কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।।
…
১৯৪৭ সালের ৩০ শে নভেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়া আলাপ হয়, সৈয়দ মুজতবা আলী সেইখানে বাংলা ভাষার পক্ষে একটা লেকচার দেন। উনার এই লেকচার নিয়া অনেক তর্ক বিতর্ক হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী তখন বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। বলা হয়, এই ঘটনার পরে উনার বিরোধীপক্ষ গর্ভমেন্টের কাছে বিচার দেন আর এডুকেশন মিনিস্ট্রি থিকা উনারে শোকজ করা হয়। উনার বড় ভাই সৈয়দ মুতর্জা আলী, যিনি এইটা নিয়া কথা কইতে গেছিলেন, তারেও তার পজিশন থিকা ডিমোশন দিয়া ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বানায়া চিটাগাংয়ে ট্রান্সফার কইরা দেয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এইসব দেইখা ইন্ডিয়াতে চইলা যান।
পরে ১৯৫৬ সালে আল ইহসান পত্রিকায় উনার এই ভাষণ প্রবন্ধ হিসাবে ছাপা হয়। অই বছরই বই হিসাবেও ছাপা হয়, আলাদা কইরা।
মজার ব্যাপার হইলো, কলকাতার মিত্র অ্যান্ড ঘোষ পাবলিকেশন কোম্পানি থিকা ১১ খন্ডে সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাসমগ্র ছাপানো হইছে, উনার পাবলিশড, আনপাবলিশড অনেক লেখা সেইখানে আছে, কিন্তু এই বইটা নাই। 🙂 মানে, রচনাসমগ্র দেইখা আপনার মনে হবে, সবকিছুই আছে এইখানে, কিন্তু সবকিছুর ভিতরে অল্প কিছু জিনিসরে যে গোপন করা হয়, সেইটা চাতুরির ঘটনা না খালি সাবভারসিভ একটা জিনিসও।
২.
সৈয়দ মুজতবা আলী যখন এই আর্গুমেন্টগুলা হাজির করতেছেন, তখন পাকিস্তান রাষ্ট্র যে বানানো হইছে, সেইটার ৬ মাসও হয় নাই। রাষ্ট্র নিয়া অবশ্যই অনেক এক্সপেক্টশন থাকতেছে তখন, নানান আলাপ চলতেছে নানান জায়গায়।
ব্রিটিশ আমলে ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রভাষা ছিল ইংলিশ, হিন্দি আর উর্দু। ১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান দুইটা রাষ্ট্র হওয়ার পরে, হিন্দিরে ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হইছিল, কিন্তু যেহেতু ইন্ডিয়ার সব জায়গায় হিন্দি চালু নাই, বলা হইছিল হিন্দির পাশাপাশি ইংলিশও থাকবো। তো, ইন্ডিয়াতে যেহেতু ইংলিশ বাদ দিয়া হিন্দি চইলা আসছে, পলিটিশিয়ানদের ধারণা ছিল, পাকিস্তানেও তো উর্দুই হওয়ার কথা!
সৈয়দ মুজতবা আলী এইসব কথা বলার আগে, ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তমুদ্দীন মজলিসের পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু? পাবলিকেশনে কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ ও প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমও পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা করার পক্ষে লেখেন। এরপরে ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখে জিন্নাহ ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে আইসা উর্দুরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বইলা ঘোষণা দেন, এক স্টুডেন্ট নো বলেন। আন্দোলন, মুভমেন্টের পরে ১৯৫৬ সালে উর্দুর লগে বাংলারেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়। এইগুলা নিয়া কমবেশি আলাপ তো চালু আছেই।
৩.
ভাষা তো পাওয়ারের লগে রিলেটেড একটা ঘটনা। ব্রিটিশ আমলে ইংলিশ যে সরকারি দফতরের ভাষা আছিল, সেইটা তো পাওয়ারের কারণেই। তো, ব্রিটিশরা যখন নাই তখন তো আরেকটা ভাষার দরকার।
ইন্ডিয়া চাইলো, হিন্দি ভাষারে এস্টাবলিশ করতে, না পাইরা ইংলিশটারে রাইখা দিয়া হিন্দিরেও প্রমোট করলো। এখন ইন্ডিয়াতে যতদিন হিন্দি চালু আছে ততদিন দিল্লীতে নর্থ ইন্ডিয়ানদের পাওয়ার কমার কোন কারণ আসলে নাই। (খালি ভাষাই না, ভাষার ভিতরে অ্যাকসেন্ট আর ডায়ালেক্টের ব্যাপারও আছে, কুষ্টিয়া-খুলনার দিকের কথারে যত বাংলা লাগে, সিলেট-চিটাগাংয়ের ডায়ালেক্টরে তো এতোটা লাগে না। এইরকমের ব্যাপারগুলা আছে।) আর এই পাওয়ারের কারণেই দেখবেন, পশ্চিমবঙ্গের সোকল্ড শিক্ষিত লোকজন হিন্দিরে যতোটা হেইট করেন, ইংলিশরে এতোটা না। কারণ উনারা ইংলিশ তো জানেন কিছুটা কলোনিয়াল আমল থিকা, কিন্তু নতুন কইরা হিন্দি শিখাটা তো পসিবল না! বা ইংরেজদের নিজেদের মালিক বইলা মানতে যতোটা রাজি আছিলেন, সেই জায়গায় অন্য নেটিভ ইন্ডিয়ানদের মালিক বইলা ভাবাটাও মুশকিলেরই হওয়ার কথা।…
পাকিস্তানেও একইরকমের সিচুয়েশনই ছিল, ইংলিশের জায়গায় কোনটা আসবো, এই কোশ্চেনটা উঠছিল। রাষ্ট্র যেহেতু সেন্ট্রালাইজড একটা জিনিস, একক একটা জিনিস তো থাকা লাগবে। মানে, ইংলিশের বিপরীতে আরেকটা অপশনের কথাই উঠছিল।
জিন্নাহ কিন্তু ইংলিশেই কইছিলেন – উর্দু’রে স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ করার কথা; উর্দুতে কন নাই। আর যেই স্টুডেন্ট এইটার প্রতিবাদ করছিলো, সে কিন্তু ‘না’ কয় নাই; ‘নো’-ই কইছিলো! ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না? যেই দুইটা ভাষা’র লাইগা ফাইটটা চলতেছে, সেই দুইটাই নাই; এইটা নিয়া কথা হইতেছে অন্য আরেকটা ভাষাতেই।
জিন্নাহ আসলে ইংরেজি জানা লোকদেরকেই শুনাইতে চাইতেছিলেন (উনার উর্দু না বলতে পারা’র কথা মনে রাইখাই বলতেছি)। যারা খালি বাংলা জানে, ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়া উনারা কিছু কইতে পারবে এইরকম গণতন্ত্রে উনি বিলিভই করেন নাই আসলে। যিনি রিভোল্ট করলেন, উনিও জিন্নাহরে জানাইতে চাইছিলেন, বাংলা তো আমরা জানি, ইংরেজির ভিতর দিয়াই। উনি জিন্নাহরে প্রটেস্টই করছেন, অথরিটি’টারে যে উনি চিনেন এইটা জানাইছেন।
মজার ব্যাপার হইলো, “অরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়…” গানটা নিয়া; ‘কাইড়া’, কি রকম অদ্ভূত বাংলা! লিখতে গেলেও ফানি লাগে না একটু, ব্যাপারটা! এই বাংলা-ভাষা ভাষা আন্দোলনের ‘নো’ বেঙ্গলিরা চাইছিলেন বইলা মনে হয় না। এইখানে পাওয়ারের ঘটনাটা আরো ক্লিয়ার হওয়ার কথা আসলে।
তো, সৈয়দ মুজতবা আলী তার আর্গুমেন্টের ভিতরে বারবার ভাষা কেমনে অন্য সব সোশিওপলিটিক্যাল জায়গাগুলাতে দখলের জায়গাগুলা জারি রাখে, সেই জায়গাগুলারে খোলাসা করতেছিলেন। এই জায়গা থিকা দেখতে গেলেও, এইটা ইন্টারেস্টিং একটা লেখা।
৪.
এই পোস্ট’টা পড়া আগে আগের দুইটা কিস্তিগুলা পইড়া নিলে ভালো। কারণ এইটা একটা লেখারই কন্টিনিউয়াস পার্ট। আর পড়ার সময় লেখার কনটেক্সট’টা মাথায় রাখতে পারলে বেটার। বাংলা-ভাষা নানান সময়ে নানান তর্কের ভিতর দিয়া গেছে। এইটা এইরকম একটা মোমেন্টের কথা। অই সময়টা আমরা পার হয়া আসছি। কিন্তু পার হয়া আসছি বইলাই অই আলাপ-আলোচনাগুলারে ভুইলা যাওয়াটা ঠিক হবে না। বরং এখনকার যেই বাংলা-ভাষা সেইটার বেইজ এইরকমের আলাপগুলাই। যেইগুলা আমরা আসলে আমলে নিতে পারি নাই, বা নতুন কইরা রিলিভেন্ট কইরা তুলতে পারি নাই। এই কারণে এই ধরণের লেখাগুলা রিভিউ করার দরকার আছে। আবারো ছাপাইতেছি আমরা।
ই. হা.
…
আমি যে শিক্ষা-ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছি তাতে দেশের শতকরা নব্বই জন মাইনর, ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়বে। এবং সে মাইনর, ম্যাট্রিকের শিক্ষাদান অনেক বেশী উন্নত পর্যায়ের হবে। ইংরেজী বা উর্দুর জন্য জান পানি করবে না বলে তারা অতি উত্তম বাংলা শিখবে এবং ইংলণ্ড, ফ্রান্স, মিশর, ইরানে যে রকম সাধারণ শিক্ষিত লোক মাতৃভাষায় লেখা দেশের শ্রেষ্ঠ পুস্তক পড়তে পারে এরাও ঠিক তেমনি দেশের উন্নততম জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। দেশের তাবৎ লোকই যে উত্তম উত্তম পুস্তক পড়বে সেকথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়—কারণ সকলেই জানেন জ্ঞানতৃষ্ণা কোনো বিশেষ শ্রেণী বা সমাজের মধ্যে নিবদ্ধ নয়, এমনকি উচ্চশিক্ষা পাওয়া না পাওয়ার উপরও সে জিনিস সম্পূর্ণ নির্ভর করে না, কত বি-এ, এম-এ, পরীক্ষা পাশের পর চেক্ বই ছাড়া অন্য কোনো বইয়ের সন্ধানে “সময় নষ্ট” করেন না, আর কত মাইনরের ছেলে গোগ্রাসে যা পায় তাই গেলে—কিন্তু মাতৃভাষা দেশের সর্বোত্তম প্রচেষ্টার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এর সত্যতা সপ্রমাণ হয় আরেকটি তথ্য থেকে—ইউরোপের বহু সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক আবিষ্কর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়ন না করেও যশস্বী সৃষ্টিকার হতে সমর্থ হয়েছেন।
সেই তাই দেখতে হবে, মাতৃভাষার যে নির্ঝরিণী দিয়ে বিদ্যাভ্যাস আরম্ভ, নির্ঝরিণীই যেন বিশাল এবং বিশালতর হয়ে বিশ্ববিদ্যার অগাধ সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছয়। মাঝখানে ইংরেজী বা উর্দুর দশ হাত শুকনো জমি থাকলে চলবে না।
বিশেষ করে উর্দুওয়ালা মৌলবী-মৌলানাদের এ কথাটি বোঝা উচিত। বাংলাতে ধর্মচর্চা না করার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মুসলিম ধর্মের কুসংস্কারে নিমজ্জিত। ডান দিক থেকে বাঁ দিকে ছাপা বই দেখলেই সে ভয়ে ভক্তিতে বিমূঢ় হয়ে যায়—তা সে গুল-ই-বাকাওলির কেচ্ছাই হোক আর দেওয়ান-ই চিরকীন্ই হোক্। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবার জন্য তাকে শেখাতে হবে :
১. ইসলামের ইতিহাস*, [* পাকিস্তানকে theocratic রাষ্ট্র করার কথা উঠছে না। আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস, ধর্মের নামে যে রাজনৈতিক ধাপ্পা, অর্থনৈতিক শোষণ চলে তার শেষ কোনোদিনই হবে না, যতদিন না দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় ধর্মালোচনায় প্রবৃত্ত হন। ভারতীয় ইউনিয়ন সম্বেন্ধেও এই নীতি প্রযোজ্য।] এবং বিশেষ করে শেখাতে হবে এই তথ্যটা যে সে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করা অসম্ভব। আব্বাসী ওম্মাই যুগের ভেতর দিয়ে মুসলিম সংস্কৃতি যে-রূপ নিয়েছে সে-রূপ পূর্ব পাকিস্তানে আবার নেবে না। অথচ ইসলামের গণতন্ত্রের খুঁটি এবং ধনবণ্টনে সমতার নোঙ্গর জোর পাকড়ে ধরে থাকতে হবে।
২. শত শত বৎসরের জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা করে ইয়োরোপ যে শক্তি সঞ্চয় করতে, মিশর দমস্ক আজ তাই শিখতে ব্যস্ত। প্রাচীন ঐতিহ্য যেরকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করে গ্রহণ করা যায় না, ইয়োরোপীয় কর্ম এবং চিন্তাপদ্ধতি ঠিক সেই রকম বিনা বিচারে গ্রহণ করা চলবে না।
৩. ইসলাম আরবের বাইরে যেখানেই গিয়েছে সেখানেই তথাকার দেশজ জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলাকে গ্রহণ করে নূতন সভ্যতা-সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। ইরানের সুফীতত্ত্বের যশ কোন দেশে পৌঁছায় নি? তাজমহল এই করেই নির্মিত হয়েছে, উর্দুভাষা এই পদ্ধতিতেই গড়ে উঠল, খেয়াল গান এই করেই গাওয়া হল, মোগল ছবি এই করেই পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ভারতীয় ঐতিহ্য নগণ্য নয়, অবহেলনীয় নয়। পূর্ববঙ্গের বহু হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্বনামধন্য হয়েছেন, তাঁদের বংশধরগণ যেদিন নবীন রাষ্ট্রে আসন গ্রহণ করে সভ্যতাকৃষ্টি আন্দোলনে যোগ দেবেন সেদিনই উভয় সম্প্রদায়ের অর্থহীন তিক্ততার অবসান হবে। (এস্থলে অবান্তর হলেও বলি ঠিক, তেমনি ভারতীয় ইউনিয়নের মুসলমানদের অবহেলা করেও সে রাষ্ট্র পরিপূর্ণতায় পৌঁছতে পারবে না।) একথা কিছুতেই ভুললে চলবে না যে মামুন, হারুনের সময় যখন আরবেরা ‘জ্ঞান-গরিমায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ঠিক তখনই তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ‘চরক’ ‘সুশ্রুত’ ‘পঞ্চতন্ত্র’ আরবীতে অনুবাদ করেছিল, গজনীর মাহমুদের আমলে ঐতিহাসিক আল-বীরুনী কী বিপুল পরিশ্রম করে সংস্কৃত শিখে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে প্রামাণিক গ্রন্থ লিখেছিলেন। Continue reading →