অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (৩)
পার্ট ৩: হোয়াট ইজ বাংলা সিনেমা?
তো, এখন যেইটারে ‘বাংলা সিনেমা’ বলি আমরা, সেইটা চালু হইছে ১৯৬৫ সালে, রূপবানের পর থিকা। মানে, ‘বাংলা সিনেমা’ বইলা একটা টার্ম তো চালু আছে এখনো আমাদের কথা-বার্তার ভিতরে যে, পুরা ‘বাংলা সিনেমা’র মতন ঘটনা; বা আগেরদিনের ‘বাংলা সিনেমা’ ভালো ছিল, এখন কি সব বানায়… এইরকম। মানে, বাংলা সিনেমা বইলা একটা ধারণা আছে আমাদের মনে। আর এইটা কোন না কোন ঘটনা বা ঘটনাগুলা থিকাই তৈরি হইছে। তো, সেই ঘটনাগুলা, আমার ধারণা ঘটতে শুরু করছে ১৯৬৫ সালে রূপবান সিনেমার পরে। এর আগেও যেই ৩০/৪০ টা সিনেমা বানানো হইছে, সেইগুলা স্ট্রাগল করতেছিল অনেক। হিন্দি আর উর্দু সিনেমার বাইরে আলাদা কইরা বাংলা সিনেমা টিকতে পারবে কিনা, সেইটা নিয়া ডাউট ছিল। কিন্তু রূপবান সিনেমার সাকসেসের পরেই কনফিডেন্স নিয়া বাংলা সিনেমা বানানোর শুরু হয়।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]
তারপরও রাষ্ট্র হিসাবে যেহেতু পাকিস্তান ছিল; উর্দু সিনেমা বানানো বন্ধ হয় নাই; তবে যেইভাবে মেইনস্ট্রিম হয়া উঠতেছিল, সেইটা একভাবে কইমা আসছিল। যেইখানে ১৯৫৬ থিকা ১৯৬৫, বাংলা সিনেমা বানানো হইছিল ২৭টা আর উর্দু ছিল ২০ টা; সেইখানে আর ১৯৬৫ থিকা ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলা সিনেমা রিলিজ হইছিল ১৩২টা আর ঢাকায় উর্দু সিনেমা রিলিজ হইছিল ৩৩টা (এর মধ্যে রূপবান আর নবাব সিরাজদ্দৌলা সিনেমার উর্দু ভার্সনও আছে)। আরেকটা যেই ঘটনা ঘটছিল ১৯৬৫ সালের ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে ইন্ডিয়া থিকা সিনেমা আমদানি বন্ধ হয়া গেছিল; সেইটাও বাংলা সিনেমার জন্য মার্কেট ওপেন করছিল। আর স্বাধীনতার (১৯৭১ সালের) পরে উর্দু সিনেমাও বানানো বন্ধ হয়া যায়; যার ফলে বাংলাদেশের সিনেমাহলে এই সময়টাতে বাংলা সিনেমা ছাড়া আর কিছু চালানো হয় নাই। ইংরেজি সিনেমার আমদানিও কম-ই থাকার। ‘এক টিকিটে দুই সিনেমা’ নামে হংকংয়ের সিনেমা দেখানো শুরু হয় মেবি ১৯৯০’র দিকে; ‘অশ্লীল সিনেমা’র যুগের কিছুদিন আগে। এইসব কারণে, এই সময়টাতে বাংলাদেশের লোকজনের সিনেমা-হলে বাংলা সিনেমা বাদে অন্য কিছু দেখার সুযোগ আসলে খুব একটা ছিল না। (যদিও ভিসিআর-ভিসিপি’র মাধ্যমে হিন্দি-সিনেমা অবশ্য ১৯৮০’র দিক থিকাই স্ট্রং একটা পজিশনে ছিল।)
………………………………
উর্দু থিকা বাংলা: ‘আযান’ থিকা ‘উত্তরণ’
খুবই ছোট্ট একটা ইনফরমেশন। ১৯৬০ সালে একটা সিনেমা বানানো হয় ‘আযান’ নামে, তখন রিলিজ হয় নাই; পরে এই সিনেমা বাংলায় ডাব কইরা ১৯৭৬ সালে রিলিজ দেয়া হয়, কিন্তু সিনেমা নাম চেইঞ্জ কইরা রাখা হয় ‘উত্তরণ’। 🙂
“মাসিক ‘সিনেমা’র সম্পাদক ফজলুল হক ১৯৬০ সালে ‘আযান’ নামে একটি উর্দু ছবির কাজ শুরু করেন ওবায়েদ-উল-হকের কাহিনি নিয়ে। রিয়াজ বোখারীর ক্যামেরায় ওই ছবিতে অভিনয় করেন রহমান, চিত্রা, শবনম, আনোয়ারা, নাসিমা খান প্রমুখ। ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন খাদেম হোসেন খান ও খান আতাউর রহমান। মোহাম্মদ নাসের প্রযোজিত এ ছবিটি ‘উত্তরণ’ নামে ১৯৭৬ সালে মুক্তি দেয়া হয় বাংলায় ডাব করে।” (বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা, অনুপম হায়াৎ, পেইজ ৯৭)
ব্যাপারটা একটু খেয়াল কইরা দেখেন, ১৯৭৬ সালে ‘আযান’ ব্যাপারটা কিন্তু এতোটা ‘বাংলা’ ছিল না, যতোটা ‘উত্তরণ’। এইরকমের একটা চিন্তা-ভাবনা তখন ছিল, এখনো তো এই ধরণের চিন্তাই ডমিনেটিং। যে, এইগুলা ‘বাংলা-ভাষায়’ ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ; মানে, যেইটা ‘বাংলা’ সেইটা ‘হিন্দি’ বা ‘উর্দু’ থিকা আলাদা, ‘সংস্কৃতের দুহিতা’ :p আর এই ব্যাপারটা স্বাধীনতার পরে পরে আরো বাইড়া গেছিল।
বাইড়া যে গেছিল, এইটার আরেকটা নজির পাইবেন আবুল মনসুর আহমেদের কথাতে:
“প্রথম ঘটনাটা ঘটিল স্বাধীনতার প্রায় শুরুতে্ই – ১৮ ই ডিসেম্বর। ঐ দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা উদযাপনের জন্য দিল্লীর রামলীলা ময়দানে এক বিরাট জনসভা হইল। সে সভায় ভারতের দেশরক্ষা মন্ত্রী শ্রী জগজীবনরাম বক্তৃতায় বলিলেন: ‘এতদিন পাকিস্তানের গর্বের বিষয় ছিল, সে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। গত পরশু হইতে সে গৌরব বর্তাইয়াছে বাংলাদেশের উপর। বাংলাদেশই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।… কিন্তু বাংলাদেশের সদ্য-দীক্ষিত একজন অফিসার মি. রামের ঐ উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করিয়া বলিলের: “মি. রামের স্মরণ রাখা উচিৎ ছিল বাংলাদেশ একটি সেকিউলার রাষ্ট্র, মুসলিশ রাষ্ট্রি নয়।’ আমি বুঝিলাম এটা যদি বাংলাদেশের সরকারের সরকারী অভিমত হয়, তবে বিপদের কথা। বাংলাদেশের পরিচালন-ভার এমন সব ‘অতি-প্রগতিবাদী’ লোকের হাতে পড়িতেছে, যারা ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম রাষ্্রটের পাথর্ক্য বুঝে না বা বুঝিতে চাহেন না।…
প্রবাসী সরকারের ঢাকায় ফিরার সংগে সংগে প্রমাণিত হইল যে এটা সরকারী অভিমত। দেশে ফিরিয়াই তারা যা দেখাইলেন তাতে রেডিও-টেলিভিশনে কোরান তেলাওয়াত, ‘খোদা হাফেয’ ‘সালামালেকুম’ বন্ধ হইয়া গেল। তার বদলে ‘সুপ্রভাত’ ‘শুভ সন্ধ্যা’, ‘শুভ রাত্রি’ ইত্যাদি সম্বোধন প্রথা চালু হইল।” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ৫৯৩-৫৯৪)
সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ না হইলেও ‘আযান’ নামে সিনেমা বানানোটা রিস্কিই হওয়ার কথা, এইরকম সিচুয়েশনে। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলতেছিলেন, ১৯৭৫ সালে অনেক রিস্ক নিয়া উনি ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতার বইটার সম্পাদনা করছিলেন। তো আমার ধারণা, সিনেমাটা সুপার ফ্লপ হওয়ার কথা, কারণ পাবলিকের ‘উত্তরণ’ দেখার কোন কারণ দেখি না; ‘আযান’ নাম হইলেই যে সিনেমা হিট হয়া যাইতো – ঘটনা এইটা না, কিন্তু চেইঞ্জ যে করা লাগলো নামটা, এইটা খেয়াল করার মতো একটা ঘটনা মনেহয়।
……………………………………
তো, আমরা যেইটারে বাংলা-সিনেমা বলি, সেইটা হইতেছে ১৯৬৫ – ১৯৯০, এইরকম ২৫ বছর সময়ের একটা ঘটনা। কিন্তু একটা সিঙ্গুলার কোন জিনিসরে বাংলা সিনেমা বললে ভুল হবে আসলে, বরং বাংলা সিনেমার কয়েকটা প্যাটার্ন ছিল, যেইটা কম-বেশি এখনো কন্টিনিউ হইতেছে। এই ট্রেন্ডগুলা শুরু থিকাই ছিল, বা এখন এই অবস্থায় আছে বইলা কোন না কোনভাবে শুরুটা দেখতে পাইতেছি আমরা। এটলিস্ট চাইরটা ট্রেন্ড বা ধারার কথা বলতে পারি আমি:
‘গ্রামের সিনেমা’ – পরিচিত ‘লোককাহিনি’ বা যাত্রাপালা বেইজড সিনেমা। কিন্তু পরিচিত কাহিনি তো আসলে কম-ই, যার ফলে পরে গ্রামের ‘সমাজ-বাস্তবতা’র উপ্রে বেইজ কইরাও এই জনরা’তে অনেক সিনেমা হয়; কিন্তু এইটা মেবি এখন বাংলা সিনেমার সবচে ‘ক্ষীণ ধারা’, ‘মরা নদী’…। ২০০৬ সালে রিলিজ হওয়া ৯৮টা সিনেমার মধ্যে নাম্বারটা ৮টার বেশি হওয়ার কথা না। মুশকিল হইলো, কিছু ‘ঐতিহাসিক’ সিনেমাও (যেমন ধরেন, হাজী শরিয়তউল্লা, বীরঙ্গনা সখিনা…) এই ক্যাটাগরি ভাইবা বানানো হইছে। মানে, এইসব সিনেমা দেখবে, ‘গ্রামের লোকজন’ – এইরকম একটা অডিয়েন্সের কথা ভাইবা বানানো সিনেমা।
গ্রামের সিনেমা মানে সব গ্রাম-বেইজড সিনেমা না; যেমন ধরেন, ‘সারেং বউ’ পারিবারিক সিনেমাই আসলে। বা এমনকি নবাব সিরাজদ্দৌলা (১৯৭০) ঐতিহাসিক সিনেমা হইলেও আসলে গ্রামের সিনেমা। কারণ, এই সিনেমাগুলা দর্শক হিসাবে এক ‘গ্রামের লোক’ বইলা একটা অডিয়েন্সরে অ্যাজিউম করে। যে, এই সিনেমা ‘গ্রামের লোকজন’ দেখবে, তো, অরা কি পছন্দ করে, সেই জিনিসগুলারে রাখার ট্রাই করে। যেমন, যাত্রা একটা অবভিয়াস ব্যাপার। যে, যাত্রা’তে কি করে? অইরকম কিছু জিনিস রাখতে হবে। যেমন, উঁচা গলার সংলাপ, কাল্পনিক রাজ্য… এইরকম। এন্টারটেইনমেন্টের টুল হিসাবে ‘মঞ্চ-নাটক’ যতোটা না ছিল তার চাইতে বেশি ছিল তো যাত্রাপালা, পালাগান; কিন্তু বাংলা-সিনেমা অইটারে গোড়া হিসাবে নিতে পারেন নাই; খালি কিছু কাহিনিই নিছে। যদিও গানের জায়গা কিছুটা একসেপশনাল… বাংলা সিনেমার গান যতোটা না হিন্দি সিনেমা থিকা আসছে (পরে বরং এই রেফারেন্সটাই মেইন হয়া উঠছে) তার চাইতে যাত্রাপালা থিকা, পালাগান থিকাই বেশি আসছে। কিন্তু বেশ সারপ্রাইজিং একটা ঘটনা হইলো, মিউজিক্যাল মুভি খুব কমই বানানো হইছে বাংলা সিনেমায়। মানে, পালাগান, যাত্রা থিকা কাহিনি নেয়া হইছে, কিন্তু এই মিউজিক্যালের কোনরকম কোন ইম্প্রুভাইজেশন পাইবেন না।
এইটা না হওয়ার কারণ, এইটারে একটা সিনেমাটিক জায়গা থিকা না দেখা, খুবই ইনফিরিয়র একটা জায়গা থিকা লোকেট করতে চাওয়া যে, এই রকমের সিনেমা থিকা পয়সা উইঠা আসে। জহির রায়হান ১৯৬৮ সালে ৪ টা ‘গ্রামের সিনেমা’র (দুই ভাই, কুচবরণ কন্যা, জুলেখা, সুয়োরাণী-দুয়োরাণী) প্রযোজক হয়া টাকা তুইলা অই টাকা দিয়া ‘পারিবারিক সিনেমা’ বানাইছেন। মানে, এইটা একটা ক্যাটাগরি হিসাবে ছিল এবং স্টিল রয়া গেছে যে, পাবলিক তো সিনেমা বুঝে না, যাত্রা দেখতে আসে! 🙁 এইরকম একটা মুর্খতার জায়গা হিসাবে দেখা হইছে এবং হইতেছে এই জনরাটারে। যার ফলে, এইটা সাইড-লাইনের একটা ব্যাপার হিসাবেই আছে, থাকতেছে। এই ধরণের জনরা’র সিনেমার ফুল পটেনশিয়াল কখনোই বাংলা-সিনেমায় আসতে পারে নাই, এইরকম ‘গ্রাম্য’ এটিটুডের কারণে।