বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ)
[কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।]
………….
চুম্বন
জোর বরাত’ -এর একটা বেদনাদায়ক ঘটনা আজও আমার কাছে রহস্যাবৃতই রয়ে গেল।
একটা সিনের টেক হচ্ছিল। রিহার্সাল অনুযায়ী যথারীতি সংলাপ বলে গেলাম। সিনের শেষে হঠাৎ ছবির হিরো ইংরাজী ফিল্মের ঢঙে আমায় জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলেন।…ঘটনার আকস্মিতায় হঠাৎ বিহ্বল হয়ে পড়লাম। সামলে উঠতে সময় লাগল। যখন প্রকৃতিস্থ হলাম, বিস্ময়, বেদনা, অপমান, অভিমান, নিজের অসহায় অবস্থার জন্য কষ্ট সব মিলিয়ে একটা নিষ্ফল কান্না যেন মাথা কুটতে লাগল। অল্প বয়স, তখন ভাব-প্রবণতাও প্রবল। তাছাড়া বাঙালী ঘরের মেয়ে, আবেগের এমন উগ্র প্রকাশে অভ্যস্ত নই। আর এ-কাজ ঘটল তাঁরই পরিচালনায় অভিভাবক ভেবে যাঁর .. ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। যাঁর দায়িত্বজ্ঞানের ওপর আমার এত শ্রদ্ধা, বিশ্বাস! যদি অভিনয়কে স্বাভাবিক করবার জন্য এই চুম্বনের প্রয়োজন, তবে আমাকে আগে থেকে বলে মনকে কেন প্রস্তুত করবার অবকাশ দিলেন না?
জ্যোতিষবাবুকেও আমি এ প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বললেন, “বললে তুমি রাজী হতে না। ইট ইজ অ্যান এপেরিমেন্ট, অত ‘টাচি হলে চলে? আর্টিস্টদের আরো স্পোর্টিং হতে হয়। সাধারণ মানুষ যা কল্পনায় আনতে পারে না, শিল্পীরা অনায়াসে তা পারে বলেই না তারা শিল্পী।” ইত্যাদি অনেক স্তোকবাক্য শোনালেন।
কিন্তু যাই বলুন আমার মনের ভার নামল না। নিজেকে বড় অপমানিত মনে হয়েছিল, আমি কি পরিচালকের হাতের ক্রীড়নক? নিজের মতামত, স্বাধীন সত্ত্বা কিছুই থাকবে না? ভেবেছি আর কেঁদেছি।
আজ ত নায়িকাদের সম্রাজ্ঞীর সম্মান। আমার এ সমস্যা এ-যুগে হাস্যকর। এখন ত নায়ক-নায়িকার একটিমাত্র ইচ্ছে বা সাজেশনই এ-লাইনে বেদবাক্য। এ আঘাত আজও ভুলিনি। তবে এর মধ্যেও ভাববার কথা আছে বৈকি।
এখন চলচ্চিত্রের অগ্রগতির স্বর্ণযুগ। তবুও বোম্বে ফিল্মে আলিঙ্গন ত আছেই অথবা চুম্বনের প্রায়-চালু অবস্থা। কিন্তু এই প্রগতিশীল যুগের বাংলা ছবিতে চুম্বনের অবতারণা করা যায় কিনা এ নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। কিন্তু আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে চলচ্চিত্রের শৈশবে, বাংলাদেশেরই এক পরিচালক চুম্বন-এর দৃশ্যের কথা ভেবেছিলেন এবং তাকে ছবিতে প্রয়োগ করার দুঃসাহসও হয়েছিল—এটা প্রোগ্রেসিভ মাইণ্ডের লক্ষণ নিশ্চয়। তাঁর সঙ্গে সমান তালে আমাদের মন পা ফেলতে না পারলেও, দুঃসাহসিক পরীক্ষার কৃতিত্ব তার প্রাপ্য নিশ্চয়ই। ভালমন্দর বিচার ত আপেক্ষিক।
যাই হোক, দৃশ্যে আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে নায়ককে দুহাতে ঠেলে দেওয়ার জন্য ছবিটি ঠিক পরিবেশনযোগ্য হয়নি এবং সেইজন্যই শেষ পর্যন্ত ঐ দৃশ্যটি এন জি হয়ে গিয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা আজও ভুলিনি। স্টুডিওতে যে বাবুর্চি বা বেয়ারার ওপর আমাদের খাওয়াবার ভার থাকত, আপাতদৃষ্টিতে খুব হাসিখুশি চেহারা। কি বদান্যতা। সবাইকে তাড়াতাড়ি খাওয়াবার সে কি ব্যগ্রতা! কিন্তু ব্যগ্রতার অন্তরালের কাহিনীটুকু আর কেউ জানত কিনা বলতে পারি না, তবে আমার অজানা ছিল না। ওর একটা অভ্যাস ছিল, একজনকে খাইয়ে পাঁচজনের হিসেব দেওয়া। উদ্বৃত্তাংশ যেত তারই ছাঁদায়। অন্য সবার ভাগ্যে কি জুটত জানি না। তবে লাঞ্চ বলতে আমার বরাদ্দ ছিল চায়ের প্লেটে দু’ স্লাইস পাউরুটি, দু-টুকরো আলু ও চার-টুকরো মাংস। ওপর থেকে পরিমাণের সত্যিই নির্দেশ দেওয়া ছিল কিনা বলতে পারি না। তবে আমার হাতে পৌছত ঐটুকু এবং তালিকায় থাকত আমার মত চারজনের উপযোগী ভোজ্যবস্তুর হিসেব।
নায়ক ও পরিচালক
তখনকার যুগের নায়িকাদের ত আজকের মত সাম্রাজ্ঞীর মর্যাদা ছিল না। অত্যন্ত আনন্দের কথা—আজকের যুগের নায়িকা সত্যিকারের শিল্পীর সম্মান পেয়ে থাকেন। তার ইচ্ছে অনিচ্ছেয় শুনেছি নায়ক নির্বাচন হয়ে থাকে। কিন্তু তখনকার দিনের নায়িকা নামেমাত্র নায়িকা, কার্যতঃ প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত নায়কদের পর্যন্ত আজ্ঞাবাহিকা ছাড়া কিছুই ছিলেন না। মাঝে মাঝে মনে হোত আমি কি কলের পুতুল। নিজস্ব কোন সত্তা নেই? শুধু অন্যের জুলুম সহ্য করেই জীবনটা কাটাতে হবে। প্রযোজক, পরিচালকদের কথা ছেড়েই দিলাম। তারা তো সবারই প্রভু। কিন্তু অল্প বয়স ও অনভিজ্ঞতার কত সুযোগই না সবাই নিয়েছে। নিরুপায় অবস্থার জন্য গ্লানিভরা মুহূর্তের সে অসহ্য যন্ত্রণা কি ভোলার? Continue reading