বঙ্গবন্ধুর শেষ পাবলিক ভাষণ
১৯৭৫ সালের ২৫ শে জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী পাশ হওয়ার পরে নতুন সরকার ব্যবস্থা কি রকম হবে, সেইটা জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যাখ্যা করেন ২৬শে মার্চ, ঢাকার সোহরায়োর্দি মাঠে, বিশাল এক জনসভায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট নির্মমভাবে খুন হওয়ার আগে এইটা ছিল উনার শেষ পাবলিক ভাষণ। ভাষণ হিসাবে এইটা খুবই ইম্পর্টেন্ট, উইকিপিডিয়ার এন্ট্রি’তে (https://cutt.ly/2jM02VM) বলা হইছে : ২৬ মার্চ ১৯৭৫ মুজিবুর তার দ্বিতীয় বিপ্লব পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, বিপ্লবের চারটি উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এবং বহুমাত্রিক সমবায়কে অর্থনৈতিক একক হিসাবে গঠনের অভিপ্রায় ঘোষণা করেন।
পরের দিন, ২৭ শে মার্চ, দৈনিক সংবাদে এই ভাষণের ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপা হয়। ২০১৯ সালে বাংলা ট্রিউবিন পত্রিকা সেইটা রিপ্রিন্ট্র করে। (https://cutt.ly/xj1lPmX) এই ওয়েব সাইটেও সেই ট্রান্সক্রিপ্ট’টা আছে: 1975.03.26 | বঙ্গবন্ধুর ভাষণসমগ্র | বাকশাল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | সংগ্রামের নোটবুক (songramernotebook.com) কয়েকটা অডিও, ভিডিও লিংকও অনলাইনে এভেইলেবল। কিন্তু কোন লিংকেই সংবাদের ট্রান্সস্ক্রিপ্টের পুরা অডিও বা ভিডিও নাই। কিন্তু অডিও-ভিডিও যতটুকই পাওয়া যায়, সেইগুলা শুইনা বুঝা যায়, সংবাদের ট্রান্সক্রিপ্ট’টা পুরাপুরি অথেনটিক না, বঙ্গবন্ধুর কথারে ‘লিখিত রূপ’ দেয়ার একটা চেষ্টা ছিল; যা এখনো চালু আছে। যেমন ধরেন, বঙ্গবন্ধু কইছেন, “ফোর প্রিন্সিপাল”, ট্রান্সক্রিপ্টে লেখছে, “চারটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ”; বঙ্গবন্ধু কইছেন “স্কয়ার মাইল”, লেখছে “বর্গমাইল”; বঙ্গবন্ধু কইছেন, “জাগা”, লেখছে “জায়গা” – এইরকম প্রতিটা প্যারাতে (আমার ধারণা, ইচ্ছা কইরা) ভুল লেখছে। রাজনৈতিক সিগনিফিকেন্সের বাইরেও, এইগুলা কোন ইনোসেন্ট ঘটনা না।…
তো, এইখানের ট্রান্সক্রিপ্টে একটা অডিও আর একটা ভিডিও ফাইল ফলো করা হইছে। অডিও’টা এই লিংকে পাইবেন: http://103.156.52.70/ (১১৬ নাম্বার ভাষণে অডিও’টা আছে। কিন্তু একটু কনফিউজড হয়া যাইতে পারেন কারণ প্রথম ১১/১২ মিনিটে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ। এর পরে ভাষণটা শুরু হইছে।) এবং ভিডিও লিংকটা এইখানে পাইবেন: https://www.youtube.com/watch?v=n2l6eGSIfyM তবে দুইটা লিংকই ইনকমপ্লিট। কিছু কিছু অংশ বাদ দেয়া হইছে। এই অডিও এবং ভিডিও’তে যেই অংশটা পাওয়া যায় নাই, কিন্তু দৈনিক সংবাদের নিউজে ছিল, সেইটা ব্র্যাকেটে গ্রে কালারে রাখা হইছে।
ই. হা.
………………………..
২৬শে মার্চ, ১৯৭৫। সোহরার্দি মাঠ, ঢাকা।
আমার ভাই ও বোনেরা, আজ ২৬শে মার্চ। ২৫শে মার্চ রাত্রে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষকে আক্রমণ করেছিল। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। সেদিন রাত্রে বিডিআর-এর ক্যাম্প, পুলিশ ক্যাম্প, আমার বাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়, চারিদিকে আক্রমণ চালায় ও নিরস্ত্র মানুষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিক শক্তি।
বাংলার মানুষকে আমি ডাক দিয়েছিলাম। ৭ই মার্চে আমি প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে আবার আমি ডাক দিলাম, আর নয়, মোকাবিলা কর! যে বাঙালি যে যেখানে আছে, যার যা কিছু আছে শত্রুর মোকাবিলা কর। বাংলার মাটি থেকে শত্রুকে উৎখাত করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীন করতে হবে। বাঙালিকে, সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবে না।
দুনিয়ার মানুষের কাছে আমি সাহায্য চেয়েছিলাম। আমার সামরিক বাহিনী, যারা বাঙ্গালী ছিল, আমার বিডিআর, আমার পুলিশ, আমার ছাত্র, যুবক ও কৃষকদের আমি আহ্বান করেছিলাম। বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে মোকাবিলা করেছিল। ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হল। লক্ষ লক্ষ মা-বোন ইজ্জত হারাল। শত শত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হল। দুনিয়ার জঘণ্যতম ইতিহাস সৃষ্টি করল পাকিস্তানের শোষক শ্রেণী, যা কোনদিন দুনিয়ায় হয় নাই। দুনিয়ার ইতিহাসে এত রক্ত স্বাধীনতার জন্য কোন দেশ দেয় নাই, যা বাংলার মানুষ দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, তারা এমনভাবে পঙ্কিলতা শুরু করল, যা কিছু ছিল ধ্বংস করতে আরম্ভ করল। আমার এক কোটি লোক ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল; তার জন্য আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করব। আমি তাদের স্মরণ করি, খোদার কাছে মাগফেরাত কামনা করি যারা এই স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে, আত্মাহুতি দিয়েছে। আমি তাদের কথা স্মরণ করব যে সকল মুক্তিবাহিনীর ছেলে, যে সব মা-বোনেরা, আমার কর্মী বাহিনী যারা আত্মাহুতি দিয়েছিল শহীদ হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। এইদিন তাদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করা উচিত। আজ আমি স্মরণ করি ভারতীয় সেনাবাহিনীর যারা জীবন দিয়েছিল বাংলার মাটিতে। তাদের কথাও আমরা স্মরণ করি।
কিন্তু একটা কথা। আপনাদের মনে আছে, তারা যাবার পূর্বে ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে, ১৬ই ডিসেম্বরের আগে, কার্ফু দিয়ে ঢাকা এবং অন্য অন্য জায়গায় আমার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করব, সম্পদ ধ্বংস করব, বাঙ্গালী স্বাধীনতা পেলেও এই স্বাধীনতা রাখতে পারবে না।
ইনশাল্লাহ, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা হয়েছে। বাংলার লোক স্বাধীন হয়েছে। বাংলার পতাকা আইজ দুনিয়ায় উড়ে। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের সদস্য। বাংলা জোট-নিরপেক্ষ গোষ্ঠীয় সদস্য, বাংলা কমনওয়েলথের সদস্য, বাংলা ইসলামিক সামিটের সদস্য। বাংলাদেশ দুনিয়ায় এসছে; বাংলাদেশ থাকবে! কেউ একে ধ্বংস করতে পারবে না।
[ এক নেতা, এক দেশ! বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ! ]
ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, আমরা চেষ্টা করেছিলাম, একটা ওয়াদা আমি আপনাদের কাছে রাখতে পারি নাই। জীবনে যে ওয়াদা আমি করেছি জীবন দিয়ে হলেও সে ওয়াদা আমি পালন করেছি। আমরা সমস্ত দুনিয়ার রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। আমরা জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা কো-এক্সিস্টেন্সে বিশ্বাস করি, আমরা বিশ্ব শান্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা ভেবেছিলাম পাকিস্তান, তারাও দুঃখ পাবে, তারাও নিশ্চই দুঃখিত হবে, আমার সম্পদ ফেরত দেবে। আমি ওয়াদা করেছিলাম তাদের বিচার করব। একটা ওয়াদা আপনাদের পক্ষ থেকে খেলাপ করেছি, তাদের আমি বিচার করি নাই। তাদের আমি ছেড়ে দিয়েছি। এই জন্য যে এশিয়ায়, দুনিয়ায় আমি বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম। Continue reading