১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি থিকা “আঞ্চলিক ভাষার অভিধান” ছাপা হয়। তখন বাংলা একাডেমির পরিচালক আছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। আর এই ডিকশানি প্রজেক্টের প্রধান সম্পাদক আছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। উপদেষ্টা কমিটিতে মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী ও কাজী দীন মুহম্মদ ছিলেন।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]
তো, উনারা যেইটা করছেন, ভাষার ব্যাপারটারে পয়লাই ছড়ায়া দিছেন বা রিডিউস কইরা নিয়া আসছেন – “আঞ্চলিক” ব্যাপারটার ভিতরে। কলকাতার কলোনিয়াল কারখানার লোকজন যেই বেইজটাতে জোর দিছিলো যে, “বাংলা হইতেছে সংস্কৃতির দুহিতা” – এই আলাপের বেইজটার বাইরে উনারাও যাইতে পারেন নাই; উনারা ফাইট দিছেন সংস্কৃত শব্দের লগে “সর্বজনবোধ্য আরবী-ফারসী শব্দ” নিয়া; যে, এইগুলাও বাংলা-ভাষা; তো, এইগুলা যে বাংলা-ভাষা না – তা না, কিন্তু ভাষা জিনিসটা খালি এইরকম শব্দ দিয়া ডিটারমাইন্ড করার ঘটনা তো না। 🙁
সৈয়দ আলী আহসান ক্লেইম করছেন যে, “আঞ্চলিক” শব্দগুলারে ডিকশনারিতে নেয়া হয় নাই “অসাধু” বইলা, কিন্তু শুরুর দিকে বিদেশিরা যেই ডিকশনারী বানাইছিলেন, সেইখানে এই “আঞ্চলিক” শব্দগুলা কিন্তু ছিল! মানে, বিদেশিরা বাংলা-ভাষায় যেই শব্দ ইউজ হইতেছে নানান এলাকায় সেইগুলারে বাংলা-শব্দ মনে করছে, কিন্তু যখন কলকাতার কলোনিয়ান কালচারে যেই একটা ভাষা প্ল্যানিং হইছে সেইখানে অই শব্দগুলা বাংলা-শব্দ হইতে পারে নাই। একইভাবে, সৈয়দ আলী আহসান একটা ভাষা প্ল্যানিংয়ের কথাই কইতেছেন; কিন্তু আনফরচুনেট জিনিস হইলো, এই শব্দগুলারে সরাসরি বাংলা-শব্দ কইতে পারতেছেন না আর, বলা লাগতেছে “আঞ্চলিক শব্দ”। 🙁 মানে, ভাষা-প্ল্যানিংয়ের যেই ফ্রেম, যেই বেইজ, সেইখানে ক্রিটিক্যাল হইতে আর রাজি হইতে পারতেছেন না।
শব্দগুলারে ঠিক বাংলা-শব্দ হিসাবে না দেইখা যে দেখতেছেন “আঞ্চলিক” শব্দ হিসাবে। সেইখানে উনারা নিজেরাই একটা ইনফিরিয়র পজিশনরে বাছাই কইরা নিতেছেন নিজেদের জন্য। উনারা এক ধরণের “আঞ্চলিকতা”রে বাঁচাইতে চাইতেছেন বা আইডেন্টিফাই করতেছেন, মূল বা সেন্ট্রাল বাংলা-ভাষারে ডির্স্টাব না কইরা। ভাষা-প্ল্যানিংয়ে উনারা যে বাংলা-ভাষারে ডিফাইন করার সাহস দেখাইতে পারেন নাই, সেই কারণে এই প্রজেক্টটা একটা সাইড-লাইনের জিনিস হয়াই রইছে। সোকল্ড ”শুদ্ধ” বাংলাভাষা যে আরেকটা ডায়ালেক্ট বা আঞ্চলিক ভাষা, এইটা কইতে না পাইরা অন্য সব ডায়ালেক্টগুলারে আঞ্চলিক ভাষা বইলা যাইতে হইতেছে এখনো।
কিন্তু উনাদের এই কাজের এটলিস্ট তিনটা সিগনিফিকেন্স আছে বইলা মনে করি –
১. অথরিটি ক্লেইম করা: এই ডিকশনারি ছাপানোর ভিতর দিয়া বাংলা একাডেমি বা তখনকার পূব পাকিস্তান পয়লা তার অথরিটি ক্লেইম করে। অই সময়ে অন্য যেই সব ডিকশনারি ছিল বাংলাভাষার, তার সবগুলাই কলকাতার প্রডাকশন, এর বাইরে ১৯৫৩ সালে কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দ বাদ দিলে, বাংলাদেশে লেখা কোন ডিকশনারিই ছিল না ; তো, এই যে একটা ডিকশনারি তৈরি করা, এইটা নিজেদের অথরিটি ক্লেইম করার একটা ঘটনা তো! পলিটিক্যালি ইর্ম্পটেন্ট জিনিস একটা।
২. ভাষার ভিতরে পাবলিকরে নিয়া আসা: এই ডিকশনারির একটা ক্লেইম খুবই ক্লিয়ার যে, এই শব্দগুলা মানুশ বলে! যদিও সাহিত্যে ইউজ করার জন্য বানাইতেছেন, কিন্তু পাবলিক বলে বইলা এইগুলারে নিতেছেন উনারা। এই যে, ভাষার ভিতরে পাবলিকের এগজিসটেন্সটারে স্বীকার করা – এইটা সিগনিফিকেন্ট একটা ঘটনা। মানে, সংস্কৃত থিকা আসা বা আরবি-ফারসি শব্দ – এইসব ক্যাটাগরি হিসাবে না দেইখা, পাবলিকে বলে – এইটারে নেয়াটা, ভাষা নিয়া আলাপের বেইজটারে একভাবে চেইঞ্জ করার ঘটনা।
৩. এই অভিধান একটা টেম্পোরারি ঘটনা: খুবই সুন্দর একটা কথা কইছেন সৈয়দ আবুল আহসান – “…সময় সাপেক্ষ হইলেও পরস্পরের এই ব্যবহারের ফলে সৰ্বাঞ্চলবােধ্য একটি ভাষারীতি গড়িয়া উঠা সম্ভব হইবে বলিয়া আশা করা যায়। …একাডেমীর এই প্রচেষ্টা ‘পূর্ব পাকিস্থানী বাংলার আদর্শ অভিধান’ পরিকল্পনার অংশ বিশেষ।” মানে, এই আঞ্চলিক ভাষার অভিধানটা আল্টিমেট কোন ঘটনা না, বরং একটা ‘আদর্শ’ অভিধানে যাওয়ার একটা রাস্তা।
কিন্তু এই ডিকশনারি এখনো যে “আঞ্চলিক” হয়া আছে, আর আমরা যে ক্যাটাগরি হিসাবে এখনো আমরা “আঞ্চলিক ভাষার” মুড়ি খাইয়াই যাইতেছি, এইটা উনাদের ভাষা প্ল্যানিংয়েরই লিগ্যাসি একটা।
২.
এইখানে ভাষা ও সাহিত্য নিয়া আরেকটা আলাপ আছে। সৈয়দ আলী আহসান ধরে নিছেন যে, এই ডিকশনারি সাহিত্যিকরা ইউজ করতে পারবে, আর সাহিত্যে ইউজ হওয়া শুরু হইলে সাহিত্যের কমন জায়গা থিকা এই “আঞ্চলিকতা” একটা কমন ভাষার দিকে যাইতে পারবে। কিন্তু ঘটনাটা যে এইরকমের লিনিয়ার না, সেইটা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও বলছেন, “…কোনও একটা উপভাষাকে ভিত্তি করিয়া রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাহিত্যিক প্রভাবে সাহিত্যিক ভাষা গড়িয়া উঠে।“
কিন্তু তারপরও সাহিত্যে ইনক্লুড হওয়াটারে উনারা গুরুত্ব দিছেন। অ্যাপিয়েরন্সের কারণে এই ইল্যুশনটা হয় যে, সাহিত্যটারেই ভাষা বইলা মনে করি আমরা। মানে, সাহিত্য দিয়া ভাষা তৈরি হয় না, সাহিত্য ভাষার একটা ঘটনা। কিন্তু লিখিত সাহিত্য দিয়া যা হয় ভাষারে একটা ‘জাতে’ তোলার ঘটনা ঘটে। তো, সৈয়দ আলী আহসান ভাষারে জাতে তুলতে চাইতেছেন আগে। আর এইটা বাজে ঘটনা না অবশ্যই; কিন্তু পদ্ধতি হিসাবে একই। যার ফলে এই পদ্ধতিতে হিন্দু ব্রাহ্মণের জায়গায় মুসলিম আশরাফরা চইলা আসেন, অটোমেটিক্যালি। ভাষাটা “আঞ্চলিক”-ই থাইকা যায়, সবসময়।
৩.
তো, ব্যাপারটা হিস্ট্রিটারে আন-ডু করার ঘটনা না; বরং নতুন একটা জায়গা থিকা রিড করার ঘটনা। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একটা রিডিং করছেন বাংলা-ভাষার। দেখাইতেছেন, কোন জায়গায়, কেমনে শুরু এই বাংলা-ভাষার; পলিটিক্যালি বৌদ্ধ রাজাদের আমলে গৌড় এলাকায় এর ইউজ বাড়তে থাকে, কিন্তু হিন্দু রাজাদের আমলে এরে ইনফিরিয়র কইরা রাখা হয়; মুসলমান রাজারা এরে দরবারে তোলেন (“কৃত্তিবাস গৌড়ের জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের (১৪১৮-১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দ) আদেশে বাংলা ভাষায় রামায়ণ রচনা করেন।”); শ্রীচৈতন্যের কারণে একভাবে নদীয়া’রে বেইজ কইরা বাংলা-ভাষার সেন্টার গইড়া উঠে; পরে কলকাতা রাজধানী হয়া উঠলে অইখানে ‘সাধু-ভাষা’র রাজত্ব শুরু হয়, যেইখান থিকা ক্রিয়াপদ চেইঞ্জ কইরা সাধু-ভাষার “সহচর” চলিত-ভাষা চালু হয়। যেইটারে এখন বাংলা-ভাষা বইলা জানি আমরা।
এইখানে একটা জার্নি আছে ভাষার, একটা রিডিং আছে হিস্ট্রির এবং উপভাষাগুলা থিকা শব্দগুলা ভাষাতে আসতেছে, এমনকি বিদেশী শব্দগুলা আগে ইউজ হইতেছে, বলাবলি হইতেছে, তারপরে একটা চেইঞ্জের ভিতর দিয়া ভাষাতে আসতেছে। মানে, ভাষা জিনিসটা অনেকগুলা ডায়ালেক্টের মিলমিশের ভিতর দিয়াই ভাষা হয়া উঠতেছে।
এখন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যে “পূর্ব পাকিস্তানী বাংলার আদর্শ অভিধানের প্রথম খন্ড“ লিখতে পারতেছেন এইখানে ভাষার বাইরেও পলিটিক্যাল জায়গাটা তো আছে। অথচ মনে হইতে পারে এইটা যেন খুবই “স্বাভাবিক“ জিনিস বা ভাষাবিজ্ঞানের ঘটনা। আমরা ধারণা, এই সিলসিলা এখনো জারি আছে। সৈয়দ আলী আহসান আর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ যেই সাহস করছিলেন, যেই ভাষা-প্ল্যানিংয়ের কথা ভাবছিলেন, সেইটারে ‘ভুল’ ভাইবা বাদ দিতে পারছি আমরা; মনে করতে পারতেছি যে, অইটা তো পাকিস্তানি আমলের প্রজেক্ট একটা, এইরকম। 🙂
কোন সাহিত্য পলিটিক্যালি ইনফ্লুয়েন্সড (যেইরকম,মার্কসিস্ট সাহিত্য) হইলেই যেমন ‘ভালো-সাহিত্য’ হয়া যায় না, একইভাবে কোন চিন্তা একটা পলিটিক্যাল আমলে শুরু হইছিল বইলা বাতিল হইতে পারে না। এই ডিফরেন্সগুলারে বুঝতে পারা আর কাজগুলারে আগায়া নিয়া যাইতে পারা বরং দরকারি ঘটনা।
আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের জায়গা থিকা “আঞ্চলিক” বইলা যেই ক্যাটাগরি, সেইটারেই ক্রিটিক্যালি দেখতে চাই আমরা। এমন না যে, আঞ্চলিক ভাষা বইলা কিছু নাই, বা ডায়ালেক্টগুলা এগজিস্ট করে না, বরং কি কারণে একটা ডায়ালেক্ট প্রমিনেন্ট হয়া উঠে, ‘শুদ্ধ’ বা ‘সাধু’ বইলা মনে হইতে থাকে, সেই জায়গাগুলারে দেখাটা জরুরি মনে করি। আর এই কারণে উনাদের ভাষা প্ল্যানিংয়ের ব্যাপারটা ইর্ম্পটেন্ট একটা রেফারেন্স। যেই কারণে আরেকবার আলাদা কইরা হাজির করতেছি এইখানে।
৪.
সৈয়দ আলী আহসান আর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্’র পুরা লেখা কোট করা হয় নাই। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ আর আঞ্চলিক ভাষার ক্যাটাগোরাইজেশনের জায়গাগুলারে বাদ রাখা হইছে। উনাদের পুরা টেক্সট পড়তে চাইলে, অই অভিধানে তো পাইবেনই। আমরা রিলিভেন্ট জায়গাটুকই রাখতেছি, এইখানে।
ই. হা.
………………….
প্রথম সংস্করণের
প্রসঙ্গ কথা
যে কোনও বস্তু ভাষা পরিবর্তনশীল। অনবরত গ্রহণবর্জনের মাধ্যমে ইহা অগ্রসর হয়। ইহার ফলে শুধু ভাষার শব্দরূপেরই পরিবর্তন ঘটে না, বরং শব্দার্থ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ব্যতিক্রম দেখা দেয় । এই সর্বাঙ্গীন পরিবর্তন কোন বিশেষ ভাষারীতিতে সীমাবদ্ধ নহে । সাহিত্য-রীতিতে যে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহা যে কোনও সাহিত্যের সৃষ্টি-সম্ভার পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করিলেই বুঝতে পারা যায় । চির প্রবাহমান আঞ্চলিক রীতিতে এই পরিবর্তন আরও ব্যাপক। এই কারণে বিভিন্ন সময়ে এই পরিবর্তনের প্রকৃতি বিচার করিয়া ভাষার বৈশিষ্ট্য নিরূপণের প্রয়োজন রহিয়াছে। অভিধান সংকলনের দ্বারা এই প্রয়োজন আংশিক ভাবে পূরণ হইয়া থাকে ।
বাংলা ভাষায় অভিধান সংলনের ইতিহাস খুব বেশী দিনের নহে। ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দে মানুয়েল-দা- আসসুম্পসাও সংকলিত পোর্তুগীজ-বাংলা অভিধান মােন হরফে মুদ্রিত হয়। বাংলা হরফে সর্বপ্রথম মুদ্রিত হয় ফস্টার সাহেবের ইংরেজী-বাংলা অভিধান ১৭৯৯ খৃষ্টাব্দে ! পরবর্তী কালে বিভিন্ন প্রকৃতির এবং পরিসরে বহু অভিধান সংকলিত হইয়াছে। কিন্তু প্রথম দিকে বিদেশী পণ্ডিতদের দ্বারা সংকলিত অভিধানে এবং তাঁহাদের অন্যান্য রচনায় আঞ্চলিক শব্দ ও বাক্রীতি ব্যবহারের যে আদর্শ বিদ্যমান, পরবর্তী কালে তাহা রক্ষিত হয় নাই। অভিধান সংকলনের সময় আঞ্চলিক শব্দসমুহকে অসাধু বলিয়া পরিত্যাগ করা হইয়াছে। এই জন্য দেখা যায়, অভিধান সংকলয়িতাগণ একদিকে যেমন নির্বিকার চিত্তে প্রচলিত সংস্কৃত শব্দ গ্রহণ করিয়াছেন, অন্যদিকে তেমনি সাহিত্যে অনুপ্রবিষ্ট বহু আঞ্চলিক শব্দকে নির্বিচারে বাদ দিয়াছেন। একই কারণে সর্বজনবােধ্য আরবী-ফারসী শব্দও পরিত্যক্ত হইয়াছে। ইহার কারণ প্রথমতঃ উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সাহিত্য সৃষ্টিতে পন্ডিতী–বাংলা ব্যবহারের ব্যাপক প্রচেষ্টা এবং দ্বিতীয়তঃ বাংলা অভিধানকে সংস্কৃতির জন্যও ব্যবহার করিবার প্রয়াস। কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ হইতেই ইহার সূত্রপাত ।
সম্ভবতঃ এই কারণেই বাংলা ভাষায় সাহিত্য-রীতির সহস্রাধিক বৎসরের নিদর্শন বিদ্যমান থাকিলেও সেই তুলনায় আঞ্চলিক রীতির লিখিতরূপ অতি নগণ্য। ভাষাতাত্বিক প্রয়োজনে সংগৃহীত শব্দ এবং সাহিত্যে ব্যবহৃত সামান্য বাক্রীতি ব্যতীত অন্য কোন ব্যাপক নিয়মে আঞ্চলিক ভাষারূপ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয় নাই।
তদুপরি বাংলা ভাষার সাহিত্য-রীতিতে একটি বিশেষ অঞ্চলের প্রভাব থাকায় অন্যান্য অঞ্চলের ভাষা দীর্ঘ কাল উপেক্ষিত হইয়া আসিয়াছে। পুথিসাহিত্য, পল্লীগীতিকা এবং নাটকাদিতে ইহার আত্মপ্রকাশ ঘটিলেও এবং কোনও কোনও সহৃদয় ব্যক্তি ইহার শব্দসংগ্রহ প্রকাশের চেষ্টা করিলেও আঞ্চলিক ভাষা রীতি–বিশেষ করিয়া পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্থানের আঞ্চলিক রীতি সাহিত্যিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই।
পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষাগত ব্যবধান সুস্পষ্ট। তদুপরি পূর্ব পাকিস্তানে আঞ্চলিক ভাষারূপের বিভিন্নতা যেরূপ প্রত্যক্ষ, পশ্চিমবঙ্গে তদ্রূপ নহে। সেখানে শিক্ষিত সমাজে প্রধানতঃ কলিকাতা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের ভাষাই প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। অথচ পূর্বপাকিস্তানে বিশেষ কোন অঞ্চলের ভাষা সর্বত্র গৃহীত না হওয়ায় শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম, নােয়াখালী, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষা শিক্ষিতসমাজেও কথা হিসাবে প্রচলিত রহিয়াছে। সেইজন্য এই সকল আপাতবিভিন্ন ভাষারূপের প্রকৃতি নিরূপণ ও প্রগতি বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।
অন্যদিকে একান্ত স্বাভাবিক কারণে আজ পূর্ব পাকিস্তানে সাহিত্য সৃষ্টিতে স্থানীয় ভাষাসম্পদ ব্যবহারের প্রয়েছিল তীব্র ভাবে অনুভূত হইতেছে। এই অনিবার্য চাহিদা পূরণের সহায়ক হিসাবে বিভিন্ন অঞ্চলের শব্দ-সংগ্রহ প্রকাশ করিবার প্রয়ােজনীয়তা অস্বীকার করা যায়না; যাহাতে অতি সহজেই এক অঞ্চলের সাহিত্যিক অন্য অঞ্চলের শব্দ সম্পর্কে অবহিত হইতে পারেন এবং প্রয়ােজন বােধে উহা ব্যবহার করিতে সক্ষম হন। সময় সাপেক্ষ হইলেও পরস্পরের এই ব্যবহারের ফলে সৰ্বাঞ্চলবােধ্য একটি ভাষারীতি গড়িয়া উঠা সম্ভব হইবে বলিয়া আশা করা যায়। Continue reading →