আমার পোশাক এবং আমি ।। সিমন দ্য বোভোয়া ।।
লেখাটা অবজার্ভার পত্রিকার আর্কাইভ থেকে ঘেঁটে বাইর করা হইছে। সিমন দ্য বোভোয়ার এই ইন্টারভিউ কাম আর্টিকেল ছাপা হইছিলো মার্চের ২০ তারিখ, ১৯৬০ সালে। সেই সময়কার অবজার্ভারের সাংবাদিক সিন্থিয়া জুডাহ এই ফ্রেঞ্চ ফিলোসফারের সাথে আলাপ করছিলেন তার ফ্যাশন নিয়ে, ফ্যাশন সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা নিয়ে। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]
ফ্যাশন তো পালটায়, সেকেলে হয়া যায়। তবে তার এই কথাবার্তার পিছনে কিংবা ফ্যাশনের চিন্তার পিছনে যে ফিলোসফি তা বোধহয় এই ষাট বছর পরে আইসাও ফালায়ে দেয়া যায় না। বোভোয়ার এই লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা কারণে, পোশাক নিয়ে এখনও বাংলাদেশে যে ন্যারেটিভ চালু আছে, যে ন্যারেটিভ প্রায় প্রায় উঠে আসে ‘কেবল নারী’ রেপড হইলে বা হ্যারাসড হইলে, বিশেষ করে যে ন্যারেটিভের কারণে ধর্ষণের দায় বেশিরভাগ সময়ে চাপায়ে দেয়া হয় নারীর পোশাকের উপ্রে, সেই ন্যারেটিভকে আরেকবার ভাবার অছিলায়। পোশাক, জামাকাপড়, আমি শার্ট পরব না পাঞ্জাবী পরবো নাকি শাড়ি পরবো না স্কার্ট পরবো, এই সিদ্ধান্ত কে নিবে না নিবে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে পোশাক চুজ করার সিদ্ধান্তের পিছের ফিলোসফির রং ভিন্নও হইতে পারে। কিন্তু একটা ফিলোসফির আরেকটা ফিলোসফির সাথে ফাইট কইরা নির্দিষ্ট কোন একটা পোশাকরে স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন করার এখতিয়ারও কারো থাকার কথা না।
জাতীয় মাছের মতো জাতীয় পোশাকের মতো ধারণাও একটা বেহুদাপনা, জাতীয়তাবাদী চিন্তা। এই চিন্তা আরোপ করে কোন একটা নির্দিষ্ট পোশাকরে উঁচু ভাবার, ভালো ভাবার। আবার একই কারণে, লিট ফেস্টে লুঙ্গি পরে গেলে পুলিশি বাধা আরও বেশি পোশাকের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনেরই ফলাফল। পোশাক আশাক ক্লাস তৈরি করে, ক্লাস মেইন্টেইন করে। ব্র্যান্ডের পোশাক কেবল একটা সোসাইটিই কিনতে পারবেন, তারাই ব্র্যান্ডের অডিয়েন্স, সোসাইটির লোকজনও সেই ব্র্যান্ডের পোশাক কিনে, কেনা-মেইন্টেইন করার সাইকেলটাও এইভাবে মোটামুটি ঠিক থাকে। ওই সোসাইটির লোকজন কখনো গুলিস্তানে যায় না, হকার্স মার্কেটে যায় না, কারণ এই মার্কেটগুলা যেন একটু নিচু গোত্রের, এইখান থেকে পোশাক হয়তো না কিনাই ভালো। এইভাবে একটা সোসাইটি আরেকটা সোসাইটিরে দূরে ঠেলার কামিয়াবি হাসিল করে। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটা সোসাইটির সাথে, একটা ক্লাসের সাথে, কোন একটা মার্কেট, কোন একটা দোকান কিংবা কোন একটা পোশাক জড়ায়া যায়। এই সম্পর্ক থেকে একটারে আরেকটা থেকে আলাদা করা যেন একটু ডিফিকাল্টই।
একটা ক্লাসরে নির্দিষ্ট কোন পোশাক দিয়ে চিহ্নিত করা, সেই পোশাকের মাপে কোন ব্যক্তিকে পুরাপুরি বুইঝা ফেলার যে প্রবণতা, তা আরও বেশি প্রবলেমাটিক। লুঙ্গি সবসময়ই খেটে খাওয়া মানুষের ইমেজ আনে, কোটপ্যান্ট বড়লোকি সাহেবের ইমেজ আনে, পোশাকের কারণে ধরে নেয়া হয় হয়তো এই লুঙ্গি পরা লোকটা একশ টাকার টিকিট কাইটা ঢুকতে পারবেন না মেলায় অথবা কোটপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক মেজবানে আসলে তার জন্যে হে হে করে আগেভাগে সিট ছাইড়া দেয়া উচিত; এই ধরণের প্রিকনসেপশনের আসলে ভিত্তি নাই বললে ভুল হবে।
ভিত্তি আছে তবে এই ভিত্তি চিন্তা প্রক্রিয়ার বিশেষ ভুল ‘কগনিটিভ এরর’-এর। ধরেন আপনি কোন ভার্সিটির টিচার। আপনার স্টুডেন্ট প্রায় সময় ক্লাসে লেইট করে আসে। সেইজন্যে, আপনি ভাইবা নিলেন আপনার স্টুডেন্ট লেইট মফিজ, তার খাসলতই হইতেছে লেইট করা। কিন্তু এমনও তো হইতে পারে, তার লেইট হওয়াটার জন্যে কোন গাড়ি দায়ী, ভার্সিটির বাস দায়ী কিংবা কোন পার্টিকুলার রাস্তা অথবা অনেক কিছু। এই ধরণের নানান পসিবিলিটি বাদ দিয়ে যখন এই ‘লেইট হওয়া’টারে স্টুডেন্টের খাসলতের সাথে মিলায়া ফেলেন, চিন্তাভাবনার এই প্রকাররে সাইকোলজিস্টরা কন ‘কগনিটিভ এরর’।
একইভাবে পোশাক দিয়ে কারো খাসলত, ইকোনমিক/পলিটিকাল অবস্থান আগেভাগে ধরে নেয়াটাও হইতেছে একপ্রকার প্রিকনসেপশন বা ত্রুটি। এই ত্রুটি একটা ক্লাসরে আরেকটা ক্লাসের উপর ছড়ি ঘোরানোর বৈধতা জারি কইরা দেয়। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের মধ্যকার রেসপেক্টের জায়গাটারে বৈধতা দিতে সাহায্য করে না। পোশাক আশাকের কোন ধরাবান্ধা নিয়ম থাকা উচিত না, নিয়ম যদি লাগেও তা পোশাক যে পরতেছে সেই বরং ঠিক করুক। রেগুলার নিয়মে প্রত্যেকটা ধর্ষণের কেসে পোশাকের ন্যারেটিভ বারবার আসলে মনে হয়, যদিও আমাদের দেশে ফ্যাশন ব্র্যান্ড, মার্চেন্ডাইজার, গার্মেন্টেসের অভাব নাই, তবুও কোথাও কোন এক পোশাকের মধ্যে পুলিশ বইসা আছে। পোশাকের পুলিশি নিয়ম প্রায়ই চেষ্টা করে মাথাচাড়া দিয়া উঠতে। হয়তো আমাদের পলিটিকাল কালচারের ভিতর দিয়ে এই পুলিশ আরও শক্ত হইতে পারতেছে।
কিংবা এমনও হইতে পারে, এই পোশাকের পুলিশ মাথা নিচু কইরা বসে থাকে কারণ তার বেল নাই, তাই সে সুযোগ খুঁজে কোন একটা ইস্যুর যে ইস্যুতে সেই পোশাকি পুলিশ ফের নিজেরে ভাববে আমি তো আসলে কোথাও হারায়ে যাই নাই, বরং গভীরভাবে বসবাস করতেছি এই দেশের কালচারাল ডিসকোর্সে। এই শতকে কিংবা এই দশকে আপনি পাঞ্জাবী পরতে পারেন, পাঞ্জাবীর সাথে লুঙ্গিও পরতে পারেন। কিংবা আপনি ডেনিমের শার্টের সাথে গুলিস্তানের প্যান্টও পরতে পারেন। আবার আপনি লুঙ্গি নাও পরতে পারেন কিংবা পারেনও। এই সবকিছু আপনি কিভাবে পরতেছেন বা না পরতেছেন, সকল ডিসিশান আপনার ফিলোসফিরেই প্রকাশ করে। পোশাক তো আপনার নিজের উপর। আর এই চিন্তাটা ছিলো বোভোয়ারও।
/তৌকির হোসেন
……………………………………
আপনারে আমার আগেই বইলা রাখা ভালো যে আমি পোশাক আশাকের ব্যাপার নিয়ে একদমই ইন্টারেস্টেড না- সিমন দ্য বোভোয়া বলতেছিলেন, সাথে সাথে এইটাও যোগ করে দিলেন- আসলে মাথা ঘামানোর মতো এত এত জিনিস আছে, এত এত ইন্টারেস্টের জায়গা আছে, পোশাক নিয়ে ভাববার মতো অবকাশ আমার নাই।
প্যারিসের সেকেন্ড সেক্সের মানুষজনের মধ্যে সিমন দ্য বোভোয়ার যে অবস্থান, তা তার লেখালেখির দিক দিয়েই হোক কিংবা তার ইন্টেলেকচুয়াল প্রভাবের জায়গা থেকেই হোক, বোভোয়ার এই কমেন্ট আশ্চর্যজনক কিছু না। মানুষজন বরং ‘বোভোয়া জামাকাপড় নিয়া কথা বলতেছেন’ এই জিনিস শুনলেই হাসাহাসি করবে। কিন্তু যেই মুহূর্তে বোভোয়া তার মন্তপাঘনাসের স্টুডিও ফ্ল্যাটের দরজা খুলে আমাদের প্রবেশ করাইলেন, আপনার নির্ঘাত মনে হবে- নাহ! বোভোয়ার জামাকাপড় নিয়ে কিছু হইলেও নিজস্ব ভাবনা আছে।