Main menu

আমার পোশাক এবং আমি ।। সিমন দ্য বোভোয়া ।।

লেখাটা অবজার্ভার পত্রিকার আর্কাইভ থেকে ঘেঁটে বাইর করা হইছে। সিমন দ্য বোভোয়ার এই ইন্টারভিউ কাম আর্টিকেল ছাপা হইছিলো মার্চের ২০ তারিখ, ১৯৬০ সালে। সেই সময়কার অবজার্ভারের সাংবাদিক সিন্থিয়া জুডাহ এই ফ্রেঞ্চ ফিলোসফারের সাথে আলাপ করছিলেন তার ফ্যাশন নিয়ে, ফ্যাশন সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা নিয়ে। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]

ফ্যাশন তো পালটায়, সেকেলে হয়া যায়। তবে তার এই কথাবার্তার পিছনে কিংবা ফ্যাশনের চিন্তার পিছনে যে ফিলোসফি তা বোধহয় এই ষাট বছর পরে আইসাও ফালায়ে দেয়া যায় না। বোভোয়ার এই লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা কারণে, পোশাক নিয়ে এখনও বাংলাদেশে যে ন্যারেটিভ চালু আছে, যে ন্যারেটিভ প্রায় প্রায় উঠে আসে ‘কেবল নারী’ রেপড হইলে বা হ্যারাসড হইলে, বিশেষ করে যে ন্যারেটিভের কারণে ধর্ষণের দায় বেশিরভাগ সময়ে চাপায়ে দেয়া হয় নারীর পোশাকের উপ্রে, সেই ন্যারেটিভকে আরেকবার ভাবার অছিলায়। পোশাক, জামাকাপড়, আমি শার্ট পরব না পাঞ্জাবী পরবো নাকি শাড়ি পরবো না স্কার্ট পরবো, এই সিদ্ধান্ত কে নিবে না নিবে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে পোশাক চুজ করার সিদ্ধান্তের পিছের ফিলোসফির রং ভিন্নও হইতে পারে। কিন্তু একটা ফিলোসফির আরেকটা ফিলোসফির সাথে ফাইট কইরা নির্দিষ্ট কোন একটা পোশাকরে স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন করার এখতিয়ারও কারো থাকার কথা না।

জাতীয় মাছের মতো জাতীয় পোশাকের মতো ধারণাও একটা বেহুদাপনা, জাতীয়তাবাদী চিন্তা। এই চিন্তা আরোপ করে কোন একটা নির্দিষ্ট পোশাকরে উঁচু ভাবার, ভালো ভাবার। আবার একই কারণে, লিট ফেস্টে লুঙ্গি পরে গেলে পুলিশি বাধা আরও বেশি পোশাকের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনেরই ফলাফল। পোশাক আশাক ক্লাস তৈরি করে, ক্লাস মেইন্টেইন করে। ব্র্যান্ডের পোশাক কেবল একটা সোসাইটিই কিনতে পারবেন, তারাই ব্র্যান্ডের অডিয়েন্স, সোসাইটির লোকজনও সেই ব্র্যান্ডের পোশাক কিনে, কেনা-মেইন্টেইন করার সাইকেলটাও এইভাবে মোটামুটি ঠিক থাকে। ওই সোসাইটির লোকজন কখনো গুলিস্তানে যায় না, হকার্স মার্কেটে যায় না, কারণ এই মার্কেটগুলা যেন একটু নিচু গোত্রের, এইখান থেকে পোশাক হয়তো না কিনাই ভালো। এইভাবে একটা সোসাইটি আরেকটা সোসাইটিরে দূরে ঠেলার কামিয়াবি হাসিল করে। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটা সোসাইটির সাথে, একটা ক্লাসের সাথে, কোন একটা মার্কেট, কোন একটা দোকান কিংবা কোন একটা পোশাক জড়ায়া যায়। এই সম্পর্ক থেকে একটারে আরেকটা থেকে আলাদা করা যেন একটু ডিফিকাল্টই।

একটা ক্লাসরে নির্দিষ্ট কোন পোশাক দিয়ে চিহ্নিত করা, সেই পোশাকের মাপে কোন ব্যক্তিকে পুরাপুরি বুইঝা ফেলার যে প্রবণতা, তা আরও বেশি প্রবলেমাটিক। লুঙ্গি সবসময়ই খেটে খাওয়া মানুষের ইমেজ আনে, কোটপ্যান্ট বড়লোকি সাহেবের ইমেজ আনে, পোশাকের কারণে ধরে নেয়া হয় হয়তো এই লুঙ্গি পরা লোকটা একশ টাকার টিকিট কাইটা ঢুকতে পারবেন না মেলায় অথবা কোটপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক মেজবানে আসলে তার জন্যে হে হে করে আগেভাগে সিট ছাইড়া দেয়া উচিত; এই ধরণের প্রিকনসেপশনের আসলে ভিত্তি নাই বললে ভুল হবে।

ভিত্তি আছে তবে এই ভিত্তি চিন্তা প্রক্রিয়ার বিশেষ ভুল ‘কগনিটিভ এরর’-এর। ধরেন আপনি কোন ভার্সিটির টিচার। আপনার স্টুডেন্ট প্রায় সময় ক্লাসে লেইট করে আসে। সেইজন্যে, আপনি ভাইবা নিলেন আপনার স্টুডেন্ট লেইট মফিজ, তার খাসলতই হইতেছে লেইট করা। কিন্তু এমনও তো হইতে পারে, তার লেইট হওয়াটার জন্যে কোন গাড়ি দায়ী, ভার্সিটির বাস দায়ী কিংবা কোন পার্টিকুলার রাস্তা অথবা অনেক কিছু। এই ধরণের নানান পসিবিলিটি বাদ দিয়ে যখন এই ‘লেইট হওয়া’টারে স্টুডেন্টের খাসলতের সাথে মিলায়া ফেলেন, চিন্তাভাবনার এই প্রকাররে সাইকোলজিস্টরা কন ‘কগনিটিভ এরর’।

একইভাবে পোশাক দিয়ে কারো খাসলত, ইকোনমিক/পলিটিকাল অবস্থান আগেভাগে ধরে নেয়াটাও হইতেছে একপ্রকার প্রিকনসেপশন বা ত্রুটি। এই ত্রুটি একটা ক্লাসরে আরেকটা ক্লাসের উপর ছড়ি ঘোরানোর বৈধতা জারি কইরা দেয়। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের মধ্যকার রেসপেক্টের জায়গাটারে বৈধতা দিতে সাহায্য করে না। পোশাক আশাকের কোন ধরাবান্ধা নিয়ম থাকা উচিত না, নিয়ম যদি লাগেও তা পোশাক যে পরতেছে সেই বরং ঠিক করুক। রেগুলার নিয়মে প্রত্যেকটা ধর্ষণের কেসে পোশাকের ন্যারেটিভ বারবার আসলে মনে হয়, যদিও আমাদের দেশে ফ্যাশন ব্র্যান্ড, মার্চেন্ডাইজার, গার্মেন্টেসের অভাব নাই, তবুও কোথাও কোন এক পোশাকের মধ্যে পুলিশ বইসা আছে। পোশাকের পুলিশি নিয়ম প্রায়ই চেষ্টা করে মাথাচাড়া দিয়া উঠতে। হয়তো আমাদের পলিটিকাল কালচারের ভিতর দিয়ে এই পুলিশ আরও শক্ত হইতে পারতেছে।

কিংবা এমনও হইতে পারে, এই পোশাকের পুলিশ মাথা নিচু কইরা বসে থাকে কারণ তার বেল নাই, তাই সে সুযোগ খুঁজে কোন একটা ইস্যুর যে ইস্যুতে সেই পোশাকি পুলিশ ফের নিজেরে ভাববে আমি তো আসলে কোথাও হারায়ে যাই নাই, বরং গভীরভাবে বসবাস করতেছি এই দেশের কালচারাল ডিসকোর্সে। এই শতকে কিংবা এই দশকে আপনি পাঞ্জাবী পরতে পারেন, পাঞ্জাবীর সাথে লুঙ্গিও পরতে পারেন। কিংবা আপনি ডেনিমের শার্টের সাথে গুলিস্তানের প্যান্টও পরতে পারেন। আবার আপনি লুঙ্গি নাও পরতে পারেন কিংবা পারেনও। এই সবকিছু আপনি কিভাবে পরতেছেন বা না পরতেছেন, সকল ডিসিশান আপনার ফিলোসফিরেই প্রকাশ করে। পোশাক তো আপনার নিজের উপর। আর এই চিন্তাটা ছিলো বোভোয়ারও।

/তৌকির হোসেন

……………………………………

আপনারে আমার আগেই বইলা রাখা ভালো যে আমি পোশাক আশাকের ব্যাপার নিয়ে একদমই ইন্টারেস্টেড না- সিমন দ্য বোভোয়া বলতেছিলেন, সাথে সাথে এইটাও যোগ করে দিলেন- আসলে মাথা ঘামানোর মতো এত এত জিনিস আছে, এত এত ইন্টারেস্টের জায়গা আছে, পোশাক নিয়ে ভাববার মতো অবকাশ আমার নাই।

প্যারিসের সেকেন্ড সেক্সের মানুষজনের মধ্যে সিমন দ্য বোভোয়ার যে অবস্থান, তা তার লেখালেখির দিক দিয়েই হোক কিংবা তার ইন্টেলেকচুয়াল প্রভাবের জায়গা থেকেই হোক, বোভোয়ার এই কমেন্ট আশ্চর্যজনক কিছু না। মানুষজন বরং ‘বোভোয়া জামাকাপড় নিয়া কথা বলতেছেন’ এই জিনিস শুনলেই হাসাহাসি করবে। কিন্তু যেই মুহূর্তে বোভোয়া তার মন্তপাঘনাসের স্টুডিও ফ্ল্যাটের দরজা খুলে আমাদের প্রবেশ করাইলেন, আপনার নির্ঘাত মনে হবে- নাহ! বোভোয়ার জামাকাপড় নিয়ে কিছু হইলেও নিজস্ব ভাবনা আছে।

Continue reading

বাংলা ক্ল্যাসিক। দ্বিজ কানাইয়ের মহুয়া।

This entry is part 1 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

এইটা কাহিনিটার পাঁচ নাম্বার ভার্সন।

দ্বিজ কানাই ১৫০০/১৬০০ সালের দিকে এই কাহিনিটা বান্ধেন। গ্রেটার মৈমনসিংহ এলাকায় এইটা গাওয়া হইতো। নেত্রকোণা জেলার সান্দিকোনার মসকা গ্রামের সেখ আসক আলী আর উমেশচন্দ্র দে’র এইটা জানা ছিল। তাদের কাছ থিকা এই কাহিনি সংগ্রহ করছিলেন চন্দ্রকুমার দে, ১৯০০ সালের দিকে। তারপরে এইটা এডিট করছিলেন শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন। ছাপাইছিলেন এবং অনেক প্রচার প্রচারণা করছিলেন। উনার ‘প্রাচীন পল্লীগীতিকা’রে  এখন কাহিনির আকারে লিখতেছি আমি।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন ২৪টা অধ্যায়ে ভাগ কইরা আলাদা আলাদা নাম দিছিলেন। আমি নামগুলা চেইঞ্জ করছি, আলাদা কইরা নাম না দিয়া, কাহিনির ভিতর থিকাই নামগুলা নিছি। অধ্যায় বা পার্টগুলাও অল্প একটু বদলাইছি। অনেকগুলা ফুটনোট দিছিলেন উনি, শব্দগুলার কি মানে, সেইগুলা বুঝানোর লাইগা, সেইগুলার অনেক কমাইছি, বেশিরভাগই অদরকারি মনে হইছে আমার। বানানে অনেক যফলা ইউজ করা হইছিল উচ্চারণের কাছাকাছি থাকার লাইগা, তো সেইগুলাও কিছু জায়গায় অদরকারি মনে হইছে আমার। উচ্চারণের কাছাকাছি থাকতে পারাটা লিখিত ফর্মে একটু ঝামেলার জিনিসই, অনেক ক্যারিকেচার করলেও মৈমনসিংহা উচ্চারণ অ্যাচিভ করাটা মেবি টাইফই হবে যারা ধরেন কানাডা আম্রিকায় জন্মানোর পরে বাংলাভাষা শিখছেন।… শব্দের বানানরে উচ্চারণের কাছাকাছি রাখার পরে পরিচিত লিখিত বানানের ব্যাপারে যতোটা কম চেইঞ্জ করা যায়, সেই চেষ্টা করছি।

আর দীনেশচন্দ্র সেন তো একটা অরিজিনাল ফরম্যাটে রাখার ট্রাই করছেন, সেইখানে আমি ফর্মটারেই চেইঞ্জ করছি গ্রসলি। কিন্তু ফর্মের দোহাই দিয়া নতুন শব্দ না ঢুকায়া পুরান যত শব্দ আছিল, বেশিরভাগ সময় সেইগুলাই রাখার ট্রাই করছি। কারণ আমার মনে হইছে, বলা বা পারফর্ম করা যেমন একটা ঘটনা, লেখা বা পড়া একইরকমের ঘটনা না। সুর কইরা পড়াটা বেশিরভাগ সময়ই আরামের। কিন্তু অনেক সময় মনেহয় অভ্যাসের কারণেই বেশি কনসানট্রেশন দিতে হয় সুরটাতে, বা সুরটা মেইন ঘটনা হয়া উঠে, তখন পড়াটা ঝামেলারই হয় কিছুটা। তো, পড়ার জন্য সুরটারে কিছুটা আলগা কইরা কাহিনির মতন বলাটা বেটার না ঠিক, বরং স্মুথ ও রিলেটিভলি সহজ একটা এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারে হয়তো। এইভাবে ভাবছি। মানে, একটা জিনিস যখন একটা মিডিয়াম থিকা আরেকটা মিডিয়ামে আসে তখন এমনিতেই ফর্মের কিছুটা চেইঞ্জ হওয়ার কথা। যেই জিনিস আমি বলবো, লেখার সময় হয়তো একইভাবে লিখবো না। তো, বলার জিনিসটারে লিখলে কি রকম হইতে পারে, সেইরকম একটা এক্সপেক্টশন থিকা লেখার জিনিসটারে সাজাইতে চাইছি আমি। 

তবে মোস্টলি যেই ঘটনাটা ঘটছে, শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন এইটারে একটা ‘আঞ্চলিক সাহিত্য’ হিসাবে রিড করছেন, যারে তিনি রক্ষা করতেছেন বা উদ্ধার করছেন, যেইটা আমাদের বাংলা সাহিত্যে স্থান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আমি এইরকম মার্জিনাল জায়গা থিকা দেখি নাই। এইটা গ্রাম্য, আঞ্চলিক কোন জিনিস না, বরং এইটাই বাংলা সাহিত্য, মেইনস্ট্রিম ঘটনা। এইটারে বাংলা ভাষা, বাংলা ক্ল্যাসিক হিসাবে আমি পড়ছি আর পড়ার সাজেশন দিতেছি।

 

ই.হা.
ডিসেম্বর, ২০১৯ – জানুয়ারি, ২০২০

 

…………………………………………………………

নমশুদ্রের বাহ্মণ দ্বিজ কানাই নামক কবি ৩০০ বৎসর পূর্বে এই গান রচনা করেন। প্রবাদ এই, দ্বিজ কানাই নমশূদ্র-সমাজের অতিহীনকূল-জাতা এক সুন্দরীর প্রেমে মত্ত হইয়া বহু কষ্ট সহিয়াছিলেন, এজন্যই ‘নদের চাদ’ ও ‘মহুয়া’র কাহিনীতে তিনি এস প্রাণঢালা সরলতা প্রদান করিতে পারিয়াছিলেন। নদের চাদ ও মহুয়ার গান একসময় পূর্ব-মৈমনসিংহের ঘরে ঘরে গীত ও অভিনীত হইত। কিন্তু উত্তরকালে ব্রাহ্মণ্য-ধৰ্ম্মের কঠোর শাসনে এই গীতিবর্ণিত প্রেম দুর্নীতি বালয়া প্রচারিত হয়, এবং হিন্দুরা এই গানের উৎসাহ দিতে বিরত হন।…

গীতিবর্ণিত ঘটনার স্থান নেত্রকোণার নিকটবর্তী। খালিয়াজুরি থানার নিকট-রহমৎপুর হইতে ১৫ মাইল উত্তরে। “তলার হাওর” নামক বিস্তৃত হাওর’–ইহারই পূৰ্বে বামনকান্দি, বাইদার দীঘি, ঠাকুরবাড়ীর ভিটা, উলুয়াকান্দি প্রভৃতি স্থান এখন জনমানবশূন্য হইয়া রাজকুমার ও মহুয়ার স্মৃতি বহন করিতেছে। এখন তথায় কতকগুলি ভিটামাত্র পড়িয়া আছে। কিন্তু নিকটবর্তী গ্রামসমূহে এই প্রণয়িযুগ্মের বিষয় লইয়া নানা কিংবদন্তী এখনও লোকের মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছে। যে কাঞ্চনপুর হইতে “হোমরা” বেদে মহুয়াকে চুরি করিয়া লইয়া যায়—তাহা ধনু নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।

নেত্রকোণার অন্তর্গত সান্দিকোনা পোষ্টাফিসের অধীন মসকা ও গোরালী নামক দুইটি গ্রাম আছে—মসকা গ্রামের সেক আসক আলী ও উমেশচন্দ্র দে এবং গোরালীর নসুসেকের নিকট হইতে এই গানের অনেকাংশ সংগৃহীত হয়। ১৯১২ খৃষ্টাব্দের ৯ই মার্চ আমি চন্দ্রকুমারের নিকট হইতে এই গাথা। পাইয়াছি। চন্দ্রকুমার দে যেভাবে গীতিটি পাঠাইয়াছিলেন, তাহাতে… গোড়ার গান শেষ আর শেষের গান গোড়ায় এই ভাবে গীতিকাটি উলট-পালট ছিল, আমি যথাসাধ্য এই কবিতাগুলি পুনঃ পুনঃ পড়িয়া পাঠ ঠিক করিয়া লইয়াছি।

এই গানের মোট ৭৫৫ ছত্র পাওয়া গিয়াছে, আমি তাহা ২৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত করিয়া লইয়াছি।

 

শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন
১৯২৩

 

…………………………………………………………

 

কিবা গান গাইবাম আমি

পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর।
এক দিকে উদয়রে ভানু চৌদিকে পশরৎ|

দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।
যেখানে বানিজজি করে চান্দ সদাগর॥

উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্বত।
যেখানে পড়িয়া গো আছে আলীর মালামের পাথুথর॥

পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন স্থান।
উরদিশে বাড়ায় ছেলাম মমিন মুসলমান ॥

সভা কইরা বইছ ভাইরে ইন্দু মুসলমান।
সভার চরণে আমি জানাইলাম ছেলাম ॥

চাইর কুনান্ট পিরথিমি গো বইন্ধ্যা মন করলাম স্থির।
সুন্দর বন মুকামে বন্দলাম গাজী জিন্দাপীর॥

আসমানে জমিনে বন্দলাম চান্দে আর সুরুয।
আলাম-কালাম বন্দুম কিতাব আর কুরাণ॥

কিবা গান গাইবাম আমি বন্দনা করলাম ইতি।
উস্তাদের চরণ বন্দলাম করিয়া মিন্নতি॥

 

. মহুয়া সুন্দরী

এইখান থিকা উত্তরের পথে যাইতে থাকলে ছয় মাস পরে পড়বো গারো পাহাড়। তারও উত্তরে আছে হিমানী পরবত। সেই পরবতের পারে আছে সাত সমুদ্দুর। সেইখানে এক বন, যেইখানে চান্দ নাই, সুরুয় নাই। কিছুই দেখা যায় না। বাঘ ভালুক বাস করে। মাইন্‌সের কোন লরাচরা নাই।

সেই বনে থাকতো হুমরা বাইদ্দা। এই কাহিনি হুমরা বাইদ্দার।

বেটা আছিল ডাকাইত, ডাকাইতের সদ্দার। মাইনকা নামে তার এক ছুড ভাই আছিল। নানান দেশ ঘুরত অরা। ঘুরতে ঘুরতে একদিন ধনু নদীর পারে যাইয়া উপস্থিত হইল। গেরামের নাম কাঞ্চনপুর। সেইখান বসতি ছিল এক বরাম্মনের। তার ছিল ছয় মাসের শিশু কইন্যা। নিশাকালে হুমরা তারে করল চুরী। চুরী কইরা দেশ ছাইরা গেল।

ছয় মাসের শিশু কন্যা বচ্ছরের হৈল। পিঞ্জরে রাখিয়া পঙ্খী যেমনে পালে, সেইরকম যতন কইরা তারে পালতে লাগলো হুমরা বাইদ্দা। এক দুই তিন কইরা ১৬ বছর হৈল। অনেক যতন কইরা তারে সাপের খেলা শিখাইলো। সাপের মাথার মণি জ্বলা দেখলে যেমন মানুশ পাগল হয়, বাইদ্দার মেয়েরে দেখলে এইরকম পাগল হওয়ার দশা হয়।

বাইদ্দা বাইদ্দা করে লোকে বাইদ্দা কেমন জনা।
আন্দাইর ঘরে থুইলে কন্যা জ্বলে কাঞ্চা সোনা॥

হাটিয়া না যাইতে কইন্যার পায়ে পরে চুল।
মুখেতে ফুট্টা উঠে কনক চাম্পার ফুল॥

আগল ডাগল আখিরে আসমানের তারা।
তিলেক মাত্র দেখলে কইন্যা না যায় পাশুরা॥

বাইদ্দার কইন্যার রূপে ভাইরে মুনীর টলে মন।
এই কইন্যা লইয়া বাইদ্দা ভরমে তিরভুবন॥

পাইয়া সুন্দরী কইন্যা হুমরা বাইদ্দার নারী।
ভাবা চিন্তা নাম রাখল “মহুয়া সুন্দরী” ।

Continue reading

কোহেনের কবিতা

লিওনার্দ কোহেনরে আমরা গায়ক হিসাবেই চিনি, যিনি সুন্দর লিরিকসও লিখছেন। কিন্তু উনি নভেলও লিখছিলেন, কবিতাও। বেশ কয়েকটা কবিতার বই আছে উনার।

কবিতাতে উনি উনার গানের লিরিকসের চাইতে আরো অনেক বেশি ওয়াইল্ড, প্যাশোনেটের পাশাপাশি। একটা মুচকি মুচিক হাসির কিছু ঘটনাও আছে। সাফারিংস। কিছু দেখতে চাওয়া আর কষ্ট হইলেও মাইনা নেয়ার একটা ট্রাই করা।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

তো, মেইনলি উনার দুইটা কবিতার বই থিকা এই কবিতাগুলা তরজমা করা। একটা হইতেছে উনার “সিলেক্টেড পোয়েমস : ১৯৫৬ – ১৯৬৮“, এই বইয়ের কবিতাগুলা তরজমা করছিলাম ২০১৭ সালের দিকে। আর পরে ২০১৯ সালে উনার “দ্য এনার্জি অভ স্লেভস“ এর কিছু কবিতাও তরজমা করি। এইখানে দুইটা পার্টে দুইটা বইয়ের কিছু কবিতাগুলা রাখা হইলো।

 

ই. হা.

………………………………………………………………………………………..

১.

দ্য এনার্জি অফ স্লেভস

সব মানুষেরা আনন্দ দেয় তোমারে

যদি তুমি কখনো পড় এইটা
অই মানুষটার কথা ভাইবো, যে এইটা লিখতেছে

তোমার হয়া সে এই দুনিয়াটারে ঘৃণা করতো

 

দ্য এনার্জি অফ স্লেভস

প্রেম হইতেছে একটা আগুন
এইটা পুড়ায় সবাইরে
এইটা বিকৃত করে সবাইরে
এইটা হইতেছে দুনিয়া’টার ছুঁতা
বিশ্রী হওয়ার লাইগা

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

সব মানুষেরই
আছে বিট্রে করার একটা তরিকা
এই যে রেভিউলেশন
এইটা হইতেছে আমার

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

আমার ঘৃণার কোন শেষ নাই
যদি না তুমি জড়ায়া ধইরা রাখো আমারে
যতো আজবই লাগুক
আমি হইতেছি জোয়ান অফ আর্কের ভূত
আর হইতেছি ত্যক্ত বিরক্ত
স্বরগুলার কনসিকোয়েন্স
আমারে শক্ত কইরা জড়ায়া ধরো
তা নাইলে আমি ঘামতেই থাকবো
যেইখানে আমি ছিলাম

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

আমি মারা যাইতেছি
কারণ তুমি আমার লাইগা
মরো নাই
আর এই দুনিয়া
এখনো তোমারে ভালোবাসে

আমি এইটা লিখতেছি কারণ আমি জানি
যে তোমার চুমা
জন্মায় অন্ধ হয়া
গানগুলার উপরে, যারা তোমারে ছুঁইয়া যায়

আমি চাই নাই একটা পারপাস হইতে
তোমার লাইফে
আমি চাইছি হারায়া যাইতে
তোমার চিন্তাগুলার ভিতরে
যেমন তুমি শোনো নিউইয়র্ক সিটিরে
যখন তুমি ঘুমায়া যাও

 

Continue reading

পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ।। সৈয়দ মুজতবা আলী।। কিস্তি ২ ।।

This entry is part 12 of 22 in the series লেখার ভাষা

।।

…………………………………

ভাষা তো পাওয়ারের লগে রিলেটেড একটা ঘটনা। ব্রিটিশ আমলে ইংলিশ যে সরকারি দফতরের ভাষা আছিল, সেইটা তো পাওয়ারের কারণেই। তো, ব্রিটিশরা যখন নাই তখন তো আরেকটা ভাষার দরকার।

ইন্ডিয়া চাইলো, হিন্দি ভাষারে এস্টাবলিশ করতে, না পাইরা ইংলিশটারে রাইখা দিয়া হিন্দিরেও প্রমোট করলো। এখন ইন্ডিয়াতে যতদিন হিন্দি চালু আছে ততদিন দিল্লীতে নর্থ ইন্ডিয়ানদের পাওয়ার কমার কোন কারণ আসলে নাই। (খালি ভাষাই না, ভাষার ভিতরে অ্যাকসেন্ট আর ডায়ালেক্টের ব্যাপারও আছে, কুষ্টিয়া-খুলনার দিকের কথারে যত বাংলা লাগে, সিলেট-চিটাগাংয়ের ডায়ালেক্টরে তো এতোটা লাগে না। এইরকমের ব্যাপারগুলা আছে।) আর এই পাওয়ারের কারণেই দেখবেন, পশ্চিমবঙ্গের সোকল্ড শিক্ষিত লোকজন হিন্দিরে যতোটা হেইট করেন, ইংলিশরে এতোটা না। কারণ উনারা ইংলিশ তো জানেন কিছুটা কলোনিয়াল আমল থিকা, কিন্তু নতুন কইরা হিন্দি শিখাটা তো পসিবল না! বা ইংরেজদের নিজেদের মালিক বইলা মানতে যতোটা রাজি আছিলেন, সেই জায়গায় অন্য নেটিভ ইন্ডিয়ানদের মালিক বইলা ভাবাটাও মুশকিলেরই হওয়ার কথা।…

পাকিস্তানেও একইরকমের সিচুয়েশনই ছিল, ইংলিশের জায়গায় কোনটা আসবো, এই কোশ্চেনটা উঠছিল। রাষ্ট্র যেহেতু সেন্ট্রালাইজড একটা জিনিস, একক একটা জিনিস তো থাকা লাগবে। মানে, ইংলিশের বিপরীতে আরেকটা অপশনের কথাই উঠছিল। 

জিন্নাহ কিন্তু ইংলিশেই কইছিলেন – উর্দু’রে স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ করার কথা; উর্দুতে কন নাই। আর যেই স্টুডেন্ট এইটার প্রতিবাদ করছিলো, সে কিন্তু ‘না’ কয় নাই; ‘নো’-ই কইছিলো! ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না? যেই দুইটা ভাষা’র লাইগা ফাইটটা চলতেছে, সেই দুইটাই নাই; এইটা নিয়া কথা হইতেছে অন্য আরেকটা ভাষাতেই।

জিন্নাহ আসলে ইংরেজি জানা লোকদেরকেই শুনাইতে চাইতেছিলেন (উনার উর্দু না বলতে পারা’র কথা মনে রাইখাই বলতেছি)। যারা খালি বাংলা জানে, ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়া উনারা কিছু কইতে পারবে এইরকম গণতন্ত্রে উনি বিলিভই করেন নাই আসলে। যিনি রিভোল্ট করলেন, উনিও জিন্নাহরে জানাইতে চাইছিলেন, বাংলা তো আমরা জানি, ইংরেজির ভিতর দিয়াই। উনি জিন্নাহরে প্রটেস্টই করছেন, অথরিটি’টারে যে উনি চিনেন এইটা জানাইছেন।

মজার ব্যাপার হইলো, “অরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়…” গানটা নিয়া; ‘কাইড়া’, কি রকম অদ্ভূত বাংলা! লিখতে গেলেও ফানি লাগে না একটু, ব্যাপারটা! এই বাংলা-ভাষা ভাষা আন্দোলনের ‘নো’ বেঙ্গলিরা চাইছিলেন বইলা মনে হয় না। এইখানে পাওয়ারের ঘটনাটা আরো ক্লিয়ার হওয়ার কথা আসলে। 

তো, সৈয়দ মুজতবা আলী তার আর্গুমেন্টের ভিতরে বারবার ভাষা কেমনে অন্য সব সোশিওপলিটিক্যাল জায়গাগুলাতে দখলের জায়গাগুলা জারি রাখে, সেই জায়গাগুলারে খোলাসা করতেছিলেন।  এই জায়গা থিকা দেখতে গেলেও, এইটা ইন্টারেস্টিং একটা লেখা। 

ই. হা.

…………………………………

ইংরেজও ‘ভদ্রলোক’ ও ‘ছোটলোকের ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা করে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। ইংরেজ কৃষি রিপোর্ট বের করত ইংরেজি ভাষায় এবং চাষাভুষাদের শেখাত বাংলা! বোধ হয় ভাবত বাঙলি ‘মাছিমারা’ কেরানী যখন ইংরেজি  না জেনেও ইংরেজি দলিলপত্র নকল করতে পারে তখন ইংরেজি অনভিজ্ঞ চাষাই বা ইংরেজিতে লেখা কৃষি রিপোর্ট, আবহাওয়ার খবরাখবর পড়তে পার, না কেন? এই পাগলামি নিয়ে যে আমরা কত ঠাট্টা-মস্করা করেছি সেকথা হয়তো উর্দুওয়ালারা ভুলে গিয়েছেন কিন্তু আমরা ভুলি নি। তাই শুধাই, এবার কি আমাদের পালা? এখন আমরা কৃষি-রিপোর্ট, বাজার দর, আবহাওয়ার খবরাখবর বের করব। উর্দুতে আর চাষীদের শেখাব বাংলা! খবর শুনে ইংরেজ লণ্ডনে বসে যে অট্টহাসি ছাড়বে আমরা সিলেটে বসে তার শব্দ শুনতে পাব।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

উর্দুওয়ালারা বলবেন, ‘ক্ষেপেছ? আমরা উর্দু কৃষি রিপোর্ট বাংলাতে অনুবাদ করে চাষার বাড়ীতে পাঠাব।’

উত্তরে আমরা শুধাই সে অনুবাদটি করবেন কে? কৃষি রিপোর্টের অনুবাদ করা তো পাঠশালা-পাসের বাংলা বিদ্যে দিয়ে হয় না। অতএব বাংলা শেখানোর জন্য। হাইস্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতে হবে। অর্থাৎ আমাদের সকলকে স্কুল। কলেজে বাংলা উর্দু দুই-ই বেশ ভালো করে শিখতে হবে (কৃষি রিপোর্ট ছাড়া উর্দুতে লেখা অন্যান্য সৎসাহিত্যও তাে বাংলাতে তর্জমা করতে হবে); ফলে দুই কুলই যাবে, যেমন ইংরেজ আমলে গিয়েছিল—না শিখেছিলাম, বাংলা লিখতে, না পেরেছিলাম ইংরেজি ঝাড়তে।

ইংলণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানীতে যে উচ্চশিক্ষার এত ছড়াছড়ি, সেখানেও দশ হাজারের মধ্যে একটি ছেলে পাওয়া যায় না যে দুটো ভাষায় সড়গড় লিখতে পারে। আরব, মিশরের আলিম-ফাজিলগণও এক আরবী ছাড়া দ্বিতীয় ভাষা জানেন না।

না হয় সব কিছুই হল কিন্তু তবু মনে হয়, এ বড় অদ্ভুত পরিস্থিতি—যে রিপাের্ট পড়নেওয়ালার শতকরা ৯৯ জন জানে বাংলা সে রিপাের্টের মূল লেখা হবে উর্দুতে! ব্যবস্থাটা কতদূর বদখত বেতালা তার একটা উপমা দিলে আমার বক্তব্য খোলাসা হবে: যেহেতু পূর্ব পাকিস্থানে উপস্থিত শ’খানেক রুটি-খানেওয়ালা পাঞ্জাবী আছেন অতএব তাবৎ দেশে ধানচাষ বন্ধ করে গম ফলাও! তা সে আলবাধা, জলে-টৈ-টম্বুর ধানক্ষেতে গম ফলুক আর নাই ফলুক!

উর্দুওয়ালারা তবু বলবেন, ‘সব না হয় মানলুম, কিন্তু একথা তো তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না যে কেন্দ্রের ভাষা যে উর্দু সে সম্বন্ধে পাকাপাকি ফৈসালা হয়ে গিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের লোক যদি উর্দু না শেখে তবে করাচীর কেন্দ্রীয় পরিষদে তারা গাকগাক করে বক্ততা বাড়বেনই বা কি প্রকারে, এবং আমাদের ছেলেছোকরারা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ডাঙর ডাঙর নোকারি বা করবে কি প্রকারে?

বক্ততা দেওয়া সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য এই যে, আমরা যত ছেলেবেলা থেকে যত উত্তম উদুই শিখি না কেন, উর্দু যাদের মাতৃভাষা তাদের সঙ্গে আমরা কস্মিনকালেও পাল্লা দিয়ে পেরে উঠব না। আমাদের উচ্চারণ নিয়ে উর্দু-ভাষীগণ হাসিঠাট্টা করবেই এবং সকলেই জানেন উচ্চারণের মস্করাভেংচানি করে মানুষকে সভাস্থলে যত ঘায়েল করা যায় অন্য কিছুতেই ততটা সুবিধে হয় না। অবশ্য যাদের গুরদা-কলিজা লোহার তৈরী তারা এ সব নীচ ফন্দি-ফিকিরে ঘায়েল হবেন না কিন্তু বেশীরভাগ লোকই আপন উচ্চারণের কমজোরী বেশ সচেতন থাকবেন, বিশেষত যখন সকলেই জানেন যে প্রথম বহু বৎসর ধরে উত্তম উচ্চারণ শেখবার জন্য ভালো শিক্ষক আমরা যোগাড় করতে পারব না, এবং একথাও বিলক্ষণ জানি যে একবার। খারাপ উচ্চারণ দিয়ে বিদ্যাভ্যাস আরম্ভ করলে অপেক্ষাকৃত বেশী বয়সে সে জখমী উচ্চারণ আর মেরামত করা যায় না। দৃষ্টান্তের জন্য বেশী দূর যেতে হবে না। পূর্ববঙ্গের উর্দু ভাষাভাষী মৌলবী সাহেবদের উচ্চারণের প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই তাদের উচ্চারণের দৈন্য ধরা পড়ে। সে উচ্চারণ দিয়ে পূর্ব বাংলায় ‘ওয়াজ দেওয়া চলে কিন্তু যাদের মাতৃভাষা উর্দু তাদের মজলিসে মুখ খোলা যায় না। এমন কি দেওবন্দ রামপুর ফের্তা কোনো কোনো মৌলবী সাহেবকে উচ্চারণ বাবতে শরমিন্দা হতে দেখেছি, অথচ বহুক্ষেত্রে নিশ্চয় জানি যে এদের শাস্ত্রজ্ঞান দেওবন্দরামপুরের মৌলানাদের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে। কিন্তু এরা নিরুপায়, ছেলেবেলা ভুল উচ্চারণ শিখেছিলেন, এখনো তার খেসারতি ঢালছেন।

কিন্তু কি প্রয়োজন জান পানি করে ছেলেবেলা থেকে উর্দু উচ্চারণে পয়লানম্বরী হওয়ায়? অন্য পন্থা কি নেই?

Continue reading

কবুল, কবুল: কবুলিয়তের শাশন

ইতিহাসে রাষ্ট গজাইছে এই তো কয়েক বছর আগে, ৫/৬ হাজার বছর ধরেন, আর সমাজের বয়স অন্তত মানুষের ভাষার সমান। সমাজ বা রাষ্ট, যেইটারে লইয়াই ভাবেন, কোন একটা সমাজ বা রাষ্ট যেই ছিস্টেমেই চলুক না কেন, চোখা নজরে বিচার করলে দেখবেন, দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষের খমতা পেরায় নাই, সমাজ বা রাষ্ট্র চালায় হয়তো তাবত মানুষের বড় জোর ১{855ff4e32ca5c8db0719e8f837cd158afce0d103a8821dfb7d995472b79aa6d7}; বাকিরা ছিস্টেমের কোন একটা পোস্টে খাড়াইয়া হুকুম তামিল করে মাত্র! 

এই হিসাবে একটু গলদ আছে অবশ্য; ছিস্টেম পেরায়ই কোন একজন মানুষের তুলনায় পাওয়ারফুল, তাইলে কার খমতা কতটা, সেইটা মাপার উপায় কি? এই ব্যাপারে একটা খশড়া পরস্তাব আছে আমার: ছিস্টেমকে কে কতটা এক্সপ্লয়েট করতে পারে, বা নিজের দরকারে ইউজ করতে পারে–এইটারে মিটার হিসাবে ধরতে পারি আমরা। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]

আরেকটু ভাইঙ্গা কই, মানে দুয়েকটা নজির দেখাইতেছি: ১৮ আগস্ট ২০১৯’র বাংলা ট্রিবিউনের একটা খবরের হেডলাইন পড়েন–“খুলনা জিআরপি থানায় গণধর্ষণ: অভিযোগকারী গৃহবধূর জামিন নামঞ্জুর”। ছিস্টেম মোতাবেক থানায় রেপ হবার কথা না, হইলে সেই ব্যাপারে মামলা করতে পারার কথা, সেই নালিশ কইরা এখন দেখা যাইতেছে, জেলে যাওয়া লাগলো। এইটারে অবশ্য জেল-হাজত না কইয়া কিডন্যাপ কইলেই আরো ঠিক হয়। যাই হউক, এই ঘটনায় যারা ছিস্টেমকে এক্সপ্লয়েট করতে পারলো, তাগো খমতা বেশি আর ছিস্টেমের কাছে বিচার চাইয়া যে উল্টা দোবারা ভিকটিম হইলো, তার খমতা নাই। দেশে ছিস্টেমকে এমনে এক্সপ্লয়েট তাইলে কারা কারা করতে পারে? ডাইরেক শরকারি লোক আছে কয়েক লাখ আর শরকারি দলের কয়েক লাখ লোক, লগে কিছু পয়সাঅলা, যারা ভাড়া করতে পারে ছিস্টেমকে। এনারা তাই ছিস্টেমের কোন একটা পোস্টে খাড়াইয়া স্রেফ হুকুম তামিল করলেও খমতাবান ধরতে হইতেছে; কেননা, তারা সবাই ছিস্টেমের বদৌলতে অন্যরে জুলুম করতে পারে চাইলে, সেই মওকা তাগো দিয়া রাখছে ছিস্টেম।

বাকি জনতা নিজেদের হাঁস-মুরগি, রাস্তার কুত্তা বা নিজেদের বাচ্চা-কাচ্চার উপর খবরদারি করতে পারলেও ছিস্টেমের নিরিখে ভাবলে খমতা নাই তাগো পেরায়; সমাজ-কালচার মোতাবেক বউদের উপর ভাতারের খবরদারি আছে, আমির-গরিব বিচারে বান্দি আর বান্দির বাচ্চারে ভাতারের বিছানায় যাইতে বাধ্য করতে পারে কোন মাইয়া, গরম খুন্তি দিয়া পোড়াইতে পারে গাল, ভাতারের রেপে গাভীন বান্দির বাচ্চারে খুন করতে পারে ভাতার-বউ, তবু রাষ্ট্রের ছিস্টেমের নিরিখে তাদের খমতা তত নাই ধরা যায়।

তো, এই যে ৯৯{855ff4e32ca5c8db0719e8f837cd158afce0d103a8821dfb7d995472b79aa6d7} মানুষ, খমতা নাই যাদের, এরা কি চায়? খিদা লাগে, লিবিডো আছে, ভোগের আরো আরো বাশনা-খায়েশ আছে, দরকারি এইসব জিনিস কোন না কোন কাম কইরা যেন জোটাইতে পারে, ভাতার-বউ-নাগর জোটাইতে পারে যেন  কোন এক ভাবে; ছিস্টেমের কাছে তাগো পয়লা চাওয়া কি?

আমার হিসাবে কয়, এদের পয়লা চাওয়া হইলো– গোলামি থিকা মুক্তি। এখন গোলামি কোনটারে ধরবেন? এই ব্যাপারে একমত হইতে আমরা মুশকিলে পড়তেছি মনে হয়, কিন্তু গোলামির যে হেরফের আছে সেই ব্যাপারে অন্তত একমত হইতে পারার কথা! সবচে বেশি গোলামি হয়তো গরিব মাইয়াদের, যেমন ধরেন- বান্দির বাচ্চারা, তার পর গরিব পোলারা, রিশকাঅলা যেমন; ধর্ম বা জাতি বা ভাষাও কারো গোলামিতে হেরফের ঘটাইতে পারে। একজন বিহারি বাংলাদেশি যদি দেশে উর্দুতে আরামে কথা কইতে ডরায়, তাইলে ধরতে হবে, সে কিছু গোলামির মাঝে আছে।

সমাজে গোলামির এমন হাজারো আলামত বা নিশানা পাইতে পারি আমরা। এমন গোলামিতে যারা থাকে তাদের কেউ কেউ গোলামির মাঝে সুখও পাইতে পারে, তাতে বাকিদের মুক্তির আশা গুরুত্ব হারায় না; কোন দিকে শতকরা কত, সেই সোজা যুক্তি বাদেও বড়ো যুক্তি আছে: গোলামি থিকা সাচ্চা মুক্তি ঘটলে গোলামিতে সুখিরা সহজেই মনিব বাইছা নিতে পারবে, কেউ তাদের ঠেকাইতেছে না, কিন্তু কেউ কেউ গোলামিতে সুখি বইলা গোলামি যদি এমনই থাকতে দেই তাইলে কেউ চাইলেও গোলামির বাইরে যাইতে পারতেছে না! তাইলে গোলামি থিকা মুক্তি মানে গোলাম হবার ফ্রিডমও!

এখন, গোলামি থিকা কতটা মুক্তি পাইলো, সেইটা কেমনে হিসাব করবে লোকে, বা মুক্তির শুরু হিসাবে কোন একটা বিন্দুরে ধরা যায় কি?

চিন্তাভাবনা কইরা মনে হইলো, শুরুর বিন্দুটা হইলো কবুলিয়ত, কনসেন্ট বা কবুল করা বা না করা। কবুলের এই মিটার দিয়া আমরা বিছানা-ফেমিলি থিকা রাষ্ট তক বিচার করতে পারতেছি! যেইখানে, শেইটা বিছানা হউক বা সমাজ বা রাষ্টের শাসন হউক, মানুষের কবুল করা বা না করারে যতো কম তোয়াক্কা করা হয়, সেইখানে গোলামি ততো বেশি। গোলামিরে যদি হারাম মানেন, তাইলে যেই ছিস্টেম জনতারে যতো বেশি গোলাম কইরা তোলে, সেই ছিস্টেম ততো বেশি হারাম!

এই মিটার দিয়া যদি মাপা শুরু করেন, তাইলে দুনিয়ার সব পলিটিক্যাল থিয়োরি আর তার আতেলদের ব্যাপারে খুবই মজার কিছু দরকারি ফয়ছালা করতে পারবেন! ঝগড়া-ফ্যাছাদ আর খুনাখুনি করতে থাকা দুইটা পলিটিক্যাল থিয়োরি বা দুই দল আতেলরে হয়তো দেখবেন একই ক্যাটেগরিতে পড়তেছে! দেশ-বিদেশের কিছু থিয়োরি আর আতেলরে মাপা শুরু করেন; ওকে, আমি একটু মদদ দিতেছি 🙂 ! 

Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →