আমারে যত বাঁধা দিতাছে, আমি তত শার্প হইতাছি – আজম খান
আজম খানের (১৯৫০ – ২০১১) এই ইন্টারভিউটা নেয়া হইছিল ২০১১ সালের মার্চ মাসে। উনি মারা যান জুন মাসে। ইন্টারভিউটা দেশ টিভি’তে দেখানো হইছিল। ইউটিউবে কয়েকটা ভার্সন পাওয়া যায় এই ইন্টারভিউটার। আমাদের জন্য ট্রান্সক্রিপ্ট’টা করে দিছেন হুসাইন হানিফ।
…
কবির সুমন: আজম সাহেব, আমি তো কলকাতার লোক।
আজম খান: আরে সাহেব বইলেন না, আহা, ভাই বলেন!
কবির সুমন: আমি তো কলকাতার লোক। কলকাতায় আমরা কিন্তু আপনার নাম শুনেছিলাম, কিন্তু গান শোনার সুযোগ কলকাতায়… আমি বলছি, আমার আজকে তেষট্টি বছর বয়স। আমরা বোধহয় প্রায় সমবয়সী?
আজম খান: হ্যাঁ। আমারও বাষট্টি চলতাছে।
কবির সুমন: কিন্তু সেই সময় এতটা যোগাযোগ ছিল না। ফলে আমরা অনেকেই দুর্ভাগ্যবশত আমরা প্রায় কিছুই জানি না। অথচ আপনি অবিসংবাদিতভাবে রক সম্রাট নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গেও। আপনি এই যে এই রকসম্রাট নামটা আপনার কেমন লাগে?
আজম খান: আসলে সম্রাট গুরু এইসবের জন্য তো আর আমি সঙ্গীত করি নাই। আমাদের ফ্যামিলির ট্রেডিশনের মধ্যেই সঙ্গীতটা আছে। আমাদের আত্মীয়স্বজন মা বাপ ভাই বোন, সবাই গান বাজনা কম বেশি জানে। তো এইখানে আমার মেজভাই আলম খান, সুরকার, সঙ্গীত জগতের। আর আমি এই লাইনে মানে কিছু না জাইনা আর কি।
তা আমার ইচ্ছা ছিল যে, প্রথমে গণসঙ্গীত করতাম আর কি; স্কুলে লাইফে, শেষের দিকে, তখন নাইন টেনে পড়ি। তখন পাকিস্তান সরকার আইসা আমাদের ঠকায়, তখন বুঝতাম আর কি। এই বিপ্লবী মাইন্ডের একটু ছিলাম। গান বাজনা গণসঙ্গীত গাইতাম। এই করতে করতে যুদ্ধ লাগলো। যুদ্ধে চইলা গেলাম। ওইখানে ক্যাম্প লাইফে, আগরতলায়, মেলাঘর ক্যাম্পে…
কবির সুমন: আপনি মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন?
আজম খান: হ্যাঁ, আমি একজন সেকশন কমান্ডার। আমার ভাইগ্য ভালো আমি ফ্রন্টেও ফাইট করছি সরাসরি—সম্মুখযুদ্ধ, এবং গেরিলা স্টাইলে, ঢাকা, ঢাকার আশেপাশে অঞ্চল—সব জায়গায় ফাইট করছি।
কবির সুমন: অত অল্প বয়সে?
আজম খান: তখন আমার বয়স কত, পঞ্চাশ সালে জন্ম, নাইনটিন ফিফটিতে—সেভেনটি ওয়ান—একুশ পার হয়া বাইশে পড়ছি। তো যাইহোক তখন তো গণসঙ্গীত শালবনের, সন্ধ্যা ছয়টার পর থেকে ডিউটি কিছু থাকত না।
ভাব বুইঝা গ্রেনেড বক্স, থালা বাসন চামচ লয়া আমরা হইচই করতাম। আর ঢাকার ছেলে, একটু ফরোয়ার্ড বেশি ছিল, স্বাভাবিক শহরের। আমরাই প্রাধান্য নিতাম আর কি। ওস্তাদ, টস্তাদ, অনেক—গ্রামের ছেলেরা সব আইসা হাজির হয়া যাইতো। একদম ডেইলি এইটা সন্ধ্যার সময় বান্ধা থিয়েটার ছিল। আর সবাই খুব মজা পাইতো। এই করতে করতে ওইখানে একটা গণসঙ্গীত আসর করলাম। প্রায় পাঁচ ছয়টা লোক। আপনার, তখন ওই, আর্মির অফিসারের ওয়াইফরা শুদ্দা কানতাছে। এত সুন্দর প্রোগ্রাম হইছিল।
তখন ফ্রন্টে চইলা গেলাম। এইখানে ত্রিপুরা রাজ্যের দুইটা মিনিস্টার ছিল, ওনারা রেডিও, তারপরে পেপার, দুধ, চা, চিনি—এইসব সব সেকশন কইরা দিল খুশি হয়া। আমরা খাইতে পারলাম না, আমরা ফ্রন্টে যুদ্ধে চইলা গেলাম। আসলাম, বেতন পাইলাম, ৫০, ৭৫ টাকা। যুদ্ধ টুদ্ধ শেষ হইলো।
তখন ঢাকার মনে করেন যে, মানুষ সংখ্যা খুব কম। ছেলেমেয়েরা শখে শখে গান বাজনা নাটক টাটক করে। তো আমি তখন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, ছেলেমেয়েদের যাতে ডিস্টার্ব না করে একটু দেইখা রাখতাম, শিল্পীগোষ্ঠিটারে—পরিচিত সব। এরা প্রথম তখন টেলিভিশন আমাদের একটাই ছিল, ডিএটি’তে সেভেনটি ওয়ানের শেষের দিকের কথা আরকি। ওরা একটা প্রোগ্রাম করল ছাব্বিশ জন ছেলে মেয়ে মিইলা। খুব খারাপ প্রোগ্রাম হইছে, একদম, মানে এমন ফল করছে এমন— তাদের মুখ কালো একদম। আমার খুব প্রেস্টিজে লাগলো। তো আমি একটু বন্ধুবান্ধব আড্ডায় ইয়েতে গণসঙ্গীত, তারপর বানায়া ছানায়া ফকিরা গান… (উনি হাতে ইশারা করে দোতারা বা গিটারের মতো কিছু বাজানোর ভঙ্গি করলেন)
কবির সুমন: আপনি কি গিটার বাজাতেন?
আজম খান: না, আমি কোনো যন্ত্র বাজাইতে জানি না। এইটা কথা বলতে গিয়া বলতাছি…
কবির সুমন: (সেইদিকে ঈঙ্গিত করে) না, এইটা করছেন দেখে মনে হলো।
আজম খান: না, বলতাছি আর কি … তখন মনে করেন যে সারা পৃথিবীতে বিটেলস, রোলিং স্টোন, শ্যাডোস, পপের একটা হাওয়া বইতাছে—আমাদের ঢাকা শহরেও বেশকিছু শহরকেন্দ্রিক, ঢাকা চিটাগাং এইসব জায়গাও পপের একটা বাতাস বইতাছে। কিছু ইংলিশ গান টান হয়, প্রোগ্রাম ট্রোগ্রাম হয়। তা আমি চিন্তা করলাম, আমাদের বাংলাদেশের গান করে পপ স্টাইলের জার্নিতে। এই গানগুলি আমি গিটার ড্রামসেট এইগুলি দিয়া করব। কিন্তু ওদের বলি নাই, আমি বলছি তোরা একটা প্রোগ্রাম নে, প্রোগ্রাম নিয়া আমাকে একটু জানাইস।
কবির সুমন: আচ্ছা এই গানগুলি কি আপনাদের তৈরি?
আজম খান: আমারই ম্যাক্সিমাম। তৈরি বললে হবে না, আমি কিন্তু কাগজে কলমে লিখি না। স্লিপ অফ টাং বাইর হয়া যায়, ওইটাই পরে টাইনা গান বানায়া ফেলি, সুর-টুর লাগায়।
কবির সুমন: আচ্ছা, কোথাও লিখছেন না?
আজম খান: না। এই যে আজকে গান লিখতে হবে চেয়ার টেবিল নিয়া বসলাম এইটা না। জার্নিতে থাকতে, রিকশায় একটা গান বের হয়া গেল। এইভাবে হইছে আর কি। যেমন গানের ভেতর একটা গানের কথা বলি: আমার একটা গান আছে খুব ফেমাস, বাস্তবধর্মী আর কি। রেললাইনে ওই বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে, মা তার কাঁদে, ছেলেটি মরে গেছে, হায়রে হায় বাংলাদেশ, হায়রে হায় বাংলাদেশ।
এই গানটা, আমি যুদ্ধের পরে যখন আমাদের এইখানে খুব সময়টা খারাপ যাচ্ছিল, মানে কী বলব আর কি—দুর্ভিক্ষ। খালাম্মারা দুধ আনতে যাইতাছে কাদা পাড়ায়া, চেয়ারম্যান অফিসে, দুধ পায় না ফেডো। এই রাস্তা স্টেশন থাইকা আরামবাগ, নটরডেম পর্যন্ত, কালো হয়া গেছে, গ্রামের মানুষ ঢাকা আইসা গেছে। ঢাকা আসলে বোধহয় আমরা কিছু বাঁচতে পারব। এরকম দুর্ভিক্ষ। কালো ছায়া, মানুষ মইরা যাইতাছে, লাশ দাফন করার মতো মানুষ নাই। মা বাচ্চারে ফালাই থুয়া ভাগতাছে। আমি প্রোগ্রাম ট্রোগ্রাম কইরা আসতাম, বড় বড় বাবরি দাড়ি, বুঝছেন, একটু ভাব আলাদা, তখন আইসা দেখতাম, ছোট ছোট বাচ্চারা মামা মামা করত, আমিও পয়সাগুলি সব বিলায়া দিতাম। তখন আমার কইলজা ফাইটা গান বাইর হইলো, রেললাইনের ওই বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে, মা তার কাঁদে, ছেলেটি মরে গেছে। এইভাবে গানগুলি তৈরি হইছে আমার আর কি। Continue reading