আমরা আসলে যেখানেই যাইতে চাই, ঘোরের একটা এফেক্টের বাইরে যাইতে পারি না
জঁ বদ্রিয়াঁ (Jean Baudrillard,১৯২৯ – ২০০৭) ১৯৭৭ সালে “ফরগেট ফুকো” নামে একটা লেখা ‘ক্রিটিক’ পত্রিকাতে ছাপানোর লাইগা পাঠান, মিশেল ফুকো তখন ওই পত্রিকার এডিটিং প্যানেলে আছিলেন। সেই লেখা ক্রিটিক-এ ছাপা হয় নাই আর ফুকো লেখাটার কোন রেসপন্সও করেন নাই। পরে বদ্রিয়াঁ ছোট বই বানাইয়া লেখাটা ছাপান। ১৯৮৩ সালে ‘ফরেন এজেন্টস’ সিরিজের আন্ডারে সেমিওটেক্সট পাবলিকেশন এইটা ইংলিশে ট্রান্সলেট কইরা ছাপানোর প্ল্যান করে, কিন্তু ১৯৮৪-তে ফুকো মারা যাওয়ার কারণে একটু লেইট কইরা ১৯৮৭ সালে একটা বই ছাপানো হয়; ‘ফরগেট ফুকো/ফরগেট বদ্রিয়াঁ নামে। বইয়ের একদিক দিয়া বদ্রিয়াঁ’র লেখা আরেকদিক দিয়া কয়েকটা পার্টে বদ্রিয়াঁ’র একটা বড়সড় ইন্টারভিউ, ৫টা পার্টে। এই ইন্টারভিউ’টা অইগুলার একটা পার্ট। (আরেকটা পার্ট এইখানে পড়তে পারেন।)
ফরাসি ফিলোসফারদের মধ্যে উনারে নিয়া মাতামাতি’টা একটু কম, একাডেমিক জায়গাগুলাতেও। এর একটা কারণ মেবি উনার থিওরি’র পলিটিক্যাল আসপেক্টটারে আর্টিকুলেট করাটা ঝামেলার, আমাদের দেখাদেখির যেই নজর’টা আছে সেইটারেই বাতিল কইরা দিতে হয়, এই কারণে উনারে মিডিয়া-থিওরিস্ট হিসাবে পরিচয় করানোটা নিয়ম। কিন্তু আমি দেখি যে, উনার খুবই রেডিক্যাল একটা পলিটিক্যাল পজিশন আছে; (আমি যদ্দূর বুঝতে পারছি) উনি বলতেছেন যে, একটা ‘রিয়ালিটির’ জায়গা থিকা ঘটনাগুলারে দেখা যাবে না, দেখতে হবে একটা ‘সিডাকশনের’ বা ছল-চাতুরির জায়গা থিকা। এইটা ফুকোর ক্ষমতা-সম্পর্কের অল্টারনেটিভ কোন প্রপোজাল না, বরং অই গ্রাউন্ডটারেই বাতিল কইরা দেয়। যার ফলে, উনার চিন্তারে অনেক প্যারাডক্সিক্যাল লাগে। কারণ “কি আছে?” – এইটা উনার ফোকাস পয়েন্ট না, বরং “কিভাবে জিনিসগুলা চেইঞ্জ হইতেছে” তারে সেন্টার করতে বলেন। এই কারণে মনে হইতে পারে, বদ্রিয়াঁ যেন বলতেছেন, কিছু নাই, শূণ্যতাই আছে বা অন্য কোন রিয়ালিটি আছে, আর আমরা কিছু করতে পারি না, এই সেই… কিন্তু আমার কাছে উনার পজিশন এইরকম ‘নিহিলিস্ট’ কোন কিছু বইলা মনেহয় না। বরং আমি দেখি যে, উনার থিওরি’রে পলিটিক্যাল স্পেইসে কেমনে ডিল করবো আমরা, সেই আলাপ’টা করা হয় নাই।
বদ্রিয়াঁ’র বয়ান’টা এইরকম না যে, হিস্ট্রি বইলা কিছু নাই, বরং একটা সিস্টেম যখন এক্টিভ থাকে এইরকম ফুলফিলিং একটা জায়গাতে অপারেট করতে থাকে যে, যেন এর বাইরে আর কিছু নাই! আমার ফেভারিট এক্সাম্পল হইতেছে, আল-কেমি আর কেমেস্ট্রি; হিস্ট্রিক্যালি আল-কেমি থিকাই কেমেস্ট্রি আসছে, কিন্তু যখন কেমেস্ট্রির বেইজটা শুরু হইছে, আল-কেমির জায়গাগুলা পুরাপুরি ইনভ্যালিড হয়া গেছে। রেফারেন্স পয়েন্টগুলা এইভাবে একটা এবসুলেট এবং একটা সময় পরে গিয়া অবসুলেটও হয়া উঠে। এইরকম ক্ষমতা-সম্পর্কের জায়গাগুলা, রেফারেন্স পয়েন্টগুলা, দেখার, বুঝার ও জানার নজরগুলা যখন চেইঞ্জ হয়, আমাদের কাছে মনেহয় হঠাৎ-কইরা-ঘটা একটা ঘটনা, একটা গজব, আন-রিয়েল একটা এক্সপ্লোরেশন এবং এক্সপেক্ট করি যে, একটা ‘স্থিরতা’র জায়গাটাতে গিয়া সেটেল হবো আমরা, আবার। তো, পলিটিক্যালি এই ন্যারেটিভটা ঝামেলার। বদ্রিয়াঁ’র কথা যদি শুনেন, উনার কথা যদি মানেন, এইরকম জায়গা থিকা দেখলে হবে না, বস! দিস থিঙ্কস আর ডেড!
তো, বদ্রিয়াঁ’র এই ইন্টারভিউ’টা উনার চিন্তা-ভাবনার একটা ইন্ট্রো হিসাবে পড়তে পারেন। উনার চিন্তা এন্টারটেইনিং না হইলেও, ইন্টারেস্টিং।
ই. হা.
…………………………………….
সিলভা লট্রিঞ্জার: ‘শেষ’ থেকে শুরু করা যাক, কিংবা আরও ভাল করে বললে, ‘শেষগুলা’ থেকে। প্রোডাকশনের ইন্তেকাল, ইতিহাসের ইন্তেকাল, পলিটিকালের ইন্তেকাল। আপনার এনালাইসিস শুরু হয় এইরকম বহুকিছুর শেষ হয়ে যাওয়া, নাই হয়ে যাওয়া দিয়া। তাহলে কি আমাদের ওয়েস্টার্ন সিভিলাইজেশনকে মোমের জাদুঘরে উঠায়ে রাখার সময় আসছে? এখন কি সবকিছুই তাহলে বিক্রি হওয়ার জন্য?
জ্য বদ্রিয়া: আমি জানি না, এই প্রশ্নটা আসলে ‘শেষ’ হওয়ার প্রশ্ন কিনা। এই শব্দ এখন যেকোন কেসেই মিনিংলেস, কারণ আমরা কোনভাবেই শিওর না লিনিয়ারিটি বলে কিছু আছে কিনা। যদিও কথাটা অনেকখানি সায়েন্স ফিকশনের মতো শোনাবে, তাও আমি বরং ইলিয়াস কানেট্টির (Elias Canetti) দ্য হিউম্যান প্রভিন্স বইয়ের একটা কোটেশন দিয়া শুরু করি। খুব রিসেন্ট একটা বই। তিনি বলতেছেন- তার কাছে এমন একটা মুহূর্তের কথা কল্পনা করবার আইডিয়া খুব পেইনফুল লাগে, যেখান থেকে শুরু করা খুব সম্ভব, যেই মুহূর্তে হিউম্যান রেস, ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেল। এমনকি উধাও হওয়ার ফলে যে চেইঞ্জটা ঘটল, তার ব্যাপারে আমরা পুরাপুরি আনকনশাস, এবং আমরা হুট করে এক সময়ে রিয়ালিটি ছেড়ে যাত্রা শুরু করলাম। এখন যেইটা করতে হবে, কানেট্টি বলতেছেন, আমাদের সেই ক্রিটিকাল পয়েন্টটা খুঁজে বাইর করতে হবে, সময়ের সেই ব্লাইন্ড স্পটটা খুঁজতে হবে। তা না হলে, আমরা নিজেদের ধ্বংস করার এই জার্নিগুলোর ভিতরেই থাকব। আমার এই হাইপোথিসিসটা খুব পছন্দ হইছিল, কারণ কানেট্টি কোন ‘শেষ’ এর চিন্তা করতেছেন না, বরং আমি বলব তিনি এক ধরণের সর্বোচ্চ অর্থে ’নির্বাণ’ এর কথা চিন্তা করছেন। এমন একটা প্যাসেজে তিনি একই সময়ে একই সাথে আকার ও নিরাকার থাকার কথা ভাবছেন।
লট্রিঞ্জার: ইতিহাস এর ভিতরকার শূন্যতা টাইনা নিয়া চলে। কিন্তু কোথাও যেন এর স্পিরিট কেড়ে নেয়া হইছে।
বদ্রিয়া: ইতিহাসের আসলে ইন্তেকাল ঘটে নাই। ইতিহাস বরং সিমুলেশনের মধ্যে আছে। অনেকটা সবসময় কোমায় থাকা একটা দেহের মতন। এই কোমা থেকে বাইর হওয়া যায় না। এবং এই কোমার ভিতরে বডি আগের মতই ফাংশন করতেছে, সব ঠিক আছে, এবং মাঝে মাঝে তা ‘ইতিহাসের’ মতো সবকিছু জড়োও করতেছে। এবং তারপরেই খুব সন্দেহ জাগে, সবকিছু হয়তো আর রিয়েল (Real) না অথবা সত্য না। এবং তখন কিন্তু কোনোভাবে আমরা এই সত্যিটা ডিসাইড করবার মতো পজিশনে থাকব না।
লট্রিঞ্জার: আপনি যে ’শেষ’ নিয়া কথা বলতেছেন তা সম্ভবত সমস্ত ‘শেষ’-এর ‘শেষ’ হইয়া উঠবে। এবং সবকিছু মিলে কোন ‘শেষ’ এর রিসার্জেন্সের সম্ভাবনারে আরও নষ্ট করবে, শেষ কইরা দিবে।
বদ্রিয়া: দেখেন, গড ইজ ডেড কিংবা হিস্টোরি ইজ ডেড কথাতে কিন্তু কোন ‘ইন্তেকাল’ অর্থে শেষ বোঝায় না। আমি কোন হতাশ কিংবা পুরাপুরি ইউজলেস কিসিমের নবীর রোল প্লে করতে চাই না। এই ঘটনা কোন ট্র্যাজিক কিংবা ইমোশনালি চার্জড ঘটনা না যেইটার জন্যে আপনি শোক করতে পারবেন, ভাববেন এইটা এড়ানোর জন্য যদি কিছু করা যাইতো। যা ঘটছে- হঠাৎ করে রাস্তায় একটা কার্ভ তৈরি হইছে, একটা মোড় তৈরি হইছে। কোথাও রিয়েল দৃশ্যটা হারায়ে গেছে, সেই দৃশ্যটার জন্য হয়তো আপনার কাছে গেইমটা খেলার রুলসগুলা থাকত কিংবা কোন সলিড কিছু যার উপর সবাই নির্ভর করতে পারত। এখন আর সেইটা নাই।