Main menu

স্লটারহাউজ-ফাইভ: বুক রিভিউ? আই গ্যেস…

স্লটারহাউজ-ফাইভ, যদি তকমা দিতেই হয়, একটা যুদ্ধবিরোধী বই। কার্ট ভনেগাট নিজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ড্রেসডেনে ছিলেন। ড্রেসডেন, যেই শহরে ইংল্যান্ড-আমেরিকা কর্তৃক তিনদিন ধরে ৩৯০০ টন বোমা ফেলা হয়। কার্ট ভনেগাট তখন একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কসাইখানায় আশ্রয় নেন। বের হয়ে এসে দেখেন ১৭০০ একর জমি নাই হয়ে গেসে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু বছর পর ভাবলেন এই নিয়া তিনি একটা বই লিখবেন। কিন্তু কী লেখা যায়? কেমন শব্দ তার দেখা বীভৎসতার প্রতি সুবিচার করতে পারে? গেলেন এক পুরনো বন্ধুর কাছে, যে তার সাথে যুদ্ধে ছিল। যুদ্ধ নিয়া বই লিখবেন শুনে বন্ধুর বউ তার প্রতি পুরাপুরি শীতল আচরণ শুরু করলেন। কারণ তিনি জানেন এইসব লেখকেরা যুদ্ধের কথা কত রসায়ে রসায়ে লেখে, বীরত্ব আর দেশপ্রেমের মোড়কে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়া বই লেখার কিছু নাই। যুদ্ধ হচ্ছে যেইখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের পাঠানো হয় খুন হওয়ার জন্য। ভনেগাট সেই মহিলারে কথা দিয়াসছিলেন, তিনি যুদ্ধ নিয়া রোম্যান্টিক কোনো বই লিখবেন না। আর বইটার বিকল্প নাম রাখলেন, Children’s Crusade.
আরেক বন্ধুর সাথে আলাপ করায় তিনি বললেন, “যুদ্ধবিরোধী বই যারা লিখতে চায় তাদের আমি কী বলি জানো? তারচেয়ে বরং তোমরা তুষারস্রোতের বিরুদ্ধে একটা বই লেখো।” অর্থাৎ স্রোত কখনো থামবে না, যুদ্ধও না। কী লাভ?

তবু একটা বই লিখলেন ভনেগাট। বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টারেই উপরের এইসব কথা লেখেন উনি। যেকোনো বইয়ের প্রথম লাইন গোটা বইয়ের পূর্বাভাস দিয়ে দেয়। এই বইয়ের প্রথম লাইন, “All of this happened, more or less. The war parts, anyway, are pretty much true.” প্রথম লাইনেই উনি ফিকশন আর রিয়ালিটির বর্ডারে এসে দাঁড়াইলেন। ফিকশন থেকে আমরা চাই একটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে ক্যাথার্সিস গেইন করতে। কিন্তু এই বই উনি আমাদের নিখাদ ফিকশন হিসেবে এঞ্জয় করতে দিবেন না, আবার নিতান্ত তথ্যনির্ভকর ডকুমেন্টারিও না। এইটা তাইলে কী? সম্ভবত ভনেগাট নিজেও জানেনা।

উপন্যাস শুরু হয় দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে: “Billy Pilgrim has come unstuck in time.” বিলি পিলগ্রিম সময়ের বাঁধন হতে খুলে গেসেন, এবং পুরা বইতে বিলি পিলগ্রিম এক সময়কাল হতে আরেক সময়কালে পড়ে যেতে থাকবেন। কখনো বারো বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে প্রথমবার গ্র‍্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে যাওয়ার সময় হতে ড্রেসডেনে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কসাইখানার পথে শুয়ারের মত জীবনে, কিংবা নিজের মৃত্যু হতে ট্রাল্ফামাডোরের চিড়িয়াখানায় বাস করার সময়।

ট্রাল্ফামাডোর হচ্ছে পৃথিবী হতে ৪৪৬,১২০,০০০,০০০,০০০,০০০ মাইল দূরের একটা গ্রহ। সেই গ্রহের অধিবাসীরা বিলি পিলগ্রিমকে তুলে নিয়ে যায় নিজেদের গ্রহে। “আমাকেই কেন?”, জিজ্ঞেস করলো বিলি পিলগ্রিম; “কেন কোনোকিছুই?”, উত্তর দিলো ট্রাল্ফামাডোরিয়ান। “কেন”র মত ফালতু প্রশ্ন নিয়া তারা ভাবে না। ট্রাল্ফামোডোদিয়ানরা চতুর্মাত্রিক প্রাণী, তারা সকল মুহূর্ত একসাথে ঘটতে দেখে। তারা একইসাথে দেখতে পায় আকাশের প্রতিটা নক্ষত্র কোথায় ছিল, কোথায় আছে এবং কোথায় যাচ্ছে। তাই রাত্রির আকাশ তাদের কাছে অনেকগুলা নক্ষত্রের বিশাল ন্যুডলসের মত দেখায়। আর তারা যেহেতু সকল সময় একইসাথে দেখতে পায়, তাই যাকিছু ঘটবে তার সবটাই তারা আগে থেকে জানে, এমনকি মহাবিশ্বের ধ্বংসও। কিন্তু তারা এইসব ঠেকাইতে কিছুই করে না। কারণ যা কিছু হওয়ার তা এমনিই ঘটে-ঘটসে-ঘটবে, চিরকাল, বারবার। তাইলে কি কারো স্বাধীন ইচ্ছা নাই? ট্রাল্ফামোডোরিয়ানরা জানায়, তারা মহাবিশ্বের ১১০টা গ্রহের প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করসে, একমাত্র পৃথিবীর একটা প্রজাতির মধ্যেই “স্বাধীন ইচ্ছা” নামক হাস্যকর জিনিসের ধারণা আছে। তাদেরও নিজস্ব সাহিত্য আছে। Continue reading

সেন্সরশিপ আর সাইলেন্স – উমবের্তো একো

[ইতালিয়ান ভাষায় লেখাটা ছাপা হইছিল ২০১১ সালে। ইংলিশে ট্রান্সলেট হইছিল ২০১২ সালে। ইতালিয়ান থিকা ইংলিশে ট্রান্সলেট করছেন Richard Dixon.]

আজকে আপনার যারা বয়সে ইয়াং, ভাবতে পারেন যে, veline হইতেছে সুন্দরী মেয়ে যারা টেলিভশন শো’গুলাতে নাচে, আর যে casino হইতেছে একটা হাউকাউের জায়গা।* আমার জেনারেশনের যে কেউই জানে যে, ক্যাসিনো শব্দ দিয়া বুঝাইতো ‘মাগিপাড়া’ আর এর পরেই, কনোটেশন দিয়া, এইটার মানে আইসা দাঁড়াইছে ‘কেওটিক কোন জায়গা’, এখন যেহেতু এইটা তার আদি মানে হারায়া ফেলছে, আর আজকে যে কেউ, ইভেন একজ বিশপও, বিশৃঙ্খলা বুঝাইতে এইটা ইউজ করেন। একইরকমভাবে, bordello ছিল একটা বেশ্যাপাড়া, কিন্তু আমার গ্রান্ডমা, যিনি খুবই কঠিন মোরালিটি মহিলা ছিলেন, প্রায়ই বলতেন যে, ‘একটা bordello বানাইও না’; মানে হইতেছে, বেশি হৈ চৈ করবা না’; এই শব্দটা তার অরিজিনাল মিনিং পুরাপুরি হারায়া ফেলছে। আপনাদের মধ্যে যারা ইয়াং এইটা নাও জানতে পারেন যে, ফ্যাসিস্ট আমলে, veline ছিল হইতেছে কয়েকটা কাগজের শিট যেইটা দিয়া গর্ভমেন্টের যেই ডিপার্টমেন্ট (বলা হইতো মিনিস্ট্রি অফ পপুলার কালচার, শর্ট ফর্মে মিনিকালপপ – এইরকমের একটা রহস্যময় আওয়াজের নাম এভয়েড করার মতো হিউমার অদের ছিল না) কালচার কন্ট্রোল করতো, নিউজপেপারে পাঠাইতো। অই পাতলা কাগজের শিটগুলাতে লেখা থাকতো নিউজপেপারগুলার কোন কোন জিনিস নিয়া চুপ কইরা থাকতে হবে আর কোন কোন জিনিস অরা ছাপাইতে পারবে। এইভাবে, velina’টা, জার্নালিস্টিক জার্গনে, আসছে সেন্সরশিপ’রে সিম্বল হিসাবে দেখাইতে, কি গোপন করতে হবে, কোন ইনফরমেশন গায়েব কইরা দিতে হবে, সেইটা বুঝাইতে।

আজকে আমরা যেইটারে veline হিসাবে জানি – টেলিভিশনের শো-গার্লরা – হইতেছে, হাউএভার, পুরা অপজিট: অরা হইতেছে, যেইরকম আমরা জানি, বাহ্যিক দেখনদারির, ভিজিবিলিটির সেলিব্রেশন, আসলে খাঁটি ভিজিবিলিটির ভিতর দিয়া ফেইম এচিভ করার জিনিস, যেইখানে এপিয়েরেন্সটাই এক্সিলেন্সটারে ফুটায়া তোলে – এমনকি এইরকমের এপিয়েরেন্সরে একটা সময়ে কুরুচির ব্যাপার বইলাই ভাবা হইতো।

আমরা দুই ধরণের velina এইখানে পাইতেছি, যেইটারে আমি দুই ধরণের সেন্সরশিপের ফর্মের লগে তুলনা করতে চাই। পয়লা সেন্সরশিপ’টা হইতেছে সাইলেন্সের ভিতর দিয়া, সেকেন্ড সেন্সরশিপ হইতেছে হাউকাউয়ের ভিতর দিয়া; আমি এই কারণে velina শব্দটারে ইউজ করতেছি টেলিভিশনের ঘটনাটার একটা সিম্বল হিসাবে, শো’টা, এন্টারটেইনমেন্ট, নিউজ কাভারেজ, আর এইরকম কিছু দিয়া।

ফ্যাসিজম এইটা বুঝছে (যেইরকম ডিক্টেটর’রা জেনারেলি করে) যে, মিডিয়া যত কাভারেজ দেয় পথভ্রষ্ট ব্যবহার তত বাড়ে। যেমন ধরেন, velina কইলো, “সুইসাইড নিয়া লেখবা না’ কারণ সুইসাইড নিয়া কোন কথা কইলেই কয়দিন পরে এইটা দেইখা কারো সুইসাইড করার কথা মনে হইতে পারে। এইটা পুরাপুরি ঠিক – আমাদের এইটা ধইরা নেয়া ঠিক হবে না যে, ফ্যাসিস্ট হায়ার্কির মনে যা আসে তার সবকিছুই ভুল – আর এইটা খুবই সত্যি যে যেইসব ঘটনারে আমরা ন্যাশনাল সিগনিফিকেন্স ভাবি ঘটছে খালি মিডিয়াতে এইগুলা নিয়া কথা-বার্তা হইছে বইলা। যেমন ধরেন, ১৮৭৭ আর ১৯৮৯ সালের স্টুডেন্ট প্রটেস্ট; অইগুলা ছিল অল্প-সময়ের ঘটনা যেইগুলারে ভাবা হইছিল ১৯৬৮’র প্রটেস্টের আবার ঘটা, কারণ নিউজপেপারগুলা বলা শুরু করছিল ‘১৯৬৮ ফিরা আসতেছে।’ অইসব ঘটনাগুলাতে যারা জড়িত ছিল তারা ভালো কইরাই জানেন প্রেস অই ঘটনাগুলারে তৈরি করছিল, একইরকমভাবে প্রেস জেনারেট করে রিভেঞ্জ এটাকস, সুইসাইড, ক্লাসরুম শুটিং – একটা স্কুলে শুটিংয়ের নিউজ আরেকটা স্কুলের শুটিং’রে প্রভোক করে, আর অনেক রোমানিয়ানরা বুড়া মহিলাদেরকে রেইপ করার ব্যাপারে এনকারেজড হয় কারণ নিউজপেপারগুলা অদেরকে বলে যে, এইটা ইমিগ্রেন্টদের স্পেশালিটি আর এইটা করাটা সহজ: আপনারে যেইটা করা লাগবে কোন হাঁটা-চলার পথের ধারে, কোন রেলস্টেশনের কাছে বা এইরকম কোন জায়গা খালি একটু ঘুর ঘুর করা লাগবে।

পুরান-স্টাইলের velina বলবে যে, ‘যেইসব জিনিস বাজে হইতে পারে, সেইসব জিনিস এভেয়ড করার লাইগা, অইগুলা নিয়া কথা বলবা না’, আজকের দিনের velina কালচার বলবে যে, ‘বাজে জিনিসগুলা নিয়া কথা বলা এভেয় করার লাইগা অনেক বেশি অন্য জিনিস নিয়া কথা বলবা।’ আমি সবসময় এই ভিউ’টা নিছি যে, যদি কোন চান্স থাকে, আমি টের পাই যে আমার কোন আকামের কথা নিউজপেপার জাইনা গেছে আর আগামীকালকে ছাপা হইতে পারে, যেইটা নিয়া কঠিন বিপদে পড়তে পারি আমি তাইলে ফার্স্ট কাজ আমি যেইটা করবো, লোকাল পুলিশ হেডকোয়ার্টার বা রেলওয়ে স্টেশনের সামনে গিয়া একটা বোমা পুঁইতা আসবো। তাইলে পরের দিনের নিউজপেপারের ফন্টপেইজ ভরা থাকবে অইটা দিয়া আর আমার পারসোনাল আকাম’টা ভিতরের একটা ছোট স্টোরি হয়া থাকবে। আর কে জানে কতগুলা সত্যিকারের বোমা পুঁইতা রাখা হয় অন্য ফ্রন্ট-পেইজ স্টোরিগুলারে মুইছা দেয়ার জন্য। এই বোমাটার উদাহারণটা আওয়াজের দিক দিয়াও ঠিকঠাক, যেহেতু এইটা এমন একটা বিশাল নয়েজের উদাহারণ যা অন্য সবকিছুরে চুপ করায়া ফেলে। Continue reading

বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ) – ২

কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।

………

ফার্স্ট পার্ট

………

মালিক ভগবান

এও এক অভিজ্ঞতা। দুপুর থেকে স্টুডিওতে গিয়ে বসে আছি ত আছিই। কেউ কথাও বলে না, বার্তাও না। আর সকলের সে কি গর্বিত চালচলন। যেন মাটিতে পা ই পড়ে না। সবসময় যেন গোঁফে তা দেওয়া ভাব। বেয়ারা থেকে শুরু করে হোমরাচোমরা অবধি সকলের। আমরা কি যে সে লোক? এন-টি ব্যানারে কাজ করি। এই ভাবেই ডগমগ। দিন গড়িয়ে বিকেল এল। বিকেলের পর সন্ধ্যা। হঠাৎ যেন ‘সাজ সাজ’ রব উঠল। “কি ব্যাপার?” “না, সাহেব আসছেন।’ ‘সাহেব’?—অবাক হয়ে তাকাতেই এক বেয়ারা আমার অজ্ঞতা দেখে কৃপা পরবশ হয়ে এগিয়ে এসে চুপিচুপি বলল, ‘সাহেব হলেন বি এন সরকার—নিউ থিয়েটার্সের ভগবান, এটা জেনে রাখুন। বলেই শশব্যস্তে কোমরের বেল্ট, মাথার ক্যাপ ঠিক করে মুখে বৈষ্ণবী বিনয়ের গদগদভাব ফুটিয়ে সাহেবের গাড়ির দিকে ছুটল। অন্যান্য সবাইও সাহেবের সম্মুখীন হবার আগে ঠিক ফার্নিচার ঝাড়ার মতই নিজেদের যথাসম্ভব ঝাড়পৌঁছ করে নিলেন। স্যুট পরিহিতরা টাই-এর নটটা একটু টাইট করে রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নিলেন। কেউ বা সার্টের কলারটা একটু সোজা করে নিলেন। আবার ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিতরা হাতের ভাজ টান টান করে কেঁাচাটা ধরে ঠিক খেলার মাঠে দৌড়োনোর প্রতিযোগিতায় নামার মত বেগে ধাবিত হলেন বি এন সরকারের গাড়ির দিকে। তারপর প্রতিযোগিতা হোলো কে সবচেয়ে আগে স্যারের চোখে পড়তে পারেন এবং কার অভিবাদনে আনুগত্যর প্রকাশ স্যারের কতটা বেশী প্রসন্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে? সারাদিন বসে থাকার বিরুক্তি ও ক্লান্তির বাধা ঠেলেও মনটা যেন মুহূর্তের জন্য কৌতুকে নেচে উঠল। নিজের অজ্ঞাতে কখন উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করেছি বুঝতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা শুরু করেছি বুন্টুতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা দেখা মতই উপভোগ করলাম অবস্থা বিশেষে বয়স্ক মানুষও কেমন ছেলেমানুষের মত হয়ে যায়। এন-টির পদস্থ ব্যক্তিরা পরস্পরকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় পাঁচজনে মিলে স্যারের গাড়ির দরজা খুললেন। স্যার গাড়ি থেকে মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে দু-পাশের অনুগতের দল তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেন। তার আগে অবশ্য দুহাত জোড় করে প্রায় মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করা হয়ে গেছে। আমি তারই প্রোডাকশনের একজন শিল্পী, সেইদিনই প্রথম কাজে যোগ দিয়েছি, সারাদিন বসে আছি। অথচ আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করানোরও একটা প্রয়োজন আছে একথা কারো চিন্তাতেও স্থান পেয়েছে বলে মনে হোলো না। যে যার নিজের ভাবনাতেই বিভোর। আমার মত সামান্য মানুষের দিকে তাকাবার তাঁদের সময় কই? আমি ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই বুঝতে পারলাম তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকাটা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। গরজ করে একাজ সম্পন্ন করার মত কোনো মধ্যস্থা ব্যক্তি এতবড় প্রতিষ্ঠানেও নেই, এ অভিজ্ঞতা যেমন বিস্ময়ের তেমনই বেদনার। যাই হোক, দূর থেকে দুহাত জোড় করে তাঁকে নমস্কার জানিয়ে অন্য ঘরে চলে এলাম। সে নমস্কার সহস্র ভক্তের ভীড়ের আড়াল অতিক্রম করে স্যার বি এন সরকারের চোখে পড়েছিলো কিনা জানি না। কিন্তু তাঁরই প্রতিষ্ঠানের শিল্পী হয়ে যখন সেইদিনই প্রথম প্রবেশ করলাম এ কর্তব্য না করলে সে অ-সৌজন্য নিজেকেই পীড়া দিত। যাই হোক, আরো ঘণ্টা দুয়েক বসে মিঃ পি এন রায়কে ‘আমি এখন যেতে পারি?”—বলতেই খুব অবাক হয়ে তিনি বললেন, ‘সে কি! আপনি এখনও বসে?’- মনটা খুবই দমে গেল।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানানো দরকার। আমার নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেবার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনার কাহিনীর মধ্যে যেন স্যার বি এন সরকারের প্রতি বিন্দুমাত্র কটাক্ষ বা শ্লেষ আছে ভেবে নিয়ে আমার প্রতি অবিচার না করেন। কারণ এখানে আমার আলোচ্য তাঁর পরিপার্শ্বিক, তিনি নন।

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী সাহেবের উল্লেখ না করলে ‘বিদ্যাপতি’র অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আগেই বলেছি ‘বিদ্যাপতি’ চিত্রে অনুরাধা চরিত্র-যোজনা কাজী সাহেবেরই পরিকল্পনা।

বোধহয় ‘বিদ্যাপতিতে কাজ করারও অনেক আগে মেগাফোনের রিহাস্যাল রুমে জে এন ঘোষ আমার সঙ্গে নজরুলের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। এর আগে তাঁর খ্যাতির সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু মানুষটির সঙ্গে পরিচয় সেইদিনই। প্রথমটায় তাকাতেই ভয় করছিলো। উনি কত বড় কবি, আর আমি সামান্য একটি মেয়ে। কিন্তু ভয়ের যে সত্যিকার কোনো কারণ ছিলো না, সে-কথা বুঝতে পারলাম কয়েক মুহূর্তেই। চেয়ে দেখি পাঞ্জাবি পরা বাবরী-চুল এক ভদ্রলোক আস্তে আস্তে হার্মোনিয়াম বাজাতে বাজাতে গুন-গুন করে সুর ভাঁজছেন চোখদুটি বুজে। মাঝে মাঝে চোখ খুলে এদিক-ওদিক অন্যমনস্কভাবে তাকাচ্ছেন, কিন্তু মনটা যে অন্য জগতে, চাউনি দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। এক সময় হার্মোনিয়ম থামিয়ে আমাদের দিকে যখন তাকালেন, বিরাট দুটি চোখের উজ্জ্বলতা যেন তার অন্তরটি মেলে ধরল। আমায় সঙ্কুচিত দেখে পরিবেশ সহজ করে তোলবার জন্যই বোধহয় উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার গান গলা ও চেহারার প্রশংসা শুরু করে হাসির হুল্লোড়ে সারা ঘর মাতিয়ে দিলেন। অপরিচয়ের কুণ্ঠা মুহূর্তেই যেন উড়ে গেল। তারপর জে এন ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ত খিদে পেয়েইছে— মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাননেরও খিদে পেয়েছে। দাদা, এ-বিষয়ে একটু তৎপর হন।’ কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই হাসি। জে এন ঘোষ ব্যস্তসমস্তভাবে উঠে গিয়ে মস্তবড় থালাভর্তি খাবার, মিষ্টি, আর একটা বড় প্লেটে পান জর্দার স্তূপ এনে হাজির করতেই ‘খাও’ বলে আমার হাতে গোটা দশ-বারো তুলে দিয়ে নিমেষের মধ্যে সব খাবার নিঃশেষ করে শুধু থালাটিই বাকী রাখলেন। আনন্দময় মানুষটি হৈ-চৈ করে যেমন বিস্ময়কর পরিমাণ খেতে পারতেন ঠিক তেমনই বিস্ময়করভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধুমাত্র গান রচনা নিয়েই মেতে থাকতে পারতেন। আর সে কি আশ্চর্যভাবে মেতে থাকা! কখনও যদি কোনো সুর মনে এল সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে কথা বসানো, আবার কখনও বা কথার তাগিদে সুর। রাগরাগিণীর সম্বন্ধে প্রগাঢ় জ্ঞান হয়ত আমার ছিল না, কিন্তু লক্ষ্য না করে উপায় ছিলো না, কি ব্যাকুল আবেগে তিনি কথার ভাবের সঙ্গে মেলাবার জন্য হার্মোনিয়ম তোলপাড় করে সুর খুঁজে বেড়াতেন। এ যেন ঠিক রাগের মর্ম থেকে কথার উপযুক্ত দোসর অন্বেষণ। Continue reading

নিসিম এজিকিয়েলের ভারত দর্শন

নিসিম এজিকিয়েল নামের এক কবির বসতি ছিল ভারতে। ইংরাজি ভাষায় লিখতেন। সাবকন্টিনেন্টের মেবি একমাত্র ইহুদি কবি! তাঁর সম্প্রদায়ররে ‘বেনে ইজরাঈল’ বইলা ডাকত স্থানীয়রা। মানে বোম্বাই থেইকা মুম্বাই হওয়া পাবলিকরা, যেই শহর’রে কবি নিজের বইলা ভাবতেন। তাঁর কাব্যের যেই তালা, তা ভাঙতে, কম্যুনালি উনি যে মাইনোরিটি, সেই পরিচিতিটা সামনে রাখবো আমরা। হিন্দি, সংস্কৃত বাদ দিয়া কবির ইংরাজিতে সাহিত্যচর্চার অদম্য বাসনার হেতু মাথায় রাখতে হবে। মানে, ভাষা চয়েজ তো কবির সচেতন কাজ, ফলে পলিটিক্স ও কালচার নিয়া নানান বুঝাপড়া এমবেডেড হইয়া থাকে, থাকবে ওইসব ডিসিশনে। উনি কি লেইখা কার কাছে পৌছাইতে চান’, এর জওয়াব মিলাইতে গেলে আমাদের দরকারি কাজে আসতে পারে আরকি!

রামায়ণ, মহাভারত না ছুইয়াও যে প্রমিনেন্ট ভারতীয় কবি হওয়া যায় তার মেছাল হইয়া রইবেন ইনি! উনার কবিতার সহযোগিতায় লইয়া আমরা উনার দর্শন নিয়া আলাপ করবো। তবে তা করতে গেলে ব্যাপারটারে একটা শিরোনামে ঢুকানো তো টাফ, ফলে আমাদের কাছেও যেই জিনিসটা চোখা লাগতে পারছে, সেইটারে ধইরা নিয়াই আমরা নাম দিলাম একটা, ভারত দর্শন।

নিসিম এজিকিয়েল টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান কবি ছিলেন না। এই কথার শানে নুযুল বুঝতে হলে আপনারে দেখতে হবে উনার বেড়ে উঠার সময়কাল। দেশভাগ বা নিজদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় উনি টগবগা জোয়ান কবি! ইউরোপের হিউম্যানিজমে উনার অগাধ আস্থা। ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ ভারতে চেরাগ জ্বালার পশ্চিমা নবুয়তি সীল ফেইড হইয়া থাকে তেনার কলমে! যদিও প্রাথমিক পাঠে উনারে জনরার বিচারে ভারতীয় (দর্শনার্থে) বইলা ভ্রম হয়।

উনার ম্যাগনাম ওপাস কাব্যগ্রন্থ হইতেছে, দ্য এক্সেক্ট নেইম। ওই বইয়ের কবিতার বাইরে আমরা কানপড়া দিবো না। ইন্ডিয়ান ইংলিশ লিটারেচারের গুরুত্বে পূর্ণ কিছু কবিতারে বিশ্লেষণ কইরা তেনার ভাবের তালা ভাঙবার স্বার্থে চাবিকাঠির কোন খোঁজখবর পাওয়া যায় নাকি, দেখার কোশেশ করি।

‘নাইট অব দ্য স্করপিয়ন’ বা ‘বিচ্ছু রাইত’ নামের এক কবিতা দিয়া শুরু করা যাক। পইড়া আপনে আবেগে ভাইসা না গেলেও জোয়ার অন্তত টের পাইবেন এর! কবিতাটা গল্পের আদলে তৈয়ার করা। মানে, কবি অটোবায়োগ্রাফিকাল কলমে ফিকশনাল একটা কাহিনী বর্ণনা করতেছেন। এইটা পড়তে গিয়া বব ডিলানের ‘দ্য ব্যালাড অব ফ্রাঙ্কি লি এন্ড জুডাস প্রিস্ট’ গানটার কথা মনে পড়তে পারে, 🙂 নো অফেন্স। তো, কবিতাটায় ন্যারেটর বলতেছেন, এক ভয়াবহ বাদলা রাতের কথা। যেই রাতে তার আম্মাজান এক বিষাক্ত বিচ্ছুর কামড়ে প্রায় মূর্ছা গেছেন। তো, এই ঘঠনায় পাড়াপড়শি, তাহার শ্রদ্ধেয় পিতাজান, স্থানীয় বৈদ্য এবং শেষে মায়ের কমেন্টারি কি কি ছিল, কবি তার নির্মোহ বর্ণনা দিতেছেন। কবিতাটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আইরনি, মকারির লেয়ার অল্প মনোযোগেও চোখে পড়ার মতো। এই ব্যাপারটারে বাদ দিয়া গেলে কবিতাটা আমরা যেই এনালিসিস দেখাব তার বিপরীত কোন বুঝাপড়া তৈয়ার করবার পারে। তাই আমরা উনার ফিলোসফি, বেড়ে উঠা ও নানান কবিতায় তেনার অটোবায়োগ্রাফিকাল চালচলনের খোঁজখবর দেবার চেষ্টা করবো। এতে বুঝা যাবে, কেন বা কিভাবে তেনার পক্ষে একজন নারী বা মায়ের কাল্পনিক যন্ত্রণায় ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট, কমলা দাসের ভাষায় ‘রুথলেস ওয়াচার’, বা ডিটাচড অবজারভার হওয়া সম্ভব হইয়াছে। এবং এতে কবিতার সমাপ্তিতে উনার সিরিয়াস (আইরনি মুক্ত আরকি) বর্ণনা উনার কমেন্টারিরে মকারিতেই পর্যবসিত করলো।

কৃষক পরিবারের পড়শিরা আইসা বিচ্ছু কর্তৃক আহত (জীবন্মৃত) মা’রে সিম্পেথি জানায়া যাইতেছে। যে যার যার খোদার নাম জপে জপে বিচ্ছুর পরানে করুণা সৃষ্টি করবার কোশেশ করতেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইতেছে না। এভাবে নানান কায়দা কইরা সফল না হওয়ায় তেনারা নয়া এক জিনিস আবিষ্কার করলেন, পুরানা পাপ! ভিক্টিমের আগের জন্মের পুরানা পাপের জাগতিক প্রায়শ্চিত্ত হইতেছে আসলে, মত দিতেছেন তারা। পাশাপাশি বিচ্ছুটারও একটা জাগতিক বিহিত করবার জন্যে তারা অনেকগুলা লণ্ঠন আনাইলো, রাতের মেটাফোরের বিপরীতে আলোর মতো, তবুও কিছুতেই কিছু হইতেছে না। এবার কথকের বাপের পালা, তিনি একজন যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনষ্ক লোক। ফলে কৃষকগোষ্ঠীর লোকাল চিকিৎসায় তিনি বেজার। কিন্তু তেনার এনলাইটেন্ড দেমাগও তো পুঁছতেছে না বিচ্ছু! এজন্যে পাশে শ্লোক আওড়ানো বৈদ্যের কাজেও কোন গ্যাঞ্জাম লাগাইতেছেন না তিনি, মশকরা করতেছেন কবি। বারো ঘন্টা পর, মায়ের যন্ত্রণা কমে, আপনাআপনিই বিষ নাইমা যায়! আইরনি পাকাপোক্ত হইতে না হইতেই খুশি হইয়া উঠেন মা, এবং খোদাকে থ্যাংকস জানান, কারণ তার উসিলায় তিনি তার সন্তানদের তো মুক্তি দিছেন অন্তত! এই ছিলো গল্প, কবিতাটায়। নামটাতে খেয়াল করেন, রাত হলো অন্ধকারের ইমেজ, আবার বিচ্ছু হলো খারাপ, ইভিল। ওই খারাপ আন্ধারে কথকের মা ভোগান্তির শিকার হবে। মানে, মায়ের সাফারিং ওই অন্ধকারটারে হাত বুলাইতে বুলাইতে আলোকিত করবে যেন! শেষে ভারতীয় মা-সুলভ প্রার্থনা দিয়া কবিতা শেষ হলো, এনলাইটেন্ড প্রজেক্টে ইন্ডিয়ান সেক্যুলারজিমের ইন্টারভেনশন বলবেন নাকি এটারে অথবা বলা যাইতে পারে ইংলিশ কবির ইহুদী দেমাগ! Continue reading

আত্মদর্শন – এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদের (১৯২৯ – ২০২১) এই লেখা’টা ছাপা হইছে উনার “বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি” (পরিলেখ, ২০১৩) বইয়ের ১১০-১১৬ পেইজে। বইটার পিডিএফ কপি উইকিপিডিয়া’র লিংকে পাওয়া যায়। আমরা অই সোর্স থিকা লেখাটা নিছি।

এই লেখাটা অটোবায়োগ্রাফিক্যাল একটা জিনিস, কিন্তু বইটা তা না। বইয়ের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে এই লেখাটা উনি বইয়ে রাখছেন, যাতে রাইটার সম্পর্কে রিডার’রা একটা ধারণা পাইতে পারেন।

বইটা হইতেছে মেইনলি বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়া; অইটা বলতে গিয়া জাতি-উপজাতির ধারণা এবং অন্য সব আলাপ আসছে।    উনার এনালাইসিসগুলা ইন্টারেস্টিং। এটলিস্ট তিনটা জায়গা তো খেয়াল করতে পারবেনই।

এক, হিস্ট্রিক্যাল ফ্যাক্টগুলা; যেইটা হিল-ট্রাকস নিয়া পপুলার আলাপগুলাতে মিসিং। যেমন ধরেন, একটা সময়ে চাকমা রাজাদের দুইটা নাম থাকতো, এর মধ্যে একটা নামে ‘খাঁ’ থাকতো, কারণ মুসলিম শাসকের হেল্প নিয়া চাকমা রাজা আরাকানের রাজারে যুদ্ধে হারাইছিলেন, যার ফলে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল; পরে ব্রিটিশ পিরিয়ডে চাকমারা  লক্ষীপূজা শুরু করেন; আর বাংলাদেশ পিরিয়ডে খ্রিস্টান মিশনারি’রা অই এলাকাতে এক্টিভলি কাজ করতেছেন চাকমাদের বাইরে ছোট ছোট উপজাতিদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে কনভার্ট করতেছেন। এইটারে কন্সপিরেসি থিওরির জায়গা থিকা না দেইখা, ধর্ম যে একটা জরুরি জাতি-উপাদান সেইটারে মার্ক করাটা তো দরকার।

দুই হইতেছে, বৌদ্ধধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের একটা সম্ভাব্য কানেকশন থাকার কথা উনি অনুমান করছেন। ইসলামের যেইরকম অনেকগুলা তরিকা আছে, বৌদ্ধধর্মেরও অনেক প্যাটার্ন তৈরি হইছিল, যার একটা ধরণ সিরিয়া পর্যন্ত গেছিল, সেইখান থিকা এর ইমপ্যাক্ট আরব পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশে যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইছে তখন একটা ক্যাটাগরির বৌদ্ধরাই ইসলামে কনভার্ট হইছেন। যেমন হইছে, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে; মানে, এইগুলারে ‘ফ্যাক্ট’ বা  ‘সত্যি’ হিসাবে নেয়ার বাইরে কানেকশনগুলারে যাচাই করতে পারাটা দরকার আমাদের।

তিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে বিপ্লবের নামে সবসময় ‘জন-বিচ্ছন্ন’ একটা জিনিস, এই  ক্রিটিক উনার মতো আর কেউ মেবি এতো ভালোভাবে করতে পারেন নাই। তেভাগা আন্দোলনরে যে উনি ‘ইলা মিত্র ও তাঁর জামাইয়ের আন্দোলন’ বলছেন, সেইটা ‘ঠিক’ না হইলেও সমাজের বড় অংশের মানুশের লগে যে রিলেশন তৈরি করতে পারে নাই, সেইটা ‘সত্যি’ ঘটনাই অনেকটা; বা ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনরে যে ‘হিন্দু-জাগরণের’ ঘটনা বলছেন, সেইটা পুরাপুরি ‘সত্যি’ না হইলেও ‘ভুল’ কথাও না। মানে, কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলারে যে রোমান্টিসাইজ করার জায়গাগুলা আছে, সেইখানে উনি বেশ ব্রুটাল হইতে পারছেন। এইটা পজিটিভ, এক হিসাবে।

কিন্তু তারপরও দেখবেন, উনার যেই সাজেশন বা ডিসিশান সেইগুলারে নেয়া যায় না। যেমন, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থিকা মিলিটারি উইথড্র করা ঠিক না, সমতলরে বাঙালিদেরকে হিল ট্রাকসে জমি কেনার পারমিশন দিতে হবে, ‘বাঙালিরাই হইতেছে আদিবাসী’… এইরকম জায়গাগুলা। এইগুলা খালি ভুল-ই না বরং জুলুমের-অপ্রেশনের হাতিয়ারও হয়া উঠতে পারে।

আর এইগুলারে আসলে উনার ভুল হিসাবে দেখলেও ‘ভুল’ হবে, বরং উনি যেই পজিশনটাতে আছেন, সেইখান থিকা এইরকম সাজেশনগুলাই আসার কথা। উনার পলিটিক্যাল পজিশনটা কি? যদিও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ কথা উনি বলছেন, কিন্তু উনার পজিশনটারে বেটার বুঝা যাইতে পারে ‘বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদের’ জায়গা থিকা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’রে যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জায়গা থিকা দেখেন, তাইলে কিন্তু বাঙালি এবং মুসলমান, এই দুইটা আইডেন্টিটির উপরে আটকায়া থাকতে হয় না, তখন হিন্দু, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, এইরকম আলাদা করতে হয় না, বহুজাতির জায়গা থিকাই দেখতে পারা যাইতো। কিন্তু  আহমদ ছফা ও সলিমুল্লাহ খানদের মতো এবনে গোলাম সামাদও বাঙালি আইডেন্টিটির লগে মুসলিম আইডেন্টিটিরেই অ্যাড করতে চান শুধু। এইটা উনার কোর পজিশন।

সেকেন্ড জিনিস হইতেছে, উনি প্রাকটিক্যালির উপর নজর দিতে চাইলেও একটা সংজ্ঞা বা ডেফিনেশনের উপরেই ভরসা রাখতে চান, আর সেইটা খালি ‘কেতাবি’-ই না, অনেকটা ‘ব্যাকডেটেড’ ঘটনাও। যেমন ধরেন, যেইভাবে উনি বাংলা-ভাষী লোকজনরে ‘আদিবাসী’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়া উঠছেন, সেইখানে উনি যেই সংজ্ঞা’রে নিতেছেন, সেইটা পুরানা আমলের ল্যান্ডের সাথে জড়িত একটা জিনিস; কিন্তু এখন একাডেমিয়াতেও ‘আদিবাসী’ বলতে অই জনগোষ্ঠীরে বুঝানো হয় না, যারা ‘প্রাচীন বা আদিম মানুশ’, বরং এমন একটা জনগোষ্ঠী বা কালচার, যারা ‘বিলীন’ হয়া যাইতেছে, যাদেরকে প্রটেক্ট করা দরকার। এবনে গোলাম সামাদ বলতেছেন, এদেরকে তো বিলীন হইতেই হবে; এইরকমই তো হয়া আসছে, এইরকমই তো হবে!  তো, এইরকম আনফরচুনেট ডিসিশান নেয়ার জায়গাটাতেও উনি নিজেরে সন্দেহ করতে পারতেছেন না! এইটা মোটামুটি ভয়াবহ একটা জিনিস। বাঙালি হওয়ার নামে যেইরকম জুলুমরে আপনি সার্পোট করতে পারেন না, ইসলাম কায়েম করার নামে বা ‘প্রগতিশীল’ হওয়ার নামেও একইরকমের জুলুমরে সার্পোট করা যায় না। এইটা খালি আইডিওলজিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ঘটনা না, বরং যে কোন আইডিওলজিরেই জুলুমের হাতিয়ার হিসাবে ম্যান্ডেট না দিতে চাওয়ার ঘটনা। এই জায়গাটাতে এবনে গোলাম সামাদরে নেয়াটা ঠিক হবে না।

থার্ড বা ক্রুশিয়াল জায়গাটা হইতেছে, এই কারণে উনার আর্গুমেন্টগুলারে উনি আসলে মিলাইতেও পারেন নাই। বেশিরভাগ সময়ই বিচ্ছিন্ন এবং এমনকি ইরিলিভেন্টও মনে হইতে পারে যে, কেন বলতেছেন উনি এই কথা, এর রিলিভেন্সটা কি, এইরকম। মানে, এইটারে বেশি-বয়সের মানুশের কথা-বলার সমস্যা বা একসাইটিং ইনফরমেশনের বাইরেও রিলিভেন্স ক্রিয়েট না করতে পারার সমস্যা হিসাবেও নিতে পারাটা দরকার।…

তো, আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের এখনকার পপুলার ন্যারেটিভগুলার ব্যর্থতার জায়গা থিকা এবনে গোলাম সামাদের চিন্তাগুলা রিলিভেন্ট হয়া উঠার সম্ভাবনার মধ্যে আছে, যদি এখনো রিলিভেন্ট না হয়া উঠতে পারে; সেইখানে একটা বাছবিচারের মধ্যে দিয়াই আমাদেরকে যাইতে হবে, যেইটা উনারে নেয়া বা না-নেয়ার চাইতেও জরুরি একটা ঘটনা হিসাবে আমরা মার্ক করে রাখতে চাইতেছি।

গোলাম এবনে সামাদ মারা গেছেন গত ১৫ই অগাস্ট, ২০২১-এ। আসেন, উনার এই লেখাটা পড়ি।

এডিটর, বাছবিচার

……………

অনেক সময় কারো লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে লেখকের সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছা জাগে । বর্তমান পুস্তকটি পড়তে যেয়েও আমার সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছা জাগতে পারে। তাই আমি আমার নিজের সম্বন্ধে দু কথা বলছি। আজ থেকে প্রায় তিরাশি বছর আগে রাজশাহী শহরে জন্মেছিলাম আমি। আমি লেখাপড়া করেছি রাজশাহীতে স্কুলে ও কলেজে। রাজশাহী শহরের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ আমার মন মানসিকতা গঠন করেছে। রাজশাহী বড় শহর ছিল না। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখনও এ শহরে বাঘ আসত। এই শহরের কাছে খুব ঘনঘন না হলেও শিরোইল নামক এলাকায় ছিল যথেষ্ট বন। যেখানে ছিল চিতাবাঘ। এই শহরে ছিল প্রচুর সাপ । যাদের অনেকই ছিল বিষধর। শহরের কাছেই একটা এলাকায় অনেক অজগর সাপ ছিল । যারা খরগোশ গিলে খেত। অন্যদিকে রাজশাহী শহরে ছিল একটা প্রথম শ্রেণির কলেজ। আর ছিল বরেন্দ্র মিউজিয়াম। এখানে ছিল একটা শিক্ষার পরিবেশ। যা আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি বহু বিষয়ে ঘরে পড়াশোনা করে জানতে চেয়েছি। অনেক বিষয়ে ছিল আমার জানবার আগ্রহ। আমি আমার বাল্যকাল থেকেই জানতে আগ্রহি ছিলাম মানুষ সম্বন্ধে। ইচ্ছা ছিল নৃ-তত্ত্ব পড়বার। কিন্তু সেটার সুযোগ ঘটেনি। আমি ঢাকায় যেয়ে তেজগাঁ কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছিলাম কৃষিবিদ্যা । তারপর বিলাতে যাই উদ্ভিদের রোগ-ব্যারাম সম্পর্কে পড়াশোনা করতে । বিলাতের লিড্স শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলাম উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব। বিলাতে ছিলাম মাত্র এক বছর। তবে এই এক বছর আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →