ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে? – রজার এবার্ট (পার্ট ১)
ট্রান্সলেটরের ইন্ট্রো
এবার্ট ১৯৪২ সালে আম্রিকার ইলিনয় স্টেটে জন্মান। ‘৬৭ সাল থেকে নেক্সট ৪০+ বছর তিনি শিকাগো সান-টাইমস পত্রিকার ফিল্ম ক্রিটিক ছিলেন। ক্রিটিসিজম ক্যাটাগরিতে পুলিৎজার আর হলিউডের ওয়াক অফ ফেইমে স্থান পাওয়া একমাত্র ফিল্ম ক্রিটিক তিনি।
উনার লেখা কেমন?
কমন একটা কথা আছে যে, “ওয়ান পারসন’স প্রিটেনশাস ইজ এনাদার পারসন’স মাস্টারপিস”। গুগলে সার্চ দিলে এবার্টের লেখা নিয়াও পোলারাইজড কমেন্ট পাবেন। তবে, পারসোনালি উনার লেখায় আম্রিকান আউটলুক আর অপ্টিমিস্টিক অ্যাপ্রোচ ফিল করছি খুব। শুধু সিনামা না, সিনামার দর্শকদের প্রতিও একটা দরদ উনার লেখায় টের পাওয়া যায়। জনপ্রিয় বা কমার্শিয়াল সিনামারে উনি গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করতেন। বিনোদন দেয়াই সিনামার বেসিক ডিউটি, কিন্তু ফর্ম হিসেবে আমাদের আরেকটু ভালো মানুশ করার পটেনশিয়ালিটি সিনামার আছে— নানান লেখাজোকায় এমনটা বলছেন। তাঁর মতে, একটা সিনামা ‘কি নিয়া’, সেইটা সেই সিনামার মূল অ্যাস্পেক্ট না, বরং সেই ‘কি নিয়া’টা আসলে ‘কেমনে’ হইতেছে—সেইটাই সিনামা।
তিনি মনে করতেন ভিডিও গেমস কোনদিন আর্ট হইতে পারবে না।
তিনি ২০১৩ সালে শিকাগোতে মারা যান।
******
অনুবাদের লেখাটা প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৭৮ সালে, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ‘দ্য গ্রেট আইডিয়া টুডে’ বইয়ে। ২০২৩ সালে লেখাটা পড়তে গেলে কিছু জায়গা, স্পেশালি টেলিভিশন নিয়া অংশটুকু অনেক ডেইটেড লাগবে, কিন্তু স্টাইলিস্টিক যেসব টেন্ডেনসির কথা এবার্ট বলছেন, তা এখনও রিলেভেন্ট। এখনও সিনামার ‘কাহিনী’ নিয়াই মাতামাতি চলে দুনিয়া জুইড়া, চলে ‘স্পয়লার অ্যালার্ট’। এখনো সিনামা হয়া আছে গল্পের ভিজুয়ালাইজেশন। অথচ সিনামা-ই একমাত্র আর্ট ফর্ম যেইটা আমাদের প্রতিদিনের ড্রিম আর ডেড্রিমরে হুবহু ক্যাপচার করতে পারে। কিন্তু আমরা হাজারবছর পুরানো থ্রি-এক্ট স্ট্রাকচারের ভিতরে সিনামারে স্টিল বন্দি করে রাখছি। এই বস্তাপচা স্ট্রাকচার বা ন্যারেটিভরে বাদ দিলে সিনামার যে দীঘল দিগন্ত আমাদের হাতছানি দেয়, এই আর্টিকেলে এবার্ট সেই ডাকে সাড়া দিতে বলছেন।
******
আবীর হাসান একা
ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
******
ন্যারেটিভের বাইরে সিনামার কি কোনো ফিউচার আছে?
অন্য যেকোনো আর্টফর্মের চে সিনামা নিয়াই সবচে বেশি আবোলতাবোল সমালোচনা লেখা হয়। কারণ সবচে কম বোঝা-পড়া নিয়া মানুশ সিনামা দেখে, সিনামা নিয়া লেখে। আমাদের মেন্টালিটি এমন যে, আমরা ধইরা নিসি চিত্রকলা, সঙ্গীত বা নৃত্যকলা পুরোপুরি উপভোগ করতে আমাদের আগে থেকে কিছু জানাশোনা দরকার, কিন্তু সিনামার বেলায় আমাদের এইসব বাছবিচার আর জারি থাকে না—আমরা আত্মচেতনা-মেতনা সব বাদ দিয়া দেই আর চুপচাপ বইসা থাকি, যাতে নিখাদ অভিজ্ঞতা আমাদের খাইয়া ফেলতে পারে।
বাজে পরিচালকরা সেলফ-কনশাস শট আর সেলফ-এভিডেন্ট স্ট্র্যাটেজি দিয়া দর্শকদের এটেনশন নিতে চায়। অন্যদিকে, ভালো পরিচালকদের দেখবেন – সিনামার প্রতি তাদের একটা সহজ-সরল ভালবাসা থাকে। তারা জানে টেকনিক্যাল সার্কাস বাদ দিয়া কেমনে সিনামার ফ্লো’টারে সুন্দর করা যায়। সিরিয়াস ফিল্মমেকার হিসেবে মেলাদিন আউট-অফ-ফোকাসে থাকা জন ফোর্ড তার সাক্ষাৎকারে “ইনভিজিবল কাটিং”-এর কথা বারবার বলতেন। বলতেন শ্যুট করার পর এমনভাবে এডিট করো যেন ন্যারেটিভের গতি (momentum) দর্শকের কাছে সবকিছু ছাপায়া হাজির হয়।
১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দর্শকেরা ফোর্ড কিংবা তার এই থিওরি সম্পর্কে জানতো না। তবে তারা জানতো যে ফোর্ড এবং অন্যান্য হলিউড ডিরেক্টরের সিনামা তাদের ভালো লাগে। ক্যামেরার কাজের চে, ‘নায়ক কি নায়িকারে পাবে?’ তা নিয়ে তাদের আগ্রহ বেশি ছিল। একটা লেভেলে তারা ছিল সফল দর্শক, কারণ তারা ছিল প্যাসিভ দর্শক। সিনামারে তারা তাদের সাথে ‘ঘটতে’ দিতো। সত্যি বলতে অন্য কোন আর্ট ফর্ম প্যাসিভ এস্কেপিজমরে ফিল্মের মতন এতটা এনকারেজ করে না।
এইসব কারণে একদম শুরু থেকেই সিনামারে নৈতিকভাবে সন্দেহ করা হইতেছে। ইউলিসিসের মতো বইয়ের জন্য বাকস্বাধীনতার মহান লড়াই চলছে এবং বাকস্বাধীনতা জিতছে। কিন্তু সিনামার বেলায় প্রথম সংশোধনী প্রয়োগের কথা কেউ ভাবে না! অবশ্য আপনি ভাবতে পারেন যে সিনামা সেন্সর হইতেই পারে, মেইবি করা উচিতও! যেমন আদালত চাইলে বলতে পারে যে পেশাদার বেসবলকে কোনো ধরনের সাংবিধানিক সাপোর্ট দেয়া হবে না। আমাদের কাছে সিনামা ছিল একটা নেশা, যার ভিতর লুকানো থাকতো অচিন কোনো রহস্য। আর আমরা ছিলাম সেই সিনামার শিকার, সিনামা দিয়াই আমরা মোরালিটি আর লাইফরে বুঝতে চাইতাম। আমরা যদি ভ্যাটিকান II-এর আগের যুগের ক্যাথলিক হইতাম, তাইলে বছরে একবার গির্জায় গিয়া ঠিকই ডান হাত তুলে অনৈতিক সিনামা না-দেখার শপথ নিতাম।* পুল হল, সেলুন, এমনকি ব্রোথেলের জন্যেও এইভাবে পাবলিক শপথ নেয়ানো হয় নাই, ভাবতে পারেন!
কিন্তু সিনামা আসলে অন্যরকম কিছু। সিনামা, আমাদের প্রথমদিককার পলায়নবাদী ইমোশনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়ায় ছিলো। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি কমেডি কাকে বলে। সিনামা দেখেই আমরা শিখছি নায়ক বলতে কি বুঝায়। আমরা জানসি (এবং জানার সময় চিল্লাইসি) যে, নারী ও পুরুষ পারফেক্টলি লজিকাল কাজ করার সময় হঠাৎ কাজ বাদ দিয়া চুমু খায়। এর কয়েক বছর পর আবিষ্কার করলাম আমরা নিজেরাই স্ক্রিন থেকে মুখ ঘুরিয়ে চুমু খাচ্ছি— পৃথিবীর কত প্রথম চুমু যে সিনামা হলে খাওয়া হয়েছে! শৈশবে, সিনামা দেখে আমরা বড়দের রোল প্লে করতাম। আমরা প্রক্সি প্রতিবাদ করতাম। সিনামা দেখে আমরা এমন সব জিনিস শিখছি, বাসনা করছি – আমাদের ডেইলি লাইফে যেসবের ছিঁটা-ফোঁটা আনাগোনা ছিল না। Continue reading