রাধারমণের গীত
“কালা কাজলের পাখি দেইখা আইলাম কই
জলে গিয়াছিলাম সই”
এই গানের মধ্য দিয়া বলা যায় রাধারমণরে আমার প্রথম চেনা। প্রাইমারি স্কুলের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রোগ্রামে এইটা শুইনা শুইনা শিইখা গেছিলাম। খুবই পছন্দের গান হইয়া গেছিলো এইটা তখন। ধামাইল নাচও টুকটাক দেখছি আর নাচছি ছোটবেলায়। সেইখানেও তার গানগুলা গাওয়া হইতো। যদিও তখন জানা ছিলো না এইসব কার গান বা এইসব নিয়া ভাবাও হয় নাই তখন যে রাধারমণ কে।
তো রাধারমণরে নিয়া জানার শুরুটা বলা যায় ক্লাস নাইন টেনে উঠার পর। আস্তে আস্তে তার আরো গান জানলাম, শুনলাম, শিখলাম। তখন থাইকা তারে জানার আগ্রহ তৈরি হওয়া বলা যায়। কারণ তখন নিজের মধ্যে একটা গর্বের মতো ফিল হইতো যে রাধারমণ নিজের এলাকার মানুশ। মনে হইতো যে নিজের এলাকার একজন মানুশ যার গান দেশের কত মানুশ শুনতেছে, গাইতেছে বা তারে চিনতেছে। নরমালি আমাদের এলাকায় স্কুল-কলেজের প্রোগ্রামগুলায় তার গান বলা যায় সবসময় গাওয়া হইতো। যার কারণে সবাইই তার গান নিয়া মোটামুটি জানে। এরপর কলেজে যাওয়া হইলো তখন তারে নিয়া আগ্রহ আরো বাড়লো। কারণ আমাদের কলেজের পুরা জায়গাটার মালিক নাকি তিনি এইরকম শুনছি। অনেক বড় একটা জায়গা। আবার কলেজের পাশেই ছিলো তার বাড়ি বা এখন মনে হয় এইটারে রাধারমণ মন্দিরও বলা হইয়া থাকে। তো অনেকদিন যাইমু যাইমু বইলাও অবশেষে আর যাওয়া হয় নাই। তার বাড়ি দেখা হয় নাই। তো এইটা আমার এক সময় আফসোসের মতোই ছিলো।
রাধারমণ দত্ত পুরাকায়স্থ যারে রাধারমণ বইলাই আমরা জানি। তার জন্ম হইছিলো সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে। তিনি মূলত একজন গীতিকবি এর সাথে আরো কিছু যোগ করতে চাইলে বলা যায় মরমিকবি, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, ধামাইল গানের স্রষ্টা। রাধারমণের মধ্য দিয়া ধামাইল গান সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ও প্রচলিত হওয়ায় তারেই এর স্রষ্টা বইলা মনে করা হয়। সিলেট অঞ্চলে মূলত গ্রামের দিকে বিয়া বা অনেক সময় অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠান উপলক্ষে একধরণের নাচ হয় যেইটারে বলা হয় ধামাইল। এই ধামাইলের জন্য আলাদা কিছু গান আছে। তো অইসব গান গাইয়া এই নাচটা নাচা হয়। সাধারণত যারা নাচেন তারা তালে তালে হাততালির মাধ্যমে চক্রাকারে ঘুইরা ঘুইরা একলগে এই গানগুলা গান। ধামাইলের গান রাধারমণ ছাড়াও আরো কেউ কেউও রচনা করছেন। তবে পঁচানব্বই শতাংশ গানই রাধারমণের গান। ধামাইল নাচ এখন অনেকটা হারাইয়া গেছে বলা যায়। আগের মতো সব জায়গায় আর এখন এইটা অত হয় না।
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওড়ে রাধারমণ আশ্রম গইড়া তুলেন।সেইখানেই তার সাধন-ভজন চলতো। রাধারমণ কখনো তার গানগুলা নিজে লেইখা রাখেন নাই। তিনি মুখে মুখেই এইগুলা গাইছেন। পরিবর্তিতে তার ভক্তরা অইগুলা শুইনা লিপিবদ্ধ করছেন। যার কারণে অনেক গানের মধ্যেই ছোটখাটো পরিবর্তনও আসছে আর আসাটা স্বাভাবিক। আবার অনেক গানই হয়তো লিপিবদ্ধ হয় নাই। যার কারণে নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব না তিনি কতগুলা গান রচনা করছেন। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন তথ্য আছে তার গানের সংখ্যা নিয়া।বলা যায় তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, বিরহ, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরনের কয়েক হাজার গান রচনা করছেন।
রাধারমণকে অনেকে বাউল বা বাউল কবি বইলা থাকেন। কিন্তু আসলে তিনি বাউল কবি নাহ। যারা মরমি কবিতা বা গান লিখেন তারা সবাই বাউল নাহ। যখন তার জীবন ও তার গাওয়া গানগুলার দিকে ভালো কইরা তাকানো হয় তখন এইটা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে উনি বাউল ছিলেন নাহ। বাউল শব্দটার উৎপত্তি নিয়া বিভিন্ন মতবাদ আছে। কুনু কুনু গবেষকের কথানুযায়ী বৌদ্ধদের বজ্রযান নামক সম্প্রদায় থাইকা বাউল শব্দটা আসছে। তারা নির্বান লাভের জন্য নিজের দেহের মধ্যকার ইন্দ্রিয়গুলার বিকাশ এবং এর মাধ্যমে তাদের জন্মান্তরের শিকল থাইকা মুক্তি লাভ করার জন্য সাধনা করতেন। আবার অনেকের মতে সংস্কৃত বাতুল শব্দের অপভ্রংশ রূপে বাউল শব্দের উৎপত্তি হইছে। সেইখানেও আমরা দেখতে পাই যে বাউলরা কুনু ধর্ম মানেন নাহ। এই সকল বাউলেরা মুসলিমদের শরীয়ত ও হিন্দুদের সংহিতা এইগুলা না মাইনা তাদের নিজেদের মতে সাধনা করতেন। এমনকি এমনও আছে হিন্দুর গুরু ছিলেন মুসলিম এবং মুসলিমের গুরু হিন্দু। তো এইসব মতবাদ বিশ্লেষন করলে এইটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে রাধারমণ কুনুভাবেই বাউল নন। কারণ তিনি কখনোই তার ধর্ম পরিত্যাগ করেন নাই। উল্টা তিনি হিন্দু ধর্মের মধ্যকার যে চতুরাশ্রম, ব্রহ্মচর্যাশ্রম, গার্হস্থাশ্রম, বাণপ্রস্থাশ্রম ও সন্ন্যাস পর্যায়ক্রমে পালন কইরা গেছেন।
রাধারমণ মূলত ছিলেন বৈষ্ণব-সহজিয়া দর্শনের অনুসারী। সহজিয়া মূলত একটা বিশেষ ধর্মমত, যা সহজপথে সাধনা করাকে বুঝায়। বৈষ্ণব-সহজিয়াদের মূল আদর্শ রূপ-প্রেম-আনন্দ। এই ধর্মমতে পরকীয়া প্রেমে বিশ্বাস করা হয়। তাদের কাছে এইটার মধ্য দিয়া সিদ্ধিলাভ সম্ভব এমনটা মনে করা হয়। রাধারমণের অনেক গানেই এই বিষয়টা লক্ষ্য করা যায়। তার গানগুলায় রাধাকৃষ্ণ-এর প্রেমলীলাটারে খুব গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হইছে। এছাড়া অন্যান্য গানেও দেখা যায় যে কুনু নারীর জায়গা থাইকা হয়তো গানটা গাওয়া হইতেছে তো তখন সেইখানে এইরকম লাইন আছে যে ঘরে শ্বাশুড়ি-ননদী আছে তো সে কিভাবে বাইরে যাইবো বা এই টাইপ কিছু।এইখানে পরকিয়া জিনিশটার আভাস পাওয়া যায়।
তার অনেক গানের শেষদিকের একটা লাইন খুব কমন সেইটা হইলো “ভাইবে রাধারমণ বলে” মানে “ভেবে রাধারমণ বলে” তো এইটা তার গানের একটা স্পেশাল সিগনেচার বলা যায়। তার অনেক গানের মধ্যেই একই জিনিশ লক্ষ্য করা যায়। মানে একই কথা, একই মিনিং। তো আমি তার এইরকম গানগুলা থাইকা আমার পছন্দের গান বাছাই করার ক্ষেত্রে যেই কাজটা করছি সেইটা হইলো যেই গানগুলা একই রকম কথা বা মিনিং বুঝাইতেছে সেইগুলার মধ্য থাইকা মাত্র দুই একটা রাখার ট্রাই করছি। পছন্দ হইলেও এর বেশি রাখি নাই। কারণ অনেক সময় হয় কি একই মিনিং এর গান হইলেও দেখা যায় যে হয়তো একটা লাইনের জন্যই এইটা ভালো লাইগা গেছে। কিন্তু যেহেতু একই মিনিং তো যদি একই রকম অনেকগুলা রাখা হয় আমার কাছে মনে হয় এইটা সৌন্দর্যটা নষ্ট কইরা ফেলে আসলে।
তার কিছু গানের মধ্যে দুনিয়ার মিছা মায়াজালে বন্দি হইয়া জীবন যে চইলা যাইতেছে,নিজের করা পাপের জন্য যে অনুতাপ, দুনিয়াতে আসলে যে আপন কেউ নাই এই টাইপের কিছু জিনিশ খুবই গভীর ও সুন্দরভাবে ফুইটা উঠছে। প্রেম জিনিশটারে তিনি বিভিন্নভাবে তার গানে তুইলা আনছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরহের মধ্য দিয়া। আবার অনেক সময় দেখা গেছে উনি প্রেমিকের অপেক্ষারত হইয়া কুঞ্জ সাজানোর কথা বলতেছেন। অনেক সময় আকুতি করতেছেন বন্ধু বিনোদিয়া যেন দয়া কইরা আসে বা শ্যাম বন্ধুরে বলতেছেন সে যদি দয়া কইরা না আসে তাহলে তার মতো ঘোর পাপীরে কে নিবো তরাইয়া (উদ্ধার কইরা)। গুরুর চরণ পাইবার আশায় বইসা থাইকা অনেক সময় তার দিন যাইতেছে গইয়া (পাড় হয়ে)। অনেক সময় গৌর বিচ্ছেদের জ্বালা নিয়া গান গাওয়া হইছে। বিচ্ছেদের যন্ত্রণারে কত সুন্দর কইরা ফুটাইয়া তুলছেন তিনি তার গানগুলায়। এইসব জিনিশই আমি খেয়াল করছি আমার পছন্দের গান বাছাই করার সময়।
সুরাইয়া দীনা
…
আমি কারে বা দেখাব মনের দুঃখ গো
আমি কারে বা দেখাব মনের দুঃখ গো হৃদয় চিরিয়া।
আমার সোনার অঙ্গ মলিন হইল ভাবিয়া চিন্তিয়া॥
পুরুষজাতি সুখের সাথী নিদয়া নিৰ্মায়া।
তারা জানেনা মনের বেদন কঠিন তাদের হিয়া॥
আমি সাদে সাদে প্রেম করিলাম সরল জানিয়া।
আমারে ছাড়িয়া গেল প্রাণনাথে কী দোষ পাইয়া॥
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া।
আমার জগতে কলঙ্ক রইল পিরিতি করিয়া॥
আমার নারীকুলে জন্ম কেন দিলায় রে
আমার নারীকুলে জন্ম কেন দিলায় রে দারুণ বিধি
নারীকুলে জন্ম দিয়া ঘটাইলায় দুর্গতি রে॥
শিশুকালে পিতার অধীন, যৌবনেতে স্বামীর অধীনরে
ওরে বৃদ্ধকালে পুত্রের অধীন আমারে বানাইলায় রে ॥
যদি আমি পুরুষ হইতাম মোহন বাঁশি বাজাইতাম রে
কত নারীর মন ভুলাইতাম বাজাইয়া মুরলী রে॥
ভাইবে রাধারমণ বলে নারী জনম যায় বিফলে রে
না লাগিল সাধের জনম বন্ধুয়ার সেবায় রে।।
ভোমর কইও গিয়া
ভোমর কইও গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া।
ও ভোমররে কইও কইও কইও আরে কৃষ্ণরে বুঝাইয়া।।
ওরে ভোমর রে না খায় অন্ন না খায় জল নাহি বান্দে কেশ
ঘর থাকি বাইর হইলা যেমন পাগলিনীর বেশ।।
ও ভোমর রে উজান বাঁকে থাকো রে ভোমর
ভাইটাল গাঙে থানা
চোখের দেখা মুখের হাসি কে কইরাছে মানা।।
ও ভোমর রে, ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
নিভা ছিলো মনেরই অনল কে দিল জ্বালাইয়া।।
ইতা কিতা করে গো
ইতা কিতা করে গো বন্দে পায়ে কেনে ধরে
শুনছনি সই পুরুষ হইয়া নারীর পায়ে ধরে
যার কুঞ্জে গেছলায় বন্ধু তার কুঞ্জেতে যাও
আমার বিছানায় তুমি না তুলিও পাও ৷
হায় বন্ধু হায় বন্ধু বলে বালিশ লইলাম কোলে
দারুণ শিমুলের তোলা বুলাইলে না বুলে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
নিজগুণে প্রাণবন্ধু দিলায় আইয়া ধরা ॥