া কোন টেনশনই নাই, প্রি-মর্ডান নজরুলীয় সাম্যই এগজিস্ট করতেছে।

বাঁইচা থাকার সময় ফররুখ আহমদের ছয়টা কবিতার বই ছাপা হইছিল আর মরার পরে দশটার বেশি পান্ডুলিপি ছাপা হইছে। প্রকাশের সময় ধইরা বিভিন্ন সময়ের কবিতা রাখার চেষ্টা করা হইছে এইখানে; লেখার সময় হিসাবে আগ-পিছ আছে।

 

ই.হা.

 

________________________________________________

পুরানো মাজারে ।। মন ।। বর্ষার বিষন্ন চাঁদ ।। সিলেট ষ্টেশনে একটি শীতের প্রভাত ।। ভূমিকা ।। কাঁচড়াপাড়ায় রাত্রি ।। বিদায় ।। হাবেদা মরুর কাহিনী (দশ) ।। শীতরাত্রির আলাপ ।।

_____________________________________________

 

পুরানো মাজারে

পুরানো মাজারে শুয়ে মানুষের কয়খানা হাড়
শোনে এক রাতজাগা পাখীর আওয়াজ। নামে তার
ঘনীভূত রাত্রি আরো ঘন হ’য়ে স্মৃতির পাহাড়।
এই সব রাত্রি শুধু একমনে কথা কহিবার
নিজেদের সাথে। জানি; – মুসাফির-ধূলির অতিথি
প্রচুর বিভ্রমে, লাস্যে দেখেছিল যে তন্বী পৃথিবী
পুঞ্জীভূত স্মৃতি তার জীবনের ব্যর্থ শোক-গীতি:
রাতজাগা পাখীর আওয়াজ: জমা আঁধারের ঢিবি –
যেন এক বালুচর, দুই পাশে তরঙ্গ-সঙ্কুল
জীবনের খরস্রোত, নিষ্প্রাণ বিশুভ্র বালুচরে
কাফনের পাশ দিয়ে বেজে চলে দৃঢ় পাখোয়াজ।
পুরানো ইটের কোলে শোনে কারা সংখ্যাহীন ভুল
ঝরেছে অপরাজেয় অগণিত মৃত্যুর গহ্বরে।
মাজারে কাঁপায়ে তোলে রাতজাগা পাখীর আওয়াজ।।

সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর, ১৯৪৪) থেকে

 

মন

মন মোর আসন্ন সন্ধ্যার তিমি মাছ-
ডুব দিল রাত্রির সাগরে।
তবু শুনি দূর হ’তে ভেসে আসে-যে আওয়াজ
অবরুদ্ধ খাকের সিনায়।

সূর্য মুছিয়াছে বর্ণ গোধুলি মেঘের ক্লান্ত মিনারের গায়,
গতি আজ নাইকো হাওয়ায়
নিবিড় সুপ্তির আগে বোঝে না সে শান্তি নাই তমিস্রা পাথারে।
তবু পরিশ্রান্ত ম্লান স্নায়ুর বিবশ সঞ্চরণে
আতপ্ত গতির স্বপ্ন জমা হয় মনে,
বুঝি চৈত্র অবসন্ন আকাশে আকাশে ফেরে ঝড়ের সংকেত
বুঝি দুঃস্বপ্নের মত ভিড় ক’রে আসে কোটি প্রেত
অমনি
মনের দিগন্তে মোর চমকায় সহস্র অশনি।

শুনি আকাশের ধ্বনি :
তোমার দুর্ভাগ্য রাত্রি মুক্ত পূর্বাশার তীরে
হ’য়েছে উজ্জ্বল,
তোমার অরণ্যে আজ পুরাতন বনস্পতি
ছাড়িয়াছে বিশীর্ণ বল্কল।
দিগন্ত-বহ্নির মত হানা দিয়ে ফেরে সে ভাবনা,
অবসন্ন জনতার মনে দোলে বৈশাখের
বজ্র-দীপ্ত-মেঘ সম্ভাবনা।
রাত্রির সমুদ্র ছাড়ি-মন
প্রভাতের যুক্ত বিহঙ্গম।
আকাশে উধাও ডানা, ছেড়ে যায় পুরাতন লুণ্ঠিত মিনার
ছেড়ে যায় আকাশের বর্ণ বিভা, দিগন্ত কিনার;
বন্দীর স্বপ্নের মত বাঁধামুক্ত মন; -মোর মন।

সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর ১৯৫২) থেকে

Continue reading

‘আনবাড়ি’র অংশ

সমসাময়িক বাংলা গদ্য এবং গল্পের নজিরগুলা আমরা রাখতে চাই বাছবিচার-এ। বিদেশে/প্রবাসে যাঁরা থাকেন তাঁরা ম্যাক্সিমাম সময়ে দেশ বিষয়ে চিন্তিত থাকেন বইলা লিখতে বসলেই এই বিষয়ে উৎকণ্ঠিত হইতে থাকেন । বিদেশে গেলেই দেশ ও দেশের মানুষ নিয়া লিখতে হবে, এইরকম একটা চাপও সম্ভবত তৈরি হয় অথবা বিদেশ বইলা যে কিছু নাই সেইটা দেশ সম্পর্কে বেশি বেশি বইলা প্রমাণ করা লাগে। এর বাইরে, বিদেশে থাকা বাংলাভাষার লেখকেরা যে বিদেশ নিয়াও গল্প লিখতে পারেন এবং লিখেন, তার এক্সজাম্পল হিসাবে পড়া যাইতে পারে, এই উপন্যাসের অংশ।

_______________________________________

লুনার (লুনা রুশদী) আর আমার যৌথ খামার এই বই ‘আনবাড়ি’, নামখানা আমার দেয়া, সাধখানা দু’জনেরই অনেকদিনের। যদিও আমরা ভৌগোলিক প্রতিপাদস্থানে থাকি প্রায়, দূর থেকেও দু’হাতে দুইরকম বাজনা বাজানো সম্ভব নিশ্চয়ই। বইয়ের নামটা পরবাস অর্থে দেয়া, এই পরবাস নিজভূমেও হতে পারে, মিসফিটদের জন্যে সব দেশই কিনা প্রবাস। শুধু প্রবাসের গল্প বললে হয়তো ভুল বলা হবে তাই। ‘আনবাড়ি’ প্রকাশিত হবে আগামী বইমেলা ২০১৪তে, প্রকাশক শুদ্ধস্বর।

::সাগুফতা শারমীন তানিয়া

______________________________________

 

আমার দিন-২

হালকাচুলো আমাদের নিতে এসেছে। আম্মা শজারুর মতন ঝমঝম করতে করতে আর আমি পকেটে হাত পুরে ভোমরার মতো গুনগুন করতে করতে ওর পিছু পিছু চললাম। আম্মা আহ্লাদী গলায় বল্লো- “তুই কি গান করিস?” আমি বললাম- “বামি বান বরি না।” আম্মা রেগে গিয়ে গুম হয়ে রইলো। লেকের পাশে আমরা থামলাম। আম্মা আমাকে কোলে নিয়ে ঢেউয়ের উপর বয়ার মতন ডুবু-ভাসু করা গাঙচিল দেখালো- “দ্যাখ কি সুন্দর গাঙচিল।” আমি উপুড় হয়ে কালো কাদার উপর শুকনো রুপালি বালির দানা দেখতে দেখতে বলি- “ওটা হাঁস।” -“না রে ওটাকে বলে গাঙচিল।” -“না ওটা হাঁস।” -“আমি বলছি ওটা গাঙচিল।” -“হাঁস।” -“গাঙচিল। ওটার লেজ ছুঁচোলো।” -“ওটা হাঁস কারণ ওটা শাদা।” আম্মা কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়- “তুই এত বাঁদর একটা ছেলে।” এই হয়েছে এদের, বয়ার মতন পাখিটা গাঙচিল না হলে আমাকে বাঁদর হতে হবে- আপনজনের হাতে এ কি হেনস্থা। আমি আম্মার গায়ে খোশামুদে গা ঘষে বলি- “হুমম, বেটা বাঁস।” আম্মা অসম্ভব রেগে যায় আর হালকাচুলো হাসতে হাসতে আমাকে কাঁধে তুলে নেয়। আমি তখনকার জন্যে হালকাচুলোকে সয়ে নিই। আমরা হলুদ হলুদ বাতি ঘাড়ের উপর জ্বলা রেস্তোরাঁতে খেতে বসি। আমি আলুভাজা মিইয়ে যাবার পর সেটা দিয়ে বুমেরাং বানাই, ঘোড়ার পেটে গোড়ালি দিয়ে লাথি দিয়ে বলি- “আরো জোরে।” হালকাচুলো উহঃ করে ওঠে। টেবিলে ধূম ছাড়তে ছাড়তে সেদ্ধ গেঁড়িগুগলি ইত্যাদি আসে, জোরদার গন্ধ কচি পেঁয়াজের আর রসুনের। আম্মা আর হালকাচুলো হাঁসেদের হিলহিলে খাদ্য হামলে পড়ে খেতে থাকে। আমি চোখ সরু করে দেখি- ওদের লেজ ছুঁচোলো কি না। আম্মা আমাকে সাধে- “খাও সোনা, এর নাম মাজল্‌স। দ্যাখো কি মজার একটা রবারের পুতুল শুয়ে আছে ঢাকনির ভিতরে।” পুতুলহীন ঢাকনিগুলি চাউনির পাঁজা হয়ে হাঁ করে চেয়ে আছে। আমি ঘাড় বেঁকিয়ে বলি- “আমি চাই না। এগুলি মাজল্‌স না। এগুলি প্লাম।” -“মাজল্‌স এগুলি। খেয়েই দ্যাখো।” আমি আরো জোরদার গলায় বলি- “এরা প্লাম, এরা কালো।” আম্মা আমার সাদাকালো জ্ঞানে অতিষ্ট হয়ে উঠবার আগে একঝলক মাজল্‌সগুলির দিকে তাকায়, তাদের প্লামরঙা কালচে বেগুনি ঢাকনার ভিতরে মুক্তার ফিকে রঙ চিকচিক করছে, হালকাচুলো আমার কবিত্বের তারিফ করে। আম্মা আমার কাব্যপ্রতিভার আভাস পেয়ে ঠান্ডা হয়ে আসে। এত শান্তি আমার ভাল লাগে না। আমি বলি- “বাড়ি বাব, ব্লাম বাব না।” হালকাচুলো হাসতে হাসতে বলে- “বপাল!”

Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →