Main menu

নজরুল – জসীমউদ্দীন (১৯৬১)

[কবি কাজী নজরুল ইসলামরে নিয়া এই লেখাটা কবি জসীমউদ্দীন ছাপাইছিলেন উনার “ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়” বইয়ে, ১৯৬১ সালে। লেখাটা মোস্টলি কাজী নজরুল ইসলামরে নিয়াই লেখা, কিন্তু জসীমউদ্দীনের অটোবায়োগ্রাফি’রও অংশ। অই অংশগুলা দুই-একটা জায়গায় এস্কেইপ করা হইছে। আর জসীমউদ্দীন লেখাটারে আলাদা চ্যাপ্টারে ভাগ করেন নাই, যেইটা এইখানে আমরা করে নিতেছি।]

১. কলিকাতায়

পদ্মানদীর তীরে আমাদের বাড়ি। সেই নদীর তীরে বসিয়া নানা রকমের কবিতা লিখিতাম, গান লিখিতাম, গল্প লিখিতাম। বন্ধুরা কেউ সে সব শুনিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন, কেউ-বা সামান্য তারিফ করিতেন। মনে মনে ভাবিতাম, একবার কলিকাতায় যদি যাইতে পারি, সেখানকার রসিক-সমাজ আমার আদর করিবেনই। কতদিন রাত্রে স্বপ্নে দেখিয়াছি, কলিকাতার মোটা মোটা সাহিত্যিক দের সামনে আমি কবিতা পড়িতেছি। তাহারা খুশি হইয়া আমার গলায় ফুলের মালা পরাইয়া দিতেছেন। ঘুম হইতে জাগিয়া ভাবিতাম, একটিবার কলিকাতা যাইতে পারিলেই হয়। সেখানে গেলেই শত শত লোক আমার কবিতার তারিফ করিবে। কিন্তু কি করিয়া কলিকাতা যাই। আমার পিতা সারা জীবন ইস্কুলের মাস্টারী করিতেন। ছেলেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে এইরূপ আকাশকুসুম চিন্তা করে, তিনি জানিতেন। কিছুতেই তাহাকে বুঝানো গেল না, আমি কলিকাতা গিয়া একটা বিশেষ সাহিত্যিক খ্যাতি লাভ করিতে পারি। আর বলিতে গেলে প্রথম প্রথম তিনি আমার কবিতা লেখার উপরে চটা ছিলেন। কারণ পড়াশুনার দিকে আমি বিশেষ মনোযোগ দিতাম না, কবিতা লিখিয়াই সময় কাটাইতাম। তাতে পরীক্ষার ফল সব সময়ে ভাল হইত না।

তখন আমি প্রবেশিকার নবম শ্রেণীতে কেবলমাত্র উঠিয়াছি। চারিদিকে অসহযোগ-আন্দলনের ধুম। ছেলেরা ইস্কুল-কলেজ ছাড়িয়া স্বাধীনতার আন্দোলনের নামিয়া পড়িতেছে। আমিও স্কুল ছাড়িয়া বহু কষ্ট করিয়া কলিকাতা উপস্থিত হইলাম।

[…]

রামানন্দ বাবুর বাড়ি আবার গিয়া কড়া নাড়িতেই এক নারীকণ্ঠের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। তাহার নিকট হইতে চারুবাবুর ঠিকানা লইয়া শিবনারায়ণ দাস লেন তার বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। খবর পাঠাইতেই আমাকে দ্বিতলে যাইবার আহ্বান আসিল। অর্ধশায়িত অবস্থায় সেই আগের লোকটির মতই তিনি আমাকে প্রশ্ন করিলেন, “কি চাই?” ঘরে বোধ হয় আরও দু-একজন ভদ্রলোক ছিলেন। পূর্বের লোকটির কাছ হইতে প্রত্যাখ্যাত হইয়া আসিয়াছি, তার চিহ্ন বোধ হয় মুখে-চোখে বর্তমান ছিল। তার উপরে একতলা হইতে দ্বিতলে উঠিয়া শ্রান্তিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস লইতেছিলাম। কোন রকমে বলিলাম, “আমার কিছু কবিতা আপনাকে দেখাতে এসেছি।”

ভদ্রলোক অতি কর্কশ ভাবে আমাকে বলিলেন, “তা আমার বাড়িতে এসেছেন কবিতা দেখাতে?”

কল্পলোকের সেই চারুবাবুর কাছে আমি এই জবাব প্রত্যাশা করি নাই। আমি শুধু বলিলাম, “আমার ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করবেন।”

এই বলিয়া রাস্তায় নামিয়া আসিলাম। তখন সমস্ত আকাশবাতাস আমার কাছে বিষে বিষায়িত বলিয়া মনে হইতেছিল। ইচ্ছা হইতেছিল, কবিতার খাতাখানা ছিড়িয়া টুকরা টুকরা করিয়া আকাশে উড়াইয়া দিই। নিজের কর্ম-শক্তির উপর এত অবিশ্বাস আমার কোন দিনই হয় নাই। আজ এই সব লোককে কত কৃপার পাত্র বলিয়া মনে করিতেছি। কী এমন হইত, গ্রামবাসী এই ছেলে, টিকে যদি তিনি দুটি মিষ্টিকথা বলিয়াই বিদায় দিতেন। যদি একটা কবিতাই পড়িয়া দেখিতেন, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হইত।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলার অধ্যাপক, চারুবাবু তখন জগন্নাথ কলেজে পড়ান। একবার আলাপ-আলোচনায় এই গল্প তাঁহাকে কিছুটা মৃদু করিয়া শুনাইয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, “আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটেছে, এটা একেবারে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।”

বস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে চারুবাবু বহু অখ্যাত সাহিত্যিককে উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন।

আমার কলিকাতা আসার সকল মোহ কাটিয়া গিয়াছে, এবার বাড়ি যাইতে পারিলেই হয়। কিন্তু আমার যে টাকা আছে তাহাতে রেল-ভাড়া কুলাইয়া উঠিবে না। ফরিদপুরের তরুণ উকিল অধুনা পাকিস্তান গণ-পরিষদের সভাপতি মৌলবী তমিজউদ্দিন সাহেব তখন ওকালতি ছাড়িয়া কলিকাতা জাতীয় কলেজে অধ্যাপনা করিতেছেন। তিনি ছোটকাল হইতেই আমার সাহিত্য-প্রচেষ্টায় উৎসাহ দিতেন। তাহার নিকটে গেলাম বাড়ি যাইবার খরচের টাকা ধার করিতে। তিনি হাসিমুখেই আমাকে একটি টাকা ধার দিলেন, আর বলিলেন, “দেখ, ভোলার কবি মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে আমি তোমার বিষয়ে আলাপ করেছি। তুমি যদি তার সঙ্গে দেখা কর, তিনি তোমাকে উৎসাহ দেবেন। এমন কি তোমার দু-একটি লেখা ছাপিয়েও দিতে পারেন।”

ছোটকাল হইতে কি করিয়া আমার মনে একটা ধারণা জন্মিয়াছিল, মুসলমানেরা কেহ ভাল লিখিতে পারেন না। সেইজন্য মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করিবার আমার বিশেষ কোন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তমিজউদ্দিন সাহেব আমাকে বার বার বলিয়া দিলেন, “তুমি অবশ্য মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করে যেও।”

Continue reading

ফিকশন: বিষাদ সিন্ধু [শর্ট ভার্সন]- মীর মোশারফ হোসেন (পার্ট ৫)

৯. এজিদ্ দামেস্ক রাজসিংহাসনে উপবেশন করিলেন

দামেস্ক রাজপুরীমধ্যে পুরবাসিগণ, দাসদাসীগণ, মহা ব্যতিব্যস্ত। সকলেই বিষাদিত। মাবিয়ার জীবন সংশয়, বাক্‌রোধ হইয়াছে, চক্ষুতারা বিবর্ণ হইয়া ঊর্ধ্বে উঠিয়াছে, কথা কহিবার শক্তি নাই। এজিদের জননী নিকটে বসিয়া স্বামীর মুখে শরবত দিতেছেন, দাস-দাসীগণ দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছে, আত্মীয়স্বজনেরা মাবিয়ার দেহ বেষ্টন করিয়া একটু উচ্চৈঃস্বরে ঈশ্বরের নাম করিতেছেন। হঠাৎ মাবিয়া একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া “লা ইলাহা ইলাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্” এই শব্দ করিয়া উঠিলেন; সকলে গোলযোগ করিয়া ঈশ্বরের নাম করিতে করিতে বলিয়া উঠিলেন, “এবার রক্ষা পাইলেন; এবারে আল্লাহ্ রেহাই দিলেন!” আবার কিঞ্চিৎ বিলম্বে ঐ কয়েকটি কথা ভক্তির সহিত উচ্চারিত হইল। সেবারে আর বিলম্ব হইল না! অমনি আবার ঐ কয়েকটি কথা পুনর্বার উচ্চারণ করিলেন। কেহ আর কিছুই দেখিলেন না। কেবল ওষ্ঠ দুইখানি একটু সঞ্চালিত হইল মাত্র। ঊর্ধ্ব চক্ষু নীচে নামিল। নামিবার সঙ্গে সঙ্গেই চক্ষের পাতা অতি মৃদু মৃদু ভাবে আসিয়া চক্ষুর তারা ঢাকিয়া ফেলিল। নিশ্বাস বন্ধ হইল। সকলেই মাবিয়ার জন্য কাঁদিতে লাগিলেন। এজিদ্ অশ্ব হইতে নামিয়া তাড়াতাড়ি আসিয়া দেখিলেন, মাবিয়ার চক্ষু নিমীলিত, বক্ষঃস্থল অস্পন্দ; একবার মস্তকে, একবার বক্ষে হাত দিয়াই চলিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই এজিদের চক্ষে জল দেখিতে পায় নাই। এজিদ্ পিতার মৃত দেহ যথারীতি স্নান করাইয়া ‘কাফন’ দ্বারা শাস্ত্রানুসারে আপাদমস্তক আবৃত করিয়া মৃতদেহের সদ্গগতির জানাজা করাইতে শেষ শয়নাসন শায়ী করাইয়া সাধারণ সম্মুখে আনয়ন করিলেন। বিনা আহ্বানে শত শত ধার্মিক পুরুষ আসিয়া জানাজাক্ষেত্রে মাবিয়ার বস্ত্রাবৃত শবদেহের সমীপে ঈশ্বরের আরাধনার নিমিত্ত দণ্ডায়মান হইলেন। সকলেই করুণাময় ভগবানের নিকট দুই হস্ত তুলিয়া মাবিয়ার আত্মার মুক্তি প্রার্থনা করিলেন। পরে নির্দিষ্ট স্থানে ‘দাফন’ করিয়া সকলেই স্ব-স্ব গৃহে চলিয়া গেলেন।

মাবিয়ার জীবনের লীলাখেলা একেবারে মিটিয়া গেল। ঘটনা এবং কার্য স্বপ্নবৎ কাহারো কাহারো মনে জাগিতে লাগিল। হাসান-হোসেন মদিনা হইতে দামেস্কের নিকট পর্যন্ত আসিয়া মাবিয়ার মৃত্যুসংবাদ শ্রবণে আর নগরে প্রবেশ করিলেন না। মাবিয়ার জন্য অনেক দুঃখ প্রকাশ করিয়া পুনর্বার মদিনায় যাত্রা করিলেন। এজিদ্ দামেস্ক রাজসিংহাসনে উপবেশন করিলেন। সত্যবাদী, নিরপেক্ষ ও ধার্মিক মহাত্মাগণ; যাঁহারা হযরত মাবিয়ার স্বপক্ষ ছিলেন, তাঁহাদের হৃদয় কাঁপিয়া উঠিল। আমরাও বিষাদ-সিন্ধুর তটে আসিলাম।
Continue reading

ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে? – রজার এবার্ট (পার্ট ১)

ট্রান্সলেটরের ইন্ট্রো

এবার্ট ১৯৪২ সালে আম্রিকার ইলিনয় স্টেটে জন্মান। ‘৬৭ সাল থেকে নেক্সট ৪০+ বছর তিনি শিকাগো সান-টাইমস পত্রিকার ফিল্ম ক্রিটিক ছিলেন। ক্রিটিসিজম ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার আর হলিউডের ওয়াক অফ ফেইমে স্থান পাওয়া একমাত্র ফিল্ম ক্রিটিক তিনি।

উনার লেখা কেমন?

কমন একটা কথা আছে যে, “ওয়ান পারসন’স প্রিটেনশাস ইজ এনাদার পারসন’স মাস্টারপিস”। গুগলে সার্চ দিলে এবার্টের লেখা নিয়াও পোলারাইজড কমেন্ট পাবেন। তবে, পারসোনালি উনার লেখায় আম্রিকান আউটলুক আর অপ্টিমিস্টিক অ্যাপ্রোচ ফিল করছি খুব। শুধু সিনামা না, সিনামার দর্শকদের প্রতিও একটা দরদ উনার লেখায় টের পাওয়া যায়। জনপ্রিয় বা কমার্শিয়াল সিনামারে উনি গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করতেন। বিনোদন দেয়াই সিনামার বেসিক ডিউটি, কিন্তু ফর্ম হিসেবে আমাদের আরেকটু ভালো মানুশ করার পটেনশিয়ালিটি সিনামার আছে— নানান লেখাজোকায় এমনটা বলছেন। তাঁর মতে, একটা সিনামা ‘কি নিয়া’, সেইটা সেই সিনামার মূল অ্যাস্পেক্ট না, বরং সেই ‘কি নিয়া’টা আসলে ‘কেমনে’ হইতেছে—সেইটাই সিনামা।

তিনি মনে করতেন ভিডিও গেমস কোনদিন আর্ট হইতে পারবে না।

তিনি ২০১৩ সালে শিকাগোতে মারা যান।

******

অনুবাদের লেখাটা প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৭৮ সালে, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ‘দ্য গ্রেট আইডিয়া টুডে’ বইয়ে। ২০২৩ সালে লেখাটা পড়তে গেলে কিছু জায়গা, স্পেশালি টেলিভিশন নিয়া অংশটুকু অনেক ডেইটেড লাগবে, কিন্তু স্টাইলিস্টিক যেসব টেন্ডেনসির কথা এবার্ট বলছেন, তা এখনও রিলেভেন্ট। এখনও সিনামার ‘কাহিনী’ নিয়াই মাতামাতি চলে দুনিয়া জুইড়া, চলে ‘স্পয়লার অ্যালার্ট’। এখনো সিনামা হয়া আছে গল্পের ভিজুয়ালাইজেশন। অথচ সিনামা-ই একমাত্র আর্ট ফর্ম যেইটা আমাদের প্রতিদিনের ড্রিম আর ডেড্রিমরে হুবহু ক্যাপচার করতে পারে। কিন্তু আমরা হাজারবছর পুরানো থ্রি-এক্ট স্ট্রাকচারের ভিতরে সিনামারে স্টিল বন্দি করে রাখছি। এই বস্তাপচা স্ট্রাকচার বা ন্যারেটিভরে বাদ দিলে সিনামার যে দীঘল দিগন্ত আমাদের হাতছানি দেয়, এই আর্টিকেলে এবার্ট সেই ডাকে সাড়া দিতে বলছেন।

******

আবীর হাসান একা
ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

******

ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে?

অন্য যেকোনো আর্টফর্মের চে সিনামা নিয়াই সবচে বেশি আবোলতাবোল সমালোচনা লেখা হয়। কারণ সবচে কম বোঝা-পড়া নিয়া মানুশ সিনামা দেখে, সিনামা নিয়া লেখে। আমাদের মেন্টালিটি এমন যে, আমরা ধইরা নিসি চিত্রকলা, সঙ্গীত বা নৃত্যকলা পুরোপুরি উপভোগ করতে আমাদের আগে থেকে কিছু জানাশোনা দরকার, কিন্তু সিনামার বেলায় আমাদের এইসব বাছবিচার আর জারি থাকে না—আমরা আত্মচেতনা-মেতনা সব বাদ দিয়া দেই আর চুপচাপ বইসা থাকি, যাতে নিখাদ অভিজ্ঞতা আমাদের খাইয়া ফেলতে পারে।

বাজে পরিচালকরা সেলফ-কনশাস শট আর সেলফ-এভিডেন্ট স্ট্র্যাটেজি দিয়া দর্শকদের এটেনশন নিতে চায়। অন্যদিকে, ভালো পরিচালকদের দেখবেন – সিনামার প্রতি তাদের একটা সহজ-সরল ভালবাসা থাকে। তারা জানে টেকনিক্যাল সার্কাস বাদ দিয়া কেমনে সিনামার ফ্লো’টারে সুন্দর করা যায়। সিরিয়াস ফিল্মমেকার হিসেবে মেলাদিন আউট-অফ-ফোকাসে থাকা জন ফোর্ড তার সাক্ষাৎকারে “ইনভিজিবল কাটিং”-এর কথা বারবার বলতেন। বলতেন শ্যুট করার পর এমনভাবে এডিট করো যেন ন্যারেটিভের গতি (momentum) দর্শকের কাছে সবকিছু ছাপায়া হাজির হয়।

১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দর্শকেরা ফোর্ড কিংবা তার এই থিওরি সম্পর্কে জানতো না। তবে তারা জানতো যে ফোর্ড এবং অন্যান্য হলিউড ডিরেক্টরের সিনামা তাদের ভালো লাগে। ক্যামেরার কাজের চে, ‘নায়ক কি নায়িকারে পাবে?’ তা নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি ছিল। একটা লেভেলে তারা ছিল সফল দর্শক, কারণ তারা ছিল প্যাসিভ দর্শক। সিনামারে তারা তাদের সাথে ‘ঘটতে’ দিতো। সত্যি বলতে অন্য কোন আর্ট ফর্ম প্যাসিভ এস্কেপিজমরে ফিল্মের মতন এতটা এনকারেজ করে না।

এইসব কারণে একদম শুরু থেকেই সিনামারে নৈতিকভাবে সন্দেহ করা হইতেছে। ইউলিসিসের মতো বইয়ের জন্য বাকস্বাধীনতার মহান লড়াই চলছে এবং বাকস্বাধীনতা জিতছে। কিন্তু সিনামার বেলায় প্রথম সংশোধনী প্রয়োগের কথা কেউ ভাবে না! অবশ্য আপনি ভাবতে পারেন যে সিনামা সেন্সর হইতেই পারে, মেইবি করা উচিতও! যেমন আদালত চাইলে বলতে পারে যে পেশাদার বেসবলকে কোনো ধরনের সাংবিধানিক সাপোর্ট দেয়া হবে না। আমাদের কাছে সিনামা ছিল একটা নেশা, যার ভিতর লুকানো থাকতো অচিন কোনো রহস্য। আর আমরা ছিলাম সেই সিনামার শিকার, সিনামা দিয়াই আমরা মোরালিটি আর লাইফরে বুঝতে চাইতাম। আমরা যদি ভ্যাটিকান II-এর আগের যুগের ক্যাথলিক হইতাম, তাইলে বছরে একবার গির্জায় গিয়া ঠিকই ডান হাত তুলে অনৈতিক সিনামা না-দেখার শপথ নিতাম।* পুল হল, সেলুন, এমনকি ব্রোথেলের জন্যেও এইভাবে পাবলিক শপথ নেয়ানো হয় নাই, ভাবতে পারেন!

কিন্তু সিনামা আসলে অন্যরকম কিছু। সিনামা, আমাদের প্রথমদিককার পলায়নবাদী ইমোশনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়ায় ছিলো। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি কমেডি কাকে বলে। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি নায়ক বলতে কি বুঝায়। আমরা জানসি (এবং জানার সময় চিল্লাইসি) যে, নারী ও পুরুষ পারফেক্টলি লজিকাল কাজ করার সময় হঠাৎ কাজ বাদ দিয়া চুমু খায়। এর কয়েক বছর পর আবিষ্কার করলাম আমরা নিজেরাই স্ক্রিন থেকে মুখ ঘুরিয়ে চুমু খাচ্ছি— পৃথিবীর কত প্রথম চুমু যে সিনামা হলে খাওয়া হয়েছে! শৈশবে, সিনামা দেখে আমরা বড়দের রোল প্লে করতাম। আমরা প্রক্সি প্রতিবাদ করতাম। সিনামা দেখে আমরা এমন সব জিনিস শিখছি, বাসনা করছি – আমাদের ডেইলি লাইফে যেসবের ছিঁটা-ফোঁটা আনাগোনা ছিল না। Continue reading

আমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দীন আহমদ (সিলেক্টেড পার্ট ২)

পার্ট ১ ।।

।। দি সংস আই হার্ড নো মোর ॥

পূজার ছুটিতে একবার বাড়ীতে এসেছি। ঝাঁকি-জাল দিয়ে মাছ ধরার বড় সখ আমার। বাড়ী থেকে দু মাইল দুরে ঝাপই নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছি। মাছ ধরার নেশায় জাল বাইতে বাইতে নদীর ধারে ধারে বহুদূর চলে গিয়েছি। অকস্মাৎ বাঁশীর মত মিষ্টি কণ্ঠ কানে এল। অমন অপূর্ব মধুময় কন্ঠ আমার জীবনে আর শুনি নি। কোথা থেকে গান ভেসে আসছে ঠিক করতে পারছিলাম না। স্বর ক্রমশঃ নিকটবর্তী। তারপর দেখি মহিষের পিঠে মহিষের মত বা তার চাহিতেও কালো একটি ছেলে গাইতে গাইতে মহিষটাকে পানি খাওয়াবার জন্য নদীতে’ নামিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ আমাকে দেখতে পেয়ে গান তার বন্ধ হয়ে গেল। কাছে গিয়ে কত অনুনয় করলাম – সিগারেট দিতে চাইলাম – আর কিছুতেই তাকে রাজী করতে পারলাম না। জীবনে অমন কণ্ঠ আর শুনি নি।

কুচবিহারে মাঝে মাঝে জলপাইগুড়ি থেকে কুমার সরোজ রায়কত আসতেন। রাজপুত্রের মত অনিন্দিত কান্তি। খেয়াল, ঠুংরী থেকে শুরু করে সব রকম গান কি মিষ্টি কণ্ঠেই না গাইতেন। আমরা তখন কলেজে পড়ি। তিনি কুচবিহার এলে তার গানের আসর বসত সরকারী উকিল রাজেন রায়ের বাসায়। রাজেনবাবু তখনকার দিনে সারা উত্তরবংগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ খেয়াল গাইয়ে ছিলেন। অমন দরাজ কণ্ঠ আর দ্বিতীয়টি শুনিনি আজ পর্যস্ত। সেতারেও তার মিষ্টি হাত ছিল। সরোজবাবুকে শেষে “সরোজদা” বলে ডাকতাম। তার কাছে শোন৷ গান – “ওরে মাঝি তরী হেথা বাঁধব নাকো” আমি প্রায় শততম রজনী কলকাতা রেডিওতে গেয়েছি। তাঁর গলার অভিনবত্ব ছিল – যত উপরের পর্দায় গাইতেন ততই পাপিয়ার মত মিষ্টি লাগত। তাঁর গলায় বেস পার্ট বা খাদ বেশী ছিল না বলে রেকর্ড জগতে তিনি বিশেষ প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেন নি।

এই সরোজদার গান শোনার জন্যে রাজেনবাবুর বৈঠকখানাও নিমন্ত্রিত শ্রোতাদের দ্বারা ভরে উঠত। আমরা রবাহুতের দল বাইরে বসে চুপ করে শুনতাম আর আমি মনে মনে খোদার কাছে বলতাম – “খোদা এমন গায়ক কবে হতে পারব, যেদিন আসরের সবার উৎসুক দৃষ্টি শুধু আমার উপর.নিবদ্ধ থাকবে।”

আমিও তখন রাজেনবাবুর কাছে পরিচিত ছিলাম। তার ছেলে সুনীল রায় আমার বাল্যবন্ধু। সুনীলকে তিনি খেয়াল শেখাতেন মাঝে মাঝে। আমার কণ্ঠেরও তারিফ করতেন, কিন্তু যেহেতু তিনি মুখ ফুটে কোনদিনও আমাকে শেখাতে চান নি আমিও তাই শিখবার মহা আগ্রহ সত্বেও তাঁকে কিছু বলিনি। সরোজদা’র আসর বসলে তিনি আমাদের মত চুনোপুটিকে পাত্তা দিতেন না। কিন্তু মনে মনে প্রশ্ন জাগত এমন আসরে গাইবার সুযোগ কি জীবনে আসবে না? Continue reading

মোরাল ক্যাটাগরি

এই রকম একটা সিচুয়েশন চিন্তা করেন। একজন দুর্দান্ত এবং সেই সময়ের সেরা নভেলিস্ট একজন খারাপ লোক। দুইটা ফ্যাক্টই সত্য যে, তার কাজে সে টপ ক্লাস, আবার সে খারাপ লোক হিসেবে প্রমাণিতও। এখন তাকে সাহিত্যে নোবেল দেয়াটা ঠিক হবে কিনা?

যদি পুরষ্কার দেন,তবে যোগ্য ব্যাক্তি পুরষ্কার পায় কিন্তু সমাজে একটা খারাপ লোক আরো রিকগনাইজড হয়। আর যদি আপনি তাকে পুরষ্কার না দেন,তা একটা ইমমোরাল ঘটনা হবে। তার যোগ্য পুরষ্কার আপনি তাকে দিতেছেন না- এই অর্থে। অর্থাৎ আপনি ভবিষ্যতে ইমমোরালিটিকে প্রতিষ্ঠা বা স্বীকৃতি দিতে চাইতেছেন না। কিন্তু তার জন্য যেই কাজটা করতেছেন,সেইটাও ইমমোরালই। অর্থাৎ এইখানে বিচারের টুলস আর মোরালিটি না। বরং প্র‍্যাকটিকালিটি।

আরেকটা উদাহরণ দেই।

সারা দুনিয়ার ধনী গরিবের সম্পদের পার্থক্য নিয়ে যে সকল স্টাডি আছে, তাতে দেখা যাইতেছে যে, প্রোডাক্টিভিটির হাই রেটের কারণে ক্যাপিটালজম এভয়েড করা যাইতেছে না। ফলে ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স এই পার্থক্য কমানোর প্রধান উপায়। অর্থাৎ আমার সব সম্পদ আমার সন্তানেরা পাবে না। আমার একশ কোটি টাকা থাকলে পঞ্চাশ কোটি আমার সন্তানরা পাবে ,বাকি পঞ্চাশ কোটি গরিব মানুষের কাজে লাগানোর জন্য ব্যয় করতে রাষ্ট্র নিয়ে নিবে। এইটা একটা ঠিক কাজই। কিন্তু আমার অর্জিত সম্পদ নিয়ে নেওয়ার মোরাল রাইট কি সরকারের আছে? এইটা কি ব্যাক্তির রাইট ভায়োলেট করা না?

এইটার ডিরেক্ট এক্সাম্পল হইতেছে, রবিনহুড। বড়লোকের কাছ থেকে টাকা লুট করে গরিবের মধ্যে বিলায়া দেয়া। রবিনহুড তো হিরো। কিন্তু রবিনহুডের এই কাজের প্রক্রিয়ার মোরালিটি নাই।

অথবা একটা বামপন্থী সরকার যখন মানুষকে বল প্রয়োগ করে সেলফ ইন্টারেস্টের বদলে কমন ইন্টারেস্টে এক্ট করতে? এই ফোর্স করার মোরাল রাইট কি সরকারের আছে?

বলতে চাইতেছি না যে, মানুষ মোরাল ক্যাটাগরিতে এক্ট করবে না। এক্ট করবে। কিন্তু সব সময় ইমিডিয়েট মোরাল ক্যাটাগরি ন্যায্য অবস্থা তৈরি করবে না। মোরাল ক্যাটাগরি কোন দৈব বা আল্টিমেট টুলস না।

প্র‍্যাকটিকালিটি সব সময় হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। ইম্প্যাক্ট হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

এইটাই ডিসিশনের জায়গা।

প্রগতিশীলদের বলার কথা যে, কোন খারাপ উপায়ে ভাল কাজ করা যায় না। ব্যাক্তির অধিকার হরণ করে সামষ্টিক ‘ভাল’র দরকার নাই। অথবা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর রক্ষণশীলদের বলার কথা যে, ব্যাক্তির অধিকার খর্ব না করে সামষ্টিক ‘ভাল’ করা যায় না।

হিউম্যান রাইট প্রতিষ্ঠার জন্য এইটার একটা ব্যালান্স করতে হয়। ব্যালান্সের এই গ্রে এরিয়াটাই মানুষের ইতিহাসের সমস্ত আদর্শিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধের কারণ।

ধরেন,ডেমোক্রেসি কিভাবে কাজ করে? Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →