Main menu

না-বলা জিনিসের বয়ান: আল-মাহমুদের অটোবায়োগ্রাফি নিয়া আলাপ

এই লেখাটা ছাপা হইছিল “কবি” নামে বইয়ে, ২০২০ সালে। বইটা কিনতে পারবেন রকমারি‘তে বা ফেসবুক পেইজে (নন-ফিকশন | Facebook) 

……………………………………..
বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ। আল মাহমুদ। একুশে বাংলা প্রকাশন। বইমেলা, ২০০৭। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। ১৯২ পেইজ। ২০০ টাকা।
……………………………………..

আল মাহমুদ-এর বইটা পড়ার পর থিকাই ভাবতেছিলাম যে, এইটা নিয়া লিখবো। কিন্তু লিখার কথাগুলি বলতেছিলাম পরিচিত মানুষজনকে তাই আর লিখা হইতেছিল না। যার ঠিক উল্টা কাজটা আল মাহমুদ করছেন। উনি বলার কথাগুলিরেই লিখিত করছেন। খালি রাজনৈতিক ও সামাজিক না, সাহিত্যেরও নিজস্ব ঘটনা ও ইতিহাস আছে, এইগুলি যে কীভাবে সম্ভব হইতে পারে, তার একটা ধারণা হয়তো এই বইটা পড়লে টের পাওয়া যাইতে পারে।

পারসোনাল দিক থিকা বিচার করলে মনে হইতে পারে যে, একটা ‘পাপ’ না করতে পারার সাফল্যই উনারে বাঁচাইয়া দিছে। বইটাতে উনি নিজের বিয়া’র কয়দিন পরেই আরেক মেয়ের প্রতি তাঁর ‌’লোভ’-এর কথা বলছেন, এই ধরনের কনফেশন করতে গেলে এক তো হইলো বুকের পাটা লাগে; কারণ বিয়া করা মানেই তো ‘কাম’-এর শেষ না। যেইরকম আমরা ভাবতে পারি যে, ফ্রি সেক্সের অভাবেই সোসাইটিতে রেইপের ঘটনা ঘটতেছে। অথচ ঘটনাটা কোনভাবেই এইরকম না। সিমন দ্য বেভোয়াও কইতেছিলেন, সো-কল্ড “নারী স্বাধীনতার”র পরে ফ্রান্সে হ্যারাসমেন্টের ঘটনা আরো বাইড়া গেছে যে, তুমি তো ফ্রি, তুমি কেন আমার সাথে শুইবা না! এইরকম। মানে, রেইপের ঘটনারে পাওয়ার রিলেশনের জায়গা থিকা না দেইখা ‘সেক্সের অভাব’ – এই জায়গা থিকা দেখতে গেলে মুশকিলই হওয়ার কথা। ডিজায়ার, মোরালিটি আর লাভ – এইগুলা যে একই জিনিস না, এইটা একটা ব্যাপার। আরেকটা হইলো, বলার ইটসেলফ একটা প্লেজার আছে। কনফেশনের একটা আনন্দ আছে। শেষমেশ আল্লা তো উনারে বারবার বাঁচায়াই দিছে! এইটা ধরলেও উনার বলতে পারাটা কিছু জিনিস খোলাসা করে যৌনতা বিষয়ে। কট্টুক বলা যায় আর কট্টুক বলা যায় না – এই বেরিয়ারগুলি। শেষমেশ, বলতে পারাটা একটা ঘটনাই। বিয়া’র পরপরই অন্য মেয়ের প্রতি ‘লোভ’-এর লাইগা তিনি যে চড় খাইছেন, সেইটা যে বলতে পারছেন, এইরকম একটা ট্রান্সপারেন্সি’র বোধই হয়তো সোনালী কাবিন-এর জন্ম দিছে। বা কবিতার এই ট্রান্সপারেন্সিটারে উনি কোন না কোনভাবে লাইফেও নিতে পারছেন। 

বলতেছিলাম সাহিত্যের ঘটনা ও ইতিহাস-এর কথা। আসলে এইটা তো উনার নিজের লাইফের ঘটনা, এইখানে ঘটনাগুলি তিনিই সিলেক্ট করছেন এবং বর্ণনা দিছেন, একইসাথে তিনি নিজেও এই ঘটনা-প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন, তাই এই ঘটনা ও বর্ণনাগুলির নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার কোনো কারণই নাই, তাঁর অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি-ই এর মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ যেইটা ন্যারেশন, সে-ই কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার ডিরেকশনটারে ঠিক কইরা দিতেছে। যেমন ধরেন, উনি ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কয়েকদিন আগে শামসুর রাহমানের সাথে দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলার) সামনে এবং ২৫ শে মার্চের পরে ইত্তেফাকের সামনে শহীদ কাদরী’র সাথে দেখা হওয়ার ঘটনার কথা, যেইখানে তিনি নিজেই উপস্থিত, সেই বর্ণনা দুইটা খেয়াল কইরা পইড়া দেখেন:

“কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রগতিবাদী কবিরা প্রকৃতপক্ষে শেখ সাহেবের পক্ষাবলম্বন করেননি।…এ সময়কার একটি ঘটনা আমি উল্লেখ করতে চাই। অন্যত্রও করেছি। সেটা হলো, রিকশায় আমি তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। গেটে শামসুর রাহমানের সাথে দেখা হলে আমি রিকশা থেকে নেমে এলাম। শামসুর রাহমান বেশ উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলতে লাগলেন, আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি। শেখ মুজিবকে সমর্থন করি। তারপর তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন তা এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই না।অথচ আজকালের প্রেক্ষাপট কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।” (প. ৯১)

“এখানে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি, আমি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ইত্তেফাকের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য টিকাটুলি গিয়েছিলাম। মতিঝিলের যেখানে শেষ সেখানে একটি ওষুধের দোকানে জরুরি ওষুধ কিনে বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমাকে দেখে তিনি উচ্চহাস্য করেছিলেন। সে হাসির অর্থ আমার কাছে তখনো যেমন দুর্বোধ্য ছিল আজও দুর্বোধ্য।” (প. ৯৫)


এইটা আল মাহমুদেরই ন্যারেশন। কিন্তু এই ন্যারেশন এটলিস্ট ক্লিয়ার করতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটা যখন ঘটতেছে তখনো শামসুর রাহমান আর শহীদ কাদরী উনাদের এলিটিস্ট সাহিত্যিক-বোধের জায়গা থিকা পুরাপুরি সাবস্ক্রাইব করতে পারেন নাই কমন পিপলের বাংলাদেশ ধারণাটাতে। এতোটা বিচ্ছিন্নতা হয়তো আশ্চর্য লাগতে পারে এখন আমাদের কাছে, কিন্তু মিথ্যা হওয়াটা মনেহয় পসিবল না। কারণ এখনো পর্যন্ত একসেপশনাল বা আলাদা হইতে পারাটাই আর্ট বা সাহিত্য আমাদের কাছে, কমন বা সাধারণ হইতে পারাটা না। তো, পাবলিকের লগে একমত হইতে পারাটা এখনো যেমন কঠিন, তখনো একইরকমই হওয়ার কথা। 

তবে শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী একই ঘটনার কথা বললে হয়তো একইভাবে বলতেন না। মানুশের চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কাম একটা জায়গাতে আটকায়াও থাকে না সবসময়। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হইতেছে, শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী এই ঘটনাগুলিরে কখনোই লিখিত করেন নাই এবং সম্ভবত এইগুলারে সাহিত্যের বাইরের ব্যাপার বলেই মনে করতেন বা করেন। আর আল মাহমুদ তারে বলবার মতো মনে করছেন এবং বলছেন। এই বলতে পারটা যে কতোটা জরুরী তা তিনি তাঁর অস্তিত্ব দিয়াই জানছেন:

“আমাদের অনেক অসাধারণ কাব্য প্রতিভা বক্তৃতা দিতে সারা জীবনেও সম্মত হননি। হয়তো এই ভেবে সম্মত হননি যে, এতে কবির ধ্যান ও জ্ঞানের নীরবতা অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়। আমি এটা এক সময় নিজেও ভাবতাম। কিন্তু আমি যদি বলতে না জানতাম তাহলে আমাকে শেয়াল ও শকুনের খাদ্য হতে হতো।” (প. ৮২)

Continue reading

ফিকশন: একদিন তোর হইবো রে মরণ – ৫

কিস্তি ১।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।।

 

৭.০ থ্রি মার্স্কেটিয়ার

ইহুদিরা তখন মুসলমানদের মারতেছিলো প্যালেস্টাইনে, গাজা উপত্যকায়। আর এর লাইগা নিউইয়র্কে মিছিল করতেছিলো কয়েক হাজার মানুষ – কালা, ধলা, মিশ্রবর্ণের এশীয়, আরো অনেকে; সবাই আমরা মানুষ; মানুষ মারার এগেনেইস্টে আছি। কিশোর, মুসা আর রবিনও সেইখানে, মানুষদের সাথে। কিন্তু ওরা মুসলমানও, এই কারণে কিছুটা পাজলড। বাঙালি আইডেন্টিটি’র চাইতে মুসলমান তো মোর গ্লোবাল। কিন্তু খোকাভাই আবার কি যে বোঝায় ওরা ক্লিয়ার হইতে পারে না। উনি শাহবাগের পক্ষে, যদিও হেফাজতরে গালিগালাজ করেন না, কিন্তু প্রি-মর্ডান একটা ফোর্স বইলা এক্সপ্লেইন করেন আর বলেন প্রি-মর্ডান বইলা এইটারে মর্ডানিটি’র বিপক্ষে দাঁড়া করাইও না; তাইলে সেইটা মর্ডানিটিরই একটা তর্ক হইবো। কিশোরও পুরাটা বুঝতে পারে না, কনফিউজড থাকে; এইজন্য খোকাভাই’রে হেল্প করতে চায় তারা। কারণ আর যা-ই হোক, মানুষ হিসাবে উনি ভালো। আর যেহেতু উনি ভালো মানুষ উনি তো কোন খারাপ কাজ করতে পারেন না। ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটগুলা হ্যাক করতে গিয়া খোকা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হইছিলো। আর খোকা ভাই-ই দেখাইলো যে, বাঁশের কেল্লার একটা বড় ফান্ড আসে বিজেপি’র কাছ থিকা, মিডলইস্ট থিকাও আসে। সব শালা ডাবল এজেন্ট!

এই মিছিলের শেষ কইরাই ওদেরকে গ্যারাজে ঢুকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হোক আর ইসলামের পক্ষেরই হোক সবগুলা সাইট আজকের রাতের জন্য ডাউন করতে হবে। তিনজনরেই থাকতে হবে। মুসা তো নাচতে নাচতে রাজি। রবিন একটু কাচুঁমাচু করতেছিলো। পরে জানা গেলো, নতুন স্কাইপ-ফ্রেন্ড হইছে ওর, ওই মাইয়ার আওয়াজ না শুনলে নাকি ঘুমাইতে পারে না; মানে, সারারাত ঘুমায়ই না আর কি। ওরে আলাদা রুম দেয়ার কনফার্মশেন দেয়ার পরেই রাজি হইলো আর কন্ডিশন হইলো মুসারে বলা যাবে না। মুসার কোন গার্লফ্রেন্ড নাই। বেচারা কষ্টেই আছে। এই ইনফর্মেশন জানলে মুসা কথা বলার লাইগা পীড়াপীড়ি করবে আর রবিন না করতে পারবে না; আর ও তো মুসার মতো এগ্রিসিভ না; সে খালি সারাজীবন আপুটার সাথে কথা-ই বলতে চায়। অদের এইসব ফিলিংস কিশোরের কাছে অনেক দূরের জিনিস মনেহয়। মনেহয় বড় হয়া সে হয়তো মাসুদ রানা-ই হবে। হয়তো সে মাসুদ রানা’র মতো চুম্বক হবে না; টানবেও না। টানাটানি ভাল্লাগে না। একলা থাকতে চায় সে। খোকাভাইয়ের মতো। লোনলি; বাট নট  লুজার।

#

লাস্ট মোমেন্টে এমন একটা প্যাঁচে পড়লো যে, কেউই ছুটাইতে পারতেছে না। তখন কিশোরের মনে পড়লো জিনা’র কথা। এই জিনিস জিনা ছাড়া আর কেউ পারবো না।

জিনার মা বাংলাদেশ থিকা আসছিলো জিনা’র বাপের সাথে তার ফোনে বিয়া হইছিলো। কিন্তু ৩ বছরের মধ্যেই উনাদের ডির্ভোস হয়া যায়। জিনার মা খুব বিপদে পড়ছিলো, তার জামাইয়ের ফ্যামিলি তারে দেখে নাই।  তখন তার সপুারস্টোরের ম্যানেজার জন তারে বিয়া করে। জন ছিল নিগ্রো…

কিশোর ওরে দলে নিতে চায় না। কিন্তু কিছু জিনিস আছে যেইটা জিনাই জানে। আর জিনাও জানে যে শে জানে। এই কারণে ওর কোন টেনশন নাই। শে জানে, শি ইজ পার্ট অফ দ্য গেইম।

কিশোর মুসারে কইলো জিনারে ফোন দেয়ার লাইগা। মুসা অবাক হয়া তাকাইলো। ‘ফোন ধরবো আমার?’ কিশোর রাগী চোখে তাকাইলো মুসার দিকে। মুসা একবারের জায়াগায় দুইবার ট্রাই করলো। প্রায় এক মিনিট ধইরা রিঙ্গার বাজলো, কিন্তু কলটা কেউ রিসিভ করলো না। মুসা তাকাইলো কিশোরের দিকে। কিশোর বুঝলো আর কোন উপায় নাই। নিজের মোবাইল হাতে নিয়া জিনারে ফোন দিলো। এইটা যে পারসোনাল কোন জিনিস না সেই সাহস দেখানোর লাইগা স্পিকারে রাখলো ফোনটা।

একটা রিং বাজতে না বাজতেই জিনা আদুরে গলায় বইলা উঠলো, ‘হেলাউ! বস কেমন আছেন?’

কিশোর কোন ইন্ট্রো না দিয়াই কমান্ড করলো। ‘জিনা, আপনারে গ্যারাজে আসতে হবে।’

জিনা জাস্ট এই ডাকটার লাইগাই ওয়েট করতেছিলো, কিন্তু প্যাঁচাইতে লাগলো কিশোররে। ‘এখনই বস? এতো রাতে! একলাই আসবো? কেন বস?’

‘আই নিড ইউ।’ বলার পরেই বুঝলো কিশোর, কি ধরাটা সে খাইছে।

‘এই কথাটা বলতে এতোদিন লাগলো আপনার! সন্ধ্যায় বললেই পারতেন। এতো রাতে মেকাপ কেমনে নিবো?’ জিনা সমানে হাসতে থাকে।

‘দশ মিনিটের মধ্যে আসেন আপনি। আমি ঘড়ি দেখতেছি।’ বইলা ফোনটা কাইটা দেয় কিশোর। মেজাজটাই পুরা খ্রাপ হয়া গেলো।

এতোক্ষণ হাসি ধইরা রাখছিল মুসা। ফোনটা রাখার পরে গড়াগড়ি দিয়া হাসতে লাগলো। রবিন পর্যন্ত পাশের রুম থিকা বইলা উঠলো, ‘থাম ব্যাটা!’ রবিন তো আর শুনে নাই কথাগুলা। সকালে রসাইয়া রসাইয়া বলতে হবে রবিনরে। মুসা ভাবলো।

নয় মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় জিনা আইসা পৌঁছাইলো। খুবই সিরিয়াস শে। তাঁর ল্যাপটপে বইসা কাজগুলি বুইঝা নিলো কিশোরের কাছ থিকা। চেহারা দেইখা বুঝার উপায় নাই এই মাইয়া কি ফাইজলামিটা করছে।

সবকিছু শেষ হওয়ার পরে খোকা ভাই-ই মেসেজ পাঠাইলো ভাইবারে, কিশোররে – ‘ওয়েল ডান, বয়েস!’ কিশোর জিনার দিকে তাকায়া মনে মনে কইলো, ‘অ্যান্ড দ্য গার্ল…’। মুখ হা কইরা জিনা ঘুমাইতেছিল তখন। লালা পড়তেছিল ঠোঁটের কিনার দিয়া। নাক ডাকতেছিল। ঘর্‌ঘর্‌রররর…। কিশোরেরও ঘুম পাইলো তখন।

Continue reading

“দ্যা নর্থ এন্ড” উপন্যাসের অংশ

[ দ্যা নর্থ এন্ড উপন্যাস’টা ছাপা হইছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বইটা আবার নতুন পাবলিশারের মাধ্যমে বাজারে আসতেছে। বইটাতে তিনটা পার্ট আছে। এই অংশটা সেকেন্ড পার্টের সেকেন্ড চ্যাপ্টার।]

*
শাওন আর আমি শেষ যেবার বাসে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গেলাম, আমাদের ধারণাই ছিল না যে ফেরার পথে আমাদের নয় ঘণ্টা লেগে যাবে। অফিসের কাজে আমার প্রায়ই ঢাকা যাওয়া পড়তো – মাসে-দুইমাসে একবার তো হবেই। ডক্টরস্ কনফারেন্স, আত্মীয়স্বজনের বিয়ে-শ্রাদ্ধ-সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ঢাকায় পোস্টিং-এর দেনদরবার করতে শাওনেরও যাওয়া পড়তো বছরে কয়েকবার। এমন নয় যে আমাদের ঢাকা যাওয়ার অভ্যাস ছিল না – কিন্তু স্থলপথের যাত্রা যে দিনকে-দিন সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠছিল, সেটা অনেক বুঝেও হয়তো বুঝতে আমাদের কিছুটা বাকি ছিল। শাওন আমাকে বয়েলিং ফ্রগের উদাহরণ দিলো – সেই চিরাচরিত রিডার্স ডাইজেস্ট-মার্কা উদাহরণ – কী? একটা ব্যাঙকে পাত্রভর্তি পানিতে চুবিয়ে সিদ্ধ করতে থাকলে সে মানিয়ে নিতে থাকে। অল্প অল্প তাপমাত্রা বাড়াও, ব্যাঙটাও অল্প অল্প সয়ে নেবে। এইভাবে ধীরে স্ফুটনাঙ্ক পার হয়ে যাবে, আর ব্যাঙটাও জ্যান্ত সিদ্ধ হয়ে যাবে। আমার বন্ধুরা শাওনের এইসব বক্তব্যকে আড়ালে বলতো ‘চালাকচোদা কমেন্ট’। সেইদিন বাসে বসে আমার মনে হয়েছিল শাওনকে জিজ্ঞেস করি এত ফ্যান্সি উদাহরণ আমাদের কেন প্রয়োজন। মনে হচ্ছিল বলি, ও, মানে ঐ উটপাখির গল্পটার মতো? উটপাখিটা যে বালিতে মুখ গুঁজে থাকে – ঐরকম? উটপাখির সুবিদিত একখানা প্ল্যাটিচিউড থাকতে কেন আমাদের সিদ্ধ ব্যাঙের গল্প দরকার? মনে আছে সেইদিন আমার মাসিক চলছিল – সম্ভবত প্রথম বা দ্বিতীয় দিন। মাসিকের সময় আমি সমস্ত পৃথিবীর ভার শরীরে বহন করতে থাকি; অল্পেই হাসি, কাঁদি, রাগি এবং বিচার করতে বসি। নিজের এই অভ্যাসের প্যাটার্ন ভাল জানা থাকায় আমি সাধারণত মাসিকের সময়টায় নিজের মনের সব ডাকে সাড়া দেই না।

সেইদিন বাসে বসে থাকতে থাকতে হাইস্কুলের এক সহপাঠিনীর একটা ফেসবুক পোস্ট শাওনকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। সেই পোস্টের সারমর্ম ছিল এইঃ ইংরেজি ভাষা এক অভূতপূর্ব কাজ করেছে। তেইশ রকমের আবেগ – যেগুলি মানবসমাজের বেশিরভাগ সদস্যই অনুভবে সক্ষম – সেই আবেগগুলির নামকরণ করেছে। এতদিন এই আবেগগুলির কোনো নাম ছিল না – এক শব্দে প্রকাশ করার মতো কোনো উপায় ছিল না। অর্থাৎ অনুভূতিগুলিই শুধু ছিল, সেইগুলি প্রকাশের ভাষা ছিল না। বিষয়টা আমার কাছে চমৎকার লেগেছিল। আমরা যে একটু একটু অবোলা প্রাণীই, কিন্তু প্রতিদিনই ভাষা আমাদেরকে বিবর্তনের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে – এটাও মনে হয় একটু বিস্ময় জাগিয়েছিল। শাওন মশকরার সুরে বলেছিল, তেইশটা? আচ্ছা, প্লুভিওফিলিয়া ছাড়া বাকিগুলা বলো। আমি বলেছিলাম, এই লিস্টে প্লুভিওফিলিয়া নাই। ঐটা ২০১৭তেই শেষ। তাইলে কী আছে? (আছে পিরিওডের ব্যাদনা। শাওনকে হাসতে হাসতে মনে করিয়ে দেওয়া গেল যে তখন মাসের সেই সময় যখন সাবধানে কথা বলতে হয়)।

আমি ঐ তেইশটা ইমোশনের নাম, তাদের সংজ্ঞাসহ শাওনকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। শাওন মন দিয়ে শুনেছিল। সেই ইমোশনগুলি আমরা নিজেরাও নিজেদের মতো করে অনুভব করে এসেছি। এর মধ্যে কয়েকটা অবশেষে ভাষায় ধরতে পারবো জেনে খুব ভাল লাগছিল। শাওন বলল ওরও ভাল লাগছিল নামগুলি পেয়ে। সেই ইমোশনগুলির মধ্যে থেকে আমাদের যার-যার পছন্দের একটা মৌখিক লিস্ট করেছিলাম আমরা দুইজনে মিলে।

আমার লিস্ট শাওনের লিস্ট
১) Sonder: পথে চলতে গিয়ে হঠাৎ এই অনুভূতি হওয়া যে আমার মতোই বাকি পথচারীদের জীবনেও তীব্র, জটিল, উজ্জ্বল, বাঙ্ময় সব অভিজ্ঞতা আছে Vellichor: পুরানো বইয়ের দোকানে গেলে যে নস্টালজিয়া জন্মে
২) Opia: কারো চোখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার সময় যখন অপরপক্ষের দৃষ্টিকে একইসাথে আঘাতে উদ্যত ও আঘাতের সামনে নিরুপায় বলে মনে হয় Kenopsia: সচরাচর লোকের ভিড় থাকে, এমন কোনো স্থানকে নিস্তব্ধ, পরিত্যক্ত দেখলে যে অনুভূতি জন্মে
৩) Ellipsism: ইতিহাসের পথ আসলে শেষমেশ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কখনোই জানতে না-পারার দুঃখবোধ Vemodalen: ইতোপূর্বে অসংখ্য লোকে অসংখ্যবার তুলেছে এমন কোনো সুন্দর জিনিসের ফোটো আরেকবার তোলার পর যে ব্যর্থতাবোধ হয়
৪) Exulansis: লোকে বোঝে না, এই কারণে কোনো একটা অভিজ্ঞতা আর কখনোই শেয়ার করতে না-চাওয়া
৫) Occhiolism: বৃহত্তর বিচারে আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গী কতটা ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ, সেই বোধ

 

বাসে বসে থাকতে থাকতে সেই তেইশ রকমের ইমোশনের লিস্ট আমি ডেনিশকেও পাঠিয়েছিলাম। মেসেজে লিখেছিলাম কোন্‌ ইমোশনগুলির সাথে আমি পূর্বপরিচয়ের নৈকট্য বোধ করি। উত্তরে ও শুধু লিখেছিল ‘Very interesting indeed’.

আমি আরো জানতে চেয়েছিলাম ও ঘুম থেকে উঠেছে কিনা, খেয়েছে কিনা, বাকি দিন কী করবে – যদিও আসলে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে ওদের পরিবার যে দুর্যোগের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, সেইখানে সমবেদনা জানানোর মতো ভাষা আমার জানা নাই। এই তেইশ রকম ইমোশনের মধ্যে এই বিশেষ ইমোশনটা – এই সমবেদনা না-জানাতে পারার বিষয়টা – এখনো জায়গা করে নিতে পারে নাই কেন, এই ভেবে খারাপ লাগলো। এমনও মনে হলো যে ডেনিশের দাদী রোজম্যারি অন্য অনেকের চেয়ে অনেক বেশি রকমের, অনেক বেশি বিচিত্র বর্ণের আবেগের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারতেন দেখেই হয়তো জীবনসায়াহ্নে এসে অল্প কয়েকটা দিন বেঁচে থাকার আঘাতটুকুও নিতে সক্ষম হলেন না। বিরানব্বই বছর বয়সে আমি, বা আমরা, কবে পৌঁছাব? সেইখানে আমাদের জন্য কী লেখা থাকবে? সকল দুর্যোগের সামনে অম্লান, অবিনশ্বর, অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিলীভূত হৃদয়? নাকি প্রস্তরাকীর্ণ নদীখাতে থেঁতলে যাওয়া মাথা?

ডেনিশ আমাকে জানিয়েছিল ওদের দুই ভাইবোনের মধ্যে তর্কাতর্কি একটা চরম অপ্রীতিকর বিবাদের দিকে গড়াচ্ছে। রোজম্যারির ময়নাতদন্ত থেকে আত্মহত্যার প্রতিবেদন আসার পর থেকে ওর বোন আভা মিডিয়ায় কমপক্ষে বিশটা ইন্টারভিউ দিয়েছে – ইউকে’র লাইভ টিভির টকশো’তে গোটাতিনেক চ্যারিটির হোমরাচোমরা মুখপাত্রকে ধরাশায়ী করেছে, এবং কোপেনহেগেনের ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের চাকরি থেকে খণ্ডকালীন ছুটি নিয়ে আপাতত লন্ডনে আইনি সহায়তা, বিশিষ্টজনদের সমর্থন ও পাবলিক সহানুভূতি আদায়ের পিছনে সময় ব্যয় করছে। ডেনিশ ওর মা এবং লন্ডনের আত্মীয়দেরকে জানিয়েছে এই বিষয়ে ওকে যেন কোনোভাবে না-জড়ানো হয়। আভা লন্ডন থেকে ডেনিশকে ফোন করে প্রচণ্ড মারমুখী গলায় বলেছে যে ও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্যের জন্য লড়বে – এবং এই লড়াইয়ে ভাইয়ের নীতিগত কিম্বা আর্থিক সমর্থন না-থাকলেও ওর কিছু যায়-আসে না।

“You know, I too would go out of my way to look for the truth, even though I’m less certain that we will ever have all of it. It is not skepticism about the very idea of truth that exists and guides us; it is realism about how hard the truth is to find.” সত্যের খোঁজে বহুদূর যেতে ডেনিশেরও আপত্তি নাই, কিন্তু সত্য কখনো তার সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে সত্যি সত্যি ওর কাছে আসবে কিনা, সেই বিষয়ে ও সন্দিহান। কিন্তু তাই বলে ও সত্যে অবিশ্বাসী না, সংশয়ীও না। সংশয়বাদিতা আর বাস্তববাদিতা তো দুইটা আলাদা জিনিস, তাই না?
Continue reading

রওশন আরা মুক্তা’র কবিতা

………………..

ঘটমান । অবশেষে । পরীক্ষা । পীরিত । সাধ ।  পুরাতন জেলখানা রোড । প্রেমপত্র । 

………………..


ঘটমান

সকাল হইতেছে; আস্তে আস্তে সূর্যের আলো আইসা
ঢুইকা পড়লো আমারও সন্ধ্যালাগা ঘরে
অভ্যাস থেকে বাইর হইতে গিয়া তুমি
চেষ্টা করতে থাকলা মনে না করতে আমারে।
পানি খাবা বইলা জগ উল্টায়া ফেললা
গা যেন না ভিজে তাই, আকাশ কাইটা দরজা বানাই
ঐপাশে গিয়া শিউর করি ডোরটা লক হইল কি না
শিউর করতে চাই, যেন জানালাগুলার দাগ মুইছা দিতে পারি
ইরেজার দিয়া; তবে মুছতে পারতেছি না চোখের পানির রেখা
একটু পরেই তুমি বাইরে যাবা,
পার্কে বইসা অন্যের খাওয়া চকলেট খাবা।
একটু পরেই ঘুমাব আমি পানির নিচে পাতালে
ভাসতেছি আমি, মহানন্দে কাটতেছি সাঁতার তোমার গতকালে

 

অবশেষে

মালনী রোডে মিস্তরি খুঁজতে গেছিলাম
দেশে কেন এখন মিস্তরির এত সংকট!
একজনরেও পাইলাম না, তাই
আমি নিজেই হাতুড়ি লোহা নিয়া কাঠগুলাকে পিটাইতে লাগলাম
হাতুড়ির শব্দে শব্দে দোলাইতে লাগলাম মাথা
নাকমুখ লাল হয়ে গেল, ঘামায়া গেলাম প্রচুর
লোহার সাথে লোহার ঘষায় ছিটকে উঠলো স্ফুলিঙ্গ
আর কাঠে আগুন লাইগা যাবে কিনা ভাবতে ভাবতে,
ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি বড় হইয়া একদিন কাঠমিস্তরিই হবো
ও আমি কাঠ পেটাবো
শক্ত শক্ত হাতে
শক্ত শক্ত ভাবে
কাঠগুলাকে জোড়া লাগায়া দেবো

 

পরীক্ষা

আপনার আপনার আত্মার ভিতরে
লিখে দিয়া মস্ত মস্ত চিঠি
আমরা সই করলাম তার নিচে নিচে
তোমারেও দিতে হবে হে এই বিচ্ছেদী পরীক্ষা
মন চাইলে আমিও নিজেরে নিয়া খাড়া করাইতে পারি ফসলের মাঠে
হাত দুইটা উঠায়া কাকতাড়ুয়ার সারেন্ডার ভঙ্গি করে দাঁড়াইতে পারি
তবুও আমায় ভয় পাইতে থাকবে অবলা কিছু পাখি, কাক টাক চিল
আত্মার ভিতরে আমি আবার তালাক দিব আপনাকে
একবার দুইবার বারবার
তালাক দিতে থাকব
আপনার চোখের ভিতরের শূন্যতা
ভেদ করে আমি দেখব
আপনার মগজের ভিতরের সংখ্যার ভিতরে দেখব
আপনার হৃদয়ের রক্তে হাত লাল করে দিয়ে দেখব
আপনার বুক থেকে পেট, ছুরি চাকু দিয়া কেটে
সব বের করে নিয়ে জলে ধুয়ে আবার সেলাই করব
আবার আমি আপনাকে তালাক দিয়া ফেলব

Continue reading

আউলা

**ইশকুল ইশকুল খেলা বন্ধ যাদু।
আমাদের নাম লিখেছে রোদ্দুর, যদ্দুর পেরেছে —
আমরা উড়বো ঘুড়ি-সঙ্গে,
ঘুড়ি পতাকার অনেক উপরে… **

জীবনের একটা সময়, অনেক কিছু বদলানোর একটা বাসনা থাকে না? যেগুলো আমারও ছিলো, এখনও আছে। আবার এইটাও ঠিক, একটা সময়ে এসে বোঝা যায় যে, জীবদ্দশায় কিছুই আর বদলাবে না। মনের মধ্যে তখন নানান রকম চিন্তা-ভাবনা ঘুরপাক খায়। বাঙালি মুসলমান পরিবারে জন্মাইলে, শুরুতেই যেটা থাকে তা হলো, ধর্মীয় কিছু আইন মানতে হয়। আমার পরিবার থেকে অতটা চাপ ছিলো না। কিংবা সেইগুলারে আমার চাপ মনে হয় নাই। একটা সময় থাকে, তখন নিজের মধ্যে প্রশ্নও তৈরি হয় না যে, এগুলা কেন করতেছি। কিন্তু পরে যখন প্রশ্ন তৈরি হয়ে যায়, তখন এই চাপাইয়া দেওয়াটা আর ভাল্লাগে না। আর ভালো না-লাগা থেকেই বাইর হয়ে আসা। কিন্তু এই বাইর হওয়াটা আসলে ঘর থেকে বাইর হয়ে আসা না; সব নিয়ম থেকে বাইর হয়ে আসা। আর কোনো নিয়মের মধ্যে না ফেরা।

বাপের সঙ্গে কিছুটা দার্শনিক দ্বন্দ্ব থাকলেও পরিবারের আর কারও সাথে তেমন দ্বন্দ্ব হয় নাই আমার। কারণ ওই সময়ে ভেতরে লজিক—যুক্তি তৈরি হয়ে গেছে। ছোটবেলায় খুলনার দৌলতপুর রেলিগেটে আমরা যেভাবে এত অল্প বয়সে, এত সিনিয়রদের সাথে মিশছি, বড়দের সাথে মিশছি—এই মেশামিশির ভিতর দিয়াই অনেক যুক্তি তখন থেকেই তৈরি হইয়া যাচ্ছিলো। সেই যুক্তিগুলাই আসলে বাউণ্ডুলে বানাইয়া দিছে। আর কবিতা। বাঙালি ছেলে-মেয়ে, বিশেষ করে ছেলেরা, আমাদের সময়ের বাস্তবতার পর পর্যন্তও দেখছি—কেমন যেন একটা… হয়ে যায়! এই হয়ে যাওয়ার মধ্যে, নিজেকে প্রকাশ করার মধ্যে অন্যরকম একটা আনন্দ। কবিতা নিয়া কী কী যে হয়ে যায়! তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারতেছি না। আমিতো একবার একটা কবিতা এক লাইনের বেশি লিখতেই পারলাম না! মানে তখন আর হচ্ছে না। তখন ঐটাই রাইখা দিলাম। মানে ‘মেঘ দেখার পর আমি কিভাবে ফর্সা থাকি’—এই লাইনের পর আমি আর কী লিখি! যা বলার, তা তো লেখা হয়ে গেছে।

ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে কবিতার সাথে কবির যে ছোট্ট জীবনী থাকতো—এগুলা দেখতে দেখতেই জিনিসটা ঢুকে গেছে। আর এই জিনিস একবার ঢুকে গেলে আর নামে না। জুনিয়র অবস্থায় সিনিয়রদের সাথে মেশার যে প্রভাব, তার কারণে শুরুতে কবিতাই লিখতে গেছি। আর এইসবে নর-নারী প্রেমের ব্যাপার যেটা থাকে, আমার শুরুতে এইটা ছিলো না। প্রথমদিকে মানুষের ভিতরের নানা রকম অসাম্যটা মাথার ভিতরে কাজ করতো। কারণ আমি বড় হইতেছিলাম এমন এক পরিবেশে, এমন সব মানুষের সঙ্গে—যারা সাম্যের কথা কইতো। শহর খুলনা, একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা। ঐখানকার পাটকল আর বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা, নানা দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতো। সেই সব আন্দোলনে মানুষের মৌলিক চাহিদা আর সাম্যের ব্যাপার থাকতো। ওইগুলা থেকেই মনটা আউলাইয়া গেছিলো ছোটবেলায়।তারপর বাউণ্ডুলেপনা বা খামখেয়ালি জীবনযাপন। আইন-কানুনের ধারটার না ধাইরা নিজের মতো থাকা। আছে না—যে, এইভাবেই চলতে হবে, এটা করতে হয়, এই হয়ে যাচ্ছে, বিয়ে করতে হবে, বয়স হয়ে যাচ্ছে, এটা হয় নাই, চুল পেকে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে—এই যে ব্যাপারগুলা, এগুলাকে সুন্দরভাবে ইগনোর কইরা যাওয়া। এগুলা তো আছেই, এগুলা থাকবেই। এইসবে কোনো দোদুল্যমানতা নাই। আসল কথা হইলো প্রাকৃতিকভাবেই মানুষ একা। পরে অপ্রাকৃতিকভাবে এইটাকে জোড়াতালি দেওয়া হইছে। পারিবারিক জীবনটাও কিন্তু প্রাকৃতিক না। ওইটাও তৈরি করা হইছে; প্রয়োজনে। বিশেষ কইরা মানুষের। কারণ অন্যান্য প্রাণীর জীবন কিন্তু পুরাই প্রাকৃতিক। তাদের মধ্যে তথাকথিত কোনো শৃঙ্খলা নাই।

আরেকটা মজার ব্যাপার হইলো, অন্য কোনো প্রাণী কিন্তু আমগরে কয় নাই যে, আমরা সেরা। আমরা নিজেরাই, আপনাকে বড় বইলা, নিজেরে সেরা বানাইয়া, অন্যগুলারে আলাদা কইরা, অ-সেরা কইরা, নিজেরা কিন্তু অগরেই আবার খাইতাছি। পুরাটাই কিন্তু অপ্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক থাকতে পারাটাই আসল। অনেকে আছে, ঘর-সংসার করেও জীবন-যাপনে সমস্ত কিছুতে বাউণ্ডুলে। কিন্তু বাউণ্ডুলে শব্দটা অনেক পশ লাগে। এর চেয়ে এইখানে আউলা শব্দটাই বেশি উপযুক্ত মনে হয়। এই যে আমি, অনিয়মিত হইলেও এতো কিছু করি। এখন যদি কেউ আমারে জিজ্ঞেস করে যে, আমি কী করি? কিংবা আপনার পেশা কী? এখন আমি কীভাবে বুঝামু? মানে পেশাডা কী জিনিস? আবার কিছু করি না—এই কথা বললে, বলবে যে, তাইলে চলেন কেমনে? আরে ভাই, প্রকৃতির কোনো প্রাণী তো অচল না। সবাই-ই তো চলতাছে। সে তো খ্যাপা! কারণ তার যুক্তিতে মিলতাছে না কিছুই। সে উত্তর জানে, কিন্তু অন্য লোকজন তার এই উত্তরগুলারে হিসাবে আনতাছে না। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →