আমার ফিরার অধিকার: এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাইদ
যতদিন না ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগনের সাথে যা করসে সেইটার মোরাল রেসপনসিবিলিটি নিজেদের কাধে নিতেসে, ততক্ষন পর্যন্ত এই কনফ্লিক্টের কোনো শেষ হইতে পারে না
…
ইসরাইলের সবচে ইনফ্লুয়েনশাল দৈনিকে আগেও আমার ইন্টারভিউ ছাপা হইসে। কিন্তু এইটা ছিল সবচে লম্বা ও সবচে বেশি প্রিপারেশন নিয়া করা ইন্টারভিউ। ২০০০ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে নিউইয়র্কে রাইটার এবং জার্নালিস্ট আরি শাভিত (Ari Shavit) তিন দিন সময় নিয়া আমার সাথে কথা বলসিলেন। আমারে এই ব্যাপারটা সবচে নাড়া দিসিল যে, এরকম একটা ইন্টারভিউ ইসরাইলে জাতিয় দৈনিকে পাবলিশ হইতে পারে, কিন্তু মার্কিন আমেরিকার সেটাপে এরকম কিছু করা সম্ভব না।
– এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ
…
নিউ ইয়র্ক রওনা হওয়ার কিছুক্ষন আগে বাড়িটা আমি দেখতে গেসিলাম। বেশি দুর যাইতে হয় নাই আমার। আমি যেখানে থাকি তার থেকা বাড়িটা মোটামুটি ৩০০ মিটারের ভেতরে এবং যাওয়ার পথে একটা পাবলিক গার্ডেনের দেখা পাওয়া যায়, যেইখানে আমার মেয়ে খেলতে পছন্দ করে। বাড়িটার স্ট্রাকচার নিয়া বলার মতো তেমন কিছু নাই। দুইতলা, কোনাকুনি, তেমন কোনো সাজসজ্জা ছাড়া প্রটেস্ট্যান্ট ঘরানার একটা আর্কিটেকচার হিসেবে বাড়িটারে কনসিডার করা যায়। তখনকার তালবিয়ার খ্রিষ্টান আরবরা বসবাসের জন্য নিজেদের সবটুকু দিয়া যেরকম ঝকমকা পরিপাটি বাড়িগুলা বানাইতেন, এই বাড়িটা তেমন না। বরং খুব বেশি ফরমাল, আয়তাকার, সামনের উঠানে একটা তালগাছ, ছোটো একটা সিড়ি আর সুন্দর একটা প্রবেশপথ। এই প্রবেশপথের কথা-ই সাইদ নিয়মিত বিভিন্ন জায়গায় বইলা থাকেন। এই তালগাছটার কথা এখনো তার মনে আছে। আর বাড়িটার আশেপাশে অন্য কোনো বিল্ডিং না থাকার বিষয়টাও। এগুলার সবই শৈশবে একটা কনভারসেশন শুইনা প্যানিকড হওয়ার আগের ঘটনাঃ কেউ একজন ইহুদিদের তরফ থেকা আসন্ন বিপদের কথা বলতেসিল। আরেকজন বলসিল, ভয়ের কিছুই নাই। সময় হইলে হকিস্টিক লাঠিসোটা নিয়া পোলাপানরাই ইহুদিদের ভাগায়া দিবে।
নিজের ফ্যামিলির বাসা ছাড়ার এগজাক্ট মোমেন্ট সাইদের মনে নাই। বাসায় শেষ দিন, বা শেষ সময়ের কোনো মেমোরিও নাই। যা ঘটসিল সেটা হইতেসে, প্রতি বছরের মতো ঐবারও শীতের শুরুতে উনারা কায়রোর বাসায় ফিরা গেসিলেন। কিছুদিন পরে সাইদ শুনসিলেন, ফিলিস্তিনে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটসে। আর আস্তে আস্তে, আরো পরে তিনি বুঝতে পারসিলেন, তারা আর ফিরা যাইতে পারবেন না। জেরুজালেমে তাদের আর কোনো জায়গা নাই। তাদের কিছু আত্মিয় এবং ফ্যামিলি ফ্রেন্ড নিজেদের সবকিছু হারায়া এখন রিফিউজি হয়া গেসে।
আগস্টের শুরুতে সামার ভ্যাকেশনের মাঝামাঝি সময়টাতে নিউ ইয়র্কের আধা-খালি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি একলা একটা জায়গা। আর ফিলসফি ডিপার্টমেন্টের করিডোরে যেন অন্ধকার তার ডালপালা ছড়ায়া নিয়া বসছে। কিন্তু পাচ তলার উপরে এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদের অফিসটা ভালোই চওড়া, আর আলো-বাতাসের সুন্দর যাতায়াত সেইখানে আছে। বিভিন্ন ভাষার ডকুমেন্ট, বই আর জার্নালের গাদাগাদিতে ভর্তি এই রুমে কমফোর্টেবল একটা বিশৃঙ্খল ব্যাপার আছে। সবকিছুর মাঝে একটা কর্নারে ইয়েশ গভুল মুভমেন্টের একটা পুরানা পোস্টার ঝুলতেসে যেইটাতে লেখা: Don’t say ‘I didn’t know.’ আর তারও উপরে একটা শেলফে দেখা যাইতেসে সোনালি রঙের ফিলিস্তিনের একটা ম্যাপ।
গত এক বছরে তার চুল সাদা হয়া গেসে। পাকস্থলি ক্যান্সারের বাইড়া যাওয়ার বিষয়টাও বেশ ভোগাইতেসে উনারে। এতো কিছুর পরেও এডওয়ার্ড সাইদ এখনো হ্যান্ডসাম একটা মানুষ, নিজের এপিয়ারেন্স ও ড্রেসের ব্যাপারে বেশ সচেতন। জ্যাকেটের পকেটে সিল্কের একটা রুমাল দেখা যাইতেসে আর ডেস্কে রাখা পেলেগ্রিনোর বোতলের দিকে যখনই হাত বাড়াইতেসিলেন, গোল্ডের ঘড়িটা চকচক কইরা উঠতেসিল।
পারসোনালিটির দিক থেকা সাইদের তুলনা হয় না কারো সাথে। পশ্চিমের সবচে ফেমাস ফিলিস্তিনি ইনটেলেকচুয়াল খুবই মাইডিয়ার টাইপের মানুষ। একইসাথে জ্ঞানি এবং চালাক। খুবই পলিটিকাল, ইমোশনাল, সেইসাথে সেন্স অফ হিউমারওয়ালা একটা লোক। খুব সহজে তিনি দান্তের পোয়েটিক কথাবার্তা থেকা স্টার্নহেলের জায়নিস্ট-প্যাদানো আলাপে গিয়া আবার একই জায়গাতে ফিরা আসেন। বিভিন্ন ভাষা ও কালচারাল লেভেলের মাঝামাঝি যে জায়গায় উনার বসবাস, নিজের আলাদা আলাদা আইডেন্টিটি, সেগুলার মধ্যে দিয়া চলাফেরা করতে তিনি বেশ আনন্দ পান। যেন বা একইসাথে ব্রিটিশ, আমেরিকান ও আরব হওয়ার বিষয়টারে উনি সেলিব্রেট করতেসেন। একইসাথে রিফিউজি ও অভিজাত, সাবভার্সিভ ও কনজারভেটিভ, লিটারারি একজন ব্যক্তি ও প্রোপাগান্ডিস্ট, ইউরোপিয়ান ও মেডিটেরেনিয়ান।
টেপ রেকর্ডার চালু করার আগে সাইদ আমার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়া বিস্তারিত জানতে চাইলেন। আমি কতোদিন ধইরা ইসরাইলে আছি, আমার ফ্যামিলি কোথা থেকা আসছে এইসব। আর আস্তে আস্তে আমরা আমাদের কমন এলাকা নিয়া কথা বলতে শুরু করলাম। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় আগে কিছু সময়ের জন্য সেইখানে তিনি থাকতেন। এখন ঐখানে আমি থাকি। আর আমরা কথা বললাম আমাদের দুইজনের পরিচিত বিভিন্ন বিল্ডিংগুলা নিয়া। আমাদের দুইজনের পরিচিত অনেকগুলা পদবিওয়ালা ফ্যামিলির ব্যাপারেও কথা হইল। আমি চেষ্টা করতেসিলাম, আলাপের ভেতর খুব সতর্কতার সাথে সবচে সেন্সিটিভ জায়গাটা নিয়াও নাড়াচাড়া করতে, যেহেতু তিনি আমার ‘অপর’ (Other)। আমি তার ‘অপর’। এবং আমাদের আজিব ও ট্রাজিক ইন্টিমেসি। তার, আমার ও তালবিয়ার মধ্যে।
/আরি শাভিত; আগস্ট, ২০০০
…
প্রফেসর সাইদ, আপনার মতো রেকগনাইজড একজন স্কলার গ্রীষ্মের শুরুর দিকে লেবানিজ বর্ডারে ইসরায়েলি আর্মি পোস্টে পাথর মারসে শুইনা বহু ইসরায়েলি এবং নন-ইসরায়েলি অবাক হইসে। দক্ষিণ লেবানন থেকা ইসরাইল চইলা যাওয়ার পরেও কোন জিনিসটা আপনারে দিয়া এরকম আজিব একটা কাজ করাইসিল?
একটা সামার ভিজিটে আমি লেবানন ছিলাম। ঐখানে আমি দুইটা লেকচার দিসি এবং বন্ধুবান্ধব আর ফ্যামিলি মেম্বারদের সাথে কিছুদিন ছিলাম। তারপর হিজবুল্লাহ’র [/ref]লেবানিজ শিয়া ইসলামিস্ট পলিটিকাল পার্টি ও মিলিট্যান্ট গ্রুপ সাথে আমার একটা মিটিং হয়। খুবই ইম্প্রেসিভ মনে হইসে মানুশটারে। খুব সিম্পল, বেশ ইয়াং, এবসলুটলি নো বুলশিট। আমেরিকার এগেনস্টে ভিয়েতনাম যে স্ট্রাটেজি ফলো করসিল, ইসরাইলের বিরূদ্ধেও এই লোক সেইম জিনিস এডপ্ট করসিলেনঃ অদের সাথে আমরা ফাইট করতে পারবো না কারন অদের হাতে আর্মি, নৌবাহিনি আর নিউক্লিয়ার বোমা আছে, কাজেই অদের সাথে ফাইট করার একমাত্র উপায় একের পর এক কফিন পাঠায়া তাদের বুঝায়া দেয়া। আর এগজাক্টলি এই কাজটাই তিনি করসেন। মিডল ইস্টে যতো পলিটিকাল লিডারের সাথে আমি দেখা করসি, তাদের ভেতর একমাত্র এই লোকটাই ঠিক সময়ে মিটিংয়ে আসছিলেন। বিষয়টা নিয়া খুবই ইমপ্রেসড হইসিলাম আমি। তার আশেপাশে কালাশনিকভ হাতে কোনো লোকজন ছিল না। আমরা এই ব্যাপারে একমত হইসিলাম যে, ফিলিস্তিনি অধিকার রিক্লেইম করার রাস্তায় অসলো চুক্তি পুরাপুরি ইনেফেক্টিভ একটা জিনিস ছিল। তিনি আমারে বলসিলেন যে, দক্ষিণ অঞ্চলটা আমার অবশ্যই একবার গিয়া দেইখা আসা উচিত। তাই কিছুদিন পর আমি গেসিলাম ঐখানে।
আমরা ছিলাম নয়জন। আমার ছেলে আর অর ফিয়ান্সে, আমার মেয়ে আর অর ফ্রেন্ড, আমি ও আরো কয়েকজন। সাথে লেবানিজ একজন গাইড। প্রথমে আমরা গেলাম খিয়াম কারাগারে জায়গাটা আমাদের সবার ওপর কঠিন ছাপ ফেলসিল। জীবনে অনেক বাজে জায়গা আমি দেখসি কিন্তু, এইটা ছিল সম্ভবত সবচে বাজে। অনেকগুলা সলিটারি কনফাইনমেন্ট সেল আর টর্চার চেম্বার। অদের ইউস করা ইলেকট্রিক প্রোবগুলাসহ টর্চার করার বিভিন্ন ইনসট্রুমেন্ট তখনো রয়া গেসিল ঐখানে। মানুষের পেশাব-পায়খানা আর অত্যাচারের গন্ধে ভরা ছিল জায়গাটা। এই হরর ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আমার মেয়ে গোঙ্গানি কইরা কানতে শুরু করসিল।
সেখানে থেকা আমরা ডিরেক্ট বর্ডারে গেলাম। জায়গাটার নাম ছিল বোয়াবিত ফাতেমা, ফাতেমা গেট (Bowabit Fatma, Fatma’s Gate)। শত শত টুরিস্ট ঐখানে প্রচুর পরিমাণ কাটাতারের মুখামুখি দাড়ায়া ছিল। আরো প্রায় ২০০ মিটার দূরে ছিল একটা ওয়াচ-টাওয়ার। এইটাও কংক্রিট আর কাটাতার দিয়া ঘেরাও করা। সম্ভবত টাওয়ারে ইসরাইলি সৈন্যরা ছিল, কিন্তু আমি দেখি নাই তাদের। টাওয়ারটা মোটামুটি ভালোই দূরে ছিল।
আমার রিগ্রেটের জায়গাটা হইতেসে, (পাথর মারার) বিষয়টা মানুষের কাছে ক্লিয়ারলি প্রকাশ পায় নাই। লোকে ভাবসে আমি হয়ত কারো দিকে পাথর মারতেসিলাম। কিন্তু আসলে ঐখানে কেউ ছিল না। ঘটনা হইতেসে, আমার ছেলেসহ আরো কিছু ইয়াং পোলাপান দেখতেসিল কে কতোদুরে পাথর ছুইড়া মারতে পারে। আমার ছেলে যেহেতু বেসবল খেলা বিশাল বডির আমেরিকান, অর পাথরটাই সবচে দূর পর্যন্ত গেসে। আমার মেয়ে তখন বলল, ‘আব্বু, তুমি ওয়াদি (Wadie) পর্যন্ত একটা পাথর ছুইড়া মারতে পারবা?’ আর জিনিসটা তখন ইদিপাল (Oedipal) একটা কমপিটিশন হয়া দাঁড়াইল তখন। তাই আমিও একটা পাথর ছুইড়া মারসিলাম।