Main menu

অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (২)

।। আগের পোস্ট।।

 

“ভাতের খিদা লাগলে দাইমা গো,
দাইমা, পানিতে কি সারে গো?”

/রূপবান


শুরু’র দিকের সিনেমা…

১৯৫৯ সালে রিলিজ হওয়া ৪টা ছবিই ক্রুশিয়াল মনেহয় আমার কাছে, বাংলাদেশি সিনেমার হিস্ট্রি বুঝার লাইগা। ৪টা আলাদা আলাদা ট্রেন্ডরে লোকেট করা যাইতে পারে এখন, এই ২০২০ সালে বইসা।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

এই বছরের যেই ছবিটার নাম বেশি শোনা যায় সেইটা হইতেছে – জাগো হুয়া সাভেরা, ডিরেক্টর আছিলেন আখতার জং কারদার, উনি এসিসেন্ট হিসাবে নিছিলেন জহির রায়হান’রে, আর সিনেমার কাহিনি লিখছিলেন পাকিস্তানের উর্দু ভাষার কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝির একটা অ্যাডাপ্টশন ছিল কাহিনিটা। ইন্টারেস্টিং জিনিস হইলো, এই সিনেমা পাকিস্তানের সিনেমাহলগুলাতে ‘মুক্তি’ পায় নাই, পলিটিক্যাল ঝামেলার কারণে, কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ পাইছিলো, মস্কো’তে। ইন্টারেস্টিং না ব্যাপারটা! 🙂  এখনো অনেক সিনেমাই, মানে ‘আর্ট-ফিল্ম’ কিন্তু বাংলাদেশে বানানো হয় প্রাইজ-টাইজ পাওয়ার লাইগাই, সিনেমা হলে চললে ভালো, না চললেও কোন সমস্যা নাই; বা আর্ট-কালচারের লোকজন যদি বুঝে, কথা-বার্তা কয়, তাইলেই এনাফ। যেই পাবলিক ‘আর্ট’ বুঝে না – তাদের লাইগা আমরা সিনেমা বানাবো নাকি! এইরকম যেই ধারা, সেইটার শুরু হিসাবে এই সিনেমাটারে দেখতে পারেন। দুসরা ঘটনা হইলো, তখন সমাজতন্ত্রের জয়-জয়কার, এই কারণে মার্কসিস্ট ঘরানার জিনিস প্রাইজ-টাইজ পাইতো; আর এখন দেখবেন, লিবারাল ইস্যুগুলা নিয়া অনেক হাতি-ঘোড়া মারা হয়। কারণ আপনি যদি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ পাইতে চান, সো-কল্ড ইন্টারন্যাশনাল ইস্যুগুলার লগে আপনারে কানেক্ট করতে পারতে হবে তো! যেমন ধরেন, বাংলাদেশ’রে ইউরোপ-আম্রিকার আর্ট-অথরিটি’রা তো চিনে গার্মেন্টস দিয়া, পটেনশিয়ার টেররিস্টদের আস্তানা হিসাবে… তো, উনাদের নজরে আসতে হইলে, এইসব ইস্যু নিয়াই সিনেমা বানাইতে হবে; এইরকমের ঘটনা ‘নতুন’ কোন ব্যাপার না, সিনেমা জিনিস’টা শুরু হওয়ার সময় থিকাই ছিল। যদিও “জাগো হুয়া সভেরা” বরং এক্টা ফেইলড এটেম্পট হিসাবেই রিড করা হয় মনেহয় এখন। কিন্তু যারা ঋতিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম বা সতজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী’র ভিজ্যুয়াল পছন্দ করেন তাদের এই সিনেমার ভিজ্যুয়াল পছন্দ হওয়ার কথা; ১৯৫৯ সালের গ্রাম-বাংলা কি রকম ছিল, সেইটার দৃশ্যগুলা পাইবেন; কিন্তু মুশকিল হইলো এনগেইজমেন্ট’টা মিসিং (পুরাটাই ভাষার কারণে না),  অনেকবেশি ডকুমেন্টারি মনে হওয়ার কথা; যেন বিদেশিদের ক্যামেরা, বাংলার জন-জীবনের ছবি ফুটায়া তুলতেছে! আর সবচে বড় ব্যাপার হইতেছে রানওয়ে বা আন্ডার কন্সট্রাকশন এর মতো এইটা বাংলাদেশের পাবলিকের জন্য বানানো সিনেমা না, বরং বিদেশের কাছে, মানে ইউরোপ-আম্রিকার কাছে দেখানো যে, দেখেন, বাংলাদেশ কি জিনিস! তো, এই ধারাতে এরপরে আরো অনেক ডিরেক্টর, সিনেমা পাইছি আমরা; পাইতেছি।

জাগো হুয়া সভেরা সিনেমার পোস্টার

জাগো হুয়া সভেরা সিনেমার পোস্টার

[youtube id=”z4t145JEBPU”]
সেকেন্ড সিনেমাটার নাম হইতেছে, আকাশ আর মাটি, ডিরেক্টর আছিলেন ফতেহ লোহানী। ফতেহ লোহানী পরে আসিয়া (১৯৬০) আর সাত রং (উর্দু, ১৯৬৫) বানাইছেন, কিন্তু কোনটাই এই সিনেমার মতোই, তেমন কোন ব্যবসা করতে পারে নাই মনেহয়। এই সিনেমাটা নিয়া তেমন কোন ইনফরমেশন নাই; তবে যট্টুক ধারণা করা যায়, এক রকমের কলকাতার আর্ট-কালচারের একটা টোন মেবি থাকার কথা, কারণ কাহিনি ছিল ইন্ডিয়ান রাইটারের (বিধায়ক ভট্টাচার্য), নায়কও ছিলেন ইন্ডিয়ান (প্রবীর কুমার)।  যেইটা একদিক দিয়া পাবলিক যেমন খায় নাই, ডিরেক্টরও এক রকমের এন্টারটেইনমেন্ট সার্ভ করতে চাইছেন এক রকমের ‘শিক্ষিত মিডল-ক্লাসের’ জন্য যারা তখনো সিনেমা হলে যাইতে শুরু করে নাই, বা পরে টিভি-নাটকের কনজ্যুমার হইতে পারছেন। এই ধারাতেও সিনেমা হইছে কিছু বাংলাদেশে, এখনো হয়; কিন্তু পাবলিক যদি সিনেমাটা খাইলে ডিরেক্টর’রা চিন্তায় পইড়া যান, কি ভুল উনি করলেন! 🙂 এইরকম।

আকাশ আর মাটি সিনেমার একটা সিন

আকাশ আর মাটি সিনেমার একটা সিন

 

থার্ড সিনেমাটা ইর্ম্পটেন্ট। নাম – মাটির পাহাড়। ডিরেক্টর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। উনারে চিনবেন উনার আরেকটা সিনেমার নাম দিয়া – বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২), এইটারও ডিরেক্টর উনি। ১৯৭৪ সালে “ঈশা খাঁ” নামেও একটা সিনেমা বানাইছিলেন। (মোট ৯টা সিনেমা বানাইছেন উনি।) মাটির পাহাড় সিনেমার কাহিনি, সংলাপ সৈয়দ শামসুল হকের। (সৈয়দ শামসুল হক নিজেও কিন্তু একটা উর্দু সিনেমা বানাইছিলেন ১৯৬৬ সালে “ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো” নামে।)  এফডিসি থিকা মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা এইটা। এইটা নিয়াও তেমন কোন ইনফরমেশন নাই, কিন্তু যদ্দূর ধারণা করতে পারি, এই সিনেমাও খুব একটা চলে নাই। নায়ক মেবি পশ্চিম পাকিস্তানের ছিলেন, আর হইলে এইটা তখন একটা কারণ হইতে পারে কিনা, আমি শিওর না। কিন্তু আমার ধারণা, এইটা একটা ‘গুড ট্রাই’ ছিল। হইতে পারে আইডিয়ালিস্টিক জায়গা থিকা ডিল করছেন বেশি (উনার ‘বড় ভালো লোক ছিল’ মাথায় রাইখা বলতেছি, যেইটারে বাংলাদেশি আর্ট-ফিল্ম মনেহয় আমার), কিন্তু এখন যেইটারে ‘বাংলাদেশি’ সিনেমা বলতে চাই আমরা, সেইটার কোন টোন হয়তো থাকার কথা।

Continue reading

রাবেয়া বসরী

প্রাচ্যের মশহুর সুফি কবি ফরিদুদ্দীন আত্তার [১১৪৫-১২২০] শুরু জীবনে ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং ফার্মাসিস্ট। উনি ওষুধ বানাইতে খুব ভালোবাসতেন। ফলে এই কাজে দ্রুত উন্নতি করেন। একসময় ইরানের নিশাপুরে বিশাল এক ওষুধের কারখানাই গড়ে তুলেন। একদিন ওই কারখানার সামনে এক ফকির আইসা আত্তাররে বললো, অ মিয়া, অনেক তো ব্যবসা করছ, এইবার কিছু দাও। আত্তার তার হিসাবপাতিতে ব্যস্ত ছিলেন। ফকিরের দিকে উনি তাকাইলেন না। এইবার ওই লোক কিছুটা চড়া গলায় দেরহাম চাইলো আর বললো – মিয়া, সামান্য পয়সা দিতে যা অবস্থা, প্রাণ দিতে না জানি কেমন করবা। এই কথাটা আত্তারের কানে গেল। তিনি গলায় একটু ঝাঝ* নিয়া বললেন, তুমি যেমনে প্রাণ দিবা আমিও অমনেই দিবো। ফকির এই কথায় তার কাধের পুটলিটা নামাইলো আর তার উপর মাথা রাইখা চোখ দুইটা বন্ধ করলো এবং টুপ করে মইরা গেল।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

এই ঘটনায় আত্তার বড় রকমের ঝাকি খাইলেন। কয়েকদিন ভাবার পর উনি সব কিছু রাইখা জ্ঞান হাসিলের জন্য সেই সময়ের রেওয়াজমতো  এলমি-সফরে বের হন। দীর্ঘ যাত্রার পর প্রখ্যাত আলেম সুফি মাজদুদ্দীন বাগদাদীর হাতে বায়াত শেষে নিজের শহরে ফিরেন আর বিখ্যাত হন নিশাপুরের আত্তার নামে।

আত্তার তার সুফি কবিতা দিয়া পুরা ফার্সি কবিতার চেহারা পাল্টায় দেন। ফার্সি কবিতায় সুফি কবিদের মুরুব্বি সামাভীর তরল প্রকাশের পথে না গিয়া আত্তার পাখিগো কনফারেন্স ডাকলেন। পরে রুমি আইসা সেই পাখি সম্মেলনে মোহনীয় এক বাশি বাজাইলেন। লম্বা সময় ফার্সি চলা হিন্দুস্তানের বাংলা কবিতায়ও সেই সুর আইসা পড়লো কিছু; শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়ে ওঠলেন – “থাক থাক নিজ মনে দূরেতে, আমি শুধু বাশরীর সুরেতে, পরশ করিব ওর প্রাণমন অকারণ, মায়াবন বিহারীনি…।” অবশ্য উনার আব্বা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই একই কান্না পার হতে চাইছেন সুফি কবিতার সাকো দিয়া। বন্ধুমহলে উনারে ডাকা হইতো ‘হাফেজে দেওয়ান’ নামে। কারণ দেবেন্দ্রনাথ বিশ্বখ্যাত প্রেমের কবি হাফিজের কবিতা সংকলন ‘দেওয়ান’ ভালবেসে পুরাটা মুখস্থ করে ফেলছিলেন। আর শিরাজের হাফিজ ছিলেন আত্তারের অনুরক্ত, চিন্তায় ও ভাবে।

এইদিকে আত্তার তার আধ্যাত্মিক জীবনে বিশেষভাবে যেই কয়েকজন দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, তাদের মধ্যে হিজরী দ্বিতীয় শতকের সুফি কবি রাবেয়া বসরী (৯৯-১৮০ হিজরি) অন্যতম। রাবেয়ার প্রতি আত্তারের ভালবাসা ছিল তার কান্নার মতো গাঢ়। আত্তারের কবিতার বই অনেক থাকলেও গদ্যের বই মাত্র একটা। সময়ের বিশিষ্ট আলেম, বুদ্ধিজীবী আর সুফিদের জীবনী নিয়া রচিত ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ নামের এই কিতাবে রাবেয়া বসরীরে যতটা পারছেন তুলে ধরছেন আত্তার। দুই-একটা জায়গায় জনশ্রুতিরেও বিশেষ মূল্য দিয়া উল্লেখ করছেন। এইটা খুব সহজ একটা ব্যাপার – যেই লোক পাখিদের সম্মেলন ডাকতেছেন, তিনি মৃত হাসান বসরীর সাথে রাবেয়ার সাক্ষাতরেও দারুণ করে দেখবেন। প্রখ্যাত হাদিস শাস্ত্রবিদ ও সুফি কবি হাসান বসরী (রহ.) মারা গেছেন ১১০ হিজরীতে। তাই পরিণত রাবেয়ার সাথে হাসানের দেখা হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে না।

আমি আত্তারের ‘পান্দেনামা’ নামে একটা কবিতার বই পড়ি কৈশরে, যখন বয়স বারো কি তের। তার কবিতাগুলা ভালো লাগত খুব। ওইগুলা ছিল উর্দু গজলের মতো সুরেলা। আমরা মাদ্রাসার বাচ্চারা বিকালে ধানক্ষেতের বাতায় গিয়া বসতাম, নালায় বইতে থাকা সেচকলের টলমলা পানিতে পা ডুবায় দিতাম আর পান্দেনামার ফার্সি কবিতাগুলা গাইতাম।

তো এত বছর পর সেই আত্তারের সাথে ফের মোলাকাত, তার লেখার সামান্য হিস্যা অনুবাদের মধ্য দিয়া। এর পুরাটাই শ্রদ্ধেয় ইমরুল ভাইয়ের কারণে সম্ভব হইছে। উনি এমনকী তাজকিরাতুল আউলিয়ার দারুণ একটা ফার্সি এডিশনের পিডিএফও খুজে দিছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগের অধ্যাপক রেইনল্ড এ. নিকলসনের সম্পাদনায় সংকলনটা লন্ডন থেকে বের হইছে ১৯০৫ সালে। এর শুরুর ভূমিকায় দারুণ সব ওয়াজ করছেন ফার্সি ভাষার পন্ডিত মির্জা মুহাম্মাদ কাজভিনী।

তাজকিরাতুল আউলিয়া বাংলা ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন গিরিশ চন্দ্র সেন, তাপসমালা নামে, ১৮৮০ সনে। বাহ্মধর্মে দীক্ষিত গিরিশ চন্দ্র তার অনুবাদে নানাভাবে আত্তারের লেখারে প্রাণহীন করছেন এবং পৌরণিক কাহিনী বানায় ফেলছেন, উনি এর ভেতর দিয়া বাহ্মধর্মের গোড়াটারে মজবুত করতে চাইছেন। বাদবাকি যেই অনুবাদগুলা বাংলাদেশের বাজারে আছে, সোলেমানিয়া বুক হাউজ আর রাবেয়া বুক হাউজের, একদমই আন্দাজি, নিজেদের মতো বানানো – ‘এক দেশে ছিল এক বাঘ’ টাইপের। এইজন্য যখন ইমরুল ভাই তাজকিরাতুল আউলিয়া থেকে দুই চারজনের জীবনী অনুবাদ করে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন, আমি সাথে সাথেই রাজি হইছি। 

রাবেয়া বসরীর কিছু কবিতা* আছে, যেইগুলা উনি আরবি জবানে লিখছিলেন। তার আট দশ লাইন যদি মরহুমার জীবনী শুরুর আগে পড়ে নেওয়া যায়, তো খারাপ হয় না।

 

আত্মার ক্ষতগুলা শেয়ার করতে

জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হইলো নিজের ইচ্ছারে ঠিক করা
আমি খুব ঘুরতে ছিলাম, বেচাইন হয়ে আন্ধার মতো বইসা ছিলাম একগাদা অন্ধকার নিয়া
কিন্তু আমি আমার ইচ্ছা জানতে পারলাম যখন তোমার ইচ্ছা জানতে পারলাম
আর তুমি ছাড়া অন্যসব সংযোগ বেখেয়ালি বাতাসের মতো উইড়া গেল

আমি তোমারে ডাকি নিজের আত্মার ক্ষতগুলা শেয়ার করতে

আর তোমারে গোপন কইরা রাখি চোখের পাতায়
এর পুলক তুমি টের পাও, আর আমি তা জানি

আমি তোমারে ভালবাসি তুমি এর যোগ্য আর তুমি আবেগী
আবেগের জন্য আমি নিজেরে ডুবাই রাখি তোমার সময়ে
তোমার উধাও হয়ে থাকা আমাদের দেখা হওয়ার খবর দেয়
এইটা তোমার গুণ, তুমি এইজন্যই এত উপযুক্ত
এখন তোমার জন্য যা ঠিক, আমার জন্য তা নিষিদ্ধ
আর তুমি এইটার যোগ্যও।

আমার খুব আকাঙ্খা জ্বরগুলারে ছোয়ার
যেন জীবনের আগুন তোমার আলোয় মিশে যায়
আর আমি নিজের আবেগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাই না
তুমি যা চাইছো যেভাবে, সব ঠিক আছে।

 

হাসসান আতিক

 

* চাঁদ ছাড়া আর কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু না ব্যবহারের রীতি মানা হয়েছে
* রাবেয়া বসরীর এই পঙ্ক্তিগুলা সম্প্রতি মিসরের গবেষক ও ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ শাবান আইয়ুবের সম্পাদনায় আল জাজিরায় প্রকাশিত।

 

 ……………………………………

 

সে এক নুক্তাবিহীন আলিফের মতো

রাবেয়া বসরী ছিলেন তার মা-বাপের চতুর্থ মেয়ে। রাবেয়া মানেও চতুর্থ। জন্ম থেকেই তিনি একটা সংখ্যার নাম পাইলেন। যারে তিনি টানতে টানতে একসময় এক-এ নিয়া তুললেন। আর একটা আলিফের মতো নুক্তাবিহীন হয়ে থাকতে থাকলেন এই এতদিন পরও।

রাবেয়ার জন্ম হইছিল গরিব বাপের ঘরে। তিনি যে রাতে জন্মাইলেন, ঘরে বাতি জ্বালানোর মতো তেল ছিল না। তার বাপরে তার মা যাইতে বললেন পড়শির বাড়ি, তেল ধার চাইতে। কিন্তু রাবেয়ার বাপ ওয়াদা করছিলেন জীবনে আর ধার চাইবেন না কারো কাছে, খোদা ছাড়া কারো কাছে হাত পাতবেন না। তবু আসন্ন সন্তানের জন্য বিবির অনুরোধে যাইতে হইলো। তবে তিনি পড়শির দরজায় টোকা দিলেন না, শুধু হাতের তালু দিয়া নিরবে ছুঁইলেন। আর ফিরা আসলেন এবং কানতে কানতে একসময় ঘুমায় গেলেন।

চোখের পানি কোটরে কিছুটা শুকায় আসছে কিংবা তখনও চোখের পাতা ভিজাই ছিল, উনি একটা স্বপ্ন দেখলেন। তার স্বপ্নে স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চইলা আসছেন। আর তারে বলতেছেন, ও মিয়া কানতেছ কেন!  বড় আলোর কাছে সব সময় ছোট আলো নিভা যাইতে চায়। তোমার ঘরে এক বিশেষ মানুষের জন্ম হইতেছে। যার সুপারিশে আমার হাজারো উম্মত কঠিন হাশরের দিনে নাজাত পাবে। ওঠো, আর বসরার গভর্নর ঈসার কাছে যাও। একটা চিঠি তারে দিও।

চিঠিতে লেখবা – ‘তুমি প্রতি রাতে ঘুমের আগে ১শ বার নবীর নামে দরুদ পইড়া থাকো, আর জুমার রাতে পড় ৪শ বার। গত জুমায় তুমি দরুদ পড় নাই। তার বদলায় ৪শ দিনার দান কর।’

রাবেয়ার বুযুর্গ বাপ এইটুকু দেখার পর জাইগা উঠলেন এবং ফের কানতে থাকলেন। তার চোখের পানিতে দাঁড়ি ভিজা যাইতেছিল। সকাল হইলে তিনি চিঠিটা লিখলেন। আর ডাকের মাধ্যমে পাঠায় দিলেন। বসরার গর্ভনর রাসুলের পয়গামে খুশিতে আত্মহারা হয়ে তৎক্ষণাত দরবেশদের মাঝে ২ হাজার দিনার বিলি করলেন। আর লোক মারফত ৪শ দিনার পাঠাইলেন রাবেয়ার বাবার কাছে। এর কিছুক্ষণ পর নিজে হাজির হয়ে বললেন, আপনার যখন যা কিছু লাগে, আমারে জানাবেন। আমি আপনার খেদমতের জন্য হামেশা তৈরি। আপনার জন্য আমার দরবারের কোনো দরজায় খিল নাই বলে জানবেন। এরপর গর্ভনর বিদায় নিলে রাবেয়ার বাবা দরকারি সব সামানপাতি কিনা আনলেন। আর কাঁদতে থাকলেন, যতটা কাঁদা যায় মনের ভিতর। Continue reading

অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (১)

বাংলাদেশে সিনেমা কিন্তু খুব কমই বানানো হইছে। ১৯৫৬-২০০৬, এই ৫০ বছরে ২৪৩২টা বাংলা সিনেমা রিলিজ হইছে সিনেমা হলগুলাতে। (বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, পাঁচ দশকের ইতিহাস, ২০১০)। বাজারের কথা যদি ধরেন, ২০১৮ সালে হলিউডের বিজনেস সাইজ ছিল ১১ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার, বলিউডের ২.৩২ ট্রিলিয়ন (উইকিপিডিয়া), আর বাংলাদেশের কোন ডাটা নাই কিন্তু ২০১৮ সালে রিলিজ হইছিল ৬৩টা সিনেমা, হিসাব-টিসাব বাড়ায়া গড়ে ১ কোটি টাকা ধরলেও ৬৩ কোটি টাকার মার্কেট, ১ কোটি ইউএস ডলারও হয় না, বিলিয়ন-ট্রিলিয়নের হিসাব তো অনেক পরে।… তারপরে পুরষ্কার-টুরষ্কার পাওয়া বা সেনসেশনের কথাও যদি বলেন, এমন ৪/৫টা বাংলাদেশি সিনেমার নাম বলাটাও তো কঠিন, যেইগুলা দুনিয়ার সিনেমা ইতিহাসের কথা বলতে গেলে আসতে পারে। মানে, বিজনেস বলেন আর আর্ট-কালচার বলেন, যে কোন প্যারামিটারেই বাংলাদেশি সিনেমার কোন ‘গৌরবোজ্জ্বল’ অবস্থা নাই, কোনদিন তেমন একটা ছিলও না। কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টের মিডিয়াম হিসাবে সিনেমা তো ইর্ম্পটেন্ট একটা জিনিস, এবং এই দেশের মানুশ খরচও কম করেন না এন্টারটেইমেন্টের পিছনে, তো এই কারণে  বাংলাদেশি সিনেমা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠার সম্ভাবনার ভিতরে ছিল, এখনো আছে।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

কিন্তু বাংলাদেশি সিনেমা নিয়া কথা বলার সবচে বড় মুশকিল হইলো, ইনফরমেশন নাই।  উইকিপিডিয়া বা অন্য এভেইলেবল সোর্সগুলাতেও সিনেমার নাম-টাম বাদে বাংলাদেশি সিনেমার তেমন কোন ইনফরমেশন-ই পাইবেন না: যেমন, কতো টাকা বাজেট ছিল, কতো টাকা ইনকাম হইছে, কয়টা হলে চলছে, কাহিনি কি ছিল বা ইমপ্যাক্ট কি রকম… এইরকম কিছু পাওয়া মুশকিলই। আর ইনফরমেশন যেহেতু ‘জ্ঞান’ না, এই কারণে কেউ একসাথে করার বা রাখার কথা ভাবেন নাই মনেহয়। 🙁

কিন্তু ‘জ্ঞানে’র আলাপ করতে গেলেও ইনফরমেশন কম-বেশি তো লাগে আসলে।… তো, এই কম ইনফরমেশনের বেসিসেই বাংলা সিনেমার হিস্ট্রি নিয়া কিছু কথা বলতে চাইতেছি।

 

শুরু কোনটা?

কোন টাইমলাইন থিকা আলাপ’টা শুরু করতে চাই – এই ডিসিশান’টা জরুরি। তো কনসাশলিই, আলাপ’টা ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থিকা শুরু না কইরা পূর্ব পাকিস্তান পিরিয়ড থিকা শুরু করতে চাইতেছি। কারণ রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের শুরুটা ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার ভিতর দিয়াই, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন দিয়া না। এর আগে বা পরেও আরো হিস্ট্রিক্যাল ঘটনা অবশ্যই আছে, কিন্তু এই ২০২০ সালে যখন বাংলাদেশ বইলা একটা রাষ্ট্র আছে, এর পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি হিসাবে ১৯৪৭’রে একটা গোড়া হিসাবে মানতে পারাটা দরকার বইলা মনে হইছে আমার কাছে। এর বাইরে, কেউ যদি আরো আগে যাইতে চান, সেই হিস্ট্রি তো পাইবেনই অন্য বই আর লেখাপত্রে। তারপরও শুরু’র আগের জায়গাটা নিয়া কিছু কথা বইলা রাখতে চাইতেছি।

হীরালাল সেন। ছবি: উইকিপিডিয়া থিকা নেয়া।

হীরালাল সেন। ছবি: উইকিপিডিয়া থিকা নেয়া।

যেমন, ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন কিছু সাইলেন্ট ফুটেজ বানাইছিলেন (Dancing Scenes from the Flower of Persia, https://bit.ly/31rBihR), তো, উনি ঢাকার নবাবগঞ্জের লোক ছিলেন বইলা উনার বানানো সাইলেন্ট মুভিরে ‘বাংলা সিনেমা’ হিসাবে দাবি করার কিছু নজির আছে। কিন্তু অই ফুটেজ যেহেতু এভেইলেবল না এখন, অইখানে বাংলায় লেখা কোন ইন্টার-টাইটেল ছিল কিনা শিওর না আমি। তো, শুধুমাত্র বাংলাদেশের একজন লোক বানাইছেন বইলা তারে ‘বাংলা সিনেমা’ বলাটা হয়তো টাফ হবে; তার উপরে দেখেন, টাইটেল কিন্তু ইংলিশেই। ১৯১৩ সালে প্রথম যে ইন্ডিয়ান সিনেমা বানানো হয় “রাজা হরিশচন্দ্র” নামে সেইটার ইন্টার-টাইটেল ছিল ইংলিশ, মারাঠী আর হিন্দি’তে। তারপরে ১৯১৭ সালে বানানো “সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র’রে ফার্স্ট ইন্ডিয়ান সিনেমা বলা হয়, সেইখানে বাংলা ইন্টার-টাইটেল ইউজ করা হইছিল। (https://bit.ly/2DjG09s)। এরপরে ১৯১৯ সালে বিল্বমঙ্গল সিনেমার নাম আসে আর অনেকগুলারে সাইলেন্ট মুভি যেইগুলারে ‘বাংলা সাইলেন্ট ফিল্ম’ বইলা দাবি করা হইতেছে (https://bit.ly/2EToU2p) । ধারণা করি, হয় এদের ইন্টার-টাইটেলগুলা বাংলায় লেখা ছিল, বা এইগুলা কলকাতার স্টুডিও’তে বানানো হইছিল।

Continue reading

সিলেটের মণিপুরিদের ঝুলন জগোই

মনিপুরি কালচার নিয়া এই লেখাটা খাশ বাংলায় লেখা হয় নাই। বাংলাদেশের অন্য ভাষার লোকজন যাতে খাশ বাংলা’তে ইজিলি লিখতে পারেন, সেই স্পেইস তৈরি করতে চাইতেছি আমরা; এখন এই স্পেইস যেহেতু পুরাপুরি বানাইতে পারি নাই, এই কারণে এই লেখাগুলা বাদ দিতে চাই না আমরা। বাংলা-ভাষার এখনকার টেনশনগুলাতে অন্য ভাষার রাইটারাও নজর দিবেন – এইটা কিছুটা বাড়তি চাওয়া-ই; কিন্তু আমাদের এক্সপেক্টশন আছে, যদি খাশ বাংলার স্ট্রাকচারটারে স্পষ্ট করতে পারি আমরা আমাদের লেখালেখি আর বলাবলি’র ভিতর দিয়া, সেইটা এতোটা ‘বাড়তি’ জিনিস হয়া থাকতে পারবে না আর!

……………………………….

 

সিলেটে বসবাসকারী মণিপুরিদের অনন্য এক নৃত্য উৎসব ঝুলন জগোই। বাংলাদেশের অন্য কোথাও, এমনকী মণিপুরিদের মূল আবাসস্থল মণিপুরেও (যেখান থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এবং কারণে বাংলাদেশসহ আরও কিছু স্থানে মণিপুরিরা অভিবাসিত হয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করে) এই ঝুলন জগোই-এর প্রচলন নাই। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]

ঝুলন জগোই এর সময়কাল শ্রাবণ মাস। শ্রাবণ মাসের শুক্লা তিথিতে, একাদশী থেকে পঞ্চদশী পর্যন্ত চলে ঝুলন যাত্রা। এই পাঁচদিনের মধ্যে পঞ্চম দিনে, অর্থাৎ শ্রাবণ পূর্ণিমাতে ঝুলন জগোই চলে সারা রাত অবধি — ভোরের প্রথম আলো না ফোটা পর্যন্ত।

 

ঝুলনের গল্প

ঝুলন জগোই-এর ধারা গড়ে উঠেছে ভাগবত পুরাণ অবলম্বনে। ভাগবত পুরাণের মতে, রাধা তার সখিদের নিয়ে কুঞ্জবনে যেতে চান। তাঁর ধারণা, কৃষ্ণ সেখানেই আছেন। কারণ তাঁর বাঁশীর সুর রাধা ক্ষণে ক্ষণে শুনতে পান। সখিদের তিনি বলেন:

        চল চল সখি যাই ঝুলনে/ ঝুলাব প্রাণ বন্ধুয়া সনে
        গুরু পরিজন করিল শয়ন/ নগর নীরব হইল এখনে
        করে আকিঞ্চন হইয়ে বিভোর/ আর কি রহিব দহে ভূবনে
        বাজিছে সংকেত রবে সে বাঁশী/ বৈর হয়ে নীরব প্রেয়সী…

ঝুলনের আরেকটি গানে বর্ণীত হয়েছে রাধার কুঞ্জবনে যাওয়ার কথা। রাধা চলেছেন তার দুই সখি ললিতা ও বিশাখার হাত ধরে। গানের ভাষায়:

চলে প্রেমময়ী রাই/ দক্ষিণে ললিতা বামে বিশাখিকা/ মধ্যে চলে ধনি রাই

কিন্তু কুঞ্জবনে গিয়ে হতাশ হতে হয় তাঁদেরকে। কৃষ্ণ সেখানে নাই।

সখিদের নিয়ে রাধা তখন কৃষ্ণকে ডাকতে থাকেন। রাধার আকুল আবেদন, কুঞ্জবনে উপস্থিত হয়ে, মিলনাভিসার রচনা করে, শ্রাবণের এই পঞ্চদশী পূর্ণিমার রাতে কৃষ্ণ যেন তাঁর তৃষ্ণার্ত হৃদয় সিক্ত করে দেন ভালোবাসার অমৃতধারায়। কিন্তু তবু কৃষ্ণের দেখা নাই।

কোনো সাড়া না পেয়ে সখিগণ রাধাকে একাই চড়িয়ে দেন দোলে — রাধাকৃষ্ণের যুগলদোলনের জন্যে রচিত হয়েছিল যে দোল। সখিরা দোল দিতে থাকেন দোলে। দোলের দ্রুততায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে রাধা ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরেন দোলের দড়িকে। ভয় কেটে গেলে চোখ মেলে রাধা দেখেন, দোলের মধ্যে তিনি জড়ায়ে ধরে আছেন নাগর কিশোর শ্রীকৃষ্ণকেই। কৃষ্ণের এমন অলৌকিক এবং আকস্মিক আগমনের কথা ঝুলনের গানে ফুটে উঠেছে:

রাধারে দেখিয়া নাগর উঠিয়া আসিল কুঞ্জভূবনে

এভাবে রাধার ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষ্ণ ঠিকই চলে আসেন কুঞ্জবনে। আর রাধা-কৃষ্ণের এই মিলনানন্দে রাধার সখিরা তাদেরকে হিন্দোলে ঝুলিয়ে আনন্দনৃত্য করতে থাকেন।

রাধার সখিদের এই আনন্দনৃত্যই ঝুলন রাস। রাধা-কৃষ্ণকে হিন্দোলে দুলিয়ে, তাদের অপার্থিব প্রেমমিলনের আনন্দে আনন্দিত হয়েই সখিদের এই আনন্দ নৃত্য।

ভাগবত পুরাণের এই গল্পের অনুকরণে মণিপুরিরা ঝুলন জগোই-এর আয়োজন করে থাকে। দোলনায় রাধাকৃষ্ণের প্রতীকী মুর্তি বসিয়ে, তাদের সামনে রাধার সখিরূপী গোপীরা নাচতে থাকেন।

 

ঝুলনের ইতিহাস

কবে, কখন, কীভাবে ঝুলন রাস শুরু হয় সে ইতিহাসের সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। বহুকাল ধরে সিলেটে এ উৎসব চলে আসছে। এখনো যারা বেঁচে আছেন তাদের সবাই-ই জন্মাবধি এই উৎসব দেখে আসছেন। সঠিক কোনো ইতিহাস লিপিবদ্ধও নেই। তবে আনুমানিক হিসেবে বলা যায়, প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিলেটে এই ঝুলন রাস পালিত হয়ে আসছে। কেউ কেউ মনে করেন ঝুলনের সূত্রপাত ত্রিপুরা থেকে। Continue reading

ঢাকার আর্ট সিনে নতুন কালারিস্ট জে জে আর্ট

ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকেই শিল্পীদের মাঝে বিশেষত চিত্রশিল্পীদের মধ্যে এক অলিখিত অথচ দৃশমান বিভাজন থাকত রঙ ও রেখা বিষয়ে। চিত্রকলায় রঙ প্রধান না রেখা প্রধান এই ছিল বিভাজন, তর্ক। শিল্পীদের মাঝে এই নিয়া যেমন তর্ক চলত তেমনি দর্শককুলের মাঝেও তা নিয়া তর্ক থাকত, ক্ষেত্র বিশেষ অনেকটাই হট টপিকের মত জনতার মুখে মুখে তা উচ্চারিত হইত। বিশেষত মাইকেল এঞ্জেলো ও রাফায়েলের কাজ নিয়া। এঞ্জেলো রেখা প্রধান আর রাফায়েল রঙ প্রধান। রাফায়েল ও এঞ্জেলো থেকে এই তর্ক জনতার মাঝেও সংক্রামিত হইত। রেখা প্রধানকে ধরা হত ক্লাসিকাল আর রঙ আধুনিক। এই তর্কের ধারাবাহিকতাতে সেখানে এর পরের ২ মাস্টার শিল্পী রুবেন্স ও পশিন এরা ১৭ শতকের এবং এই ধারাবাহিকতার শেষ ২ মাস্টার শিল্পী দেলাক্রয়ে ও ইনগ্রেস ১৯ শতকের। যথাক্রমে রুবেন্স ও দেলাক্রয়ে রঙ প্রধান ও আধুনিক এবং পশিন ও ইনগ্রেস রেখা প্রধান ও ক্লাসিসিস্ট। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]

রেনেসাঁ থেকে চলতে থাকা এই তর্ক তাদের শিল্পের “আধুনিক”(ফরমালিস্ট) পর্বেও সমান গুরুত্ব নিয়া হাজির ছিল বিশেষত ইম্প্রেশনিজম ও পোস্ট ইম্প্রেশনিজমে। ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাজে যেমন রঙ প্রধান তেমনি রেখা ও গড়ন গুরুত্বহীন। তাদের এই রেখা ও গড়নের গুরুত্বহীনতাকে সমস্যা দায়ক হিসাবে চিহ্নিত করে তা থেকে বের হয়ে আসছিল রেনোয়া, মানে সহ আরো প্রমুখ শিল্পী এবং পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের প্রায় প্রত্যেকেই রঙের সাথে সাথে রেখা ও গড়নকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিল। পল গগা, ভ্যন গখ প্রমুখ শিল্পী এই পথেই হেটেছিলেন।

আর এই পথের দিশা ছিল তাদের কাছে প্রাচ্যের শিল্পকলা।

সমগ্র প্রাচ্যেই চিত্রকলা আদতে কন্সেপচুয়াল যা রেনেসাঁ থেকে শুরু হওয়া দৃশ্যগত বাস্তবতার বিপরিত ধর্মী বা ভিন্ন। প্রাচ্য চিত্রকলা বুঝতে রঙ রেখা ও রুপ/অবয়বকে বুঝেছে। চিত্রকলায় তাই অবয়ব নির্মাণে রঙের সাথে সাথে পরিলেখ বা আউটলাইন দিত, দেয়। চিত্র নির্মাণে এই তিন এলিমেন্টসই সমান গুরুত্ব নিয়া হাজির থাকে। যেমন আমাদের রিক্সা চিত্র। আর ইউরোপের শিল্পীদের মাঝে এই প্রবণতা জাপানিজ ছাপচিত্রের প্রভাব থেকে এসেছিল। বস্তুত কেবল প্রাচ্যই নয় এমন কি তা তাবত পৃথিবীর আদিবাসিদের কাজেও এই রঙ, রেখা ও রুপ/আকৃতি/অবয়ব একত্রে হাজির থাকত, থাকে। কেবল মাত্র ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও তাদের ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্য অর্থাৎ গ্রিকে চালু হওয়া এই চোখে দেখার বাস্তবতা পূর্ণ ইমেজে রঙের আভার সাহায্যেই বস্তুর আকৃতি ও রূপ তৈরি করত এবং রেখা অনুপস্থিত থাকত।

ফলে, ১৯ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপিয় শিল্পকলায় প্রাচ্য, আদিবাসি সহ তাদের উপনিবেশায়ীত অঞ্চলের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রভাব বা গ্রহণ চলতে থাকে ও আধুনিক মাস্টার শিল্পীদের কাজে রেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু চিত্রকলা যেহেতু ব্যক্তির সহজাত প্রবণতাও ফলে আধুনিক পর্বেও আমরা কিছু শিল্পী পাবো যাদেরকে আমরা ঐ রঙ প্রধান বা রেখা প্রধান চিত্র নিয়া হাজির হতে দেখবো। যেমন মাতিস রঙ প্রধান। আবার পিকাসো ও কান্দেনিস্কি রঙ ও রেখা উভয়কে গুরুত্ব দিয়েছে তাদের চিত্রে। শিল্পীর সহজাত ও সতস্ফুর্ত প্রকাশ হওয়াতে এই রঙ প্রধান বা রেখা প্রধান কাজ যে খুব একটা সচতেন প্রকাশ হয়তো না, অনেকটাই অটোনোমাস।

বাংলাদেশের শিক্ষায়তন কেন্দ্রিক শিল্পীদের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। এস এম সুলতান, কামরুল হাসান এই কাতারের, তাদের কাজে রঙ রেখা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম ও সাম্প্রতিক সময়ে রনি আহমেদের কাজেও রঙ ও রেখা উভয়ই প্রধান। অন্যদিকে জয়নুল ও শিশির রেখা প্রধান। জয়নুল ও শিশিরের কাজে যে রঙ নাই তা নয়, তাদের উভয়েরই কিছু সিরিজে রঙ ও রেখা উভয় থাক্লেও মূলত এই দুই শিল্পীর সিগ্নেচার মূলক কাজগুলা রেখা প্রধান। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →