অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (৪)
পার্ট ৪: বেদের মেয়ে ছোসনা (১৯৮৯)
“রাজা যদি অপরাধী হয়, তাহলে শাস্তি দেন স্বয়ং খোদা”
/বেদের মেয়ে জোসনা
বেদের মেয়ে ছোসনা রিলিজ হইছিল ১৯৮৯ সালে। ২০ লাখ টাকা দিয়া বানানো এই সিনেমা ইনকাম করছিল ২২.৫০ কোটি টাকা। আর মুশকিল হইছিল এই ব্যবসা করাটাই।
১৯৯০ সালে ফরহাদ মজহার এই সিনেমা নিয়া বড় একটা লেখা লেখছিলেন, অইখানে সিনেমার অনেকগুলা আসপেক্ট নিয়া উনি ডিল করছিলেন, সিনেমাটার নেগেটিভ ‘সমালোচনা’র উত্তর দিছিলেন। কিন্তু কেন সমালোচনা হইছিল, সেইটা নিয়া সজাগ হইতে পারেন নাই। মানে, বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমা হইছে কি হয় নাই – এইটা কোনভাবেই ‘আসল’ সমালোচনা’টা ছিল না। এই ক্যাটাগরির সিনেমা তখন বছরে ৮/১০টা কইরা রিলিজ হইতো। কিন্তু অন্য কোনটা নিয়া তো ‘সমালোচনা’ হয় নাই! ‘সমালোচনা’ হইছে কারণ এই সিনেমাটা ব্যবসা করছে। বেদের মেয়ে জোসনা দেখায়া দিছে যে, ‘বাংলা সিনেমা’র নামে যেই টাইপের সিনেমা বানানো হয়, সেইগুলা নিয়া পাবলিকের কোন ইন্টারেস্টই নাই; যদি থাকতো তাইলে ২২ কোটি টাকা না হোক, সিনেমাগুলা এটলিস্ট ২/৪/৫ কোটি টাকা হইলেও ইনকাম করতে পারতো। ‘বাংলা সিনেমা’ যে হইতেছে না, এই সত্যিটারে খোলাসা কইরা দিছিলো বেদের মেয়ে জোসনা। আর এইটা তো কিছুটা অশ্লীল ঘটনাই। :p
জনরা বা ক্যাটাগরি হিসাবে ‘রূপবান’ আর ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ একই ঘরানার সিনেমা। দুইটা সিনেমাই হিউজ ব্যবসা করছিল, দর্শক টানছিল, ‘সমালোচকদের’ নিরবতা আর নিন্দা পাইছিল; কিন্তু ‘রূপবান’ যেমন ছিল একটা ব্লেসিং, একটা শুরু; বেদের মেয়ে জোসনা হইতেছে আরেকটা শেষের শুরু। এই কনফার্মেশন যে, সিনেমা খালি আর্ট আর পুরষ্কার পাওয়ার জিনিস না, পাবলিকের দেখার জিনিস। কিন্তু সিনেমার এই ক্লেইমটারে আইডেন্টিফাই করা হইছে এইভাবে যে, বাংলা-সিনেমার ‘রুচি’ নিচে নামাইতে হবে! মানে, ‘বাংলা সিনেমা’ শরীর দিয়া দিবে, তারপরও মন দিবে না; মানবেই না যে, বাণিজ্যিক-সিনেমা, আর্টফিল্ম, মিডলক্লাসের সিনেমা, গরিবের সিনেমা… এই ক্যাটাগরিগুলা এতোটা ফিক্সড কোন জিনিস না।
তো, এই কাহিনি নিয়া আগে যে কোন সিনেমা বানানো হয় নাই – তা কিন্তু না; ১৯৬৯ সালে নুরুল হক বাচ্চু “বেদের মেয়ে” নামে সিনেমা বানাইছিলেন, নায়ক-নায়িকা ছিলেন আজিম আর রোজী সামাদ। এভারেজ আর দশটা সিনেমার মতোই ছিল সেইটা। কিন্তু বিশ বছর পরে আইসা একই কাহিনি নিয়া বাননো সিনেমা এতো হিট হইলো কেমনে!
আমার ধারণা, তিনটা ফ্যাক্টর এইখানে কাজ করছে।
পয়লা ঘটনা তো অবশ্যই একটা সার্টেন অডিয়েন্সের ফিলিংসের লগে অ্যাটাচড হইতে পারা। কিন্তু এইটা হইছে কেমনে! ১৯৮৯ সালেই এর চে পপুলার কাহিনি নিয়া “বীরঙ্গনা সখিনা” আর “নবাব সিরাজউদ্দৌলা” বানানো হয়; ফ্লপ না হইলেও হিট হওয়ার কোন খবর জানা নাই। এমনকি সখিনা’তে তখনকার হিট নায়িকা ববিতা আর দিতি ছিলেন। মানে, বলতে চাইতেছি, কাহিনি ইজ নট দ্য গল্প! পপুলার কাহিনি দিয়া সিনেমা বানাইলেন, হিট নায়ক-নায়িকা নিলেন, নাচা-গানা আর মাইর-পিট রাখলেন, তাইলেই হবে; তা তো না!
তো, অডিয়েন্সের বা দর্শকের ফিলিংসের লগে এটাচড হইতে পারার ঘটনা’টা কি রকম? এইটা নিয়া ফরহাদ মজহার ভালো একটা জায়গা ধরছেন যে, কাহিনিটা কোন ‘প্রাচীনকালে’ ঘটতেছে না, ঘটতেছে বর্তমানকালে। এইটা অতীতের কোন কাহিনি না, এইটা বর্তমানের, বাংলাদেশের কাহিনি। একটু আড়াল করার লাইগা বাংলাদেশরে বঙ্গদেশ বলা হইছে। মানে, এই যে প্রেম, ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক অন্যায়, অবিচার এইগুলা বর্তমান সময়ের ঘটনা; পুরান একটা কাহিনির ভিতর দিয়া বলা হইতেছে মাত্র। কিন্তু এইটা জাস্ট সারফেইসের ঘটনা; বরং যেই টোনটাতে বলা হইতেছে, সেই ন্যারেটিভ’টা খুবই অ্যাটাচড কাহিনির সাথে। রূপবানের ব্যাপারেও একই জিনিস। আর্টের যেই দরদ, সেইখানে ভান নাই কোন; বা ভানটা এতোটাই যে তারে রিয়েল বইলা ভাবতে কোন সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় না কারণ সত্য হওয়ার চাপাচাপিটা এইখানে নাই। এইটারে ফ্যান্টাসি বলতে চান নাই ফরহাদ মজহার; কিন্তু আমি বলবো, ফ্যান্টাসি আর রিয়েল – এই ক্যাটাগরিটাই এইখানে রিলিভেন্ট না। আর এটাচমেন্ট বলেন, দরদ বলেন, এইটা তৈরি হইছে, এই জায়গা থিকাই। টেকনিক্যালি বলেন, অ্যাপিয়ারেন্সের দিক দিয়া বলেন, এই সিনেমার আলাদা কোন ‘সিগনেচার’ নাই, অই সময়ের সব সিনেমাতেই কাছাকাছি রকমের জিনিস পাইবেন, কিন্তু একসেপশন এই ‘দরদ’ বা ‘ইমোশন’টা। যেইটারে যাত্রা বা গরিবের বা কৃষকের ইমোশন বইলা ন্যারো করছেন ফরহাদ মজহারও (মানে, ট্রাডিশনাল যেই ‘সমালোচক’, তাদের থিকা আলাদা কোন গ্রাউন্ড থিকা উনি দেখেন নাই)।
এই জায়গাটারে মেবি আরেকটু খোলাসা কইরা বলা দরকার। ফরহাদ মজহার যাদের সমালোচনার এগেনেস্টে বেদের মেয়ে ছোসনা’রে ‘ভালো’ সিনেমা হিসাবে প্রমাণ করতে চাইতেছেন, উভয়পক্ষ মাইনা নিছেন যে, সিনেমা’টা “ছোটলোকদের”; মানে ফরহাদ মজহার আদর কইরা ‘কৃষক’, ‘গ্রামের মানুষ’ আর ‘শহুরে নিন্মবিত্ত’ কইছেন, কিন্তু লোকজন তো একই। মানে, দুইদলই এগ্রিড যে, এইটা হইতেছে, গরিবের আর্ট, গ্রামের জিনিস। একদল খারাপ বলতেছেন, আর ফরহাদ মজহার বলতেছেন, এই আর্ট মিডলক্লাসের রুচিরে স্যাটিসফাই করে না বইলাই খারাপ না।… তো, আর্ট অবশ্যই ক্লাস কনজামশনের ঘটনা। কিন্তু তাই বইলা পাওয়ারফুল ক্লাসের আর্টরে যে আমরা ‘আসল’ আর্ট বইলা মাইনা নেই, সেইটা তো মিছা কথা না। মিডলক্লাশের আর্টরে তো আলাদা কইরা বলা লাগে না যে, এইটা মিডলক্লাশের সিনেমা, কিন্তু গরিবের সিনেমারে যে বলা লাগে ‘গরিবের সিনেমা’, এইটা অই ‘আসল আর্ট’র ধারণারে কোনভাবেই বাতিল করতে পারে না।
আর এই ধরণের ‘আর্ট’ চিন্তা সবচে বাজে যেই কাজ করে, আর্ট’রে একটা টুল হিসাবে দেখে, যার কাজ হইতেছে, কোন ক্লাসের রুচি’রে স্যাটিসফাই করা। কিন্তু কোন আর্ট যদি কোন ক্লাসের রুচিরে কোন না কোনভাবে অল্টার করতে না পারে, সেইটা আর্টই হইতে পারার কথা না! ইভেন এন্টারটেইনমেন্টেও এই কথা কম-বেশি সত্যি। ঘটনা’টা একটা রুচি’রে স্যাটিসফাই করা না, বরং রুচির জায়গাটারে ক্রিয়েট করা।. তো, বেদের মেয়ে জোসনা ‘গরিবের আর্ট’ বইলা যেই জিনিস আছে, সেইটারে এক তো হইলো গরিবের আর্টের জায়গা তো দেখেই নাই, এমনকি গরিবের রুচি বইলা যেই পারসেপশন চালু আছে (কাহিনি বুঝে না, চিন্তা করতে জানে না, নাচ-গানটাই আসল…) সেইগুলারে মেবি কিছুটা ইনভ্যালিডও করতে পারার কথা, যেই কারণে এটাচমেন্টের জায়গাগুলা তৈরি হইতে পারছে, সিনেমার ভিতরে।
সেকেন্ড জিনিস হইলো, ভাষার জায়গা’টা খেয়াল কইরা দেইখেন, বঙ্গরাজা আর বেদের মেয়ে দুইজনে একই ‘শুদ্ধ’ ভাষাতে কথা বলতেছেন। এখনকার হলিউডি সিনেমাতে যেইরকম দুইটা কালা কারেক্টার থাকা লাগবো, একটা স্ট্রং ফিমেইল… এইরকম ফর্মূলা মানতে হয়, এইরকম বাংলা নাটক-সিনেমাতেও দেখবেন কে কোন ল্যাঙ্গুয়েজে কথা কইবো সেইটা মোটামুটি ফিক্সড কইরা দেয়া আছে, গরিব, অশিক্ষিত লোকজন একটা ‘আঞ্চলিক’ ভাষায় কথা কইবো; এই কারেক্টারগুলা যদি ‘শুদ্ধ’ বা শহরের ভাষায় কথা কয়, আপনার মনে হবে, আন-রিয়েল, বানানো, ফেইক, ফ্যান্টাসির একটা ঘটনা। আদতে ঘটনা হইলো এই যে, রাজাকার মানে টুপি-পরা লোক, মুক্তিযোদ্ধা মানে জোয়ান… এই ন্যারেটিভগুলারে পাত্তা না দেয়ার ঘটনা। যেই গরিব’রা ‘শুদ্ধ’ ভাষা বলে, তারা আবার কেমন গরিব! বা যেই রাজার আলাদা ভাষা নাই, সে আবার কেমন রাজা – এইগুলা তো অ্যাবসার্ড বা ফ্যান্টাসির ঘটনাই! হোয়ার অ্যাজ, আপনি যদি খেয়াল করেন, এতোটা কাল্পনিক ব্যাপার না এইগুলা; কিন্তু কাল্পনিক যে বানায়া রাখা হইছে, এই জায়গাটারে কনফ্রন্ট করে, বাতিল কইরা দেয় সব কারেক্টারের একই ভাষায় কথা বলাটা। ভাষা যে গরিব’রে গরিব বানায়া রাখে সেই গরিবি’তে মেবি সাবস্ক্রাইব করে নাই বেদের মেয়ে জোসনা। সিনেমা ভিজ্যুয়াল জিনিস অবশ্যই, কিন্তু সবসময় কোন না কোন সংলাপ যে পপুলার হয়া উঠে, সেইটা থিকা বুঝতে পারার কথা যে, এইটাও ক্রুশিয়াল একটা ঘটনা। Continue reading