রিভোনিয়া ট্রায়ালে দেয়া নেলসন ম্যান্ডেলার জবানবন্দি
…
১৯৪৮ সালের ইলেকশনে আফ্রিকানার ন্যাশনালিজমের দল ন্যাশনাল পার্টি ক্ষমতায় আসে। পরে ১৯৬০ এ ন্যাশনাল পার্টির ডাকা গণভোটের মাধ্যমে সাউথ আফ্রিকা ব্রিটিশ সম্পর্ক ছিন্ন করে, রিপাবলিকের জন্ম হয়, মূলত আফ্রিকানার’দের ভোটেই এটা ঘটে। তখনও কোনো ইলেকশন বা গণভোটে নেটিভ তথা ব্ল্যাকদের ভোট দেয়ার সিস্টেম নাই। ব্ল্যাকদের কোনো পলিটিকাল রাইট-ই ছিল না।
ম্যান্ডেলার স্পিচটা পড়তে গেলে দেখবেন নেটিভদের “আফ্রিকান” বলতেছে। এই স্পিচ পড়তে গেলে বুঝার উপায় নাই যে, এই “আফ্রিকান” বলতে আসলে একটা জাতি না, বরং বেশ কয়েকটা জাতি আর ট্রাইব, আর এদের মধ্যে প্রচুর রেশারেশি-ও ছিল। ম্যান্ডেলার দল ছিল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি), যারা সব নেটিভ তথা ব্ল্যাকদের আফ্রিকান ন্যাশনালিজমের পতাকাতলে আনতে পারসিলো। আর এটা সম্ভব হইসিলো ন্যাশনাল পার্টির হোয়াইট সুপ্রিমেসি এবং জুলুমের কারণেই।
ন্যাশনাল পার্টি সাউথ আফ্রিকায় এপার্থেইড চালু করে। এপার্থেইড একটা আফ্রিকান্স ভাষার শব্দ, যার লিটারেল মিনিং এপার্ট-হুড বা সেপারেট-নেস। সাউথ আফ্রিকা এবং সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা (বর্তমান নামিবিয়া)’তে কাস্ট সিস্টেম ধরনের ব্যাপার ছিল, যেখানে হোয়াইট’রা সবার উপরে, তারপর ইন্ডিয়ান এবং কালার্ড’রা, শেষে ব্ল্যাক আফ্রিকান’রা, আর এই হায়ারার্কির উপ্রে বেইজ কইরা আইন তৈয়ার হইতো, যেখানে নির্ধারণ কইরা দেয়া হইতো কার পলিটিকাল – ইকোনোমিকাল – সোশাল রাইট কদ্দূর, কাকে কোন রাইট থেকে এক্সক্লুড করা হবে, কে কার লগে বিয়েশাদি বা সেক্স করতে পারবে, এবং এমনকি কে কোথায় থাকতে পারবে, জমি কিনতে পারবে, কতটুক ফ্রি-লি মুভ করতে পারবে (একজন ব্ল্যাক কেবল তার নিজের জন্য নির্ধারিত জায়গায়, আর যেখানে তার হোয়াইট এমপ্লোয়ি তারে এমপ্লয় করসে সেখানে মুভ করতে পারতো, আর সেটাও এমপ্লোয়ির সাইন করা পাস বই ছাড়া না), আর এভাবেই মাইনরিটি হোয়াইট পপুলেশন গোটা সাউথ আফ্রিকায় নিজের কব্জা ধইরা রাখতে পারতো আর স্লেভারি উইঠা যাবার পরও ব্ল্যাক’দেরকে প্রকারান্তরে স্লেইভ-ই বানায়া রাখতো। তবে এপার্থেইড শব্দটা খালি সাউথ আফ্রিকার ক্ষেত্রে লিমিটেড থাকে নাই (আর এখন তো এপার্থেইড উইঠা গেসে ওখান থেইকা)। অন্যান্য দেশ, যেমন ইজরায়েলের ক্ষেত্রে অনেকসময় এই ওয়ার্ডটা ইউজ করা হয় এখন।
ন্যাশনাল পার্টি মূলত পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করসিলো। শান্তিপূর্ণ ওয়েতে প্রোটেস্টের রাস্তাগুলাও আইন কইরা বন্ধ কইরা দিতেছিলো। আর এএনসি-ও ক্রমশ ভায়োলেন্ট পলিসি এডপ্ট করতে থাকে। এইগুলার ডিটেইলস আপনেরা ম্যান্ডেলার স্পিচটাতে এবং ফাঁকে ফাঁকে অ্যাড করা টিকা’গুলাতে পাইবেন। আমি জাস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের কথাগুলা হালকা করে বইলা রাখতেছি, যাতে রিডারের কানেক্ট করতে সুবিধা হয়।
১৯৬৩ সালের ১১ জুলাই রিভোনিয়ার লিলিসলিফ ফার্মে আত্মগোপনে থাকা এএনসি’র বেশ কিছু নেতা এরেস্টেড হন। শুরু হয় রিভোনিয়া ট্রায়াল। নেলসন ম্যান্ডেলা নিজেও ১৯৬১ তে এখানে হাইডে ছিলেন। বাট রিভোনিয়া ট্রায়াল (যেই ট্রায়ালে তিনি এক নম্বর আসামী) শুরুর সময় তিনি অন্য মামলায় অলরেডি পাঁচ বছরের লাইগা দণ্ডপ্রাপ্ত। এটার ব্যাপারে স্পিচের শুরুতে ম্যান্ডেলা কথা কইছেন। যাই হোক, রিভোনিয়া ট্রায়ালে আসামীদের বিরুদ্ধে আনা চার্জগুলা ছিল – সাবোটাজ, গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া, কমিউনিজম কায়েমের নীলনকশা করা, বিদেশী টাকা লইয়া দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, এইসব।
এখানে একটা ব্যাপার হইতেছে ন্যাশনাল পার্টি গভরমেন্টের উপর জাতিসংঘ সহ নানা আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তেছিলো, ম্যান্ডেলা সেটা জানতেন। ওনার স্পিচের দ্বারা উনি দুনিয়ার কাছেও নিজেদের সিচুয়েশন এবং পজিশন ক্লিয়ার করছেন নিপুণতার সহিত। আর, সাউথ আফ্রিকায় ডেমোক্রেসির ধারণা তৈরীতে এই স্পিচ খুবই ইম্পর্টেন্ট রোল প্লে করসে, এবং পৃথিবীর জন্য, আর বিশেষ কইরা বাংলাদেশের মতো অভাগা দেশগুলার মানুষের জন্য এই স্পিচ সিগনিফিকেন্ট। নেলসন ম্যান্ডেলা আর তার দল তাদের স্ট্রাগলে যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিছেন, সেইটা থেইকা আমাদের ডেমোক্রেসির পক্ষের নেতাদের আর দল’দের শেখার আছে বইলা আমার মনে হয়।
লাবিব ওয়াহিদ
মে, ২০২২
…
আমি এই মামলার এক নম্বর আসামী।
আমার একটা ব্যাচেলর ডিগ্রী আছে আর্টসে, এবং জোহানেসবার্গে একজন এটর্নি হিসাবে কয়েক বছর আমি অলিভার ট্যাম্বোর সাথে পার্টনারশিপে কাজ করসি। অনুমতি বাদে দেশ ছাড়া এবং ১৯৬১ সালের মে মাসের স্ট্রাইকে অংশ নেয়ার জন্য মানুষকে খেপায়া তোলার অভিযোগে আমি অলরেডি পাঁচ বছরের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি।
শুরুতে আমি যেটা বলতে চাই তা হইলো, রাষ্ট্রপক্ষ তার শুরুয়াতে যেই কথাটা বলসেন যে সাউথ আফ্রিকার সংগ্রাম বিদেশী শক্তি বা কমিউনিস্টদের থাবার নিচে আছে, এইটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। আমি যা করসি তা আমি করসি একইসাথে একজন ইন্ডিভিজুয়াল হিসাবে এবং আমার মানুষদের নেতা হিসাবেও, এবং আমি তা করসি সাউথ আফ্রিকায় আমার এক্সপেরিয়েন্সের কারণেই, আর আফ্রিকান ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রতি আমার গর্ববোধ থেকেই আমি তা করসি, কোনো আউটসাইডার কী বললো না বললো তার লাইগা আমি এসব করি নাই।
তরুণ বয়সে ট্র্যান্সকাই’তে আমার ট্রাইবের মুরুব্বিদের কাছে আমি পুরানা দিনের গল্প শুনতাম। এর মধ্যে অনেক গল্প ছিল সেইসব যুদ্ধের যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা জন্মভূমি রক্ষার লাইগা করসিলেন। ডিঙ্গেন, বেমবাতা, হিনসা, মাকানা, স্কুংথি, ডেলেসাইল, মোশুশু, সেখুখুনি – এনাদের গুণগান করা হইতো গোটা আফ্রিকান জাতির গর্ব হিসাবে। আমার আশা ছিল এটাই যে আমার জাতির সেবা করার এবং তার স্বাধীনতার স্ট্রাগলে নিজের ক্ষুদ্র অবদানটা রাখতে পারার সুযোগ যেন জীবন আমারেও দেয়। এটাই আমারে মোটিভেটেড করসে সেই কাজগুলা করতে যেই কাজগুলার জন্য আমার নামে এই মামলা করা হইসে।
এই পর্যন্ত বলার পর, এখন আমার অবশ্যই ভায়োলেন্স প্রশ্নে কিছু কথা বলার দরকার আছে। এই কোর্টে এখন পর্যন্ত যা যা বলা হইসে, তার কিছু সত্য এবং কিছু অসত্য। তবে, সাবোটাজ’এর পরিকল্পনার সাথে আমি যুক্ত ছিলাম না – এই কথা আমি বলবো না। কোনো বেপরোয়া ভাব থেইকা বা ভায়োলেন্সের প্রতি কোনো ভালোলাগা থেইকা আমি সাবোটাজের প্ল্যানিং করতে যাই নাই। আমি এইটা করসি ঠান্ডা মাথায় এখানকার পলিটিকাল সিচুয়েশনের মূল্যায়ন করার মাধ্যমে, যে সিচুয়েশনটা তৈরী হইসে অনেক অনেক বছর ধইরা শাদা’দের হাতে আমার জনগণের উপর চালানো স্বৈরশাসন, জুলুম আর শোষণের কারণে।
আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই স্বীকার করি, আমি ‘উমখন্তো ওয়ে সিজওয়ে’র জন্মের সাথে যুক্তদের একজন, এবং ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে এরেস্ট হওয়ার আগে পর্যন্ত এই সংগঠনে আমার স্পেশাল ভূমিকা ছিল।
আমার জবানবন্দিতে আমি রাষ্ট্রপক্ষের উইটনেস’দের তৈয়ার করা কিছু মিথ্যা ধারণা শুধরাবো। অন্যান্য জিনিশের পাশাপাশি, আমি এইটা ক্লিয়ার করবো যে এভিডেন্স হিসাবে উপস্থাপন করা কিছু কিছু কাজ উমখন্তো’র দ্বারা ঘটে নাই, এবং ঘটতে পারে না। আমি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং উমখন্তো’র মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়েও বলবো, এবং এই দুই সংগঠনে আমি পার্সোনালি কী রোল প্লে করসি সেইটার ব্যাপারেও বলবো। এবং কমিউনিস্ট পার্টির কী ভূমিকা ছিল সেইটা নিয়াও বলবো। এই সব জিনিশ ঠিকমতো ব্যাখ্যা করার খাতিরে আমার প্রথমে ব্যাখ্যা করা লাগবে উমখন্তো কোন উদ্দেশ্যে যাত্রা করসে; এইসব উদ্দেশ্য পূরণ করার কোন কোন উপায় সে প্রেসক্রাইব করসে, এবং কেন এইসব উপায় চুজ করা হইসে। আমি আরো ব্যাখ্যা করবো কীভাবে আমি এইসব সংগঠনের কাজেকর্মে জড়িত হইলাম।
অভিযোগে উল্লেখ করা কিছু কিছু জিনিশ আমি ডিনাই করি, ওগুলা স্পষ্টভাবেই সংগঠনের পলিসির বিরোধী। আমার জানা নাই ঐসব কাজের পিছনে কোন জাস্টিফিকেশন আছে, তবে এইগুলার পিছে যে উমখন্তো’র অনুমোদন থাকতে পারে না সেইটা পরিষ্কার করার লাইগা আমি সংক্ষেপে এই সংগঠনের জন্ম আর তার পলিসির ব্যাপারে কিছু বলতে চাই।
আমি অলরেডি ব্যাপারটা মেনশন করসি যে, উমখন্তো’র জন্মের সাথে আমি যুক্ত ছিলাম। আমি, এবং অন্য যারা এটার শুরুয়াত করসিলাম, তারা এইটা করসি দুই কারণে। এক, আমরা মনে করসি সরকারি পলিসিগত কারণেই আফ্রিকান জনগণের সামনে ভায়োলেন্স বাদে আর কোনো রাস্তা খোলা নাই, এবং, যদি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণের ফিলিংসকে চালিত ও নিয়ন্ত্রিত না করা যায় তাইলে সন্ত্রাসবাদ ছড়ায়া পড়বে এবং দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতি-বর্ণের মধ্যে শত্রুতা আর তিক্ততার জন্ম হবে। দুই, আমরা বুঝতে পারসি যে ভায়োলেন্স বাদে আফ্রিকান জনগণের পক্ষে শাদা বামুনবাদ [White Supremacy] এর নীতি থেইকা মুক্তিলাভ করা সম্ভব না। এই নীতির বিরোধিতা করার যাবতীয় আইনসম্মত উপায়কেই বন্ধ করা হইসে নতুন আইনের মাধ্যমে, এবং আমাদেরকে এমন একটা অবস্থায় ফেলা হইসে যে – হয় চিরকাল নিচু হইয়াই থাকতে হবে, অথবা সরকারকে ডিফাই করতে হবে। আমরা ডিফাই করার পথকেই বাইছা নিসি। আমরা প্রথমে আইন অমান্য করসি এমন উপায়ে যা যেকোনো রকম ভায়োলেন্সকে এভয়েড করে; যখন এইটার বিরুদ্ধে আইনি-ব্যবস্থারে ইউজ করা হইলো, এবং যখন সরকার অপজিশনকে দমন করার জন্য শক্তির প্রয়োগ করতে লাগলো, শুধুমাত্র তখন আমরা ডিসাইড করলাম ভায়োলেন্স দিয়া ভায়োলেন্সের জবাব দেয়ার।
কিন্তু যেই ভায়োলেন্সের পথ আমরা চুজ করসি তা টেররিজম না। আমরা যারা উমখন্তো গঠন করসি তারা সবাই আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সদস্য ছিলাম, নন-ভায়োলেন্স আর আলোচনার মাধ্যমে পলিটিকাল সমস্যার সমাধান করতে চাওয়ার যেই লম্বা ঐতিহ্য এএনসি’র আছে তা আমাদের রক্তে হাজির ছিল। আমরা বিশ্বাস করি সাউথ আফ্রিকার মালিক এখানকার সবাই, কোনো একটা গ্রুপ এর মালিক না, তা শাদা হোক বা কালো। আমরা ইন্টার-রেশিয়াল যুদ্ধ চাই নাই কোনো, একদম শেষ পর্যন্ত আমরা এটারে এভয়েড করতে চাইসি। যদি আদালতের কোনো সন্দেহ থাকে এই ব্যাপারে, আমাদের সংগঠনের গোটা ইতিহাস ঘাঁটলেই প্রমাণ হবে আমি যা বলসি, এবং যা বলতে যাইতেসি উমখন্তো’র এডপ্ট করা কৌশলের ব্যাপারে। এ কারণে আমি, আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ব্যাপারে প্রথমে কিছু বলতে চাই। Continue reading →