Main menu

হিস্ট্রি রিডিং (১): হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভের পরিচয়

।। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ।। শ্রী অতুল সুর ।। নালন্দা, ২০১৯ ।।

ধরেন ছায়ানট “বাংলা-ভাষায় সহজ নামাজ শিক্ষা” নামে একটা বই ছাপাইলো, বইটা হাতে নেয়ার আগেই আপনার একটু খটকা লাগবে না যে, ছায়ানট এই কাজ কেন করলো? কেন তারা নামাজ-পড়া শিখাইতে চাইতেছে?

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হইলো, পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১৯৪২ সালে কলকাতায় হিন্দু মহসভার ছাপানো এই বই নিয়া এই প্রশ্ন কোনদিনই করা হয় নাই। (মানে, আমি দেখি নাই; উল্টা) এখনো এই বইটারে ইতিহাসের/এনথ্রোপলজির বই হিসাবে সেলিব্রেট করার রেওয়াজই চালু আছে বাংলাদেশে।

এইরকমের কনটেক্সট ছাড়া একটা বই’রে রিড করার মতো “ভুল” বাংলাদেশি ‘প্রগতিশীলদের’ পক্ষেই সম্ভব। কারণ এইখানে ‘শিক্ষিত, প্রগতিশীল’ হওয়া মানে হইতেছে আসলে কিছুটা হইলেও ‘হিন্দুত্ববাদী’ হইতে পারা। খুবই ডিপ-রুটেড একটা জিনিস এইটা। আর এই বইটা নানান দিক দিয়াই এই জিনিসটার একটা ভালো উদাহারণ।

বই’রে সম্মান করার রীতি এখনো বাংলাদেশে আছে। যে, আরে, বইয়ে লেখা হইছে! কথা সত্যি না হইলে লেখছে নাকি! এমনকি, ফেসবুকে এই ভাষায় লেখেন ঠিকাছে, বই কি এই ভাষায় লেখা যায় নাকি? 🙂 বই পায়ে লাগলে, সেইটা যে কোন বই-ই হোক, তুইলা নিয়া সালাম করার ব্যাপার কিছুদিন আগ পর্যন্ত ছিল। মানে, আমি বলতে চাইতেছি, বই একটা সেলিব্রেটেড জিনিস-ই খালি না, সেক্রেড জিনিসও।

বইয়ে মিথ্যা কথা বলা যায়, এইটা আমাদের জানা থাকলেও রিডার হিসাবে খেয়াল না করার জায়গা হইতেছে বইয়ের কনটেক্সট’টারে খেয়াল না করা।

যে কোন বই কোন একটা নির্দিষ্ট টাইমে একটা স্পেসিফিক অডিয়েন্সের জন্যই লেখা হইতেছে, ছাপা হইতেছে; এবং অই টাইম ও অডিয়েন্সের বাইরে গিয়া একটা ‘দৈব বাণী’ হিসাবে তারে রিড করা তো সম্ভব না। কিন্তু এইরকমের একটা ঘটনা আছে আমাদের দেশে, বই পড়ার ব্যাপারে। কনটেক্সট’টারে বাতিল কইরা দেয়া না, তারে বেইজ হিসাবে মাথায় না রাইখা পড়াটা। মোটামুটি কমন প্রাকটিস এইটা। যার ফলে, বেশিরভাগ বইয়ের রিভিউ/ক্রিটিকই দেখবেন ‘নিরপেক্ষ’ হওয়ার নামে খুবই বায়বীয় ঘটনা হয়া উঠে। মিনিংলেস ব্যাপার হয়া থাকে। আর বই-লেখা জিনিসটাও টাইমলেস ক্ল্যাসিক হইতে গিয়া রেসিয়াল ন্যারেটিভ হয়া উঠে। Continue reading

সুরিয়ালিস্ট মেনিফেস্টো – আদ্রে বেতো

উনিশ আর বিশ শতকে ইউরোপের আর্ট সিন ছিল পুরাই আউলা, বিশেষত ফ্রান্স। নো রিগার্ড ফর ট্রেডিশন। একটার পর একটা নতুন মুভমেন্ট চলতেসে। এক্সপ্রেশনিজম, সিম্বলিজম, ফোভিজম, কিউবিজম, দাদাইজম, ইউ নেম ইট! তবে খুব সম্ভবত সেই সময়ের সবচাইতে ইম্প্যাক্টফুল মুভমেন্ট ছিল সুরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট। আমাদের জন্য সম্ভবত সুরিয়ালিজম সবচেয়ে এক্সেসিবল ভিজুয়াল মিডিয়ামে। দালির সেই গলন্ত ঘড়ি, কিংবা ম্যাগ্রিটের চিমনির ভিতরকার ট্রেন, এগুলাই তো মাথায় আসে সুরিয়ালিজমের কথা ভাবলে, নাকি? কিন্তু আদতে সুরিয়ালিজমের জন্ম হইসিল লিখিত মিডিয়ামে। এপোলোনিয়র নিজের এক নাটকরে প্রথম নাম দিসিলেন সুরিয়াল (বাস্তবতার চাইতেও বেশি কিছু বুঝাইতে) এবং তারপর ব্রেতো সেই শব্দটারেই এক্সটেন্ড করলেন ইচ্ছামত। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন একটা জানালায় তিনি দুইভাগ হয়া দাঁড়ায়ে আছেন। এই ইমেজটাই তারে প্রথম তাড়ায়ে বেড়াইল। সুরিয়ালিজমরে ব্রেতো দেখাইতে চাইসেন একটা ভৌতিক স্বরের মত, একটা প্রফেটিক উইজডম। সক্রেটিসের ডেমন ছিল যেমন। তিনি নিজেরে এই স্বরের কাছে ছাইড়া দিতে পারসিলেন, প্রস্তুত ছিলেন নিজেরে এই স্বর দ্বারা ডিকটেটেড হইতে দিতে। মিলান কুন্দেরা তার ‘আর্ট অফ দ্য নভেলে’ প্রায় এরকমই উইজডম অফ নভেল নামে একটা ধারণার কথা বলসিলেন।

তবে আগে যে বললাম, নো রিগার্ড ফর ট্রেডিশন, তা হয়তো পুরাপুরি সত্য না। ব্রেতোর একলার পক্ষেই কি সম্ভব হইত আর্টে এত র‍েডিকেল পজিশন নেয়া, যদি না আগে অল্প হইলেও তার পাটাতন তৈয়ার হইয়া থাকতো? সুরিয়ালিজমের ঠিক আগের দুইটা মুভমেন্ট, সিম্বলিজম আর দাদাইজম থিকা অনেক নিসে সুরিয়ালিস্টরা। ম্যাক্স আর্নস্টের* কোনো ছবিতে পাখি দেখলে বুঝবেন সে যৌনতা বুঝাইতেসে, দালির কোনো ছবিতে শামুক মানেই ফ্রয়েড। এগুলা সিম্বলিজমের দান। আর দাদাইজম নিজে খুব বেশিদূর যাইতে পারে নাই। কিন্তু তারা আগের সবকিছু তছনছ কইরা দিতে পারসিল। নতুন কিছু আসার পথ তৈরি করতে পারসিল। আমাদের এই র‍েশনাল দুনিয়া, যা চালাইতেসে সুন্দর সুট-বুট পরা, সহীহ উচ্চারণে কথা বলা, নিয়ম মাইনা চলা সেন্সিবল মানুষজন, তারাই তো লাখ লাখ মানুষরে বাধ্য করলো বিশ্বযুদ্ধে মরতে। তাইলে এই র‍েশনালিটি, এই নিয়মকানুন দিয়া আর কী হবে? তারপর এই দাদাইস্টরা সব লণ্ডভণ্ড কইরা দিলেন। চিরাচরিত সব আর্টফর্ম দিয়া জগাখিচুড়ি পাকায়ে ফেললেন। ব্রেতো নিজেও এই দলের লোক ছিলেন। এইখান থিকাই তিনি নিসেন তার সাহস।

এমনকি কনটেন্টের দিক থিকাও সুরিয়ালিস্টরা যা করসে তা একদম নতুন না। তারা বরং একটা ধারারে নতুন কইরা ডিসকভার করসে। সেই রেনেসাঁস আমলেই হিরোনিমাস বশ, কিংবা আর্কিমবোল্ডোরা যেইসব আঁকতেসিলেন, তা সুরিয়ালিজম হইতে খুববেশি দূরে না হয়তো। কিন্তু রেনেসাঁস আর্ট বলতে আমরা যেহেতু বুঝি শুধু কোমল, গুরুগম্ভীর সিমেট্রি, ফলে হয়তো ভিঞ্চি আর বোত্তিচেল্লির সমসাময়িক বইলা এদের স্বীকার করতে আমাদের কষ্ট হবে। এমনকি আমরা যদি আরো পিছে যাই, একদম দুই হাজার বছর আগের হোরেস*ও তার আর্স পোয়েটিকায় বলতেসিলেন কিছু কবিদের কথা যারা বিষয়বস্তুর একঘেয়েমি কাটাইতে গিয়া জঙ্গলে ডলফিন কিংবা সমুদ্রে শূয়ার ছাইড়া দেয়। এইটারে হোরেস নিন্দা হিসেবেই বুঝাইসিলেন, কিন্তু তার এত বছর পরে ম্যাগ্রিট কি আসমান হইতে মানুষের বৃষ্টি পড়ান নাই? আরেক জায়গায় তিনি কিছু কবিদের নিন্দা করসিলেন যে তারা ‘অসুস্থ মানুষের দুঃস্বপ্নের’ মত কবিতা লিখে। সুরিয়ালিস্টরা তো সারাজীবন স্বপ্নের কাছেই পৌঁছাইতে চাইসে। এবং বর্তমানে ‘দুঃস্বপ্নের’ মত লেখাগুলা আমাদের কাছে এসথেটিকালি আরো রিলেভেন্ট হইয়া উঠতে পারসে মনে হয়। অর্থাৎ, সুরিয়ালিজমের এই আলামতগুলা আগেও ছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে হয়তো এগুলা আমরা আরেকটু মানতে প্রস্তুত হইতে পারসি এই দুই হাজার বছরে। তার উপর ফ্রয়েডও গত শতকের হওয়ায় সুরিয়ালিস্টরা একপ্রকার ইন্টেলেকচুয়াল বৈধতাও পাইয়া গেলেন।

কিন্তু সুরিয়ালিজম যে আমার খুব প্রিয় স্টাইল তা বলবো না। অনেক ক্ষেত্রে আমার লাগে এইটা অলসদেরই হাতিয়ার হইসে বেশি। তবে সুরিয়ালিজমও তার পরের আর্ট ফর্মগুলার জন্য তাই করসে যা এর আগেরগুলা করসিল তার জন্য: নতুন কিছুর জায়গা তৈরি কইরা দেয়া। বর্তমানে কনটেম্পরারি খুব কম আর্টই হয়তো পাব যেইখানে সুরিয়ালিজমের অন্তত কিছুটা এলিমেন্ট নাই। আমাদের ভিতরে দুনিয়ারে দেখার একটা নতুন চক্ষু এড হইসে। আর্টের টোটাল ইতিহাস তো মনে হয় এইভাবে নানান পথে আমাদের নিজেদের প্রকাশ করতে পারার ও দেখতে পারার চক্ষু আবিষ্কারেরই ইতিহাস।

তো, ওই টাইমের বেশিরভাগ ফ্রেঞ্চ টেক্সটের মত এইটাও প্রচণ্ড দুর্বোধ্য ও ফ্ল্যাশি। যত না কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি স্টাইলের শো-অফ। ফলে অনুবাদটা করতে অনেক প্যারা খাইতে হইসে সত্যিই। এবং স্বীকার করি, কিছু জায়গায় অল্প কিছু বাক্য বা ছোট ছোট প্যাসেজ হয়তো বাদও দিসি। তবে তা মেইন কথাটা আরো সহজবোধ্য করার জন্যই। এছাড়া, কিছু ভুলও হয়তো হইসে অনুবাদে, কে-জানে। তবে আমার ধারণা, ভুল হইলেও, আমার ভুলগুলাও বেশ সুরিয়ালিস্টই হইসে।

মাহীন হক
ডিসেম্বর, ২০২২

 

সুরিয়ালিস্ট মেনিফেস্টো

 

জীবনের প্রতি, জীবনের সবচাইতে নাজুক অংশ তথা বাস্তবতার প্রতি মানুষের এমনই অগাধ বিশ্বাস, যে সবশেষে সেই বিশ্বাস ভাইঙা পড়তে বাধ্য হয়। যেহেতু মানুষ এক ঘাড়ত্যাড়া স্বাপ্নিক প্রজাতি, ফলে নিজের কিসমতের প্রতি রোজ তার বিরক্তি বাড়তে থাকে, যেইসব জিনিস তারে ব্যবহার করতে বাধ্য করা হইসে একসময় সে আর সেইসবের মূল্য ঠাহর পারে না। তার কাছে আর দাম থাকে না যাকিছু সে নিজের চেষ্টায় কামিয়াব হইসে, প্রায় সবসময়ই সে সেইসব পায় নিজের চেষ্টায়, যেহেতু সে কাজ করতে রাজি হইসে, অন্তত নিজের কিসমতরে নাকচ করে নাই (কিংবা যারে সে কিসমত বইলা ডাকে!) এই পর্যায়ে আইসা তার মধ্যে বিনয় জন্মায়: সে জানে কোনসব মহিলাদের সাথে সে ছিল, সে জানে কীসব আলতুফালতু কাজকাম তারে করতে হইসে; নিজের ধনসম্পদ কিংবা গরিবি নিয়াও তখন আর তার কোনো আগ্রহ থাকে না। এই অর্থে সে মাত্র জন্মানো কোনো বাচ্চার মত। এমনকি তখন আর তার বিবেক-টিবেকেরও তেমন প্রয়োজন হয় না। তবুও যদি তার মধ্যে কোনো স্পষ্টতা বাকি থাইকা থাকে, তখন নিজের শৈশবের দিকে পিছন ফিরা তাকানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। যে শৈশব হাজারো গুরু-মাষ্টারদের ধাতানিতে ভচকায়ে গিয়া থাকলেও তার কাছে তখনও তা মিঠা লাগে। যেহেতু ছোটকালে কোনো বাঁধা-ধরা সীমানা ছিল না, ফলে সে বহু জীবন একবারে যাপন কইরা ফেলার একটা স্বাদ পায়। এই ইলিউশনটা তার মধ্যে গভীর শিকড় গাঁথে। এখন সে কেবল ভাইসা যাইতে চায়, সে চায় সবকিছুর চূড়ান্ত সৌন্দর্য শুইষা নিতে। বাচ্চারা প্রতিদিন বাইর হইয়া পড়ে দিনদুনিয়ার কোনোকিছুর চিন্তা ছাড়াই। সবকিছুই তাদের হাতের কাছে থাকে। এমনকি সবচাইতে জঘন্য যা ঘটতে পারে তাও মাইনা নেয়া যায়। সকল জঙ্গলই সাদা নাইলে কালা। এবং তার চোখে কোনো ঘুম নাই। তবে এও সত্য যে আমরা অতদূর যাওয়ার সাহস জুগাইতে পারবো না। এইটা স্রেফ দূরত্বের মামলা না। এই পথে হুমকির পরে হুমকি ছড়ানো। লোকে বাধ্য হয় ধীরে ধীরে পিছু হটতে, জমিনের একটা অংশ ছাইড়া দিতে। সুতরাং যেই কল্পনা কোনো বাঁধ মানে না তারেও চর্চা করতে হয় উপযোগিতার কঠোর আউলফাউল নিয়মের অধীনে। ফলে কল্পনাশক্তি খুব বেশিদিন এই বাজে দশায় টিকতে পারে না, এবং সাধারণত মানুষের বিশ বছর হইতে না হইতেই তারে সে তার নীরস নিয়তির হাতে একলা ফালায়ে চইলা যায়। যদিও মানুষ পরে চেষ্টা করে নিজের কল্পনাশক্তিরে আবার জাগাইতে, কারণ ক্রমশ তার মনে হইতে থাকে জীবনের সকল অর্থ সে হারায়া ফেলতেসে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে ব্যর্থ হয়, কার‍ণ ততদিনে সে ভালোবাসার মত কোনো উঁচা পর্যায়ে পৌঁছানোর শক্তিই হারায়া ফেলে। কারণ ততদিনে সে তার শরীর ও মন সঁইপা দেয় নিছক দুনিয়াবি প্র‍াকটিকাল কাজকামে যা তার সব মনোযোগ খায়া ফেলে। তার কোনো আচরণই আর খুববেশি মহান থাকে না, তার কোনো ধ্যানধারণা আর থাকে না উদার কিংবা সুদূরপ্রসারী। সকল ঘটনা, বাস্তব হোক আর কল্পিত, তার মনের চক্ষুতে সবকিছুরে সে কেবলই তার পরিচিত অন্যান্য ঘটনার আদলেই শুধু বুঝতে পারবে। আমি যা বলতেসি তা হইল: সবকিছুরে সে কেবল নিজের পরিচিত অন্যান্য ঘটনার সাথের সম্পর্কের মধ্য দিয়াই বিচার করবে। কোনো ঘটনারেই সে নিজের মোক্ষ হিসেবে গ্রহণ করবে না।

প্রিয় ইমাজিনেশন, তোমার ব্যাপারে আমি যা সবচেয়ে ভালোবাসি তা হইল তোমার বিন্দুমাত্র ছাড় না দেয়ার স্বভাব। Continue reading

জালালগীতিকা

পাবলিশার’স নোট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের একশ বছর হইছে বইলা সরকারিভাবে এক প্রোগ্রাম হইতেছে কোন গ্রামে; তো, গ্রামের এক বুড়া লোক কইতেছেন, ভাই, এই লোক আবার কেমন কবি? আমাদের এলাকায় তো জীবনে কোনদিন গান করতে আসেন নাই, উনি এতো বড় কবি কেমনে হইলেন?… যিনি লিখছেন বইটা উনি কইতেছেন, গ্রামের লোকের কাছে কবি মানে হইতেছে কবিয়াল, আর বড় বড় কবিয়ালরা তো নানান এলাকায় গিয়া গান গাইয়া বেড়ান… তো, এই কারণে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’রে বড়কবি মনে করতে পারার কোন কারণ নাই!

দুসরা জিনিস হইলো, জালালউদ্দিন খাঁ বাঁইচা থাকতে উনার ৪টা বই ছাপাইছিলেন; এর মধ্যে পয়লা ২টা বই আব্বাসউদ্দিন’রে উনি পাঠাইছিলেন। উনার গান পইড়া আব্বাসউদ্দিন খুবই পছন্দ করছিলেন, উনারে চিঠিও লিখছিলেন। চিঠি’তে এইরকম লিখছিলেন যে, জালালউদ্দিন আর কতো দিন “লোকচক্ষুর অন্তরালে” পইড়া থাকবেন, উনারে “রেডিওর দুনিয়াতে” নিয়া আসবেন উনি। চিন্তা করেন ব্যাপারটা। হাওর-এলাকার এতো বড় আর্টিস্ট জালালউদ্দিন, কিন্তু পইড়া আছেন “লোকচক্ষুর অন্তরালে”; কারণ উনি তো রেডিও’তে নাই।

তো, দেখেন তাইলে, আমরা তো ভাবি যে, দুনিয়ার তাবত বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’রে চিনেন, কিন্তু আসলে খুব মিনিমাম ‘শিক্ষিত’ বাঙালিই উনারে চিনেন, এর বাইরে উনার আসলেই বেইল নাই কোন; বড়জোর দেখতে লালন ফকিরের মতন আছিলেন – এইরকম ভাবা যাইতে পারে। বা আব্বাসউদ্দিন মনে করতেন রেডিওতে যাইতে পারা’টাই হইতেছে ‘আসল’; এখন ধরেন সিনেমা বা অনলাইনে হিট হইতে পারাটা যেইরকম।… মানে, আমি যেইটা বলতে চাইতেছি, আপনার নিজের দেখা দুনিয়াটাই পুরা দুনিয়া না আর কি! এই যে ক্লাস কনশাসনেস, এই যে মিডিয়া রিচ, এইগুলাও পার্ট অফ দ্য গেইম!

জালাল উদ্দীন খাঁ এই মিডল-ক্লাস আর্ট-কালচারের গেইমটার মধ্যে নাই তেমন। সময়ের হিসাব করলে জালাল উদ্দীন খাঁ (১৮৯৪ – ১৯৭২), কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ কাছাকাছি সময়েরই লোক। কিন্তু যেহেতু “আধুনিক কবিতা”রে আমরা সেন্টার কইরা রাখছি, খালি পেরিফেরিতেই নাই উনি, মোটামুটি “বিস্মৃত” ক্যাটাগরিতে চইলা গেছেন। কিন্তু এই বইয়ের অনেকগুলা লেখা পড়লেই চিনতে পারার কথা বাংলাদেশি রিডারদের এবং বুঝতে পারার কথা যে, উনার জিনিসগুলা এখনো বাঁইচা আছে, জাস্ট উনার নামটা মুইছা ফেলা হইছে বা কোনভাবে “বাদ” পইড়া গেছে।

জালাল উদ্দীন খাঁ’র ৭০০’র বেশি গীতি-কবিতা ছাপানো অবস্থায় আছে। এই বইয়ে ৪০টা লেখা পড়তে পারবেন।

কূল নাই দরিয়ার পারে বৃক্ষ একটি মনোহর

কূল নাই দরিয়ার পারে বৃক্ষ একটি মনোহর
এর আগায় বসে সোনার পাখি গেয়ে গেল চল্লিশ বৎসর।
তোতা ময়না কই গেল আজ কই গেল সেই কোকিলা
যার গানেতে ঘুম ভাঙ্গিয়া মানুষ হইত উতালা
দহিছে সেই অন্তর্জালা কাঁপে অঙ্গ থর থর ॥

তরুণ বয়সে এসেছিল গুল বেহেশতি সুন্দরী হুর
দরিয়া মন্থন করিয়া গেছে লুটে নিছে রত্নপুর
নিশায় তখন ছিলাম বিভোর মনটা ছিল বেখবর ॥

কালের বাঁশি নানান সুরে বাজতে বাজতে অবিরাম
মৃত্যু আনলো শিয়রেতে ডঙ্কা বাজায় ধুমধাম
লয়না সে এলাহি নাম মনে মনে রয় কাতর ॥

বেতাল হয়ে পাতালপুরে ধীরে এখন চলেছি
তাজা রক্তে জ্বলতি আগুন নিভে ঠাণ্ডা হয়েছি
জালালে কয় বেঁচে আছি দুঃখকষ্টে নিরন্তর।।

Continue reading

ঢাবি বাসের উল্টাপথে যাত্রা: কী করব আমরা?

কয়দিন আগে ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠানটার সাবেক এক শিক্ষক এক নারীরে গাড়ি চাপা দেন। ব্যাপারটা নিয়া অনেক হাউকাউ হয়, অনেক আন্দোলন হয়, অনেক চিল্লাপাল্লা হয়। বহিরাগত প্রতিরোধ, ঢাবি ক্যাম্পাসের সুরক্ষাসহ আরো অনেকগুলা এজেন্ডা নিয়া ছাত্ররা রাস্তায় নামে। টানা কয়েকদিন চলে আন্দোলন (যদিও পরে ছাত্রলীগের হাতে এই আন্দোলনের অপমৃত্যু ঘটে, যা ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’দের ব্যানারে সংগঠিত যেকোন ছাত্র আন্দোলনের স্বাভাবিক পরিণতি)।

কয়দিন আগে এই ভার্সিটিরই বাস ‘ক্ষণিকা’র ড্রাইভার বজলু, ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণী যাওয়ার পথে রং রুটে গাড়ি চালাইতে গিয়া এক পথচারী, আল আমিন টুটুলরে (২৪) চাপা দেয়। টুটুল হসপিটালে যাওয়ার পর মারা যায়। খবর থেকে জানতে পারি, বাসের শিক্ষার্থীরা তখন ড্রাইভার বজলুরে পুলিশে সোপর্দ করে আদর্শ নাগরিকের দায়িত্ব পালন করে।

এই ঘটনা নিয়া দেশের কোথাও তেমন কোন আন্দোলন-সংগ্রাম দেখা যায় নাই। না নিরাপদ সড়কের ইস্যুতে, না ‘ঢাবি বাসের উল্টারুটে চলা’ ইস্যুতে— কোন ইস্যুতেই কোন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ হয় নাই। কেবল ভার্সিটির কিছু বিবেকবান স্টুডেন্ট নিজেদের ফেসবুকের পাতায় নিজেদের অক্ষম প্রতিবাদ প্রকাশ করছেন; ঢাবির গ্রুপগুলায় এ বিষয়ে টুকটাক আলাপ হইছে।

ক্যাম্পাসে গাড়ির চাপায় মানুশ মরলে ঢাবি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন ‘বহিরাগতমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানেরই বাস যখন ক্যাম্পাসের বাইরে দূর-দূরান্তে গিয়া মানুশ খুন কইরা আসে, তখন ওই মানুশেরা কি ‘ঢাবি পরিবহনমুক্ত এলাকা’র আন্দোলন করেন বা করতে পারেন? না, ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা তাদের পক্ষে কোন অবস্থান নেন? আমরা আজ অবধি এরকম কিছু দেখি নাই। স্ট্রেঞ্জ, নাহ?!

ঢাবির পরিবহন উলটা রুটে ঢুইকা পড়া এবং এর ফলে দুর্ঘটনার ঘটনা এই প্রথম না। এর আগেও বহুবার উলটা রুটে ঢুইকা পত্রিকার শিরোনাম হইছে ঢাবির বিভিন্ন পরিবহন। ২০১৭ সালের জুন মাসেও একবার, এই বিজয় সরণীতেই, উলটা রুটে ঢোকা ‘বৈশাখী’ বাসের ধাক্কায় আহত হন দুই বাইকার। কেন ঢাবির বাস উলটা রুটে ঢোকে— এটা একটা কোশ্চেন।
Continue reading

হাসান রোবায়েতের কবিতা

ইশক

যে চইলা গেছে
তার
যাওয়াটারেই ভালোবাইসা ফেলি—

 

সবুর

তোমার জন্যে সবুর করা

আল্লার
রহমতের দিকে
তাকায়া থাকার মতন—

 

রঙ্গনের বন

আমার রক্তের ভেতর খালি রঙ্গনের বন ডুকরে ওঠে
তুমি চইলা গেলা বলে—

 

পাশাপাশি

তোমারে যে ভালোবাসছিল
তার মুখ ভুলে যাইও না—
অসুখ হইলে তার পাশে বইসো—

কখনো জিজ্ঞাসা কইরো—
জলপট্টির চাইতে
কপালে হাত রাখলে ভালো লাগবে কিনা—!

যে তোমারে একদিন চিঠি লিখছিল
কাঁপা কাঁপা ভয়ে
তার কাছে যাইও; প্রশ্ন কইরো, মন খুব খারাপ হইলে
একটা গান তাকে আশ্রয় দেবে কিনা—

মানুষই মানুষের পাশে যায়—
দুঃখের কথা শুনে
নিমের ফুলের মতো হালকা কইরা দেয় সময়—

 

Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →