Main menu

ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে? – রজার এবার্ট (পার্ট ১)

ট্রান্সলেটরের ইন্ট্রো

এবার্ট ১৯৪২ সালে আম্রিকার ইলিনয় স্টেটে জন্মান। ‘৬৭ সাল থেকে নেক্সট ৪০+ বছর তিনি শিকাগো সান-টাইমস পত্রিকার ফিল্ম ক্রিটিক ছিলেন। ক্রিটিসিজম ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার আর হলিউডের ওয়াক অফ ফেইমে স্থান পাওয়া একমাত্র ফিল্ম ক্রিটিক তিনি।

উনার লেখা কেমন?

কমন একটা কথা আছে যে, “ওয়ান পারসন’স প্রিটেনশাস ইজ এনাদার পারসন’স মাস্টারপিস”। গুগলে সার্চ দিলে এবার্টের লেখা নিয়াও পোলারাইজড কমেন্ট পাবেন। তবে, পারসোনালি উনার লেখায় আম্রিকান আউটলুক আর অপ্টিমিস্টিক অ্যাপ্রোচ ফিল করছি খুব। শুধু সিনামা না, সিনামার দর্শকদের প্রতিও একটা দরদ উনার লেখায় টের পাওয়া যায়। জনপ্রিয় বা কমার্শিয়াল সিনামারে উনি গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করতেন। বিনোদন দেয়াই সিনামার বেসিক ডিউটি, কিন্তু ফর্ম হিসেবে আমাদের আরেকটু ভালো মানুশ করার পটেনশিয়ালিটি সিনামার আছে— নানান লেখাজোকায় এমনটা বলছেন। তাঁর মতে, একটা সিনামা ‘কি নিয়া’, সেইটা সেই সিনামার মূল অ্যাস্পেক্ট না, বরং সেই ‘কি নিয়া’টা আসলে ‘কেমনে’ হইতেছে—সেইটাই সিনামা।

তিনি মনে করতেন ভিডিও গেমস কোনদিন আর্ট হইতে পারবে না।

তিনি ২০১৩ সালে শিকাগোতে মারা যান।

******

অনুবাদের লেখাটা প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৭৮ সালে, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ‘দ্য গ্রেট আইডিয়া টুডে’ বইয়ে। ২০২৩ সালে লেখাটা পড়তে গেলে কিছু জায়গা, স্পেশালি টেলিভিশন নিয়া অংশটুকু অনেক ডেইটেড লাগবে, কিন্তু স্টাইলিস্টিক যেসব টেন্ডেনসির কথা এবার্ট বলছেন, তা এখনও রিলেভেন্ট। এখনও সিনামার ‘কাহিনী’ নিয়াই মাতামাতি চলে দুনিয়া জুইড়া, চলে ‘স্পয়লার অ্যালার্ট’। এখনো সিনামা হয়া আছে গল্পের ভিজুয়ালাইজেশন। অথচ সিনামা-ই একমাত্র আর্ট ফর্ম যেইটা আমাদের প্রতিদিনের ড্রিম আর ডেড্রিমরে হুবহু ক্যাপচার করতে পারে। কিন্তু আমরা হাজারবছর পুরানো থ্রি-এক্ট স্ট্রাকচারের ভিতরে সিনামারে স্টিল বন্দি করে রাখছি। এই বস্তাপচা স্ট্রাকচার বা ন্যারেটিভরে বাদ দিলে সিনামার যে দীঘল দিগন্ত আমাদের হাতছানি দেয়, এই আর্টিকেলে এবার্ট সেই ডাকে সাড়া দিতে বলছেন।

******

আবীর হাসান একা
ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

******

ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে?

অন্য যেকোনো আর্টফর্মের চে সিনামা নিয়াই সবচে বেশি আবোলতাবোল সমালোচনা লেখা হয়। কারণ সবচে কম বোঝা-পড়া নিয়া মানুশ সিনামা দেখে, সিনামা নিয়া লেখে। আমাদের মেন্টালিটি এমন যে, আমরা ধইরা নিসি চিত্রকলা, সঙ্গীত বা নৃত্যকলা পুরোপুরি উপভোগ করতে আমাদের আগে থেকে কিছু জানাশোনা দরকার, কিন্তু সিনামার বেলায় আমাদের এইসব বাছবিচার আর জারি থাকে না—আমরা আত্মচেতনা-মেতনা সব বাদ দিয়া দেই আর চুপচাপ বইসা থাকি, যাতে নিখাদ অভিজ্ঞতা আমাদের খাইয়া ফেলতে পারে।

বাজে পরিচালকরা সেলফ-কনশাস শট আর সেলফ-এভিডেন্ট স্ট্র্যাটেজি দিয়া দর্শকদের এটেনশন নিতে চায়। অন্যদিকে, ভালো পরিচালকদের দেখবেন – সিনামার প্রতি তাদের একটা সহজ-সরল ভালবাসা থাকে। তারা জানে টেকনিক্যাল সার্কাস বাদ দিয়া কেমনে সিনামার ফ্লো’টারে সুন্দর করা যায়। সিরিয়াস ফিল্মমেকার হিসেবে মেলাদিন আউট-অফ-ফোকাসে থাকা জন ফোর্ড তার সাক্ষাৎকারে “ইনভিজিবল কাটিং”-এর কথা বারবার বলতেন। বলতেন শ্যুট করার পর এমনভাবে এডিট করো যেন ন্যারেটিভের গতি (momentum) দর্শকের কাছে সবকিছু ছাপায়া হাজির হয়।

১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দর্শকেরা ফোর্ড কিংবা তার এই থিওরি সম্পর্কে জানতো না। তবে তারা জানতো যে ফোর্ড এবং অন্যান্য হলিউড ডিরেক্টরের সিনামা তাদের ভালো লাগে। ক্যামেরার কাজের চে, ‘নায়ক কি নায়িকারে পাবে?’ তা নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি ছিল। একটা লেভেলে তারা ছিল সফল দর্শক, কারণ তারা ছিল প্যাসিভ দর্শক। সিনামারে তারা তাদের সাথে ‘ঘটতে’ দিতো। সত্যি বলতে অন্য কোন আর্ট ফর্ম প্যাসিভ এস্কেপিজমরে ফিল্মের মতন এতটা এনকারেজ করে না।

এইসব কারণে একদম শুরু থেকেই সিনামারে নৈতিকভাবে সন্দেহ করা হইতেছে। ইউলিসিসের মতো বইয়ের জন্য বাকস্বাধীনতার মহান লড়াই চলছে এবং বাকস্বাধীনতা জিতছে। কিন্তু সিনামার বেলায় প্রথম সংশোধনী প্রয়োগের কথা কেউ ভাবে না! অবশ্য আপনি ভাবতে পারেন যে সিনামা সেন্সর হইতেই পারে, মেইবি করা উচিতও! যেমন আদালত চাইলে বলতে পারে যে পেশাদার বেসবলকে কোনো ধরনের সাংবিধানিক সাপোর্ট দেয়া হবে না। আমাদের কাছে সিনামা ছিল একটা নেশা, যার ভিতর লুকানো থাকতো অচিন কোনো রহস্য। আর আমরা ছিলাম সেই সিনামার শিকার, সিনামা দিয়াই আমরা মোরালিটি আর লাইফরে বুঝতে চাইতাম। আমরা যদি ভ্যাটিকান II-এর আগের যুগের ক্যাথলিক হইতাম, তাইলে বছরে একবার গির্জায় গিয়া ঠিকই ডান হাত তুলে অনৈতিক সিনামা না-দেখার শপথ নিতাম।* পুল হল, সেলুন, এমনকি ব্রোথেলের জন্যেও এইভাবে পাবলিক শপথ নেয়ানো হয় নাই, ভাবতে পারেন!

কিন্তু সিনামা আসলে অন্যরকম কিছু। সিনামা, আমাদের প্রথমদিককার পলায়নবাদী ইমোশনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়ায় ছিলো। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি কমেডি কাকে বলে। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি নায়ক বলতে কি বুঝায়। আমরা জানসি (এবং জানার সময় চিল্লাইসি) যে, নারী ও পুরুষ পারফেক্টলি লজিকাল কাজ করার সময় হঠাৎ কাজ বাদ দিয়া চুমু খায়। এর কয়েক বছর পর আবিষ্কার করলাম আমরা নিজেরাই স্ক্রিন থেকে মুখ ঘুরিয়ে চুমু খাচ্ছি— পৃথিবীর কত প্রথম চুমু যে সিনামা হলে খাওয়া হয়েছে! শৈশবে, সিনামা দেখে আমরা বড়দের রোল প্লে করতাম। আমরা প্রক্সি প্রতিবাদ করতাম। সিনামা দেখে আমরা এমন সব জিনিস শিখছি, বাসনা করছি – আমাদের ডেইলি লাইফে যেসবের ছিঁটা-ফোঁটা আনাগোনা ছিল না। Continue reading

আমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দীন আহমদ (সিলেক্টেড পার্ট ২)

পার্ট ১ ।।

।। দি সংস আই হার্ড নো মোর ॥

পূজার ছুটিতে একবার বাড়ীতে এসেছি। ঝাঁকি-জাল দিয়ে মাছ ধরার বড় সখ আমার। বাড়ী থেকে দু মাইল দুরে ঝাপই নদীতে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছি। মাছ ধরার নেশায় জাল বাইতে বাইতে নদীর ধারে ধারে বহুদূর চলে গিয়েছি। অকস্মাৎ বাঁশীর মত মিষ্টি কণ্ঠ কানে এল। অমন অপূর্ব মধুময় কন্ঠ আমার জীবনে আর শুনি নি। কোথা থেকে গান ভেসে আসছে ঠিক করতে পারছিলাম না। স্বর ক্রমশঃ নিকটবর্তী। তারপর দেখি মহিষের পিঠে মহিষের মত বা তার চাহিতেও কালো একটি ছেলে গাইতে গাইতে মহিষটাকে পানি খাওয়াবার জন্য নদীতে’ নামিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ আমাকে দেখতে পেয়ে গান তার বন্ধ হয়ে গেল। কাছে গিয়ে কত অনুনয় করলাম – সিগারেট দিতে চাইলাম – আর কিছুতেই তাকে রাজী করতে পারলাম না। জীবনে অমন কণ্ঠ আর শুনি নি।

কুচবিহারে মাঝে মাঝে জলপাইগুড়ি থেকে কুমার সরোজ রায়কত আসতেন। রাজপুত্রের মত অনিন্দিত কান্তি। খেয়াল, ঠুংরী থেকে শুরু করে সব রকম গান কি মিষ্টি কণ্ঠেই না গাইতেন। আমরা তখন কলেজে পড়ি। তিনি কুচবিহার এলে তার গানের আসর বসত সরকারী উকিল রাজেন রায়ের বাসায়। রাজেনবাবু তখনকার দিনে সারা উত্তরবংগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ খেয়াল গাইয়ে ছিলেন। অমন দরাজ কণ্ঠ আর দ্বিতীয়টি শুনিনি আজ পর্যস্ত। সেতারেও তার মিষ্টি হাত ছিল। সরোজবাবুকে শেষে “সরোজদা” বলে ডাকতাম। তার কাছে শোন৷ গান – “ওরে মাঝি তরী হেথা বাঁধব নাকো” আমি প্রায় শততম রজনী কলকাতা রেডিওতে গেয়েছি। তাঁর গলার অভিনবত্ব ছিল – যত উপরের পর্দায় গাইতেন ততই পাপিয়ার মত মিষ্টি লাগত। তাঁর গলায় বেস পার্ট বা খাদ বেশী ছিল না বলে রেকর্ড জগতে তিনি বিশেষ প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেন নি।

এই সরোজদার গান শোনার জন্যে রাজেনবাবুর বৈঠকখানাও নিমন্ত্রিত শ্রোতাদের দ্বারা ভরে উঠত। আমরা রবাহুতের দল বাইরে বসে চুপ করে শুনতাম আর আমি মনে মনে খোদার কাছে বলতাম – “খোদা এমন গায়ক কবে হতে পারব, যেদিন আসরের সবার উৎসুক দৃষ্টি শুধু আমার উপর.নিবদ্ধ থাকবে।”

আমিও তখন রাজেনবাবুর কাছে পরিচিত ছিলাম। তার ছেলে সুনীল রায় আমার বাল্যবন্ধু। সুনীলকে তিনি খেয়াল শেখাতেন মাঝে মাঝে। আমার কণ্ঠেরও তারিফ করতেন, কিন্তু যেহেতু তিনি মুখ ফুটে কোনদিনও আমাকে শেখাতে চান নি আমিও তাই শিখবার মহা আগ্রহ সত্বেও তাঁকে কিছু বলিনি। সরোজদা’র আসর বসলে তিনি আমাদের মত চুনোপুটিকে পাত্তা দিতেন না। কিন্তু মনে মনে প্রশ্ন জাগত এমন আসরে গাইবার সুযোগ কি জীবনে আসবে না? Continue reading

মোরাল ক্যাটাগরি

এই রকম একটা সিচুয়েশন চিন্তা করেন। একজন দুর্দান্ত এবং সেই সময়ের সেরা নভেলিস্ট একজন খারাপ লোক। দুইটা ফ্যাক্টই সত্য যে, তার কাজে সে টপ ক্লাস, আবার সে খারাপ লোক হিসেবে প্রমাণিতও। এখন তাকে সাহিত্যে নোবেল দেয়াটা ঠিক হবে কিনা?

যদি পুরষ্কার দেন,তবে যোগ্য ব্যাক্তি পুরষ্কার পায় কিন্তু সমাজে একটা খারাপ লোক আরো রিকগনাইজড হয়। আর যদি আপনি তাকে পুরষ্কার না দেন,তা একটা ইমমোরাল ঘটনা হবে। তার যোগ্য পুরষ্কার আপনি তাকে দিতেছেন না- এই অর্থে। অর্থাৎ আপনি ভবিষ্যতে ইমমোরালিটিকে প্রতিষ্ঠা বা স্বীকৃতি দিতে চাইতেছেন না। কিন্তু তার জন্য যেই কাজটা করতেছেন,সেইটাও ইমমোরালই। অর্থাৎ এইখানে বিচারের টুলস আর মোরালিটি না। বরং প্র‍্যাকটিকালিটি।

আরেকটা উদাহরণ দেই।

সারা দুনিয়ার ধনী গরিবের সম্পদের পার্থক্য নিয়ে যে সকল স্টাডি আছে, তাতে দেখা যাইতেছে যে, প্রোডাক্টিভিটির হাই রেটের কারণে ক্যাপিটালজম এভয়েড করা যাইতেছে না। ফলে ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স এই পার্থক্য কমানোর প্রধান উপায়। অর্থাৎ আমার সব সম্পদ আমার সন্তানেরা পাবে না। আমার একশ কোটি টাকা থাকলে পঞ্চাশ কোটি আমার সন্তানরা পাবে ,বাকি পঞ্চাশ কোটি গরিব মানুষের কাজে লাগানোর জন্য ব্যয় করতে রাষ্ট্র নিয়ে নিবে। এইটা একটা ঠিক কাজই। কিন্তু আমার অর্জিত সম্পদ নিয়ে নেওয়ার মোরাল রাইট কি সরকারের আছে? এইটা কি ব্যাক্তির রাইট ভায়োলেট করা না?

এইটার ডিরেক্ট এক্সাম্পল হইতেছে, রবিনহুড। বড়লোকের কাছ থেকে টাকা লুট করে গরিবের মধ্যে বিলায়া দেয়া। রবিনহুড তো হিরো। কিন্তু রবিনহুডের এই কাজের প্রক্রিয়ার মোরালিটি নাই।

অথবা একটা বামপন্থী সরকার যখন মানুষকে বল প্রয়োগ করে সেলফ ইন্টারেস্টের বদলে কমন ইন্টারেস্টে এক্ট করতে? এই ফোর্স করার মোরাল রাইট কি সরকারের আছে?

বলতে চাইতেছি না যে, মানুষ মোরাল ক্যাটাগরিতে এক্ট করবে না। এক্ট করবে। কিন্তু সব সময় ইমিডিয়েট মোরাল ক্যাটাগরি ন্যায্য অবস্থা তৈরি করবে না। মোরাল ক্যাটাগরি কোন দৈব বা আল্টিমেট টুলস না।

প্র‍্যাকটিকালিটি সব সময় হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। ইম্প্যাক্ট হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

এইটাই ডিসিশনের জায়গা।

প্রগতিশীলদের বলার কথা যে, কোন খারাপ উপায়ে ভাল কাজ করা যায় না। ব্যাক্তির অধিকার হরণ করে সামষ্টিক ‘ভাল’র দরকার নাই। অথবা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর রক্ষণশীলদের বলার কথা যে, ব্যাক্তির অধিকার খর্ব না করে সামষ্টিক ‘ভাল’ করা যায় না।

হিউম্যান রাইট প্রতিষ্ঠার জন্য এইটার একটা ব্যালান্স করতে হয়। ব্যালান্সের এই গ্রে এরিয়াটাই মানুষের ইতিহাসের সমস্ত আদর্শিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধের কারণ।

ধরেন,ডেমোক্রেসি কিভাবে কাজ করে? Continue reading

রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা-সমস্যা: কাজী মোতাহার হোসেন (১৯৪৭)

[কাজী মোতাহার হোসেনের এই লেখাটা ছাপা হইছিল “তমুদ্দন মজলিসের” “রাষ্ট্রভাষা কি বাংলা হইবে? – নাকি উর্দু” বুকলেটে, ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পরে মাসিক সওগাত পত্রিকাতেও ছাপা হইছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে – সেইটা নিয়া কথা-বার্তা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের আগেই হইতেছিল। এই লেখাটা অই তর্ক-বিতর্কের একটা অংশ।]

কোনো দেশের লোকে যে ভাষায় কথা বলে, সেইটিই সে দেশের স্বাভাবিক ভাষা। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে আবার বাংলাদেশের ভাষা সম্বন্ধে সমস্যা ওঠে কি করে? সত্য সত্য এইটেই মজার কথা—যা স্বাভাবিক, তা অনেক সময় জটিল বুদ্ধি দিয়ে সহজে বোঝা যায় না। একটু পরিষ্কার করে বলবার চেষ্টা করছি।

ধরে নেওয়া যাক, কোনো দেশের শতকরা ৯৯ জন বাংলা ভাষায়, আর বাকি শতকরা ১ জন মাত্র ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে। আরও মনে করা যাক, এই শেষোক্ত ব্যক্তিরা বাণিজ্যসূত্রে বা শাসক হিসাবে সে দেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠাবান হয়েছে এবং অল্প শিক্ষিত বা অল্প বিত্তশালীদের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। তাই এরা সে দেশের লোকের প্রতি ও তার ভাষার প্রতি স্বভাবতই অশ্রদ্ধাবান। সে দেশের ভাষা শিক্ষা করে তাদের সঙ্গে কাই-কারবার করা এরা অনাবশ্যক শক্তিক্ষয় বলে মনে করে, আর তাতে এদের আত্মসম্মানেও আঘাত করে বৈকি! অবশ্য, বিজিত জাতি বা শোষিত অধমর্ণের আত্মসম্মান থাকে না, আর তা শোভাও পায় না। বিশেষত বিজেতা বা উত্তমর্ণের ভাষা শিক্ষা করে তাদের সঙ্গে দহরম মহরম রাখতে পারলে তাদের সন্তুষ্টি সাধন করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে জীবিকা অর্জনের পথও প্রশস্ত হয়। আর একটা প্রধান কথা, এইভাবে দেশের আপামর সাধারণের সঙ্গে নিজেদের বিরাট পার্থক্য সংরক্ষণ ও স্মরণ করে যথেষ্ট মর্যাদা অনুভব করা যায়। বিজেতা উত্তমর্ণের অনুগৃহীত এই সৌভাগ্যবানেরাই দেশের নেতা এবং জনগণের নামে সমুদয় সুবিধা ভোগের অধিকারী। বর্তমানের সমাজ ব্যবস্থায় ইহা স্বাভাবিক, কারণ মূঢ়-মূকদের বঞ্চিত করায় ভয়ের কারণ নেই বরং না করা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় মাত্র।

এই হলো মোটামুটি বাংলাদেশের এবং বিশেষ করে বর্তমান পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষাসমস্যার মানসিক পটভূমি।

পাঠান রাজত্বে রাজভাষা ছিল পোস্তু, আর মোগল আমলে ফার্সী। মোগল-পাঠানেরা বিদেশী হলেও এদেশকেই জন্মভূমি-রূপে গ্রহণ করেছিলেন এবং দেশের অবস্থা জানবার জন্য দেশীয় ভাষাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে পাঠানরাজদের পৃষ্ঠপোষকতায় রামায়ণ ও মহাভারত বাংলাভাষায় অনূদিত হয়, তা-ছাড়া ভাগবত এবং পুরাণাদিও রচিত হয়। এর আগে বাংলা ভাষা নিতান্ত অপুষ্ট ছিল, এবং ভাষা জনসাধারণের ভাষা বলে পণ্ডিতদের কাছে অশ্রদ্ধেয় ছিল। তখনকার পণ্ডিতেরা কৃত্রিম সংস্কৃত ভাষার আবরণে নিজেদের শুচিতা ও শ্রেষ্ঠতা রক্ষা করতেন। রাজসুলভ উদারতার সঙ্গে গৌড়ের পাঠান সুবাদারগণ পণ্ডিতদের বিরুদ্ধাচরণ অগ্রাহ্য করত সাধারণ লোকের সুবিধার জন্য (এবং হয়তো সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরও গল্প-পিপাসা নিবৃত্ত করবার জন্য) এই সকল পুরাণ ও রামায়ণ-মহাভারত রচনা করান। বলা বাহুল্য দেশীয় কালচারের ধারা রক্ষা করবার পক্ষে এবং দেশবাসীর নৈতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এই সব পুস্তকের তুলনা নাই। কতকটা এই কারণেই আজ ভারতবর্ষের সামান্যতম কৃষকরাও এক একজন দার্শনিক বলে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের বিস্ময় উৎপাদন করেছে। বাস্তবিক দেশবাসীর ভাষা বৈদেশিক শাসকের উৎসাহ পেয়েছিল বলেই বাঙালীরা আত্মস্থ ছিল এবং ইসলামী সভ্যতার থেকে অনেক উৎকৃষ্ট বিষয় গ্রহণ করে নিজেদের জীবন ও সভ্যতাকে পুষ্টতর করতে পেরেছিল। অন্যদিকে, মুসলমান শাসকগণ এবং জনসাধারণও হিন্দু ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে কাল অনুযায়ী ইসলামের নব নব বিকাশ সাধন করে কার্যক্ষেত্রে স্বাভাবিক ধর্ম ইসলামের উদারতা ও সর্বোপযোগিতাই প্রমাণিত করেছে। Continue reading

পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য – ফররুখ আহমদ [সওগাত, সেপ্টেম্বর – অক্টোবর, ১৯৪৭ ]

[এইরকম কথা-বার্তা তো চালু আছে যে, ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চের পাবলিক মিটিংয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে উর্দু’র ঘোষণা দিলে* রাষ্ট্রভাষা নিয়া তর্ক-বির্তক শুরু হয়। কিন্তু এইটা পুরাপুরি সত্যি কথা না। ১৯৪৭ সালের জুন-জুলাই থিকা এই আলাপ শুরু হইছিল পত্র-পত্রিকায়। তো, অই সময়ের, শুরুর দিকের একটা লেখা হইতেছে ফররুখ আহমদের। ছাপা হইছিল কলকাতার মাসিক সওগাত পত্রিকার বাংলা ১৩৫৪ সনের আশ্বিন সংখ্যায়।

কাছাকাছি সময়েই ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (জুলাই ও নভেম্বর, ১৯৪৭) এবং তমদ্দুন মজলিসের “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা নাকি উর্দু?” বুকলেটে (১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭) কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমদ এই নিয়া লেখেন। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক এবং মাওলানা আকরাম খাঁ-ও লেখছেন ১৯৪৮ সালের মার্চের এই পাবলিক ঘোষণার আগে। এবং এরপরেও অনেক ঘটনা ঘটছে ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত। সওগাত পত্রিকা ঢাকা থিকা ছাপানো শুরু হওয়ার পরে উনারে উর্দু-র পক্ষেও ওকালতি করেন, বাংলা’র পক্ষেও লেখা ছাপান।

মানে, হিস্ট্রি’টা একটা দিনের ঘটনা না। কিভাবে অই জায়গাটাতে গিয়া রিচ করছে – অই জায়গাগুলা আমাদের সামনে না-থাকার কারণে ২১ শে ফেব্রুয়ারি’রে খুবই ড্রামাটিক মনে হইতে থাকে। এবং হিস্ট্রিকাল লাইনটা মিসিং থাকে। তো, অই সময়ের কিছু লেখা আমরা বাছবিচারে আপলোড করবো ধীরে ধীরে। এইখানে ফররুখ আহমদের লেখাটা থাকলো। ]

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে।

যদি তাই হয়, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। কেন হবে এ নিয়ে পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। কিন্তু একটা কারণে আমাকে বাধ্য হয়ে দুএকটি কথা প্রসঙ্গত বলতে হচ্ছে।

পাকিস্তানের, অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদীসম্মত হলেও আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অবাচীন মত প্রকাশ করেছেন যা নিতান্তই লজ্জাজনক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপায়িত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাঁদের অভিমত।

কী কুৎসিত পরাজয়ী মনোবৃত্তি এর পিছনে কাজ করছে এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি। যে মনোবৃত্তির ফলে প্রায় দুশো বছর বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, সেই অন্ধ মনোবৃত্তি নিয়েই আবার আমরা ইসলামকে গলা টিপে মারার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছি। দুঃখের বিষয় সন্দেহ নাই। কিন্তু আরো দুঃখের কথা এই যে, পূর্ব পাকিস্তানে এমন মানুষ আছেন (সংখ্যায় যত অল্পই হোক না কেন) যাঁরা একমাত্র মানসিক দুর্বলতার জন্যই মাতৃভাষাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে অস্বীকার করে ইসলামী ঐতিহ্যের মহান দায়িত্ব অপর একটি প্রাদেশিক ভাষার কিঞ্চিৎ-পরিপুষ্ট ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →