Main menu

অবিচুয়ারি: মাহমুদুল হক

হক স্যার বলেই আমরা তাঁকে চিনতাম। মাহমুদুল হক। চারুকলা অনুষদের প্রিন্ট মেকিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, ছিলেন চারুকলা ইন্সটিউটের চেয়ারম্যান, জাতীয় জাদুঘরের ডিরেক্টর পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

জাদুঘরের দায়িত্ব পালনের সময় উনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, যাদুঘরের কোল ঘেঁসে শাহবাগ মোড়ে আজিজের দিকে যাইতে ফুটপাতে জনতা মুতে একদম নর্দমা বানিয়ে রাখত, পাবলিক টয়লেট ছিল যেন ওটা। হাটা যাইত না ঐ দিক দিয়া। বিকট গন্ধ। উনি সেখানে পরিস্কার করেছিলেন, মুতা বন্ধ করছিলেন।

উনাকে প্রথম আলাদা করে চিনি ৯২ সালে, উনার লগে কথা বার্তা বা উনার কাছ থেকে শিক্ষা নেবার আগেই।

২টা সোর্স থেকে তাঁর সন্মন্ধে নেগেটিভ আলাপ আমারে শুনতে হইছে।

এই ২ সোর্সের কোনটা আগে কোনটা পরে তা এখন মনে করতে পারতেছি না, তবে খুব কাছা কাছি সময়ে।

একটা সোর্স আমার সহপাঠি, তার পরিবরের অনেকেই চারুকলাতে বিভিন্ন সময়ে ছিল, তো সেই সহপাঠি জানাইত উনি ভালো লোক না, বিএনপি করে। উনাদের পরিবারের একজনের সাথে শত্রুতা আছে।

আরেক সোর্স, বিক্ষাত এক ব্যাক্তি, তার লগে দেখা হইল মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে, আমার আব্বা তখন ঢাকায় আসছেন মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে তার তোলা ২৫০টা ছবি দিতে , তো উনি আমারে সাথে নিয়ে গেলেন যে তাদের সাথে মিটিং আছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের ট্রাস্টিদের সাথে মিটিং। সেগুন বাগিচায় গেলাম আব্বার সাথে। মিটিঙের শুরুতেই আব্বা আমারে পরিচয় করাই দিলেন যে আমি চারুকলাতে ভর্তি হইছি এইবার। এই শুনে ট্রাস্টিদের একজন কইলেন ওখানে আমার এক বন্ধু আছে, চিন? মাহামুদুল হক? আমি কইলাম নাম শুনেছি উনার, আমাদের ক্লাস নেয় না। তো এরপর উনি হাস্তে হাস্তে কইলেন উনি একটু বোকা মত আছেন, বন্ধু কিন্তু আমরা অত পছন্দ করি না।

এই কথা শুনে আমি নিজেই বিব্রত হইলাম। বন্ধু কইতেছে আবার কইতেছে পছন্দ করে না। এইটা তো তাইলে যে কইতেছে তারই সমস্যা। কিন্তু এই কথা আমিও মনে তেমন জোর দিয়ে আনতে পারলাম না সেই নাদান অবস্থায় কেননা যে কইতেছে সে তো মহান ব্যক্তি, বিরাট মানুষ। যা হোক বিরাট মানুষদের থেকে আমি দূরেই থাকা পছন্দ করি বলে এই নিয়া ভাব্লাম না আর সেই সময়ে।
Continue reading

বাছবিচার এডিটোরিয়াল আলাপ (২) : ইব্রাকর ঝিল্লী – জ্যাক দেরিদা ও আর্কাভাইজেশন

এইটা সেকেন্ড আলাপ আমাদের। জানুয়ারি ২ – ৩, ২০২২-তে করা হইছিল। এইটারও কিছু অংশ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট কইরা নিচে রাখা হইলো। পুরা আলাপ শুনতে ভিডিও লিংকে ক্লিক করেন। শোনার জন্য হেডফোন ইউজ করলে বেটার।

ইব্রাকর ঝিল্লী:

গ্রামে এই কথা শুনবেন, এখনও, যে আমাদের মুরুব্বিরা কইত যে অমুক ধরনের লোকজনরে বিশ্বাস করতে নাই বা, রোগে শোকে এইটা কইরো বা, ঝড়বইন্যায় সেইটা কইরো বা, পোলা কেমন হইলে ভালো, মাইয়া কেমন হইলে খারাপ- মানে মুরুব্বিদের, বাপ দাদাদের উইজডম শেয়ার করতে দেখবেন। এইটা এখন কিছু কইমা আসছে বা, অনেকটাই ইনফরমাল হইয়া আসছে। আমাদের দাদা-দাদিদের মুখে এইটা আরও বেশি শুনা যাইত। এবং এগুলি মোটামুটি রুরাল এরিয়াতে প্রত্যেকের ভিতরেই ইকুয়ালি ছড়ায়ে যাইতে পারত। মানে রাফলি বলা যাইতে পারে প্রত্যেকেই ইকুয়ালি এডুকেটেড ছিল এতদবিষয়ে। আমরা যেমন শুনি, গেরামের লোকজন আনএডুকেটেড মূর্খ ছিল, এইটা আসলে আমরা মনে হয় ওই ইকুয়াল এডুকেশনরে ঘা দেয়ার চেষ্টা করি। এবং এইটা আমরা করি একটা মডার্নিস্ট পার্সপেক্টিভ হইতে। এইরকম একটা ভাইব আমাদের মইধ্যে আছে যেন আমরা একটা বিরাট জ্ঞান বা এডুকেশন। মানে আমাদের কালেক্টিভের জ্ঞানই আমাদের জ্ঞান। মানে জ্ঞান ছড়ানোর চেয়ে জ্ঞান জমা হওয়ার ব্যাপারটা জ্ঞানের ব্যাপার হইয়া দাড়াইছে। একাডেমিয়াতে, সোমাজে, রাষ্ট্রে যত বেশি জ্ঞান জমা হইতেছে, ততই যেন আপনে বা আমি জ্ঞানী হইতেছি। মডার্নিটির যে ইডিওলজিকাল ছক তার ভেতরে এই মেসেজ ইনগ্রেইনড থাকে।

তো দেরিদা কইতেছিলেন আর্কাইভাইজেশন নিয়া যে, ভুইলা যাওয়ার আরম্ভও হয় ওইখান থেকে। কীভাবে ভুইলা যাওয়ার আরম্ভ হয় আর্কাইভাইজেশন হইতে? এই কোশ্চেনটা আমার মনে হয় মডার্নিটির মেইক আপরে কোশ্চেন করতেছে। রেকর্ড কিপিং… মানে এক অর্থে একটা ওরাল ট্রেডিশন, যেইটা পুরাটাই টিকা থাকে জ্ঞান ছড়ায়ে দেয়ার মাধ্যমে জ্ঞানরে টিকায়ে রাখার ভিতর দিয়া, সেইটারে অচল বানায়া ফেলে। জ্ঞান যেহেতু তখন রেকর্ডের ভেতরেই টিকা থাকতে পারতেছে, তখন আসলে অতটা না ছড়াইলেও চলে। মডার্ন দুনিয়া মানে পুঞ্জিভূত জ্ঞানের দুনিয়া। এখন এইটা ভালো না খারাপ সেইটা বোঝার চেয়েও জরুরি মনে হয় এই এওয়ারনেসটা থাকা মডার্ন দুনিয়ার জ্ঞানের ব্যাপারে। মানে এইটা হয়ত এখন পসিবলই না, সকল জ্ঞানরে সমানভাবে সকলের কাছে পৌছায়ে দেয়া। কিন্তু প্রশ্ন সেইটা না, প্রশ্ন হইল মডার্নিটির মেইক আপটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকলে মডার্নিটিরে ভুল বুঝবেন আপনে, কিছু ক্রাইসিস তখন ইনেভিটেবল। আমি মাঝে মাঝেই খেয়াল করি, ফেসবুক টেসবুকে পাবলিকরে কোশ্চেন করা হয়, ইজি ইজি, পাবলিক সেগুলি পারে না, তখন সেইটা খুব হাস্যকর লাগে। বিলাতেও এগুলি দেখা যায়, এমেরিকার লোকজনরেই জিগান হইতেছে এমেরিকার মাদার টাং কী? হেরা কইতেছে এমেরিকান। ইজি জিওগ্রাফির প্রশ্ন জিগানো হইল, পারবেনা। ওয়েস্টে এইটা মোটামুটি প্লেফুলি নেয়। সংকটটা খেয়াল করবেন আমগো মত দেশে, যেইখানে ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল বাংলাদেশ, মডার্নিটি এগুলি প্রোপাগাণ্ডার টুলস হিসাবে ইdউজ হয়। জুলুমের প্রিটেক্সট। বাংলায় খেয়াল করবেন, ‘অত্যাধুনিক’ বইলাও একটা চালু শব্দ আছে। বাংলাদেশে এই রকম কয়েক বছর আগে রেন্ডম পিপলরে জিগানো হইতে বাংলা বার মাসের নাম, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ’র নাম, জাতীয় সংগীত, বাংলা বর্ণমালা এইসব। এগুলি আবার এই দেশের নিউজের কন্টেন্ট হইত যে দেখেন এইসব প্রশ্নের উত্তরও এরা পারেনা! আফসোস! মানে মডার্ন রাষ্ট্রে যে জ্ঞানের পাহাড়, আধুনিক রাষ্ট্র মানেই তো জ্ঞানের শাসন তাতে রাষ্ট্র সম্পর্কিত যে বেসিক জ্ঞান, যেই জ্ঞান দিয়া আপনের মগজ ওয়াশ কইরা রাষ্ট্র গিলানো হবে আপনাকে পরতিনিয়ত, তাই লোকে পারতেছে না! এইটা তো মানা কষ্ট! এই নিয়া দেখতেন যে খুব ক্ষেপ আক্ষেপ চলতেছে।

Continue reading

কেমনে উতরাই তালুকদারি ছিস্টেম

রাশ্টো মেরামতের একটা শমিতি আছে দেশে, মাঝে মাঝেই ফেছবুকে তাগো পোস্টে দেখি। তারা হুলাহুলি (মুভমেন্টকে বাংলায় হুলাহুলি কইতে চাই আমি) করতেছেন। এনারা বাদেও বহু লোক চিনি আমি বা পোস্ট দেখি অনেকের জারা ইংরাজের কলোনিয়াল (তালুকদারি কইতে চাই এইটারে) আইনকানুন বদলাবার তোড়জোর করেন পেরায়ই, মানে একটা আলাপ মাঝে মাঝেই ভাইশা ওঠে, এবং ওনারা মন থিকাই এইটা চান বইলা ভাবি আমি।

কিন্তু এনাদের আলাপে জেইটা পাই না আমি শেইটা হইলো, তালুকদারি আইন কইতে কি বুঝাইতেছেন ওনারা এবং বদলাইয়া কোনখানে জাইতে চান! মনে আশা আমার, ওনারা একদিন বদলি আইনের মুছাবিদা বানাইয়া হাজির করবেন জনতার দরবারে, কেমন ছিস্টেম বানাইতে চাইতেছেন তার নকশা পেশ করবেন! এইখানে কিছু ইশারা দিতে চাইতেছি আমি, এমনকি ভুলভাল হইতেও, বেশ পাতলা হইলেও ওনারা এই ব্যাপারে আরো জমাট আলাপ করবেন, শেই উশকানি ধরা জাইতে পারে আর কি!

শুরুতেই একটা তালুকদারি ছিস্টেমের মর্মটা বোঝা দরকার আমাদের; বাংলাদেশ জে একটা তালুকদারি ছিস্টেমে চলে, কোন কোন আলামত দিয়া শেইটা বুঝি আমরা? কেমনে বুঝাবো আমরা?

তালুকদারি ছিস্টেমের মর্ম হইলো, এইটা দেশের জনতারে নিজের দুশমন হিশাবে দেখে এবং তাই হরদম জনতারে কনটোলের ফিকির করতে থাকে। ব্যাপারটা কিলিয়ার করতে আরেকটা ছিস্টেমের লগে একটা তুলনা করতে চাই, শেই ছিস্টেমটা আমেরিকার।

কয়দিন আগে বাংলাদেশের র‍্যাব/আর্মির কয়েকজনের উপর আমেরিকার একটা ব্যানের খবরে পক্ষ-বিপক্ষের মনে তুফান উঠছিলো, এবং এখনো তার রেশ চলতেছে; বাকশালি রেজিমের গার্জেন আতেল-বয়াতিরা এখনো লেইখা জাইতেছেন জে, আমেরিকায় পুলিশের হাতে আরো বেশি খুন হয় এবং তার মানে হইলো, আমেরিকায় মানুশের হক আরো বেশি খারাপ দশায় আছে!

তো, এনারা তর্কটা করতেছেন নাম্বারের, এবং নাম্বার দেখাইয়া হিশাব মিলাইয়া ফেলতেছেন এবং এইভাবে দুইটা ছিস্টেমের তফাত গায়েব কইরা ফেলার মতলবে আছেন।

আমরা জদি ছিস্টেমে নজর দেই তাইলে দেখবো, বাংলাদেশে পুলিশ মানে একটা মাত্র বডি, তার শর্দার একজন, শেই শর্দার আবার পিএমের বহু কিছিমের লাঠিয়ালের একজন মাত্র। কিন্তু আমেরিকায় পুলিশ কইলে একটা বডি বুঝায় না, আমেরিকায় পুলিশ মানে কয়েক হাজার বডি এবং তার বসও হাজার হাজার এবং এই বসেরা আমেরিকার কন্সটিটুশন ছাড়া কারোই তাবেদার না!

বাস্তবে কন্সটিটুশনের তাবেদারি মানে আদালতের তাবেদারি, শেই আদালত আবার অনেকগুলা এবং তা পেছিডেনের হুকুমে চলে না, পেছিডেনের তেমন কোন এখতিয়ারই নাই পুলিশ বা আদালতে। বাংলাদেশে কাগজে আদালত একটা কন্সটিটুশনাল বডি হইলেও বাস্তবে বাজেট নামে আদালতের নাকে একটা লাগাম আছে জেইটা পিএমের হাতে, জজ বানায় শরকার, বাস্তবে আইন মিনিস্ট্রির পাওয়ার আদালতের উপরে; এতো উপরেও জাইতে হয় না, ছেরেফ ওয়াশা-ডেসা-টেলিকমুনিকেশন-শুয়ারেজ ম্যানেজমেন্ট দিয়াই আদালত ছাইজ করার ঘটনা দেখছি তো আমরা!

উল্টাদিকে, আমেরিকায় বাজেট পেছিডেনের হাতে না, ছিটি কর্পোরেশনের হাতে বাজেট করার এখতিয়ার আছে, ছিনেট আছে, কংগেরেস আছে; মেয়রের হাতে পুলিশ আছে, পোরতিটা এস্টেটের হাতে পুলিশ আছে, ফেডারাল পুলিশ আছে; কাউন্টি আছে, শেরিফ আছে। মেয়র আর শেরিফ আবার ডাইরেক ভোটে ইলেকটেড। এর কোনটাই কোনটার হাতে বান্ধা না! আমেরিকার কন্সটিটুশন আছে, পোরতিটা এস্টেটেরও কন্সটিটুশন আছে, ফেডারাল কন্সটিটুশন আবার এস্টেটের কন্সটিটুশনের এখতিয়ার মানতে বাদ্ধ। তেমনি আদালতও অনেকগুলা; এই হাজার হাজার বডি নিজেদের ভিতর হরদম টেনশনের ভিতর দিয়া আমেরিকার ছিস্টেমটা চালায়।

মোদ্দা কথা হইলো, বাংলাদেশে পাওয়ারে কোন টেনশন নাই, একটা ছেন্টার আছে, শকল রাস্তা জাইয়া শেই ছেন্টারে মেলে, শেই ছেন্টারে বইশা থাকেন আশল খেলোয়াড়, উনি খেলান আর শকল দপ্তর তার ইশারায় ময়দানে খেলতে থাকে। Continue reading

বিরাজনৈতিক শিল্পসাহিত্যর বিরুদ্ধে পুরুষতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলুন!

শিল্পসাহিত্য এবং রাজনৈতিকতা পৃথকীকরণের মত এক ভয়ংকর মুমূর্ষু পথে আমরা দৌড়াইতেছি কখনো স্বেচ্ছায় বা হেজিমনিক্যালিই। শিল্পকে তুমুল স্বতন্ত্রতায় রাখার স্বার্থে প্রায়শই বিরাজনীতি এবং পাওয়ার প্র্যাক্টিসিং কে খুব আদর করেই রাখা হয় শিল্পসাহিত্য মহলে। শিল্পের ‘স্বতন্ত্রতা’টা ব্যাপারটারে খুবই ঐশ্বরিক করে তোলবার চেষ্টাটাও দেখা যায় । শিল্প স্বাধীন ও স্বতন্ত্র- এ ব্যাপারে নানাবিধ মতামত চালু আছে, শিল্পের গুণগত স্বাধীনতার প্রতি কনসার্ন আমিও রাখি কিন্তু মানুষ, জীবন ও সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকতার মধ্য দিয়ে শিল্পের স্বতন্ত্রতা এইখানে কেবলই প্রচলিত ব্যবস্থার ধারক ও বাহকের অধিক কিছু হইতে পারে নাই। শিল্প ও সাহিত্য এইখানে যে ভূমিকায় আবির্ভূত হবার কথা ছিলো, অন্তত মধ্যবিত্তের প্রোডাক্ট হিসেবেও চিন্তা ও প্রাক্টিসে যে রেনেসাঁসের আহ্বান ও আবেদন তৈরি করবার দায় বহন করে, তা থেকে আমাদের সাহিত্যিকরা স্বাতন্ত্র্যবাদীতার অজুহাতে কেবলই দমন করে গেছে মানুষের চাওয়ার প্রতিফলন। আর বারবার এই প্রাক্টিস দাঁড়িয়েছে প্রচলিত সমাজের নিপীড়কদেরই পক্ষে। এ এক তুমুল আফসোসের ব্যাপার যে আমাদের কোন সাহিত্যিক হিরো নাই, যা আছে সবই বাজারের উৎকৃষ্ট খাসির রানের অধিক কিছু না। অথচ জন্মযুদ্ধের ভিতর দিয়া তৈরি এই ভূখন্ড ও তার শিল্পচর্চা গণমানুষের পক্ষে দাড়াবার যে ওয়াদা নিয়ে হাজির হয়েছিলো, তা আমাদের সাহিত্যিকরা গলা টিপে হত্যা করেছে।

শিল্প যখন এক্সিস্টিং সোসাইটির ভাঙনের ইশতেহার না হয়া, কেবলই মুখরোচক হয়ে ওঠার দিকে যাত্রা করে তখন আমাদের মাথায় আসে মুখরোচকতার চর্চা, আমাদের ভেতর পুশ করে কে বা কারা। কোথা থেকে আসে আমাদের বাজারের জনপ্রিয় অগা মগা ছগা শিল্পী লেখকরা। আর কেনইবা চিন্তার বীজ বা বিচি না গজানো কিশোরী ও কিশোরের দল তাদের অটোগ্রাফের মোহে লাইন দিয়া খাড়ায় থাকে। মূলত তারা খুঁজে পায় মাংস, চর্বি আর মশলার মিশ্রণে নারী ও নিপীড়ত মানুষেরে নিয়া ফ্যান্টাসি ও রম্য-রসিকতা। যা যায় বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় হইতে, তা মূলত বাজারের ইন্ধনেই তৈরি। আর এই বাজারি সাহিত্য আমাদের সেই ভয়ানক শত্রু পুঁজিবাদ, ভয়ংকর প্রাক্টিস ভোগবাদ, যেই দুইটার প্রধান সেনাপতি পুরুষতন্ত্রের রিপ্রেজেন্টেটর হিসেবে হাজির হয়। আর নারী হিসেবে আমি দাঁড়িয়েই, চোখ মেললেই দেখতে পাই আরও সহজে শিল্প বিষয়ক অরাজনৈতিক “স্বাধীনতা”তে সবচেয়ে বেশি লাভবান হইতে পারে একমাত্র পুরুষতন্ত্র।

কলোনিয়াল হ্যাংওভারে ভরা শৈল্পিক সত্ত্বাদের এই স্বতন্ত্রতার কচকচানির চর্চা এইখানে প্রাচীন। রবীন্দ্রনাথের একটা আঙুল বাড়িয়ে দেওয়া আছে তাদের মুষ্টিবদ্ধতায়। রবীন্দ্রনাথ, আমাদের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ বাঙালী নারীর যে চিত্র নির্মাণ করেছে, তা এক এস্থেটিক ভোগ্যপণ্যের অধিক কিছুই না। এইখানে নারীর শ্রমজীবী চেহারাকে খুন করে রবীন্দ্রনাথ হাজির করেছে ম্রিয়, ক্লেশ আর কেবলই পুরুষের দৃষ্টিনন্দিত এক প্রতিমা হিসেবে। আর আমার হৃদয় মার্সিয়া করে ওঠে। পূর্ববঙ্গের বৃহত্তম শহরের নারীরা এখানে যতবার গিয়েছে মুক্তির সন্ধানে চিন্তাশীল মানুষদের কাছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কেবলই এলিট পণ্য হিসেবে, মর্ডানিস্ট পণ্য হিসেবে হাজির হয়েছে। তারা চিন্তার সেই মহলের কাছে গেছে যারা নারী অধিকারের মোড়কে ক্ষমতার পদলেহন করছে। তারা এইখানকার নারী ও নিপীড়িত জনগনের মধ্যিকার মিলন ও সংগ্রামের প্রধান গণশত্রু হিসেবে অবস্থান করছে। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথত্তোর অন্যান্য মহারথীগণ শিল্পের ভেতর নারীর যে রুপবতী, দমে থাকা নির্মল চেহারা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এইখানে সেটা কেবলই পরম্পরার নষ্ট বীজের উদগিরণ ছাড়া কিছুই নির্মাণ করেনি বাঙলা সাহিত্যের পৃষ্ঠাজুড়ে। আর যতবার এই অভিযোগ তোলা হয়েছে, ততবার স্বাতন্ত্র্যতা স্বাতন্ত্র্যতা স্বাতন্ত্র্যতা করে গলা উঁচিয়ে নিজেদের অপরাধকে জাস্টিফাই করে গেছে। Continue reading

পাঠ্যপুস্তক: সহজ রচনা শিক্ষা – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

জীবনের শেষদিকে আইসা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুইটা পাঠ্যপুস্তক লেখছিলেন। একটা হইতেছে “সহজ ইংরেজি শিক্ষা”; যেইটা কোন কপি এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। আরেকটা হইতেছে “সহজ রচনা শিক্ষা”। অইটারও আদি-কপি নাই, উনি মারা যাওয়ার পরে কয়েকটা এডিশন ছাপা হইছিল। এর মধ্যে ১৮৯৮ সালে ছাপা হওয়া ফোর্থ এডিশন’টা বঙ্কিম রচনাবলী’তে পাওয়া যায়। অই লেখাটাই কিছু অংশ বাদ দিয়া [যেই উদাহারণগুলা খুববেশি রিলিভেন্ট না আর] এইখানে ছাপাইতেছি আমরা।

২.
উনার লেখা খুবই লজিক্যাল, এবং এখনো পড়লে বুঝতে পারার কথা। একটা সাবজেক্ট নিয়া লেখতে গেলে কেমনে লেখবেন সেইটা চাইরটা চ্যাপ্টারে বলছেন উনি। সবচে জরুরি ব্যাপার হইতেছে, কিছু জিনিসের যে কিছু নিয়ম আছে বা থাকাটা ভালো, আর কিছু জিনিস যে নিয়মের মধ্যে আনতে গেলে ঝামেলার – এই আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা উনার খুব ভালোভাবে ছিল। এইটা এখনকার দিনেও পাই না আমরা তেমন। 

আর উনার সব নিয়ম যে এখনকার দিনে ভ্যালিড – অইটা মাইনা নেয়ার মতো বাধ্য স্টুডেন্ট হওয়াটাও ঠিক হবে না, কিন্তু উনার সাজেশনগুলা ইন্টারেস্টিং একটা রিডিং হইতে পারে, এখনো। এই জায়গা থিকা লেখাটা শেয়ার করতেছি আমরা।  

এডিটর, বাছবিচার
… … …


উপক্রমণিকা

আমরা যাহা মনে করি, তাহা লােকের কাছে প্রকাশ করিতে হইলে, হয় মুখে মুখে বলি, নয় লিখিয়া প্রকাশ করি। মুখে মুখে বলিলে, লােকে তাহাকে কথােপকথন, বা অবস্থাবিশেষে বক্তৃতা বলে। লিখিয়া প্রকাশ করিতে হইলে, চিঠি, সংবাদপত্র, পুস্তক ইত্যাদিতে প্রকাশ করা যায়।

কিন্তু মুখেই বলি, আর লিখিয়াই বলি, বলিবার সময়ে কথাগুলি একট, সাজাইয়া লইতে হয়। সাজাইয়া না বলিলে, হয়ত তুমি যাহাকে বলিতেছ, সে তােমার সকল কথা বুঝিতে পারিবে না, নয়ত সে কথাগুলি গ্রাহ্য করবে না। এই সাজানকে রচনা বলে।

রচনা অতি সহজ। মুখে মুখে কহিবার সময়েও আমরা সাজাইয়া কথা কই, তাহা না করিলে কেহ আমাদের কথা বুঝিতে পারিত না। অতএব যে মুখে মুখে কথােপকথন করিতে পারে, লিখিতে জানিলে সেও অবশ্য লিখিত রচনা করিতে পারে। তবে সকল কাজই অভ্যাসাধীন। মৌখিক রচনায় সকলেরই অভ্যাস আছে। লিখিত রচনায় যাহাদের অভ্যাস নাই, তাহাদিগকে অভ্যাস করিতে হইবে। সেই অভ্যাস করাইবার জন্য এই পুস্তকের প্রথম অধ্যায় লিখিলাম।

আর মৌখিক রচনার সঙ্গে লিখিত রচনার একট, প্রভেদ এই আছে যে, লিখিত রচনার কতকগুলি নিয়ম আছে; সে নিয়মগুলি মৌখিক রচনায় বড় মানা যায় না, না মানিলেও বিশেষ ক্ষতি নাই, কিন্তু লিখিত রচনায় না মানিলেই নয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে সেই নিয়মগুলি বুঝাইব। তৃতীয় অধ্যায়ে রচনা শিখাইব।

প্রথম অধ্যায়: রচনা অভ্যাস

প্রথম পাঠ

রাম খাইতেছে। পাখী উড়িতেছে। হরি পীড়িত হইয়াছে। মানুষ মরিয়া যায়। এইগুলিকে এক একটি বাক্য, উক্তি, বা পদ বলা যায়।

“রাম খাইতেছে”—এই বাক্যে কাহার কথা বলা যাইতেছে? রামের কথা। অতএব রাম এই বাক্যের “বিষয়”।

“পাখী উড়িতেছে”-কাহার কথা বলিতেছি? পাখীর কথা। “হরি পীড়িত হইয়াছে— কাহার কথা বলিতেছি ? হরির কথা। “মানুষ মরিয়া যায়”-কাহার কথা বলিতেছি ? মানুষের কথা। পাখী, হরি, মানুষ ইহারা ঐ ঐ বাক্যের বিষয়।

“রাম খাইতেছে” এখানে রামের কথা বলিতেছি বটে, কিন্তু রামের কি কথা বলিতেছি ? সে “খাইতেছে”—তাহার খাবার কথা বলিতেছি। “খাইতেছে”“হইল বক্তব্য।

“পাখী উড়িতেছে।” “উড়িতেছে” বক্তব্য। “ঘদ, পীড়িত হইয়াছে।” পীড়া এখানে বক্তব্য। “মানুষ মরিয়া যায়। মরা এখানে বক্তব্য।

অতএব সকল বাক্যে, দুইটি বস্তু থাকে; একটি বিষয়” আর একটি বক্তব্য”।

এই দুইটিই না থাকিলে বাক্য বলা সম্পূর্ণ হয় না। শুধু, “গােরু,” বলিলে, তুমি বুঝিতে পারিবে না যে, আমার বলিবার কথা কি। কিন্তু “গােরু চরিতেছে” বলিলেই তুমি বুঝিতে পারিলে। বাক্য সম্পূর্ণ হইল। শুধ, “ভাসিতেছে” বলিলে তুমি বুঝিতে পার না যে, আমার বলিবার ইচ্ছা কি। তুমি জিজ্ঞাসা করিবে, কি ভাসিতেছে ? কিন্তু যদি বলি যে, “কুম্ভীর ভাসিতেছে” বা “নৌকা ভাসিতেছে” বাক্য সম্পূর্ণ হইল–তুমি বুঝিতে পারিলে।

Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →