হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র এই লেখা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাপাইছিলেন বঙ্গদর্শনে (৮ নাম্বার সংখ্যা, শ্রাবণ, প. ১৮৩ – ১৮৮; বাংলা ১২৮৮ সন, আনুমানিক খৃষ্ট সন ১৮৮১)। পরে হুমাযূন আজাদ উনার ‘বাঙলা ভাষা’ বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে (আগামী প্রকাশনী, ১৯৮৪, নতুন ভার্সন ২০০৯-এ) ‘ভাষা-পরিকল্পনা’ সেকশনে রি-প্রিণ্ট করছেন (পেইজ: ৩৬০ – ৩৬৪)। যেহেতু বঙ্গদর্শনে ‘গ্রাডু্এট্’ নামে ছাপানো হইছিলো, হুমায়ুন আজাদ লেখক পরিচয়ে লিখছেন যে, “লেখককে শনাক্ত করা যায় নি।” অথচ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র রচনাসংগ্রহ ২য় খন্ডে এই লেখা ইনক্লুডেড হইছে ১৯৮১ সালে। আমাদের চিন্তা’র হিস্ট্রি যে কতোটা আলগা এই একটা ঘটনা দিয়াই বুঝা যাইতে পারে। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]
এইখানে শাস্ত্রী সাহেবের আর্গুমেন্ট’টা হইতেছে, যেইটা এখনকার (মানে, তখনকারই) লিখিত বাংলা-ভাষা সেইটা সোসাইটির ভিতর থিকা আসে নাই, কলোনিয়াল আমলে সংস্কৃত কলেজ থিকা ইম্পোজড হইছে এই মাল। তার আগে লিখিত ফর্ম হিসাবে পদ্যই চালু আছিলো বাংলা-ভাষায়, কিন্তু তিন ধরণের গদ্য ডেইলি লাইফে ইউজ হইতো – একটা ছিল ভদ্রসমাজের (মুসলিম নবাব’রা – কাজী নজরুল ইসলাম যাদেরকে ভদ্রলোক বইলা হাসি-ঠাট্টা করছেন উনারা হইতেছেন এই ক্লাসটা, ইউরোপিয়ান মিডল-ক্লাস না) ভাষা, উর্দু শব্দ ইউজ করাটা একটা নবাবি ব্যাপার আছিলো, এখন আবার এই ট্রেন্ড চালু হইতেছে কিছুটা। সেকেন্ড হইলো যারা শাস্ত্র পড়তেন/পড়াইতেন (আমার ধারণা এইটা খুবই ছোট্ট একটা গ্রুপ ছিল), সংস্কৃত শব্দের ভান্ডার নিয়া থাকতেন; যেহেতু রেয়ার জিনিস হইতে পারলে আমাদের সেক্স-চিন্তা আর আর্টে ইর্ম্পটেন্স বাড়ে, এইরকম জায়গা থিকা উনারা্ বেশ এক্সোটিক ছিলেন বা হইতে পারছেন। কিন্তু মোস্টলি যোগাযোগের একটা ব্যাপার তো থাকেই সোসাইটির ভিতরে, নানান পেশার লোকজনের মিলতে হইতো, কথা কওয়া লাগতো, ওইখানে যেই বাংলা-ভাষা সেইখানে উর্দু-সংস্কৃত নানানরকমের শব্দের মিশানিটা থাকতো। কিন্তু শাস্ত্রী সাহেব কনক্লোশনে কোনদিকেই যান নাই, বরং এনার্কি’র প্রপোজাল দিছেন। যেহেতু কনফাইন্ড কোনকিছু নাই, যে কেউ যে কারো মতো লিখতে পারা’র অবস্থা থাকা দরকার। তো, এইটা উনার গ্রাজুয়েট (গ্রাডুএট্) হওয়ার প্রাউডই মে বি।
এমনিতে, গ্রামসি’র লেখা ব্রাউজ করলে পাওয়া যাবে সোসাইটিতে ডিফরেন্ট প্রফেশনের ভিতর থিকাই ইন্টেলেকচুয়ালিটির (সেইদিক দিয়া ভাষার) জিনিসটা গ্রো করে, অ্যাক্টিভ থাকে। এখন জিনিসগুলি কমপ্লিকেটেট হইছে আরো। ব্যাপারটা যতোটা না ইন্টার-অ্যাকাশন তার চাইতে ইন্টারভেনশনের জায়গাগুলিতে চইলা আসতেছে আরো।… তো, বাংলা-ভাষা নিয়া এই আলাপগুলি করতে গেলে হিস্ট্রিক্যাল কারণেই এই লেখাটার দরকার পড়তে পারে। এই সিরিজে এইজন্য জোড়া দেয়ার কথা ভাবলাম।
ই..হা.
————————————————————————–
বাঙ্গালা ভাষায় লিখিতে গেলে প্রথমতঃ রচনাপ্রণালী লইয়া বড়ই গোল বাঁধে। একদল, জনমেজয় যেমন সর্প দেখিলেই আহূতি দিতেন, সেইরূপ পারসী কথা দেখিলেই তাহাকে তাহার আহূতি দেন। আর একদল আছেন, তাঁহারা সংস্কৃত কথার প্রতি সেইরূপ সদয়। কেহ ভাষার মধ্যে সংস্কৃত ভিন্ন অন্য ভাষার কথা দেখিলেই চটিয়া উঠেন, প্রবন্ধের মধ্যে হাজার ভাল জিনিস থাকুক, আর পড়েন না। আবার কেহ আছেন যেই দেখিলেন, দুই পাঁচটি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার হইয়াছে, অমনি সে গ্রন্থ অপাঠ্য বলিয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। এখন আমরা গরীব, দাঁড়াই কোথা? আমরা ইংরেজি পড়ি আমাদের অর্দ্ধেক ভাবনা ইংরেজিতে। আমরা কলম ধরিলেই ইংরেজি কথায় ইংরেজি ভাব আইসে। সংস্কৃত আমরা যা পড়ি, তাতে সে ভাব ব্যক্ত হয় না। বাঙ্গালার বিদ্যা বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস, আর বঙ্কিমবাবুর নবেল কয়খানি। তাতেও ত কুলায় না। নূতন কথা গড়ি এমন ক্ষমতাও নাই। তবে আমাদের কি হইবে। হয় কলম ছাড়িতে হয়, না হয় যেরূপে পারি মনের ভাব ব্যক্ত করিয়া দিতে হয়। নিজের কথায় নিজের ভাব আমি ব্যক্ত করিব, তাহাতে অন্যের কথা কহার স্বত্ব কতদুর আছে জানি না। কিন্তু, পূর্ব্বোক্ত দুই দলের লোক দুইদিক হইতে কুঠার লইয়া তাড়া করেন। সুতরাং এক এক সময়ে বোধ হয় “…তত্র মৌনং হি শোভতে” কিন্তু আবার যখন অঙ্গুলিকন্ডুরন উপস্থিত হয়, তখন না লিখিয়াও থাকিতে পারি না। বিশেষ এই যে, যখন কর্তব্যবোধে কোন কার্জ্যে প্রবৃত্ত হওয়া যায়, তখন পাঁচজনের কথায় তাহা হইতে নিরস্ত হওয়া নিতান্ত কাপুরুষের কাজ। যে কোন ভাষাই হউক, যে কোন রচনাপ্রণালীতেই হউক, যদি দুটা ভাল কথা বলিতে পারি, পাঁচজনের তরে চুপ করিয়া থাকিব কেন?
তবে ভাল কথা বলিতে যদি মন্দ কথা বলি, তাহা হইলে পাঁচজনের গালাগালি দিবার বাস্তবিক অধিকার আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পুর্ব্বোক্ত দুই শ্রেনীর সমালোচকগণ কথাটা ভাল কি মন্দ সেদিকে লক্ষ্যও করেন না। নাই করুন, কথাটা ভাল করিয়া বলা হইয়াছে কি না, তাহাও দেখেন না। দেখেন কেবল লেখার মধ্যে বড় বড় সংস্কৃত কথা আছে কি পারসী ও ইংরেজি শব্দ আছে। মারামারি করেন কেবল তাহাই লইয়া। সুতরাং আমার মতো ক্ষুদ্র লেখকবর্গের সেই বিষয়েই দৃষ্টি রাখিয়া চলিতে হয়। তাহাতেও গোলযোগ। যখন দুই দল দুইদিক ধরিয়া টানাটানি করিতেছেন, তখন উভয়দলের মন রক্ষা করা অসম্ভব। অথচ যে দলের মনরক্ষা না হইবে, তিনিই কুঠার উত্তোলন করিয়া লেখকের প্রতি ধাবমান হইবেন। এ অবস্থায় লেখকবেচারা বিষম সমস্যায় পড়িয়া যায়। Continue reading →