Main menu

[বই থেকে] ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন – শাহেদ আলী

[পাকিসতান আমলে দুইটা ফ্রি-ফেয়ার ইলেকশন হইছিল, একটা ১৯৫৪ সালে, এবং আরেকটা ১৯৭০ সালে। ১৯৫৪ সালের ইলেকশনে খেলাফতে রাব্বানী পার্টি থিকা ইলেকশন করছিলেন গল্পকার শাহেদ আলী।

খেলাফতে রব্বানী পার্টির মেইন লিডার ছিলেন আবুল হাশিম (ব্রিটিশ আমলে যিনি মুসলিম লিগের সভাপতি ছিলেন, বাংলা-প্রদেশের)। মুসলিম লিগ থিকা বাইর হয়া আইসা এই দল বানাইছিলেন উনি, এবং উনি ছিলেন মুসলিম-লিগ বিরোধি যুক্তফ্রন্ট তৈরি করার একজন কারিগর, থিওরেটিকালি এবং পলিটিকালি; কিনতু শেষে তাদেরকেই যুক্তফ্রন্টে রাখা হয় নাই। ১০টা সিটে রব্বানী পার্টি ইলেকশন করছিল, শাহেদ আলী ছিলেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের কেনডিটেট।

উনার ইলেকশন করার কাহিনি উনার মুখেই শুনেন। উনার “জীবন কথা” বই থিকা নেয়া হইছে নিচের কথাগুলা।]

১৯৫৩ সাল। আমি তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করছি। একবার ছুটিতে ঢাকায় এসেছি। তখন নির্বাচনের খুব তোড়জোড় চলছে। আল্লামা আবুল হাশিম সারা পূর্ব পাকিস্তান ট্যুর করেন। সে-সময় মোমেনশাহীতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সমমনা বিরোধী দলগুলো যুক্তফ্রন্ট গঠনের ডাক দেয়। মুহূর্তে রাজনীতির অঙ্গনে এক প্রচণ্ড চাঞ্চল্যকর অবস্থা শুরু হয়ে গেল। আমি রব্বানী পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, যার প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন জনাব আবুল হাশিম। (রব্বানী পার্টি: খেলাফতে রব্বানী পার্টি, প্রতিষ্ঠাকাল: সেপ্টেম্বর ১৯৫৩।) তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি রংপুর যাবার সময় আমার একটা চিঠি নিয়ে যেয়ো। ওখানে আমার ঘনিষ্ঠ একজন নামকরা উকিল আছে। আবু হোসেন সরকার। আমাদের আন্দোলনের জন্য তাঁকে আমাদের একান্ত দরকার। তাঁকে বুঝিয়ে বলবে, উত্তরবঙ্গে তাঁকে ছাড়া আমাদের চলবে না। শেরেবাংলারও একই কথা।’

আমি রংপুর কারমাইকেল কলেজে ফিরে পরদিন সকালে জনাব আবু হোসেন সরকারের সঙ্গে দেখা করি। দীর্ঘদেহী জনাব আবু হোসেন সরকার। তাঁর গোলাকৃতি মস্ত বড়ো মাথায় ঘন কাঁচাপাকা চুল। দাড়ি-গোঁফ কামানো মজবুত স্বাস্থ্য।

সরকার সাহেব আমাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে নম্রকণ্ঠে বললেন, ‘আপনার পরিচয়? কোনো কেস আছে?’

আমি আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আমি কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক। আমি জনাব আবুল হাশিমের একটা চিঠি এবং শেরেবাংলার একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি।’ এ-কথা বলার পর আমি আবুল হাশিমের চিঠিখানা সরকার সাহেবের অনিচ্ছুক হাতে তুলে দিলাম। তিনি চিঠি হাতে নিয়ে বললেন, ‘আবুল হাশিম এবং শেরেবাংলাকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন, তাঁরা আমাকে স্মরণ করেছেন বলে। এককালে রাজনীতি করলেও আমি এখন আর রাজনীতি করি না। আমি দুঃখিত।’

আমি সরকার সাহেবের এই নিরুত্তাপ সংক্ষিপ্ত জবাবে হতাশ হয়ে পড়লাম। সরকার সাহেব বললেন, ‘আসুন, বসুন, চা খান। আপনি কেবল শিক্ষকতাই করেন, না রাজনীতিও করেন?’

বললাম, ‘এখন পর্যন্ত অধ্যাপনাতেই আছি। আর রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে পারি না। আমরা আপনাকে মুসলিম লীগ শাহির বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে সামনের সারিতে পেতে চাই।’ আমি ও সরকার সাহেব মুখোমুখি বসলাম। তিনি বললেন, ‘দেখুন, বয়স হয়েছে, জীবনে অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, জেলও কেটেছি। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। ওকালতি করে দুটো পয়সা আয় করি। আমাকে রোজ পঞ্চাশটি মুখে ভাত তুলে দিতে হয়। সুতরাং রাজনীতি করা আমার আর সাজে না।’

আমি বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম, ‘আপনার মুখে এ-কথা শুনব, আশা করিনি। আপনার পরিবারকে আপনি পঞ্চাশ জনের একটি পরিবার মনে কেন করছেন? দেশবাসী মনে করে পাঁচ কোটি মানুষ নিয়ে আপনার পরিবার। এই পাঁচ কোটি মানুষের মুখে আপনি ভাত তুলে দেবেন। আপনার কাছে এই তো দেশবাসীর ঢাবি।’

এবার সরকার সাহেবের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমাকে কিছু ভাবতে দিন। আমি কিছু দিনের মধ্যেই ঢাকা যাচ্ছি। তখন আমি শেরেবাংলা ও হাশিম সাহেবের সঙ্গে আলাপ করব।’ কিছু দিনের মধ্যেই যুক্তফ্রন্ট গড়ে উঠল। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলাম পার্টি মিলে। জনাব আবুল হাশিম সাহেব দাবি করলেন, কেবল সমমনা ইসলামবিশ্বাসী দলগুলো নিয়েই যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে। কিন্তু বামপন্থিরা দাবি করল তাদেরও যুক্তফ্রন্টে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত খেলাফতে রব্বানী পার্টিকে বাইরে রেখেই শেরেবাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট। খেলাফতে রব্বানী পার্টি দাবি করেছিল দশটি আসন, যেসব আসনে যুক্তফ্রন্ট নমিনি দেবে না। অন্যসব আসনে রব্বানী পার্টি যুক্তফ্রন্ট নমিনিদের পক্ষে কাজ করবে। সেই দাবিও গৃহীত হলো না। খেলাফতে রব্বানী পার্টি বাধ্য হয়ে দশটি আসনে তাদের নিজস্ব নমিনির নাম ঘোষণা করে।

আমি তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। আমার কাছে টেলিগ্রাম গেল। আমাকে আমার জেলা সিলেটের ১ নম্বর আসনে নমিনেশন পেপার সাবমিট করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ নিয়ে গঠিত ছিল এই বিশাল নির্বাচনী এলাকা। নমিনেশন পেপার সাবমিট করার সময় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এই সময়ে আমার ওপর এই নির্দেশ আমার কাছে বজ্রপাতের মতো মনে হলো। আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে ১৯৫১ সালে। এর পর থেকে আমি প্রথমে বগুড়া কলেজে ও পরে কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করেছি। আমার নির্বাচনী এলাকায় বলতে গেলে আমাকে কেউ চেনে না। আমিও সুনামগঞ্জের দু-একজন লোক ছাড়া আর কাউকে চিনি না। আমার নির্বাচনী এলাকায় তাদের কোনো পরিচিতিও নেই।

সুনামগঞ্জের একজন জাঁদরেল সাংবাদিক মকবুল হোসেন চৌধুরী, যিনি সাবেক আসামের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন এককালে, এখন পেয়েছেন যুক্তফ্রন্টের টিকিট। প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির সিটিং সদস্য জনাব আবদুল খালেক আহমেদ পেয়েছেন মুসলিম লীগের টিকিট। দুজনেই এলাকায় সুপরিচিত। এই এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা তাঁদের সমর্থক ও কর্মী। এই অবস্থায় আমি আমার নমিনেশন নিয়ে মহাসংকটে পড়লাম। এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা আমাকে চেনে না। কারণ আমার জীবন কেটেছে বাইরে-বাইরে। ১৯৪৭-এর নির্বাচনে এবং রেফারেন্ডামের সময়ে আমি এলাকায় কাজ করেছি। রেফারেন্ডামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, জিন্নাত আলী প্রমুখ আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু নির্বাচন এবং রেফারেন্ডামের পরে আমি এলাকা ছেড়ে চলে আসি। এলাকার কোনো লোকের সঙ্গেই আমার দৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচনে কে আমার পক্ষে কাজ করবে? কেন্দ্রেও আমার কোনো লোকজন নেই যে ওখানে গিয়ে তারা কাজ করবে। এলাকায় কেবল একজন লোক আছে, নাম হাফেজ আবদুর রহিম। তাকে কোথায় পাব? কী করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করব? আমার শ্বশুর সাহেব ঢাকায় থাকেন, আমার স্ত্রীও ঢাকায় থাকেন। আমি এ-ব্যাপারে তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারিনি।

অধ্যাপক গোলাম আযম ও কবি মোফাখখারুল ইসলাম কারমাইকেল কলেজে ছিলেন। আমি তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা সুনামগঞ্জ রওয়ানা হলাম। সোজা মানে-ট্রেনে রংপুর থেকে গাইবান্ধা হয়ে বাহাদুরাবাদ ফেরি পার হয়ে ময়মনসিংহ; ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে আখাউড়া, সেখান থেকে ট্রেনে সিলেট, সিলেট থেকে বাসে চড়ে সুনামগঞ্জ। এই পথ পাড়ি দিতে তখন বিরাট-বিরাট ফেরিঘাট ছিল অনেকগুলো। এভাবে কোনোমতে গিয়ে সুনামগঞ্জ গিয়ে পৌঁছলাম। রাত পোহালে একটিমাত্র দিন থাকবে নমিনেশন সাবমিট করার। তার মানে এক দিনে আমার নমিনেশন সাবমিট করতে হবে। ভেবেচিন্তে সুনামগঞ্জের মাহবুব ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। তাঁর আসল নাম মির্জা গোলাম সামদানী। শুনলাম, কেবল আমার এলাকারই রেজিস্টার্ড ভোটারই নমিনেশন পেপারে প্রস্তাবক এবং সমর্থক হতে পারে। কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরে আমি কোথায় পাব আমার এলাকার ভোটার? সুনামগঞ্জ থেকে তাহেরপুর এবং ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ এখান থেকে অনেক দূর। এলাকায় যাওয়া-আসা করতে হয় নদীপথে নৌকা করে। তখন ইঞ্জিনবোট বলতে কিছুই ছিল না। তাহিরপুরের একজন লোক আমার পরিচিত। প্রভাবশালী একজন লোক। সম্ভবত সেকান্দার আলী ছিল তার নাম। তাঁকে বললাম, ‘আপনি আমার একটা নমিনেশন পেপারে প্রপোজার হন।’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি আবদুল খালেক সাহবেকে কথা দিয়ে ফেলেছি তাঁর প্রপোজার হব। আমি দুঃখিত।’

তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আগামী কালের মধ্যে নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে হবে। ভাবলাম, গয়নাঘাটে গিয়ে দেখি, যে-সময় নৌকা ছাড়বে সে-সময় আমাদের এলাকার কোনো লোক পাই কি না। গয়নাঘাটে গিয়ে পেলাম লক্ষ্মীছড়ির হোসেন বখতকে। হোসেন বখত রাজনৈতিক কর্মী। গণতন্ত্রী দলের ওয়ার্কার। আমার পেরেশানি দেখে বললেন, ‘কী ব্যাপার প্রফেসর সাব, এত চিন্তিত কেন? কাউকে খুঁজছেন?’

আমি তাঁকে খুব সংক্ষেপে আমার অবস্থাটা বুঝিয়ে বললাম। শুনে তাঁর কিছুটা সহানুভূতি হলো। একটা নৌকা দেখিয়ে বললেন, ‘ওই নৌকায় আপনার এলাকার একজন কর্মীলোক যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ আগেই নৌকায় তাঁর বিছানা তোলা হয়েছে। একটু অপেক্ষা করুন, এক্ষুনি ওই লোক এসে পড়বে।’ সূর্য ডোবার আগেই সেই লোক এসে হাজির গয়নার ঘাটে। হোসেন বখত বললেন, ‘একে চেনেন? আপনার এলাকার লোক, অধ্যাপক শাহেদ আলী। নির্বাচনের জন্য আপনাদের এলাকায় নমিনেশন পেয়েছেন। কালকের মধ্যেই নমিনেশন পেপার সাবমিট করতে হবে। তার জন্য দরকার আপনার এলাকার ভোটার, যারা প্রপোজ করবে এবং সাপোর্ট করবে। দেখেন আপনি কিছু করতে পারেন কি না।’

সেই লোক একজন তরুণ দীর্ঘদেহী দৃঢ় অভিব্যক্তির মানুষ, মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। তিনি বললেন, ‘আমি একজন প্রপোজার হতেই পারি, কিন্তু আরেকজন কোথায় পাব?’ এরপর একটু চুপ করে থেকে কপালে আঙুলের টোকা দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ আমাদের এলাকার কয়েকটি যুবক এখানে একটা ট্রেনিঙে এসেছে। ওরা প্রত্যেকেই ভোটার। দেখি এদের নিয়ে আসতে পারি কি না।’ তিনি আমার ঠিকানা জেনে নিলেন এবং সন্ধ্যার পরই চার জন যুবককে নিয়ে হাজির হলেন। এভাবে নমিনেশন পেপার সাবমিট করার সংকট থেকে পরিত্রাণ পেলাম। আমি তখন সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলাম আল্লাহর ওপর। বুঝতে পারলাম, তাঁর ইচ্ছেতেই সকল জটিলতার গিটগুলো খুলে যাচ্ছে। Continue reading

(বাংলা-ক্লাসিক) বিশ্বনবী – গোলাম মোস্তফা [শর্ট ভার্সন।] পার্ট ৪

৯: অলৌকিক কান্ড

হালিমার গৃহে অবস্থানকালে হযরত মুহম্মদের জীবনে একটি অলৌকিক কান্ড ঘটিয়াছিল বলিয়া জানা যায়।

এই ঘটনা হাদিস শরীফে নিম্নরূপে উল্লিখিত হইয়াছে : “আনাস বলিতেছেন: একদা হযরত বালকদিগের সহিত খেলা করিতেছিলেন, এমন সময় জিব্রাইল ফিরিশতা তথায় উপস্থিত হইলেন। জিব্রাইল হযরতকে একটু আড়ালে লইয়া তাঁহাকে চিৎ করিয়া শোয়াইলেন; তারপর তাঁহার বুক চিরিয়া হৃৎপিণ্ডটিকে বাহিরে আনিয়া তাহার মধ্য হইতে খানিকটা জমা-রক্ত বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং বলিলেন: শয়তানের অংশ যেটুকু তোমার মধ্যে ছিল তাহা এই। তারপর সেই হৃৎপিণ্ডটিকে একটি সোনার তশতরীতে রাখিয়া জমজমের পবিত্র পানি দ্বারা ধৌত করিলেন। অতঃপর সেটিকে জোড়া লাগাইয়া পুনরায় যথাস্থানে সংস্থাপন করিলেন। বালকেরা দৌড়াইয়া গিয়া হালিমাকে বলিল: ‘দেখ গিয়া, মুহম্মদ নিহত হইয়াছে।” তখন সকলে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মুহম্মদ বিবর্ণ হইয়া পড়িয়া আছেন। আনাস বলিতেছেন: ‘আমি হযরতের বুকে সেলাইয়ের দাগ দেখিয়াছি।”

শুধু যে আনাসই এই হাদিসটি বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা নহে। ইবনে হিশাম এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করিয়াছেন। ইবনে হিশাম বলিতেছেন :

“হালিমা বলিয়াছেন: মুহম্মদ একদিন তাহার দুধভাইদের সহিত বাড়ীর নিকট মেষ চরাইতেছিল, এমন সময় বালকেরা ছুটিয়া আসিয়া আমার নিকট বলিল যে, দুইজন শ্বেতবাসপরিহিত লোক আসিয়া তাহাদের কোরেশ-ভাইকে ধরিয়া তাহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া ফেলিয়াছে। আমি এবং আমার স্বামী তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম মুহম্মদ বিবর্ণ ও ভীত অবস্থায় পড়িয়া আছেন। আমরা বালকটিকে আলিংগন করিলাম এবং এরূপ হইবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। তখন বালক উত্তর দিল: “দুইটি শ্বেতবাস-পরিহিত লোক আমার নিকট আসিযা আমাকে চিৎ করিয়া শোয়াইয়া আমার কলিজা বাহির কবিয়া লইল এবং উহার মধ্য হইতে একটা-কিছু বাহির করিয়া ফেলিল। সে যে কী জিনিস, আমি জানি না।”

অন্য আর একটি হাদিসে আছে :

“একদা কতিপয় লোক হযরতের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিজের সম্বন্ধে কিছু, বলিতে অনুরোধ করিল। হযরত বলিতে লাগিলেন: “হযরত ইসমাইলের প্রতি খোদাতালা যে আশীর্বাদ প্রেরণ করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, আমি সেই আশীর্বাদ এবং যিশু যাহার সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, আমি সেই ব্যক্তি। আমি যখন মায়ের পেটে ছিলাম, তখন আমার মা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন যে তাঁহার মধ্য হইতে একটি দিব্যজ্যোতিঃ বিকীর্ণ হইয়া সিরিয়ার রাজপ্রাসাদকে আলোকিত করিয়া তুলিয়াছে। একদিন আমি আমার দুভাইদের সংগে মেষ চরাইতেছিলাম এমন সময় শুভ্রবেশধারী দুই ব্যক্তি আমার নিকট উপস্থিত হইযা আমাকে চিৎ করিয়া শোয়াইয়া ফেলিয়া হৃৎপন্ড বিদীর্ণ করিয়া উহার মধ্য হইতে এক ফোঁটা কালো রক্ত বাহির করিয়া ফেলিলেন। তারপর তাঁহাদের হস্তস্থিত তরীর পানিতে উহা ধৌত করিয়া দিলেন। তখন একজন ফিরিশতা আমাকে ওজন করিবার জন্য অপরকে বলিলেন। ওজনে আমি দশজনের চেয়েও ভারী প্রমাণিত হইলাম। তখন আমাকে একশত জনের বিরুদ্ধে ওজন করা হইল, এবারেও আমি সকলের চেয়ে ওজনে ভারী হইলাম। তখন একজন অপরজনকে বলিলেন: আর দরকার নাই, সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে ওজন করিলেও ইহার ভার কম হইবে না।” Continue reading

অগ্নিগিরি – কাজী নজরুল ইসলাম

This entry is part 5 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

বীররামপুর গ্রামের আলি নসিব মিয়াঁর সকল দিক দিয়েই আলি নসিব। বাড়ি, গাড়ি ও দাড়ির সমান প্রাচুর্য! ত্রিশাল থানার সমস্ত পাটের পাটোয়ারি তিনি।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। কাঁঠাল-কোয়ার মত টকটকে রং। আমস্তক কপালে যেন টাকা ও টাকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র।

তাঁকে একমাত্র দুঃখ দিয়াছে – নিমকহারাম দাঁত ও চুল। প্রথমটা গেছে পড়ে, দ্বিতীয়টার কতক গেছে উঠে, আর কতক গেছে পেকে। এই বয়সে এই দুর্ভাগ্যের জন্য তাঁর আপশোশের আর অন্ত নাই। মাথার চুলগুলোর অধঃপতন রক্ষা করবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেননি; কিন্তু কিছুতেই যখন তা রুখতে পারলেন না, তখন এই বলে সান্ত্বনা লাভ করলেন যে, সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডেরও টাক ছিল। তাঁর টাকের কথা উঠলে তিনি হেসে বলতেন যে, টাক বড়োলোকদের মাথাতেই পড়ে – কুলি-মজুরের মাথায় টাক পড়ে না! তা ছাড়া, হিসেব নিকেশ করবার জন্য নি-কেশ মাথারই প্রয়োজন বেশি। কিন্তু টাকের এত সুপারিশ করলেও তিনি মাথা থেকে সহজে টুপি নামাতে চাইতেন না। এ নিয়ে কেউ ঠাট্টা করলে তিনি বলতেন – টাক আর টাকা দুটোকেই লুকিয়ে রাখতে হয়, নইলে লোকে বড়ো নজর দেয়। টাক না হয়ে লুকোলেন, সাদা চুল-দাড়িকে তো লুকোবার আর উপায় নেই। আর উপায় থাকলেও তিনি আর তাতে রাজি নন। একবার কলপ লাগিয়ে তাঁর মুখ এত ভীষণ ফুলে গেছিল, এবং তার সাথে ডাক্তাররা এমন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল যে, সেইদিন থেকে তিনি তৌবা করে কলপ লাগানো ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু, সাদা চুল-দাড়িতে তাঁর এতটুকু সৌন্দর্যহানি হয়নি। তাঁর গায়ের রং-এর সঙ্গে মিশে তাতে বরং তাঁর চেহারা আরও খোলতাই হয়েছে। এক বুক শ্বেত শ্মশ্রু – যেন শ্বেত বালুচরে শ্বেত মরালী ডানা বিছিয়ে আছে!

এঁরই বাড়িতে থেকে ত্রিশালের মাদ্রাসায় পড়ে – সবুর আখন্দ। নামেও সবুর, কাজেও সবুর! শান্তশিষ্ট গো-বেচারা মানুষটি। উনিশ-কুড়ির বেশি বয়স হবে না, গরিব শরিফ ঘরের ছেলে দেখে আলি নসিব মিয়াঁ তাকে বাড়িতে রেখে তার পড়ার সমস্ত খরচ জোগান।

ছেলেটি অতিমাত্রায় বিনয়াবনত। যাকে বলে – সাত চড়ে রা বেরোয় না। তার হাবভাব যেন সর্বদাই বলছে – ‘আই হ্যাভ দি অনার টু বি সার ইয়োর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট’।

আলি নসিব মিয়াঁর পাড়ার ছেলেগুলি অতিমাত্রায় দুরন্ত। বেচারা সবুরকে নিয়ে দিনরাত তারা প্যাঁচা খ্যাঁচরা করে। পথে ঘাটে ঘরে বাইরে তারা সবুরকে সমানে হাসি ঠাট্টা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের জল ছিঁচে উত্যক্ত করে। ছেঁচা জল আর মিছে কথা নাকি গায়ে বড়ো লাগে – কিন্তু সবুর নীরবে এ সব নির্যাতন সয়ে যায়, এক দিনের তরেও বে-সবুর হয়নি।

পাড়ার দুরন্ত ছেলের দলের সর্দার রুস্তম। সে-ই নিত্য নূতন ফন্দি বের করে সবুরকে খ্যাপানোর। ছেলে মহলে সবুরের নাম প্যাঁচা মিয়াঁ। তার কারণ, সবুর স্বভাবতঃই ভীরু নিরীহ ছেলে ; ছেলেদের দলের এই অসহ্য জ্বালাতনের ভয়ে সে পারতপক্ষে তার এঁদো কুঠরি থেকে বাইরে আসে না। বেরুলেই প্যাঁচার পিছনে যেমন করে কাক লাগে, তেমনি করে ছেলেরা লেগে যায়।

সবুর রাগে না বলে ছেলেদের দল ছেড়েও দেয় না। তাদের এই খ্যাপানোর নিত্য নূতন ফন্দি আবিষ্কার দেখে পাড়ার সকলে যে হেসে লুটিয়ে পড়ে, তাতেই তারা যথেষ্ট উৎসাহ লাভ করে।

পাড়ার ছেলেদের অধিকাংশই স্কুলের পড়ুয়া। কাজেই তারা মাদ্রাসা-পড়ুয়া ছেলেদের বোকা মনে করে। তাদের পাড়াতে কোনো মাদ্রাসার ‘তালবিলিম’ (তালেবে এলম বা ছাত্র) জায়গির থাকত না পাড়ার ছেলেগুলির ভয়ে। সবুরের অসীম ধৈর্য! সে এমনি করে তিনটি বছর কাটিয়ে দিয়েছে। আর একটা বছর কাটিয়ে দিলেই তার মাদ্রাসার পড়া শেষ হয়ে যায়।

সবুর বেরোলেই ছেলেরা আরম্ভ করে – ‘প্যাঁচারে, তুমি ডাহ! হুই প্যাঁচা মিয়াঁগো, একডিবার খ্যাচখ্যাচাও গো!’ রুস্তম রুস্তমি কন্ঠে গান ধরে –

ঠ্যাং চ্যাগাইয়া প্যাঁচা যায় –
যাইতে যাইতে খ্যাচখ্যাচায়।
কাওয়ারা সব লইল পাছ,
প্যাঁচা গিয়া উঠল গাছ।
প্যাঁচার ভাইশতা কোলা ব্যাং
কইল চাচা দাও মোর ঠ্যাং।
প্যাঁচা কয়, বাপ বারিত যাও,
পাস লইছে সব হাপের ছাও
ইঁদুর জবাই কইর‍্যা খায়,
বোচা নাকে ফ্যাচফ্যাচায়। Continue reading

সাহিত্য কোনো মোরাল বিউটি কনটেস্ট না – ফিলিপ রথ

This entry is part 24 of 29 in the series ইন্টারভিউ সিরিজ

ফিলিপ রথ, যার একটাই পরিচয়, আগাগোড়া লেখক। জীবনভর কন্ট্রাডিক্ট কইরা যাওয়া লোকটার লেখক আইডেন্টিটি নিয়া কইতে গেলেও কন্ট্রাডিকশন প্রাসঙ্গিক হয়া যায়। এতো শৈল্পিক উপায়ে কন্ট্রাডিক্ট কয়জনই বা করতে পারে!

লেখক রথ উপন্যাস লিখছেন, ছোট গল্পও লিখছেন। তাঁর সাহিত্যে উইঠা আসছে কন্টেম্পোরারি পলিটিক্স, কালচার, আর জীবনবোধ। মোটা অংশ জুইড়া লেইখা গেছেন নিজেরে নিয়া। না, ‘অটোবায়োগ্রাফি’ বললে ভুল হইবো। উনি নিজের আইডেন্টিটি নিয়া খেলছেন। এতো বাস্তবের মতো কইরা খেলছেন যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা ধরতে গেলে ফিকশনের স্বাদ নেওয়াই উল্টা কঠিন হয়া যাইবো। আর তাই উনি চাইতেনও না কেউ উনার ফিকশনরে দূরে ঠেইলা লেখায় তাঁরে খুঁইজা বেড়াক।

জাকারম্যান, কেপেশ, আর পোর্টনয় – রথের এই কারেক্টারগুলারে উনি নিজের নানা বয়স আর সময়ের লগে মিলায়া, চারপাশের এলিমেন্ট বসায়া, যত্ন দিয়া গড়ছেন – একটা ভাস্কর্যের মতন। পুব-পশ্চিম, রিপাবলিক -টোটালারিয়ান, সেমেটিক-এন্টি সেমেটিক থিকা শুরু কইরা নারী-পুরুষ পর্যন্ত মানুষ-মানুষের সম্পর্ক, আর ক্রাইসিস নিয়া উনি গল্প বইলা গেছেন।

সাইকো-এনালাইসিসের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার মধ্যে বড় ভূমিকা রাখছে। আমজনতা, লোকে কী ভাবলো, পাঠক কী মনে করলো এইগুলারে উনি কখনো গুনেন নাই। নিউ জার্সি থিকা নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা থিকা চেকোশ্লোভাকিয়া, ইংল্যান্ড – নানা স্থান-কাল-পাত্র থিকা উনি নিছেন, আর একটার পর একটা নভেল ডেলিভারি দিছেন।

আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা লেখক রথ দুইটা ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড, দুইটা ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল এওয়ার্ড, তিনটা ফকনার এওয়ার্ড, একটা পুলিৎজার আর ম্যান বুকার ইন্টার্ন্যাশনাল প্রাইজ পাইছেন।

যদিও রথরে চেনার জন্য প্রাইজের এই লিস্ট কাজে আসবো না। নিজের লাইফের সাথে মিল রাইখা এতগুলা নভেল লেখার পরও রথ আদৌ নিজেরে চেনাইতে চাইতেন কিনা সন্দেহ আছে। উনি নিজের জন্যই লিখতেন, কারণ এইটা তারে ভালো রাখতো। পাঠক নিয়া তার তেমন মাথা ব্যথা ছিল না, যদিও এইটাও তাঁর জীবনভর হেঁয়ালির আরেকটা কিনা – জানা সম্ভব না। কারণ, এইটা জিগানোর টাইম ফুরায়ে গেছে।

মোদ্দা কথা, লেখক হিসাবে রথ যতটা মজার, মানুষ হিসাবে ততটাই ডিফিকাল্ট। তারে যদি চিনতেই হয়, কয়টা রথ পইড়া দেখতে পারেন। তবে বইলা রাখতেছি, পুরাপুরি চিনতে না পারলে সেই দায়ভার আমার না। আর তার লেখা বইগুলার কোনো লিস্ট এখানে দিতেছি না (কোনটা রাইখা কোনটা দিবো), সেইটা বরং আপনারা গুগুল কইরা নিয়েন।

১৯৩৩ সালে নিউ জার্সির ইহুদী পরিবারে জন্মানো রথ, ২০১৮ সালে ম্যানহাটনে মইরা যাওয়ার আগে শেষ বয়সে দুঃখ করতেছিলেন, ফিকশন পড়ার এস্থেটিক দিন দিন ‘কাল্ট’ এক্টিভিটি হয়া যাইবো। তাঁর এই ভাবনা কি সত্য হইবো না মিথ্যা? সময়ই বইলা দিবো।

২.
ফিলিপ রথের এই প্যারিস রিভিউ ইন্টার্ভিউটা ৮৪’ সাল পর্যন্ত লেখক রথের পুরা জার্নিটারেই তুইলা ধরছে। একজন সাকসেসফুল নভেলিস্ট, যারে আমেরিকার অন্যতম সেরা সাহিত্যিক ধরা হয়, উনি নিজ মুখে বলতেছেন কেমনে তার লেখার জার্নি শুরু হয়, কেমনে শেষ হয়, লেখার টাইমে তার কী ক্রাইসিস ফেইস করা লাগে—এইটা উঠতি লেখক আর কিউরিয়াস পাঠক, সবার জন্যই দারুণ রিসোর্স হইতে পারে।

অবশ্য উনি এইখানে ফিকশান লেখা শিখায়ে দিছেন, বা কোনো ট্রিক বইলা দিছেন, এমন ভাবাটা ভুল হইবো। উনারে নিয়া মানুষের অনেক প্রি-এজাম্পশনস এইখানে ভাইঙ্গা দিছেন। ফিকশন কেমনে লিখতে হয়? এই প্রশ্নের কোনো প্রি-এজিউমড উত্তর আপনার মনে উঁকি দিতেছে? দিলে উনি সেটাও যে ভাইঙ্গা দিবেন, এইটুকু স্পয়লায় দিয়া রাখতেছি।

কাজের এথিকস, পাঠক নিয়া ভাবনা, আর লেখার ক্রাইসিস উনারে কেমনে প্রভাবিত করে সুন্দর কইরা বুঝায়া দিছেন। অটোবায়োগ্রাফি আর তাঁর উপন্যাস নিয়া পাবলিক কোয়েশ্চান নিয়া বিশাল বাহাস হইছে, সেখানে উইঠা আসছে তাঁর ইন্সপাইরেশন, সিচুয়েশন, আর থট-প্রসেস।

যখন অপ্রিয় কিছু জিগানো হইছে, ডাউন দ্যা উইকেটে আইসা ছক্কা পেটানোর মতো কইরা রথ মারছেন–তাঁর কথা দিয়া। রথের সাথে আপনার মিলা গেলে পিঠে মোলায়েম স্পর্শ টের পাবেন আর না মিললে চাবুকের বাড়ির মতোও লাগতে পারে। যদিও রথ ওসবের থোড়াই কেয়ার করতেন। রথের কাছে সামাজিক মোরালিটি সাহিত্যের সাথে কন্ট্রাডিক্ট করার রাইট রাখে না। তাঁর কাছে যা ঘটে, তা-ই লেখা সাহিত্য। যা ঘটে তা ভালো কি মন্দ–সেইটা আলাদা আলাপ।

যেহেতু ব্যক্তিজীবনের সাথে তাঁর সাহিত্যের অনেক মিল আছে, এই ইন্টার্ভিউতে তাঁর পার্সোনাল লাইফ নিয়াও প্রশ্ন উইঠা আসছে। বিশ্ব রাজনীতি নিয়া, রেজিম নিয়া, ন্যারেটিভের চয়েস নিয়া আর এক গাদা রথ নভেল আর পেছনের ইতিহাস নিয়া তাঁরে প্রশ্নবানে জর্জরিত করছেন হারমিওন লি। আশা করতেছি, এইটা পইড়া মজা পাবেন, জানবেন, আর রথরে ‘একটু’ হইলেও চিনতে পারবেন।

কে, এম ইতমাম ইসলাম
অক্টোবর, ২০২৩

Continue reading

কোনো এক দূরবর্তী উত্তরবঙ্গীয় শীতের কথা ভেবে—

কখনো মনে হয় অনেক লম্বা একটা লেখা লিখি। তার জন্য শীতকালের বিষন্নতা হাজির হইছে আবার। এই শহর নিয়েও দু’একটা ভালো কথা ভাবতে ইচ্ছা করে। দুএকটা ভালো ঘটনা এই শহর যে আমারে দেয় নাই এমন তো না। লিখতে ইচ্ছা করে আমার বন্ধু আশার কথা। যে বন্ধু ধীরে ধীরে পরিবার হয়ে ওঠে, তারও পরে হয়তো শরীরের হাত পায়ের মতো একটা অংশ হয়ে যায়। জীবনের একেকটা সময় এসে আমরা টের পাই পাতার মতোন ঝরে যাওয়া। একটা ডাল থেকে একটা পাতা যেমনে ঝরে যায়, না চাইতেও। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও আমরা কোনো দল থেকে, কোনো মানুষ থেকে এমনে ছিটকে পড়ি। অনেক আপন ভাবলেও কারো কাছে আমি অটটুক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারি না যতটুক ভাবি তারে। ঘটনাগুলা থাইকা যায় কোথাও না কোথাও। কিন্তু আমি আর আশা এক অপরের কাছ থেকে ছিটকে পড়ি নাই। আশারে ভাবতে পারি আমার নিজের মানুষ হিসেবে।

কোনোকিছু অর্জন না করে মানে নিজে না বানায়া, না কিনে ওই জিনিসরে নিজের ভাবতে পারা তো টাফ। বাড়ি ছাড়ার আগে বাড়িরে একান্তই আমার মনে হইতো না আমার। আব্বা মার টাকারেও আমি কখনো আমার টাকা ভাবতে পারি নাই। এখনো পারি না। দুনিয়ায় কোনোকিছুই আসলে আমার ওইভাবে নিজের মনে হয় না। কিন্তু কিছুদিন আগে যখন আমি আশা দুজনেই অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা বিপর্যস্ত তখন কিসের জন্য যেন আশা আমার কাছে টাকা চাইলো। আর বললো তোর টাকারে যতটা আমার নিজের টাকা মনে হয় অতটা আর কারো বেলায় হয় না। একটা টঙের দোকানে, বিশ্রি শব্দের মধ্যে এমন একটা কথা শুনে কেমন আনন্দ লাগতে পারে তা আমি জানি। দলা পাকানো কান্নার মতো এমন সুখের মোমেন্ট আমার জীবনে আসছে। এইসব তো হুট করে হয় নাই৷ একদিনে না। ভার্সিটিতে থাকতে আমাদের যে কোনো একজনের টিউশনি থাকলেই আমরা বলতাম, চাপ নাই৷ চলে যাবে আমাদের৷ এবং চলে গেছে আমাদের পাথরের দিন। দীর্ঘ রাত। আমার লকারে আশার হাজার হাজার টাকা থাকতো। আমি যখন খুশি খরচ করতে পারতাম বিনাদ্বিধায়৷ এবং আজও চাপ লাগলে আমি জানি আশার কাছে টাকা থাকলে ওইটা দিয়ে আমি চালাইতে পারবো। এইটা ধারের মতো না। মনে হয় আমার জমানো টাকা খরচ করতেছি, আবার জমলে রাইখা দেবো৷ আমার সামান্যতম অভাব নিয়েও আমি যেমনটা আশার সামনে দাঁড়াইতে পারি তেমনটা তো আব্বার সামনেও পারি না। এমন একটা সম্পর্কে থাকা তো শুধু আনন্দই দেয় না—এই ধূসর শীতকালের মতো বিষন্ন করে তোলে আমাদের। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →