না-বলা জিনিসের বয়ান: আল-মাহমুদের অটোবায়োগ্রাফি নিয়া আলাপ
এই লেখাটা ছাপা হইছিল “কবি” নামে বইয়ে, ২০২০ সালে। বইটা কিনতে পারবেন রকমারি‘তে বা ফেসবুক পেইজে (নন-ফিকশন | Facebook)
……………………………………..
বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ। আল মাহমুদ। একুশে বাংলা প্রকাশন। বইমেলা, ২০০৭। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। ১৯২ পেইজ। ২০০ টাকা।
……………………………………..
আল মাহমুদ-এর বইটা পড়ার পর থিকাই ভাবতেছিলাম যে, এইটা নিয়া লিখবো। কিন্তু লিখার কথাগুলি বলতেছিলাম পরিচিত মানুষজনকে তাই আর লিখা হইতেছিল না। যার ঠিক উল্টা কাজটা আল মাহমুদ করছেন। উনি বলার কথাগুলিরেই লিখিত করছেন। খালি রাজনৈতিক ও সামাজিক না, সাহিত্যেরও নিজস্ব ঘটনা ও ইতিহাস আছে, এইগুলি যে কীভাবে সম্ভব হইতে পারে, তার একটা ধারণা হয়তো এই বইটা পড়লে টের পাওয়া যাইতে পারে।
পারসোনাল দিক থিকা বিচার করলে মনে হইতে পারে যে, একটা ‘পাপ’ না করতে পারার সাফল্যই উনারে বাঁচাইয়া দিছে। বইটাতে উনি নিজের বিয়া’র কয়দিন পরেই আরেক মেয়ের প্রতি তাঁর ’লোভ’-এর কথা বলছেন, এই ধরনের কনফেশন করতে গেলে এক তো হইলো বুকের পাটা লাগে; কারণ বিয়া করা মানেই তো ‘কাম’-এর শেষ না। যেইরকম আমরা ভাবতে পারি যে, ফ্রি সেক্সের অভাবেই সোসাইটিতে রেইপের ঘটনা ঘটতেছে। অথচ ঘটনাটা কোনভাবেই এইরকম না। সিমন দ্য বেভোয়াও কইতেছিলেন, সো-কল্ড “নারী স্বাধীনতার”র পরে ফ্রান্সে হ্যারাসমেন্টের ঘটনা আরো বাইড়া গেছে যে, তুমি তো ফ্রি, তুমি কেন আমার সাথে শুইবা না! এইরকম। মানে, রেইপের ঘটনারে পাওয়ার রিলেশনের জায়গা থিকা না দেইখা ‘সেক্সের অভাব’ – এই জায়গা থিকা দেখতে গেলে মুশকিলই হওয়ার কথা। ডিজায়ার, মোরালিটি আর লাভ – এইগুলা যে একই জিনিস না, এইটা একটা ব্যাপার। আরেকটা হইলো, বলার ইটসেলফ একটা প্লেজার আছে। কনফেশনের একটা আনন্দ আছে। শেষমেশ আল্লা তো উনারে বারবার বাঁচায়াই দিছে! এইটা ধরলেও উনার বলতে পারাটা কিছু জিনিস খোলাসা করে যৌনতা বিষয়ে। কট্টুক বলা যায় আর কট্টুক বলা যায় না – এই বেরিয়ারগুলি। শেষমেশ, বলতে পারাটা একটা ঘটনাই। বিয়া’র পরপরই অন্য মেয়ের প্রতি ‘লোভ’-এর লাইগা তিনি যে চড় খাইছেন, সেইটা যে বলতে পারছেন, এইরকম একটা ট্রান্সপারেন্সি’র বোধই হয়তো সোনালী কাবিন-এর জন্ম দিছে। বা কবিতার এই ট্রান্সপারেন্সিটারে উনি কোন না কোনভাবে লাইফেও নিতে পারছেন।
বলতেছিলাম সাহিত্যের ঘটনা ও ইতিহাস-এর কথা। আসলে এইটা তো উনার নিজের লাইফের ঘটনা, এইখানে ঘটনাগুলি তিনিই সিলেক্ট করছেন এবং বর্ণনা দিছেন, একইসাথে তিনি নিজেও এই ঘটনা-প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন, তাই এই ঘটনা ও বর্ণনাগুলির নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার কোনো কারণই নাই, তাঁর অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি-ই এর মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ যেইটা ন্যারেশন, সে-ই কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার ডিরেকশনটারে ঠিক কইরা দিতেছে। যেমন ধরেন, উনি ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কয়েকদিন আগে শামসুর রাহমানের সাথে দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলার) সামনে এবং ২৫ শে মার্চের পরে ইত্তেফাকের সামনে শহীদ কাদরী’র সাথে দেখা হওয়ার ঘটনার কথা, যেইখানে তিনি নিজেই উপস্থিত, সেই বর্ণনা দুইটা খেয়াল কইরা পইড়া দেখেন:
“কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রগতিবাদী কবিরা প্রকৃতপক্ষে শেখ সাহেবের পক্ষাবলম্বন করেননি।…এ সময়কার একটি ঘটনা আমি উল্লেখ করতে চাই। অন্যত্রও করেছি। সেটা হলো, রিকশায় আমি তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। গেটে শামসুর রাহমানের সাথে দেখা হলে আমি রিকশা থেকে নেমে এলাম। শামসুর রাহমান বেশ উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলতে লাগলেন, আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি। শেখ মুজিবকে সমর্থন করি। তারপর তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন তা এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই না।অথচ আজকালের প্রেক্ষাপট কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।” (প. ৯১)
“এখানে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি, আমি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ইত্তেফাকের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য টিকাটুলি গিয়েছিলাম। মতিঝিলের যেখানে শেষ সেখানে একটি ওষুধের দোকানে জরুরি ওষুধ কিনে বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমাকে দেখে তিনি উচ্চহাস্য করেছিলেন। সে হাসির অর্থ আমার কাছে তখনো যেমন দুর্বোধ্য ছিল আজও দুর্বোধ্য।” (প. ৯৫)
এইটা আল মাহমুদেরই ন্যারেশন। কিন্তু এই ন্যারেশন এটলিস্ট ক্লিয়ার করতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটা যখন ঘটতেছে তখনো শামসুর রাহমান আর শহীদ কাদরী উনাদের এলিটিস্ট সাহিত্যিক-বোধের জায়গা থিকা পুরাপুরি সাবস্ক্রাইব করতে পারেন নাই কমন পিপলের বাংলাদেশ ধারণাটাতে। এতোটা বিচ্ছিন্নতা হয়তো আশ্চর্য লাগতে পারে এখন আমাদের কাছে, কিন্তু মিথ্যা হওয়াটা মনেহয় পসিবল না। কারণ এখনো পর্যন্ত একসেপশনাল বা আলাদা হইতে পারাটাই আর্ট বা সাহিত্য আমাদের কাছে, কমন বা সাধারণ হইতে পারাটা না। তো, পাবলিকের লগে একমত হইতে পারাটা এখনো যেমন কঠিন, তখনো একইরকমই হওয়ার কথা।
তবে শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী একই ঘটনার কথা বললে হয়তো একইভাবে বলতেন না। মানুশের চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কাম একটা জায়গাতে আটকায়াও থাকে না সবসময়। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হইতেছে, শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী এই ঘটনাগুলিরে কখনোই লিখিত করেন নাই এবং সম্ভবত এইগুলারে সাহিত্যের বাইরের ব্যাপার বলেই মনে করতেন বা করেন। আর আল মাহমুদ তারে বলবার মতো মনে করছেন এবং বলছেন। এই বলতে পারটা যে কতোটা জরুরী তা তিনি তাঁর অস্তিত্ব দিয়াই জানছেন:
“আমাদের অনেক অসাধারণ কাব্য প্রতিভা বক্তৃতা দিতে সারা জীবনেও সম্মত হননি। হয়তো এই ভেবে সম্মত হননি যে, এতে কবির ধ্যান ও জ্ঞানের নীরবতা অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়। আমি এটা এক সময় নিজেও ভাবতাম। কিন্তু আমি যদি বলতে না জানতাম তাহলে আমাকে শেয়াল ও শকুনের খাদ্য হতে হতো।” (প. ৮২)