ফিকশন: দোস্তি
১.
পায়রার পুব পাড়ে, তিতকাটা নামের গেরামটা পছন্দ হইলো রেজন মিরার বাপের। তাছাড়া নৌকায় আর কতো দিন! শেই মুর্শাদাবাদ থিকা পানিতে, পেরায় ১ মাশ কাটলো, এর ভিতর কোথাও তেমন ভিড়তে পারলো না, পছন্দ হয় না ঠিক! তিতকাটাও জে খুব পছন্দ হইছে, তা না; কিন্তু এইবার মাটিতে নামা দরকার মনে হইলো তার; আর নৌকায় বইশাই জাইল্লাদের থিকা তাজা ইলিশ কিনা দুপুরের ভাত খাইতে খাইতে রেজন মিরার বাপের মনে হইলো–কিশের কি পদ্দা, এই পায়রার ইলিশই তো মনে হইতেছে শবচে বেশি ভালো লাগলো! পোলার কাছে জিগাইলো, রেজন মিরাও কইলো, হ, ভালোই তো লাগতেছে! রেজন মিরার মায়ের দিকে নজর ফিরাইতে শে কইলো, খাই নাই এখনো, তবে রানতে রানতে কড়া ঘেরান পাইছি, মাছটায় তেলও আছিলো জব্বর!
আর কিছু দিন মুর্শিদাবাদে থাকলে হয় খয়রাত করতে হইতো বা না খাইয়া মরা লাগতো! পলাশির জুদ্ধের পরে পেরায় ১২০ বছর পার হইছে, এতো দিনে মির বংশের লোকেরা পেরায় শবাই চইলা গেলো কোন কোন দিকে, খালি রেজন মিরার বাপেই থাইকা গেছিলো! কামাই আছিলো না কোন, কোন মতে খাইয়া পইরা আছিলো, ব্যবশা আছিলো কাপড়ের, ঐটা খতম; একে তো কলের কাপড়, তার উপর মুর্শিদাবাদ নামের ঐটা তখন একটা গেরাম, শহর চইলা গেছে কলিকাতায়। তার বাপ-দাদার আমলের কিছু শোনাদানা, আর বাড়িটা আছে। শোনা বেইচাই খাইতেছিলো, কিন্তু অমনে জে টিকতে পারবে না, শেইটা বুঝতেছিলো ভালোই!
তাই একদিন বউ, ৩ পোলা, বড়ো পোলা রেজনের বউ, ধর্ম মাইয়া আর জামাইরে লইয়া একটা নৌকায় উইঠা পড়লো রেজন মিরার বাপে। বাড়িটা বেচলো, বাকি শোনাদানাও শব এক লগে বেইচা দিলো। একটা নৌকা কিনলো। ধর্ম মাইয়ার জামাই নৌকার কাজকাম পারে; হাড়িপাতিল, পাটা-পুতা শব নৌকায় তুইলা অজানায় রওনা দিয়া দিলো। অল্প কিছু টাকা রাইখা বাকিটা দিয়া চাল-ডাল-লাকড়ি কিনলো, আর কিনলো কতগুলা কলের কাপড়, একটা শদাগরি নৌকা জেনো, কাপড়ের ব্যবশা করে–এমন একটা পরিচয় ঠিক কইরা পাল তুইলা দিলো নৌকায়! ধর্ম মাইয়ার জামাই হাল ধরলো, নৌকা টানলো পালে। ২/৩ দিনের ভিতর রেজন মিরা আর তার বাপেও নৌকার খুটিনাটি শিখা নিলো জামাইর কাছে।
এমনেই ভাশতে ভাশতে এই তিতকাটা। এই দুর ভিনদেশে কেমনে নিজের ঠাই গাড়বে, ভাবলো রেজন মিরার বাপ। আখেরে বেশি কঠিন হয় নাই। হাটে পরিচয় হইলো তিতকাটার পাশের গেরামের করিম দফাদারের লগে। কথার টানে এমনিতেই বোঝা জাইতেছিলো; তার লগে নিজেই কইলো, আমি মোটামুটি বিদেশি; ওদিকের মাল এদিকে, এদিকের মাল ওদিকে বেইচা শদাগরি করার খায়েশ মনে। তাই এদিকে একটা বাড়ি করতে চাই, পরিবার এইখানে রাখতে চাই। আমারে এক টুকরা জমিনের বন্দোবস্ত কইরা দেন।
কথা দিলো দফাদার। জমিন আছে জানাইলো, চাইলে এখনি লইতে পারে! রেজন মিরার বাপ তাড়াহুড়া করলো না, ৮/১০ দিন পরে আশবে জানাইলো। তবে জমিটা দেখতে চাইলো। দেখা গেলো, পায়রায় জেইখানে নাও ভিড়াইছে তার, শেই বরাবরই জমিটা! দফাদারের কাছে বিদায় লইয়া নৌকায় উঠলো রেজন মিরার বাপ। তারপর দিন ১২ পানিতে পানিতে ঘুরলো, আরো শামনের দিকে গেলো, আমতলির হাট করলো, গোলবুনিয়া, তালতলি ঘুইরা তিতকাটা ফিরলো আবার। এইভাবেই এই বাড়িতে রেজন মিরাদের পত্তন হইছিলো। কয় বছর পর বাপ মরলো। মা মরলো। মাঝে ঘর উঠলো, আশেপাশে আরো কিছু ধানি জমি কিনলো, নয়া ঘর বানাইয়া ভাইরা জুদা হইয়া গেলো। কেউ কিশান হইয়া গেলো, কেউ মাছ ধরতে নামলো পায়রায়।
৩০/৩৫ বছরের ভিতর রেজন মিরা তিতকাটার মাতবর হইয়া উঠলো। শদাগরি বাদ দিয়া চাশবাশ করে এখন, শালিশি কইরাও কিছু কামাই হয়, গরু-বাছুর আছে, হাশ-মুরগি, নদিতে মাছ, খোরাকি ধান, মিশ্টি কুমড়া, বাদাম, মিশ্টি আলু, নারিকেল বাগানেও ফলন ভালো। পোলা ছোবাহান বেশ তাগড়া হইয়া উঠছে, পুরা বংশে কয়েকটা তাগড়া পোলা থাকলে জমিজমার দখল রাখতে অতো মুশকিল হয় না। পুবের দিকে ধানি জমি লইয়া ক্যাচাল আছে, মাঝে মাঝে রাম দা, বল্লম, মাছ ধরার চল বইলা একটা জিনিস আছে–একটা লোহার থাবার গোড়ায় লম্বা একটা বাশ লাগাইয়া বানায়, বাশের লাঠি লইয়া হুলাহুলি হয়, কিন্তু ছোবাহানের বুদ্ধি ভালো, পুবের গেরামের ওরা ততো শুবিধা করতে পারে না। মোটের উপর, আরামেই আছে রেজন মিরা।
আফছোছ, মাঝখানে ছোবাহানের মা শরিফুন্নেছা মইরা গেল! ২ মাইয়া আর ১ পোলা হইছে তার পেটে। মুর্শিদাবাদের খান্দানি ঘরের মাইয়া, দুধে-আলতা গায়ের রঙ, হাতের রগের ভিতর রক্তের চলাচল দেখা জায়; জেনো ইরানি কার্পেটের ভিতর ঢুইকা নগদ নগদ চালান হইয়া আশছে!
ছোবাহানের মা মরার পরে দুইটা বিয়া করলো রেজন মিরা, কিন্তু শেই খান্দান আর পাইলো না। ছাহেরার মায়রে দিয়া বউয়ের কাম চলে কদ্দুর, কিন্তু রেজন মিরার মনে পিরিতি গজাইলো না আদৌ! মেজাজ খাপ্পা হইয়া থাকে পেরায়ই। এমনও হইছে জে, দুপুরে খাইয়া ঘুমায় রেজন মিরা, মোরগের ডাকে ঘুম ভাংলো, অমনি ছাহেরার মায়রে ডাইকা পিটানি শুরু করলো; মোরগের ডাক কেন তার কানে ঢুকবে, দেইখা রাখে নাই কেন! ছাহেরা তবু একটু শ্যামলা হইছে, পরে পেরায় কয়লার মতো কালা একটা পোলা হইলো। বাচ্চা হবার ধকলের লগে রেজন মিরার মাইর মিলাই বুঝি ছোট ছোট পোলা-মাইয়া রাইখা মইরা গেলো ছাহেরার মা! তবে আরেক বউ থাকলো, শেই ঘরে হইলো আরেক পোলা আর ১ মাইয়া। পরে আরো কি কি হইতে পারতো, শেইটা বোঝার উপায় নাই; একদিন দেখা গেলো, দুপুর বেলা মোরগ ডাকলো, কিন্তু রেজন মিরার ঘুম ভাংলো না, বিকাল গড়াইলো, উঠলো না তবু! মাগরিবের আগে আগে খালেকের মা ছোবাহানরে জাইয়া কইলো, ছোবাহান বাপের গায়ে হাত দিয়াই বুঝলো, ঘুমের ভিতরই আখেরি দম ছাড়ছে রেজন মিরা। Continue reading