আমার দোস্ত, আমার দুশমন – ইসমত চুগতাই
অ্যাডোলফি চেম্বারের সিঁড়ি বাইয়া উঠার সময় আমার একটু প্যারা লাগতেসিল। পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় যেমন প্যারা লাগে, ওইরকম। নতুন কারো সাথে দেখা হওয়ার সময় আমার এমনিতেই নার্ভাস লাগে, কিন্তু এইবার সেই ‘নতুন মানুষ’টা ছিল মান্টো। যার সাথে আমার প্রথমবার দেখা হবে। তাই প্যারাটা বাইড়া বিরক্তির পর্যায়ে চইলা যাইতেসিল। আমি শহিদরে কইলাম, “চলো ফিইরা যাই, মান্টো মনে হয় বাসায় নাই।” কিন্তু শহিদ আমার সব আশায় পানি ঢাইলা দিল।
“সন্ধ্যাবেলা মান্টো বাসায়ই থাকে, এই সময়ে সে বইসা বইসা মদ খায়।”
এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হইলো, আমি মনে হয় ভূত দেখসি। মান্টো তো মান্টো, এরপর আবার মাতাল মান্টো! কিন্তু ভয় পাওয়ারই বা কী আছে? সে কি আমারে খায়া ফেলবে নাকি। যত ত্যাড়াব্যাঁকা কথাই উঠুক, বিষয় না। আমিও তো হালকা কোনো বুদবুদ না যে ফুঁ দিলেই উইড়া যাব। তো এইসব ভাবতে ভাবতে, ধুপধাপ ধুলা উড়াইতে উড়াইতে আমরা সেই ভাঙাচোড়া সিঁড়িটা দিয়া উপরে উঠলাম। মান্টোর বাসায়। দরজা হালকা কইরা খোলা ছিল। ঢোকার সময় ঘরটা দেইখা মনে হইলো অনেকটা ড্রয়িং রুমের মতো। একটা কোণে সোফা, আর অন্য কোণে একটা খাট রাখা। ধবধবে সাদা-পরিষ্কার একটা চাদর বিছানো। জানালার পাশে একটা টেবিল ভর্তি বই। টেবিলের সামনেই একটা লোক বইসা আছে, যারে প্রথম নজরে দেইখা মনে হবে বড়সড় একটা পোকা! বা ওইরকমই কিছু।
আমাদেরকে দেইখা অবশ্য মান্টোরে খুবই উৎফুল্ল মনে হইলো, “আরে আসেন আসেন।” ও বেশ আপ্যায়নের ভঙ্গিতে উইঠা দাঁড়াইলো। চেয়ারে বইসা থাকলে যেমন ছোটখাটো লাগে, পুরাপুরি উইঠা দাঁড়াইলে ভুলটা ভাঙে। বুঝা যায়, ও এমনিতে বেশ লম্বা। আর যখন ও একটু বেশিই সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ওরে দেইখা খুব ভয়ংকর কেউ মনে হয়। একটা খসখসে সুতি কুর্তা-পাজামার সঙ্গে জওহর-কাটের কোটি পরা মান্টো।
ও দাঁত দেখায়া হাইসা বললো, “আরে আমি তো ভাবসিলাম আপনে মনে হয় কালো আর রোগা কেউ হবেন।”
আমিও জবাব না দিয়া পারলাম না, “আর আমি ভাবসিলাম আপনে চিল্লাফাল্লা করা অসহ্য একটা পাঞ্জাবি লোক।”
এরপরই আমরা দুইজন এমন সব আলাপে মইজা গেলাম যে দুইজনেরই মনে হইতে থাকলো, আমাদের আগে দেখা না হয়া বহুত বড় ‘লস’ হয়া গেছে। তাই যত কম সময়ে যত বেশি আলাপ কইরা ক্ষতি পুষানো যায়, তারই চেষ্টা করতেসিলাম মনে হয়। এক মুহূর্তও দেরি সইতেসিল না আমাদের। এক-দুইবার আমাদের মাঝে ঝামেলা লাগসে, কিন্তু তখনো যেহেতু একটু রাখঢাক আছে তাই পরেরবার দেখা হওনের জন্য ওই বিষয়গুলা আমরা একটু সাইডে সরায়া রাখলাম। কয়েক ঘণ্টা ধইরা আমাদের চোয়ালগুলা বোধহয় এক মিনিটের জন্যও থামে নাই। মেশিনের মতো দ্রুতগতিতে একেকটা বাক্য জন্ম নিতেসিলো। আর কিছুক্ষণ আলাপের পর আমি বুঝতে পারলাম, মান্টোরও সবকিছু না শুইনা মাঝখানে কথা কয়া ফালানোর অভ্যাস আছে। এইটা বুঝার পর আমার দিক থিকা আর কোনো ভদ্রতা বাকি থাকলো না। এরপরে আলাপটা তর্কের পর্যায়ে পৌঁছায়া গেল, এরপর বাদ-বিবাদ। অবাক হয়া দেখলাম, আলাপের কিছুক্ষণের মাথায়ই আমরা একজন আরেকজনরে অতি সাহিত্যিক ভাষায় ‘স্টুপিড’, ‘ইডিয়ট’ আর ‘অযৌক্তিক’ ইত্যাদি নামে ডাকাডাকি করতেসিলাম। Continue reading