যে শিক্ষার ব্যবস্থা বর্তমানে রয়েছে তার দ্বারা জাতীয় জীবনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবার ক্ষমতা লাভ করা যাবে না – মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা (১৯৭০)
মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা ১৯৭০ সালে ঢাকা ভার্সিটির কনভোকেশনে প্রধান অতিথি হিসাবে এই ভাষণটা দিতেছিলেন। ১৯৪৮ থিকা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কনভোকেশন লেকচারে উনিই একমাত্র লোক, যিনি বাংলায় ভাষণ দিছিলেন। ভাষণটা ১৯৮৯ সালে ঢাকা ভার্সিটি থিকা ছাপানো “The Convocation Speeches volume 2” বই থিকা নেয়া হইছে।
…
জনাব উপ-চ্যান্সেলার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রীবর্গ, স্নেহাস্পদ ছাত্র ও ছাত্রীবৃন্দ উপস্থিত ভদ্রমহিলা ও সুধীমন্ডলী,
আজ আপনাদের সমাবর্তন উৎসবে আমাকে আহবান করে অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছেন ও তার জন্য আমি নিরতিশয় কৃতজ্ঞ। দেশের এই বৃহত্তম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অল্প কিছুদিন পূর্বে যে উন্মত্ততার আস্ফালন দেখে ছিলাম তাতে সারা দেশের বুদ্ধিজীবীসমাজ প্রমাদ গুণেছিলেন। ভীতির রাজত্ব এমন প্রবলভাবে শিক্ষায়তনগুলিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে আজ এই সমাবর্তন উৎসবে সম্মিলিত সম্প্রদায়ের সামনে দাঁড়িয়ে এখনও ভয় হয়, অতীতের সেই যুগের সত্যই অবসান ঘটল কিনা, আবার আশার নুতন আলোকশিখার যে কিরণমালা নৈরাশ্যের কুহেলিকা ভেদ করে আসছে, তা সত্যি স্থিতিশীল হয়ে দেশকে প্লাবিত করবে কিনা। তবে ভরসা এইটুকু যে বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার, আমার ছাত্রোপম, উপ-চ্যান্সলার সাহেব যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সে আদর্শের অনুসরণ করা হলে দেশে আবার জ্ঞানের নুতন আলোক প্রবাহ চতুর্দিকে বিকিরিত হবে। আজ তারই ইঙ্গিত পাচ্ছি। শক্তিশালী শাদ্দাদের অশুভ শক্তিও এককালে ধ্বংস হয়েছে। তবে নুতন পরিস্থিতির মধ্যে পুরাতনের ছোঁয়াচ থেকে যায়, এই নিদারুণ সত্যকে মনে রেখে বর্তমানে অগ্রসর হতে হবে। আমারা আশা আছে বর্তমানের চিন্তাধারা অবাধ প্রবাহ নুতন আশার সূর্যের পথে অবহেলার কুহেলা স্থায়ী হবে না, সে কথার আশ্বাস জনাব চ্যান্সেলার সাহেবের সেদিনের বাণী বহন করছে, তার জন্যও তাঁকে জানাই অভিনন্দন। তার আশ্বাস সফল হোক, দেশে আবার হাসি ও আনন্দের উৎস প্রখর দীপ্তি দিয়ে ভবিষৎকে উজ্জ্বল ও আনন্দময় করে তুলুক, আজ আমি এই প্রার্থনাই করি।
মানুষের চিন্তাধারাকে এখানে শৃঙ্খলিত করবার চেষ্টা চলেছিল দীর্ঘকাল ধরে। একনায়কভিত্তিক শাসনের এইটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক; পরমতসহিঞ্চুতা এতে একেবারেই আসে না, তার ফলে যারা স্বাধীন চিন্তা করতে সমর্থ তারা শাসকদের অত্যাচারে নিপীড়িত হয়ে তাদের কবল থেকে সরে পড়েছে, যারা তা পারে নি তারা সেই নায়কের সন্তুষ্টির জন্য তাঁর চিন্তাকে রূপ দিবার চেষ্টায় অনর্থ সৃষ্টি করেছে। এমতাবস্থায় আমরা চিন্তাশীল ব্যক্তিদের অনেককেই হারিয়েছি। পরিস্থিতির প্রকৃত পরিবর্তন এবং তাতে স্থিতিশীলতা না এলে তাঁদের মত স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের ফিরে পাবার আশা অল্পই কাজেই এখানে যে নুতন চিন্তাধারা বিকাশ ঘটেছে তার স্থিতিশীলতা নিশ্চয়তা পাওয়া দরকার। এ বিষয়ে উপ-চ্যান্সেলার সাহেবকে কিছু বলবার প্রয়োজন নেই, তিনি এ বিষয়টি নিজেই ভালভাবে উপলব্ধি করেছেন। আমি কেবলমাত্র এর প্রয়োজনের কথাটিই প্রাথমিক প্রয়োজনের ইঙ্গিতরূপে উল্লেখ করলাম।
আমরা আজ এক রাজনৈতিক জীবনের সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। সারা দেশে সকলের মধ্যেই বিপুল চাঞ্চল্য প্রকটিত হয়ে উঠেছে। সামরিক প্রভাবজনিত দেশের পরিস্থিতি এখনও বদলায়নি। কোনো দেশেই সামরিক শাসনের অধীনে সাফল্য অর্জন করতে পারে না, কারণ সামরিক শক্তি দেশের শাসন পরিচালনার জন্য নহে। তাদের প্রয়োজন দেশরক্ষার জন্য এবং তাদের শিক্ষা ও প্রস্তুতি ঐ উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তাই সামরিক শাসন কিংবা ঐ গোত্রীয় একনায়কত্ব দেশে দীর্ঘকাল স্থায়ী হলে বহুবিধ দুর্নীতি দেশরক্ষাসহ বিভিন্ন বিভাগে অনুপ্রবেশ করে, দেশের দুরবস্থার অবধি থাকে না। তাই দল ও মত নির্বিশেষে সকলের ঐকান্তিক চেষ্টা চালান দরকার, যাতে সন্তোষজনক ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমাধান দ্রুত হতে পারে।
আমাদের দেশে শিক্ষার সংস্কার যে প্রয়োজন সে কথার স্বীকৃতি প্রত্যেকেই দিয়েছে। দেশের লোক যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা শিক্ষা ক্ষেত্রে চেয়েছিল তারা তা আজও পায় নি। যে শিক্ষার ব্যবস্থা বর্তমানে রয়েছে তার দ্বারা জাতীয় জীবনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবার ক্ষমতা লাভ করা যাবে না। নুতন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সারা দেশ উন্মুখ হয়ে আছে, কিন্তু সে পরিবর্তনের পরিকল্পনা এখনও প্রস্তুত হ’ল না। বিশ্বের ইতিহাস আলোচনায় এ সম্বন্ধে কতকগুলি মৌলিক ব্যবহার কথা মনে উদয় হয়। যেসকল দেশ আজ শিল্প ও বিজ্ঞানে উন্নত তাদের সকলের প্রাথমিক পর্যায় শুরু করে পরিশেষের স্তর পর্যন্ত শিক্ষার বাহন মাতৃভাষায় রেখেছে। আমরা আশা করেছিলাম বিভাগোত্তর দেশে এ বিষয় আমরা সর্বাগ্রাগামী হয়ে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও যাবতীয় অন্য বিষয়ে শিক্ষা ত্বরান্বিত করতে পারব। অবিভক্ত বাংলায় এর প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পাদিত হয়েছে ১৯৩৯ সালে, এবং আমি নিজে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি বাংলার মাধ্যমে স্কুলের শিক্ষা শেষ করে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তারা উত্তমতর ভাবে বিজ্ঞানের শিক্ষা উন্নততর মানে গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। ১৯৩৯শের পর প্রায় এক দশক অতীত হলে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। আজ এই ২২ বৎসর ধরে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষিত ছাত্রদল নূতন শক্তি ও সামথ্য নিয়ে যদি এগিয়ে আসত তবে তারা নিশ্চিতভাবে দেশের নেতৃত্বের ভার সুযোগ্য হস্তে গ্রহণ করতে পারত। Continue reading