বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ – অমর্ত্য সেন (পার্ট ১)
অনুবাদকের ভূমিকা
১.
নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র। আমার মতে, পিটার টামাস বাউয়ারের কাজকর্ম বাদ দিলে, তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশের জন্য সবচাইতে প্রাসঙ্গিক ও দরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা করছেন অমর্ত্য সেন। সেই গবেষণার বড় অংশ আছে বিখ্যাত বই পভার্টি এন্ড ফ্যামিন-এ, বইয়ের নবম অধ্যায় এইটা।
নবম অধ্যায় অর্থাৎ বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ আসলে একটা কেইস-স্টাডি। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের সাথে বন্যারে সম্পর্কিত বলা হয়। অফিশিয়াল হিসাবমতে মারা গেছেন ২৬০০০ মানুষ। বাস্তবে সংখ্যাটা ছিলো অনেকানেক বেশি। দুর্ভিক্ষের কারণ হিসাবে দায়ী করা হইছে এভেইলেবল খাদ্য ঘাটতিরে (ফ্যাড)। যদিও কম খাদ্য আমদানি ও গভমেন্টের অল্প খাদ্য মজুত রিলিফ ওয়ার্করে সীমিত করে দিছে, সেন দেখাইছেন, এই ফ্যাড এপ্রোচ আসলে তেমন কিছুই ব্যাখ্যা করে না। পেশাগত স্টেটাস আর নিঃস্বতার তীব্রতার বিশ্লেষণ দেখাইছে দুর্ভিক্ষের শিকার সবচাইতে বড় গ্রুপটা ছিলো লেবার। লেবারদের এক্সচেঞ্জ এন্টাইটেলমেন্ট বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হইছ। সেন এই সিদ্ধান্তে আসছেন যে দুর্ভিক্ষ ব্যাখ্যায় ও বোঝাবুঝিতে এক্সচেঞ্জ এন্টাইটেলমেন্ট এপ্রোচ আরও ভালো কাজ করে।
মোটাদাগে এই হইলো বিষয়বস্তু। কিন্তু অমর্ত্য বাবুর গবেষণার আসল মজা ও প্রজ্ঞার জায়গাটা চিকনদাগের ডিটেইলে ও আর্গুমেন্টে। বইয়ে খালি দুর্ভিক্ষের কারণ অনুসন্ধান ও সরকারি ব্যার্থতা না, বাংলার (এখনও) মোটাদাগের কৃষিভিত্তিক সমাজের অর্থনৈতিক ও পেশাভিত্তিক নানান গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচিত হইছে। সাধারণ ডেটা পাঠ কইরাও সমাজ সম্পর্কে কি দারুণ সব পর্যবেক্ষণ বাইর কইরা নিয়া আসা যায় তার প্রমাণ এই গবেষণা। যেমন: ধানমাড়াই পেশাটার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বভাবচরিত্রের ব্যাখ্যা ড. সেন যেভাবে করছেন, আমিও বেশ অবাক হইছি, অথচ আমি বড় হইছি গ্রামে (দ্যাখেন বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ অধ্যায়টা)। উদাহরণ দিয়া ভূমিকা বড় করবো না, অমর্ত্যবাবুর গবেষণা পাঠকরে পইড়া দেখতে বলবো।
সেনের গবেষণায় উঠে আসছে, দুর্ভিক্ষের কারণ খাদ্যাভাব না, আসলে রাষ্ট্রে ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতার অভাব। অমর্ত্য বাবুর একাডেমিক পরিভাষা ‘এন্টাইটেলমেন্ট’। অর্থাৎ খাদ্য কে পাবে আর কেন, কোন মাত্রায় পাবে সেইটা ঠিক কইরা দেওয়া রাজনীতির কারণে দুর্ভিক্ষ হইছিল। মোট সংখ্যা না, ব্যক্তির আলাদাভাবে ও মিনিমাম ভালো থাকা দেখা জরুরি। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কথাই ধরেন। সেপ্টেম্বর মাসে ৬০০০ লঙ্গরখানা খুলে ৪৩ লাখ মানুষরে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। ফলে দুর্ভিক্ষের শোচনীয় অবস্থাটা কিছুটা ‘ভালো’ হয়। অথচ সেপ্টেম্বরের আগে এইটা যে দুর্ভিক্ষ সেইটা ঘোষণাই করা হয় নাই! আরও আগে ঘোষণা দিয়া সরকার আগায়ে আসলে ক্ষয়ক্ষতি আরও কমানো যাইতো। আরও মজার ব্যাপার মোট খাদ্যের মাত্র ১.৩৬% ছিলো সরকারের মজুদে। এইটা দিয়াই কাজ চালাইছে। আসলে সরকার যদি মনে করতো খাদ্য সমস্যা সমাধান জরুরি, এইটা সমাধান কঠিন কোনো ব্যাপার ছিলো না।
‘জিডিপি বাড়ছে, আয় বাড়ছে, তার মানে মানুষ খুব ভালো আছে’ –এইসব সরকারি জিকির আমাদের দেশে নতুন না। অমর্ত্য সেন দেখাইছেন যে দুর্ভিক্ষের সময় আয় আরও বেশি বাড়ে। অমর্ত্য বাবু এইসব শুভঙ্করের ফাঁকি আমাদের নজরে আনেন। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ কইরা অমর্ত্যবাবু তাই প্রস্তাব দিছেন জিডিপির বিপরীতে ‘পার ক্যাপিটা ক্যালোরি ইনটেক’ এর জনশুমারি করতে। শহর আর গ্রামে প্রোটিন ইনটেক আর ক্যালরি ইনটেকের ব্যবধান বেশি যেন না হয়। ব্যবধান বেশি হওয়া দুর্ভিক্ষের একটা লক্ষণ। সমাজে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার ইত্যাদির হাজির না থাকাই যে দুর্ভিক্ষের কারণ এমন দাবি গবেষণায় আছে। অমর্ত্য সেন একটা কথা জোর দিয়া বলেন যে, মডার্ন যুগে দুর্ভিক্ষ খাদ্যাভাবে হয় না, হয় মানুষের অব্যবস্থাপনার জন্যে, রাষ্ট্র ঠিকমতো না চললে।
জানুয়ারি ২০২৩
হাজারিবাগ| ঢাকা-১২০১
…
দরকারি টার্মগুলি
ক. নি:স্বতা — ডেস্টিটিউট আর ডেস্টিটিউশন এর বাংলা এই বইয়ে যথাক্রমে নি:স্ব ও নি:স্বতা। আরও চলনসই, সহজ বাংলা পাই নাই বইলা ‘ডেস্টিটিউশন এর চাইতে অন্তত সহজ’ – বিবেচনায় নি:স্বতা রাখছি।
খ. ক্যারি-ওভার — পরিভাষা ডিকশোনারিতে অর্থ দেওয়া আছে অগ্রে আনয়ন /মেয়াদ বর্ধিতকরণ। এই অর্থ আসলে শব্দটা এইখানে বুঝায় নাই। গত বছর/বছরগুলার পরেও এখনও যে পরিমাণ রয়েছে গেছে সেই পরিমাণ খাদ্য (যেমন: চাউল ও গম) এইখানে ক্যারি-ওভার। Continue reading