কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২।।
…
এই পোস্ট’টা পড়া আগে আগের দুইটা কিস্তি পইড়া নিলে ভালো। কারণ এইটা একটা লেখারই কন্টিনিউয়াস পার্ট। আর পড়ার সময় লেখার কনটেক্সট’টা মাথায় রাখতে পারলে বেটার। সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৪৭ সালে ভাষণ দেয়ার পরে ১৯৫৬ সালে বই হিসাবে ছাপাইছিলেন, লেখাটা। বাংলা-ভাষা নানান সময়ে নানান তর্কের ভিতর দিয়া গেছে। এইটা এইরকম একটা মোমেন্টের কথা। অই সময়টা আমরা পার হয়া আসছি। কিন্তু পার হয়া আসছি বইলাই অই আলাপ-আলোচনাগুলারে ভুইলা যাওয়াটা ঠিক হবে না। বরং এখনকার যেই বাংলা-ভাষা সেইটার বেইজ এইরকমের আলাপগুলাই। যেইগুলা আমরা আসলে আমলে নিতে পারি নাই, বা নতুন কইরা রিলিভেন্ট কইরা তুলতে পারি নাই। এই কারণে এই ধরণের লেখাগুলা রিভিউ করার দরকার আছে। আবারো ছাপাইতেছি আমরা।
ই. হা.
…
এ দেশে যে ইসলামি শিক্ষা কখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে নি তার প্রধান কারণ বাংলার মাধ্যমিকে কখনো শাস্ত্রচর্চা করা হয় নি। যে বস্তু মাতৃভাষায় অতি সহজ, অত্যন্ত সরল, বিদেশী ভাষায় সেই বস্তুই অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন আরম্ভ হয় স্কুল থেকে পালানোর পালা এবং মধ্যবিত্ত ও ধনীর গৃহের চাপের ফলেই এই দুই শ্রেণীর ছেলে তখনো লেখাপড়া শেষে, কিন্তু অনুন্নত গরীব তখন ভাবে যে পরিবারে যখন কেউ কখনো লেখাপড়া শেখে নি তখন এ ছেলেই বা পারবে কেন, বাপ-দাদার মত এরো মাথায় গোবর ঠাসা।
মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য মাধ্যমিকে শিক্ষা দিলে যে দেশের কতদূর ক্ষতি হয় তার সামান্যতম জ্ঞান এখনো আমাদের হয় নি। সে শিক্ষাবিস্তারে যে তখন শুধু অজস্র অর্থব্যয় হয় তা নয়, সে শিক্ষা ছাত্রের বুদ্ধিবৃত্তিকে অবশ করে তোলে, কল্পনাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয় এবং সর্বপ্রকার সৃজনী-শক্তিকে কণ্ঠরোধ করে শিক্ষার আঁতুড় ঘরেই গোরস্থান বানিয়ে দেয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—আমার অভিজ্ঞতা কলেজের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষকরূপে অর্জিত—যে পশ্চিমভারতের কার্ভে স্ত্রী-মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা যদিও দু’এক দিক দিয়ে বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের চেয়ে পশ্চাৎপদ তবু স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যেমন তাদের বেশী তেমনি প্রকাশ ক্ষমতা, আত্মপরিচয় দানের নৈপুণ্য তাদের অনেক বেশী। তার একমাত্র কারণ কার্ভে স্ত্রী-মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা আপন আপন মাতৃভাষার মাধ্যমিকে লেখাপড়া করে আর বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা লেখাপড়া শেখে ইংরেজীর মাধ্যমিকে। কার্ভের মেয়েরা সেই কারণে আপন মাতৃভাষায় নিঃসঙ্কোচে অবাধ-গতিতে আপন বক্তব্য বলতে পারে, বোম্বাই, কলিকাতা, ঢাকার ছেলেরা না পারে বাংলা লিখতে, না জানে ইংরেজী পড়তে।
এ-কাহিনীর শেষ নেই কিন্তু আমাকে প্রবন্ধ শেষ করতে হবে। তাই পাঠককে সবিনয় অনুরোধ করি তিনি যেন শিক্ষা বিভাগের কোনো পদস্থ ব্যক্তিকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন। শ্রীহট্টের খ্যাতনামা আলিম মৌলানা সখাওতুল আম্বিয়া প্রমুখ গুণীগণ আমার সম্মুখে বহুবার স্বীকার করেছেন যে মাদ্রাসাতে যদি বাংলা ভাষা সর্বপ্রকার বিষয় শিক্ষার মাধ্যমিক হত তবে আমাদের আরবী-ফার্সীর চর্চা এতদূর পশ্চাৎপদ হত না। এবং কৌতুকের বিষয় এই যে, উর্দুওয়ালারা বাংলাকে এত ইনকার-নফরৎ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন তাঁদেরও অনেকেই কঠিন বিষয়বস্তু যখন উর্দুতে বোঝাতে গিয়ে হিম্সিম্ খেয়ে যান তখন নোয়াখালী, সিলেটের গ্রাম্য উপভাষারই শরণাপন্ন হন।
এত সরল জিনিস উর্দুওয়ালাদের কি করে বোঝাই? কি করে বোঝাই যে পারস্যের লোক যখন ফার্সীর মাধ্যমিকে আরবী (এবং অন্যান্য তাবৎ বিষয়) শিখবে। উর্দুর মাধ্যমিকে কোন আজগুবী কাণ্ডজ্ঞানহীনতার তাড়নায়?
এ প্রসঙ্গের উপসংহারে শেষ কথা নিবেদন করি, মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যমিক না করলে সে ভাষা কখনো সমৃদ্ধিশালী হবার সুযোগ পায় না।
স্বরাজ এলো পাকিস্তান হ’ল কিন্তু হায়, গোস্বামী খাসলৎ (মনোবৃত্তি ও আচার ব্যবহার) যাবার কোনো লক্ষণ তো দেখতে পাচ্ছিনে। এতদিন করমপুর ইংরেজীর গোলামী, এখন স্বেচ্ছায় বরণ করে নিচ্ছি উর্দুর গোলামী। খতম আল্লাহু আলা কুপুবিহিম ইত্যাদি। খুদাতালা তাদের বুকের উপর সীল এঁটে দিয়েছেন। (কুরান থেকে এ অংশটুকু এখানে উদ্ধৃত করার কোনো প্রয়োজন হ’ত না, যদি কোনো কোনো ‘মৌলানা’ বাংলা ভাষার সমর্থকদের ‘কাফির’ হয়ে যাওয়ার ফতোয়া না দিতেন)।
এইবার দেখা যাক্, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সরকারী ও সংস্কৃতিক ভাষারূপে গ্রহণ করতে উর্দুওয়ালাদের আপত্তিটা কি? তাঁদের প্রধান আপত্তি, বাংলা ‘হেঁদুয়ানী’ ভাষা। বাংলা ভাষায় আছে হিন্দু ঐতিহ্য, হিন্দু কৃষ্টির রূপ। পূর্ব পাকিস্তানী যদি সে ভাষা তার রাষ্ট্র ও কৃষ্টির জন্য গ্রহণ করে তবে সে হিন্দুভাবাপন্ন হয়ে যাবে।
উত্তরে নিবেদন, বাংলা ভাষা হিন্দু ঐতিহ্য ধারণ করে সত্য, কিন্তু এইটেই শেষ কথা নয়। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
বুদ্ধদেব যে রকম একদিন বৈদিক ধর্ম ও তার বাহন সংস্কৃতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তৎকালীন দেশজ ভাষায় (পরে পালি নামে পরিচিত) আপন ধর্ম প্রচার করেন, ঠিক সেই রকম বাংলা ভাষার লিখিত রূপ আরম্ভ হয় বৌদ্ধ চর্যাপদ দিয়ে। পরবর্তী যুগে বাংলা সাহিত্য রূপ নেয় বৈষ্ণব পদাবলীর ভিতর দিয়ে। আজ পদাবলী সাহিত্যকে হিন্দু ধর্মের অংশ হিসাবে গণ্য করা হয় কিন্তু যে যুগে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারিত সে যুগে তাকে বিদ্রোহের অস্ত্রধারণ করেই বেরুতে হয়েছিল। তাই শ্রীচৈতন্য প্রচলিত ধর্ম সংস্কৃতে লেখা হয় নি, লেখা হয়েছিল বাংলায়। সঙ্গে সঙ্গে রামায়ণ মহাভারতের যে অনুবাদ বাংলায় প্রকাশিত হয় তার পেছনে ছিলেন মুসলমান নবাবগোষ্ঠী। কেচ্ছা-সাহিত্যের সম্মান আমরা দি–হিন্দুরা দেন না— এবং সে সাহিত্য হিন্দু ঐতিহ্যের গড়া নয়। এর পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে বাংলা গদ্যের পত্তন হয় তার অনুপ্রেরণা খৃষ্টান সভ্যতা থেকে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ নিজেকে হিন্দু বলে স্বীকার করেন কি না, সে কথা অবান্তর—তাঁর অবদান যে উপনিষদ-সংস্কৃতি ও ইয়োরোপীয় প্রভাবের ফলে গঠিত সে কথা অনস্বীকার্য শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রচলিত নূতন ধারাকে বৈদিক কিংবা সনাতন বলা ভুল, সে ধারা গণ উপাসনার উৎস থেকে প্রবাহিত হয়েছে এবং সে উৎসকে গোঁড়া হিন্দুরা কখনো শ্রদ্ধার চক্ষে দেখেন নি। স্বামী বিবেকানন্দের ‘জাতীয়তাবাদে’র মূল বেদ উপনিষদ নয়।
উর্দুওয়ালারা বলবেন, ‘এসব খাঁটি হিন্দু না হতে পারে, কিন্তু আর যাই হোক না কেন, ইসলামি নয়।
আমরা বলি, ‘ইসলামি নয় সত্য কিন্তু এর ভেতরে যে ইন্কিলাব্ মনোবৃত্তি আছে সেটি যেন চোখের আড়ালে না যায়। এই বিদ্রোহ ভাব বাংলায় ছিল বলে কাজী নজরুল ইসলাম একদিন আপন ‘বিদ্রোহী’ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের তথাকথিত ‘মরমিয়াপনার’ বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পেরেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে যে নবীন কৃষ্টি গঠিত হবে সেটা এই বিদ্রোহ দিয়েই আপন বিজয়-অভিযান আরম্ভ করবে।
এস্থলে সম্পূর্ণ অবান্তর নয় বলে আরেকটি কথা বলি: উত্তর ভারতের তাবৎ সংস্কৃত ভাবাপন্ন ভাষার মধ্যে (হিন্দী, মারাঠী, গুজরাতী ইত্যাদি) বাংলাই সবচেয়ে অসংস্কৃত। হিন্দী, মারাঠী পড়বার বা বলবার সময় সংস্কৃত শব্দ খাঁটি সংস্কৃত উচ্চারণে পড়া এবং বলা হয়—‘পরীক্ষা’ পড়া হয়—‘পরীক্ষা’, ‘আত্মা’ পড়া হয় ‘আত্মা’—কিন্তু বাংলায় সংস্কৃত শব্দ, এমনকি সংস্কৃত ভাষা উচ্চারণ করার সময়ও, উচ্চারণ করা হয় বাংলা পদ্ধতিতে। এ বিষয়ে বাঙালী হিন্দু পর্যন্ত উর্দুভাষী মুসলমানের চেয়ে এককাঠি বাড়া। উর্দুভাষী মুসলমান তার ভাষার সংস্কৃত শব্দ উচ্চারণ করে খাঁটি সংস্কৃত কায়দায়, বাঙালী হিন্দু উচ্চারণ করে ‘অনার্য’ কায়দায়।
না হয় স্বীকার করেই নিলুম, বাংলা ‘হেঁদুয়ানী’ ভাষা কিন্তু প্রশ্ন, এই ভাষা এতদিন ধরে ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান কি ‘নাপাক’, ‘হিন্দু’ হয়ে গিয়েছে? পাকিস্তান স্বপ্ন সফল করাতে কি পূর্ব পাকিস্তানের ‘না-পাক’ মুসলমানদের কোনো কৃতিত্ব নেই? পাকিস্তান-স্বপ্ন কি সফল হল লাহোর, লক্ষ্ণৌর কৃপায়? পূর্ব পাকিস্তানে যারা লড়ল তারা কি সবাই উর্দুর পাবন্দ আলিম-ফাজিল, মৌলানা-মৌলবীর দল? না তো। লড়ল তো তারা যারা উর্দু জানে না, এবং বাংলার জন্য আজ যারা পুনরায় লড়তে তৈরী আছে। এই সব লড়নেওয়ালারা এত দিনকার ইংরেজ আধিপত্য এবং হিন্দু প্রভাবের ফলেও যখন হিন্দুভাবাপন্ন হয়ে যায় নি, তখন পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করলেই তারা রাতারাতি ইসলামি জোশ হারিয়ে পাকিস্তানের শত্রু বনে যাবে? এ তো বড় তাজ্জব কথা? বাংলা ভাষার এত তাগদ? Continue reading →