Main menu

এলিস মুনরো’র ইন্টারভিউ (সিলেক্টেড অংশ)

This entry is part 8 of 29 in the series ইন্টারভিউ সিরিজ

এলিস মুনরো’র এই ইন্টারভিউ’র বইটাসহ ইন্টারভিউ সিরিজের ১৮টা বই কিনতে এই লিংকে ক্লিক করেন। কিনতে পারেন রকমারি থিকাও।


…………………

এলিস মুনরোকে আমি ভালবাসি

যেকোনো লেখকই তার নিজের মতো লেখকদের খুইজা বেড়াইতে থাকে৷ আমার যখন ফিকশন লেখার ইচ্ছা জন্মাইতে থাকে, তখনোই মুনরোর কিছু গল্প পড়তে পারছিলাম। উনারে মনে হইছিল নিজের মনের মতো লেখক। মানে গল্প নিয়া আমার যা যা ইচ্ছা ও বোঝাপড়া, তার অনেককিছু পাইছিলাম এলিস মুনরোর গল্পগুলাতে। এইজন্য এলিস মুনরোর সাক্ষাতকার অনুবাদ করতে পারাটা আমার জন্য বড় একটা ঘটনাই ছিল। এই সাক্ষাতকারে মুনরো নিজের লাইফ নিয়া অনেক কথা বলছেন, কথা বলছেন লেখালেখির সাথে তার এতোদিনের সম্পর্ক নিয়াও।

একজন লেখকের লেখাপত্র বুঝার জন্য ওর জীবন নিয়া জানা অনিবার্য কিছু না। কিন্তু কখনো কখনো এইগুলা আমাদের  গল্পের বোঝাপড়ায় কাজে লাগতে পারে।  মুনরোর ক্ষেত্রে কথাটা একটু বেশি খাটে। কারণ মুনরোর গল্পগুলা খুবই মিমেটিক, কাফকা বা বোর্হেসের মতো না৷ উনার গল্পে কাহিনী ইম্পর্টেন্ট। কাহিনী নিজেই রিডারের লগে কথা কইতে থাকে। 

নিজের অভিজ্ঞতা আর আশেপাশের জগত নিয়াই বেশি লেখছেন মুনরো। এইজন্য অন্টারিওর আশেপাশের এলাকাগুলা তার গল্পে খুবই ইম্পর্টেন্ট। মুনরোরে অনেকে ফকনারের মতো রিজিওনাল লেখকও বলেন।

এই অভিজ্ঞতার উপর একটু বেশি নির্ভরশীলতার কারণেই হয়তো উনার গল্পে একই চরিত্ররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুইরা ফিইরা আসে। যেমন কয়েকটা গল্পের মধ্যেই থাকে একই লাইব্রেরিয়ানের ক্যারেক্টার। আবার মুনরোর গল্পে  প্লেস খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা ব্যাপার৷ উনি একজায়গায় বলছিলেন মফস্বলের প্রান্তিক মানুষদের নিয়াই উনার বেশিরভাগ গল্প লেখা৷ মুনরোর নিজের লাইফের বেশিরভাগ সময়ও থাকছেন অন্টারিওর এক মফস্বলে। এইসব ল্যান্ডস্কেপ আর মানুষেরা তার গল্পের পরতে পরতে আছে। 

এইসব কিছুর জন্যই উনার গল্পে অটোবায়োগ্রাফিক্যাল উপাদান বেশি৷  তবে কোন লেখারে শুধুমাত্র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল হিসেবে পড়ার যে ঝামেলা, সেটার কথাও উল্লেখ করছেন উনি এই সাক্ষাতকারে৷ আসলে যেকোনো ভালো লেখাই তো খালি অভিজ্ঞতার অনুকরন না, বরং অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মাত্রাজ্ঞান, এস্থেটিক সেন্স, লিটারারি সেন্সসহ আরো অনেককিছুর মিশ্রন। 

কেউ কেউ উনারে তুলনা করেন চেখভের সাথে। এক অর্থে এটা সত্যি। যে কেউই উনার গল্পে চেখভিয়ান জিনিসপাতি খুইজা পাবেন। মুনরোর  ক্যারেক্টারগুলার মধ্যে যে আইরনির হদিস পাওয়া যায় মাঝেমাঝে, সেটা অনেকসময় চেখভের কথাই মনে করায়া দেয়৷ তবে আমার মনে হয় মুনরো গল্পে অনেক ডিটেইলস দিতে পছন্দ করেন, উনার গল্পে মানুষের লাইফের একটা বৃহৎ ক্যানভাস থাকে, যেখানে চেখভ তুলনামূলক বেশি কৌশলী আর মিনিমালিস্ট৷ এইজন্য মুনরো গল্পে সিম্বল বা খুব সূক্ষ্ম জিনিসগুলা হাজির করেন না সবসময়, পুরা গল্পটারেই একটা  কন্টিনিউয়াস লাইফের অংশ আকারে হাজির করেন। 

মুনরোরে নিয়া আরো অনেককিছুই বলা যায়। উনারে নিয়া কইতে গেলে আমি কিঞ্চিত আবেগীও হইয়া পড়ি। অনেকদিন ধইরাই উনার গল্পগুলার সাথে বাইচা আছি। যেকোনো কিছু পড়া আসলে একটা রিফ্লেক্সিভ প্রক্রিয়া। লেখা অথবা অনুবাদও তাই৷ সুতরাং, এখানে আমিই শুধু অনুবাদটা করি নাই, এই অনুবাদটাও আমারে করছে। 

তাসনিম রিফাত

…………………………..

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনি কি কখনো কোন লেখা পাবলিশ হওয়ার পরেও এডিট করছেন? যেমন ধরেন , প্রস্ত ওর মইরা যাওয়ার কিছুদিন আগে ‘রিমেম্ব্রান্স অফ থিংস পাস্ট’ বইয়ের প্রথম ভলিউমটা আবার লেখছিলেন। 

মুনরোঃ হ্যাঁ, করি। সাধারণ আর সহজে বুঝা যায় এমন লেখাগুলা হেনরি জেমস রিরাইট করে সেগুলারে ধোঁয়াটে আর কঠিন কইরা তুলতেন। আমিও এই ধরনের কাজ  করতেছি রিসেন্টলি। আমার ‘ক্যারিড  অ্যাওয়ে’ গল্পটা ১৯৯১ সালের বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরির সংকলনে জায়গা পাইছিল। গল্পটা কেমন হইছে সেটা দেখার জন্য আমি সংকলন থেকে আবার পড়তেছিলাম।  আর একটা প্যারাগ্রাফ খুইজা পাইছিলাম যেটায় কিছু ঝামেলা আছে মনে হইছিল। প্যারাগ্রাফটা খুবই ছোট ছিল, মেইবি দুইটা বাক্যের মাত্র, কিন্তু গল্পটার জন্য খুবই ইম্পর্টেন্ট।  আমি একটা কলম নিয়া ওই সংকলনের মার্জিনেই জিনিসটারে রিরাইট করছিলাম, যাতে পরে বইতে প্যারাগ্রাফটা ঠিক ভাবে লেখা যায়। আমি যখনই এমনে কোন গল্প রিভিশন দিতে যাই, তখনই কোন না কোন ঝামেলা খুইজা পাই। এটা সম্ভবত হয় লেখার সময় যে রিদমটা থাকে, এডিটের সময় ওই রিদমটায় আর না থাকার কারণে। কারণ একটা সম্পূর্ণ লেখা আপনি অনেক শ্রম দিয়া লেখেন, এডিটের সময় ক্ষুদ্র একটা অংশে মনোযোগ দেন মাত্র।  আমি সাধারণত লেখার সময়ই দেখি কোনো অংশ ঠিকঠাক ভাবে আছে কিনা, কোনো জায়গায় ঝামেলা বাঁধলে সেটা ঠিক কইরা নেই। কিন্তু সব শেষ কইরা যখন আমি গল্পটা আবার পড়তে যাই, তখনোই ব্যাপারটা সমস্যাজনক লাগে ৷ তো আমি এইসব জিনিস নিয়া কখনোই খুব নিশ্চিত হইতে পারি না ৷ হয়তো লেখালেখির ক্ষেত্রে এই ধরনের অভ্যাসগুলা বাদ দিলেই ভালো হয়। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে একবার বলছিলেন যে আপনে লেখার মাঝামাঝি সময়ে কাউরে নিজের কাজগুলা দেখান না।

মুনরোঃ হ্যাঁ, এটা সত্য। কোন লেখা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কাউরে সেটা দেখাই না।

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে সম্পাদকদের উপর কতটুক ভরসা রাখেন? 

মুনরোঃ দ্যা নিউ ইয়র্কারে কাজ করার ক্ষেত্রেই আমার প্রথম সিরিয়াস এডিটিং নিয়া অভিজ্ঞতা হইছিল। এর আগে আমি শুধু পান্ডুলিপি বানানোর সময় সম্পাদকদের কাছ থেকে টুকটাক পরামর্শ নিতাম। সম্পাদনার সময় কি কি করা যায়, তা নিয়া সম্পাদক আর লেখকের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা দরকার। যেমন, আমার এক এডিটর ছিল যে ভাবতো উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের (একজন আম্রিকান লেখক) গল্পগুলা কিছু হয় নাই, কিন্তু আমার কাছে এই কথার কোন গুরুত্ব নাই। একজন সম্পাদকের অবশ্যই চোখা নজর থাকা উচিত, যাতে আমি তারে বিশ্বাস করতে পারি।  আমার নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক ছিল চিফ ম্যাকগ্রাথ। উনিই ছিলেন আমার প্রথম এডিটর। খুবই জোস একটা লোক।  আমি মাঝেমাঝে অবাক হইয়া যাইতাম, আমি যেসব কাজ করতে চাইতাম লেখায়, সেগুলা একটা লোক কেমনে এমন গভীরভাবে বুঝতে পারে। সবসময় যে উনি আমার লেখা ইডিট করতেন সেটা না, মাঝেমাঝে অনেক পথও দেখাইতেন। আমি আমার ‘দ্যা টার্কিশ সিজন’ নামে একটা গল্প রিরাইট করছিলাম, যেটার পুরান ভার্সনটা উনি আগেই পড়ছিলেন। আমি ভাবছিলাম নয়া ভার্সনটা নর্মালিই নিবেন উনি। কিন্তু উনি আমারে বললেন, ‘নতুন ভার্সনে কিছু জিনিস আছে যেগুলা আমার পছন্দ, আর পুরানোটায়ও কিছু জিনিস আমার ভাল্লাগছে। আমরা তো আরেকবার দেখতে পারি গল্পটা?’ উনি কখনোই কিছু বদলানোর জন্য জোর দিতেন না, কিছু অপশন দেখাইতেন আরকি। তো, এইভাবে আমরা গল্পটা নিয়া আবার বসছিলাম আর মেবি আরো বেটার একটা আউটপুট পাইছিলাম।

…………………………..

Continue reading

জগৎ শেঠ – রজনীকান্ত গুপ্ত (১৮২২)

বঙ্গদর্শন পত্রিকার ৯৮ নাম্বার সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ, ১২৮৯ বাংলা সনে) এই লেখাটা ছাপা হইছিল। খুব অথেনটিক হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেন্ট হিসাবে এই লেখাটারে নিলে ভুলই হবে।

জগৎ শেঠ যে একজন মানুশ না, বরং একটা উপাধি সেইটা বলতে গিয়া হিস্ট্রিরে পারসোনাল কিছু ঘটনার ভিতর দিয়াই দেখা হইছে, একটা হিস্ট্রোরিক কোন জায়গা থিকা এতোটা না। জগৎ শেঠের সিগনিফিকেন্সটারে বুঝতে হইলে অই সময়ের বাংলাদেশের ইকনোমিক সিস্টেমটা কিভাবে ফাংশন করতো, সেই ফ্রেমওয়ার্কটার ভিতর থিকা দেখতে পারাটা দরকার। আর যখন এই মানি সার্কুলেশনের ক্ষমতা’টা ইংরেজদের দখলে চইলা আসলো তখন জগৎ শেঠের কোন সিগনিফিকেন্স আর থাকার কথা না, ছিলও না। এই আলাপটা যে নাই – তা না, বেইজ হিসাবে এইটা নাই।

সেকেন্ড হইলো, অনেক ঘটনার রেফারেন্স থাকলেও মেজর ডিসিশানগুলা একটা স্পেকুলেশনের জায়গা থিকা বলা হইছে। স্পেকুলেশন বইলাই ভুল না, কিন্তু স্পেকুলেশনের বেইজগুলা যেহেতু মিসিং, কোন হিস্ট্রিক্যাল ট্রুথ হিসাবে নেয়াটাও রিস্কি হওয়ার কথা। একটা ন্যাশনালিস্টিক প্লেজারের জায়গা থিকা ঘটনাগুলারে বলা হইছে। কিন্তু অনেকগুলা ইনফরমেশন এইখানে আছে। জগৎ শেঠরে নিয়া পপুলার যতো আলাপ আছে এখন পর্যন্ত, তার প্রায় সবগুলাই মেবি এই লেখাটা থিকাই একস্ট্রাক্ট করা। যার ফলে, একটা হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেন্ট হিসাবে, একটা সময়ের হিস্ট্রি-রিডিং হিসাবে এই লেখাটারে রিকগনাইজ করাটা দরকার।

ই. হা.

…………………………

অনেকের বিশ্বাস, জগৎ শেঠ একজন লোকের নাম। মার্শমান সাহেবের কল্যাণে এই কথা দেশময় রাষ্ট হইইয়াছে। পাঠশালার ছেলেরা জগৎ শেঠকে একটী লোক বলিয়াই জানে। আমাদের স্কুলে প্রকৃত ইতিহাসের চর্চ্চা হয় না, তাই এইরূপ দুই একটী ভ্রম থাকিয়া যায়। জগৎ শেঠ কোন মানুষের নাম নহে। একটী উপাধি মাত্র। শ্রেষ্ঠি শব্দের অপভ্রংশে শেঠ হইয়াছে। শ্রেষ্ঠি বৈশ্যদের উপাধি। হিন্দু রাজাদের অধিকারকালে বৈশ্যেরা ধনরক্ষকের কাজ করিতেন। অসময়ে তাহারা রাজাকে টাকা ধার দিতেন। মুসলমান নবাবদের অধিকার কালে সেই শেঠেরা ধনরক্ষক হন, সময়ে অসময়ে টাকা ধার দিয়া নবাবের সাহায্য করেন। এই সময়ে শেঠদিগের অসীম ক্ষমতা । ধনে,মানে, খ্যাতিতে, ইহারা এই সময়ে ভারতবর্ষের অনেক জমীদারের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। বৰ্ক সাহেব উল্লেখ করিয়াছেন, শেঠদিগের কারবার ইংলণ্ডের ব্যাঙ্কের ন্যায় বিস্তৃত। ইহা অত্যুক্তি নহে। শেঠগণ ভারতবর্ষে ধনকুবের ছিলেন। ইহারা ভারতবর্ষের “রথচাইল্ড” বলিয়া বর্ণিত হইতেন। এক সময়ে ইহারা আপনাদের ক্ষমতাবলে দিল্লীর আমখাঁসেও আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন। ইহাদের অর্থ, ইহাদের প্রভুশক্তি ও ইহাদের মন্ত্রণা অনেক সময়ে দিল্লীর বাদশাহকে রক্ষা করিয়াছিল। বাঙ্গালার ইতিহাসের অনেক প্রধান প্রধান ঘটনার সহিত শেঠদিগের সংস্রব আছে। শেঠগণ এক সময়ে বাঙ্গালার নবাবকে রক্ষা করিয়াছিলেন, এবং এক সময়ে সেই নবাবেরই বিরুদ্ধে উঠিয়া, তাহাকে হতমান ও হতসর্ব্বস্ব করিয়া, শ্বেতপুরুষকে তাহার সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন ।

যে শেঠবংশের কথা বলা যাইতেছে, তাহা দুই শত বৎসরের অধিক প্রাচীন নহে। রাজপুত হইতে এই বংশের উৎপত্তি হইয়াছে। মাড়য়ারীগণ শেঠদিগের মূল। শেঠ খেতাম্বরীর জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত। যোধপুর রাজ্যের অন্তর্গত নাগর ইহাদের আদি বাসস্থান। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইহাদের আদিপুরুষ হীরানন্দ শাহ অর্থ উপার্জ্জন মানসে পাটনায় আসিয়া বাস করেন। হীরানন্দের সাত পুত্র। ইহারা সকলেই ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন স্থলে আপনাদের কারবার চালাইতে আরম্ভ করেন। জ্যেষ্ঠের নাম মাণিকচাঁদ। ইনি ঢাকায় আসিয়া বাস করেন। শেঠগণ এই মাণিকচাঁদকেই বাঙ্গলায় আপনাদের বংশের স্থাপনকর্তা বলেন। ঢাকা এই সময়ে বাঙ্গালার রাজধানী এবং এবং প্রধান বানিজ্য ব্যবসার স্থান । মানিকচাঁদ এইখানে আপনার ভাগ্য পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হন। বাঙ্গালার নবাবী এই সময়ে মুর্ষিদ কুলি খাঁর হাতে ছিল। মাণিকচাঁদ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেখাইয়া অল্প সময়ের মধ্যেই মুর্ষিদ কুলির প্রিয়পাত্র হইয়া উঠেন। ১৭০৪ অব্দে মুর্ষিদ কুলি খাঁ ঢাকা হইতে মুর্ষিদাবাদে যাইয়া রাজধানী স্থাপন করিলে মাণিকচাঁদ মুর্শিদাবাদে আইসেন। এইখানে তাহার ক্ষমতা বাড়িয়া উঠে। মাণিকচাঁদ নবাবের দক্ষিণ হস্ত হন। তাহার পরামর্শ অনুসারে রাজ্যের সকল কার্য্য নিৰ্ব্বাহ হইতে থাকে। যে সমস্ত জমীদার ও তহশীলদার নবাব সরকারে রাজস্ব দিতেন, তাহাদের সকলকেই মাণিকচাঁদের হাতে টাকা দিতে হইত। ইহা ছাড়া প্রতি বৎসর যে দেড় কোটী টাকা রাজস্ব দিতে হইত, তাহাও মাণিকচাঁদেরর হাত দিয়া যাইত। নবাব অনেক সময়ে নিজের টাকাকড়ি মাণিকচাঁদের ধনাগারে জমা রাখিতেন। মুর্ষিদ কুলি খাঁ দিল্লীর সম্রাট ফিরোক্ শাহকে অনুরোধ করিয়া ১৭১৫ অব্দে মাণিকচাঁদকে “শেঠ” উপাধি দেন। এই সময় হইতে মাণিকচাঁদ ও তার সন্তানগণ মুর্ষিদাবাদের কৌন্সিলের প্রধান সভা হন। শাসনসংক্রাস্ত সকল বিষয়েই ইহাদের আধিপত্য থাকে। ইহারা অনেক সময়ে অনেক বিষয়ে দিল্লীর দরবারের প্রধান প্রধান ওমরাহকে পত্র দিখিয়া আপনাদের মতামত নির্দ্দেশ করিতে থাকেন।

মাণিকচাঁদ নিঃসন্তান ছিলেন। । ফতেচাঁদ নামে তাহার একটী ভ্রাতৃপুত্রকে তিনি দত্তকপুত্র লন। ফতেচাঁদও “শেঠ” উপাধি পাইয়াছিলেন। সম্রাট ফিরোক শাহ ইহাকে বড় ভাল বাসিতেন। ১৭২২ সালে মাণিকচাঁদের মৃত্যু হয়। ফতেচাঁদ তাহার পদ অধিকার করেন। কেহ কেহ কহেন, ১৭২৪ অব্দে ফতেচাঁদ যখন দিল্লীতে উপস্থিত হন, তখন সম্রাট মহম্মদ শাহ তাহাকে “জগৎ শেঠ” উপাধি দান করেন। আবার কেহ কেহ কহেন, ফতেচাঁদ ফিরোক্ শাহের নিকট হইতে এই উপাধি প্রাপ্ত হন। যাহা হউক, ফতেচাঁদই যে সকলের আগে “জগৎ শেঠ” উপাধি পাইয়াছিলেন, ইহা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন। ফতেচাঁদের বড় তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, দিল্লীর দরবারে তাহার বড় সুখ্যাতি। কোন সময়ে মুর্ষিদ কুলি খাঁ সম্রাটের বিরাগভাজন হওয়াতে বাঙ্গালায় নবাবী পদ ফতেচাঁদকে দিবার কথা হয়। কিন্তু মুর্ষিদ কুলি খাঁ শেঠবংশের সহায় ছিলেন, এজন্য ফতেচাঁদ এই পদ গ্রহণ করেন নাই; বরং সম্রাটের সহিত নবাবের মিল করিয়া দিয়া উপকারীর প্রত্যুপকার করেন। এবিষয়ে দিল্লী হইতে যে ফৰ্ম্মান প্রচার হয়, তাহাতে লেখা ছিল, “ফতেচাঁদের বিশেষ চেষ্টায় ও প্রার্থনায় বাঙ্গলার নবাব দিল্লীর সম্রাটের অনুগ্রহভাজন হইলেন।” নবাব শাসনসংক্রান্ত সমুদয় বিষয়ে ফতেচাঁদের পরামর্শ লইতেন। এই সময় হইতে ফতেচাঁদের সন্তানগণ দিল্লীর দরবারে প্রসিদ্ধ হন। বাঙ্গালার নবাবকে কোন সময়ে খেলাত দেওয়া আবশ্যক হইলে, সেই সঙ্গে জগৎ শেঠকেও খেলাত দেওয়া হইত। বাদশাহের নিকট ফতেচাঁদ মণিখচিত একটী উৎকৃষ্ট সিলমোহর উপহার প্রাপ্ত হন। ইহাতে “জগৎ শেঠ” উপাধি ক্ষোদিত ছিল। শেঠবংশীয়গণ বহুকালপর্য্যন্ত এই মোহরটী যত্নের সহিত রাখিয়াছিলেন।

মুর্ষিদ কুলি খাঁর মৃত্যু হইলে সুজাউদ্দৌলা বাঙ্গালার নবাব হন। ফতেচাঁদ সুজাউদ্দৌলার কৌন্সিলের চারি জন সভ্যের মধ্যে একজন সভ্য ছিলেন। এই নবাব, ফতেচাঁদের পরামর্শ অনুসারে, চৌদ্দ বৎসর বাঙ্গালার শাসনকার্য্য নির্ব্বাহ করেন। ইহার পর সরফরাজ খাঁ বাঙ্গালার সুবাদার হইলেও ফতেচাঁদ কৌন্সিলের পদ ত্যাগ করেন নাই। কিন্তু শেষে সরফরাজের ইন্দ্রিয়পরতা ও যথেচ্ছাচারে ফতেচাঁদ বড় বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। শীঘ্র উভয়ের মধ্যে অসদ্ভাব জন্মিল। ইতিহাসলেখক অৰ্ম্মি সাহেব কহেন, ফতেচাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধু পরমা সুন্দরী ছিলেন। নবাব তাহার রূপলাবণ্যের বিষয় অবগত হইয়া তাহাকে দেখিতে ইচ্ছা করেন। ফতেচাঁদ নবাবকে এই অনুচিত কাজ হইতে বিরত করিবার জন্য অনেক চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু ইহাতে কোন ফল হইল না। দুরাচার নবাব আপনার জিদ বজায় রাখিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলেন। ফতেচাঁদ নিরূপায় হইলেন। যুবতী পুত্রবধু নবাবের ঘরে প্রেরিত হইলেন। নবাব কিয়ৎক্ষণমাত্র নয়নযুগল পরিতৃপ্ত করিলেন। যুবতী অকলঙ্কিত শরীরে ঘরে ফিরিয়া আসিলেন। কিন্তু এই ঘটনায় ফতেচাঁদের হৃদয়ে বড় আঘাত লাগিল। অসৃস্পশ্যা অন্তঃপুরবাসিনী বধূ পরধর্ম্মাক্রান্ত পরপুরুষের মুখ দেখাতে ফতেচাঁদ আপনাকে বড় অপমানিত জ্ঞান করিলেন। এ বিরাগ, এ অপমান ও এ ক্ষোভ তিনি আর ভুলিতে পারিলেন না। ক্ষোভে, রোষে ও অপমানে ফতেচাঁদ আপনার বংশের মঙ্গল বিধাতা মুর্ষিদ কুলি খাঁর বংশধরের পক্ষ ছাড়িয়া আলিবর্দ্দি খাঁর সহিত মিশিলেন ।

কিন্তু শেঠবংশীয়গণ এই ঘটনাটী আর এক ভাবে প্রকাশ করিয়া থাকেন । তাহারা কহেন, মুর্ষিদ কুলি খাঁ মাণিক চাঁদের নিকট সাত কোটী টাকা গচ্ছিত রাখিয়াছিলেন। এই টাকা আর তাহাকে ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই। ইহার পর সরফরাজ্ খাঁ এই টাকার জন্য ফতেচাঁদকে পীড়াপীড়ি করাতে তিনি নবাবকে কিছু কাল অপেক্ষা করিতে কহেন। এই সময়ে আলিবর্দ্দী খাঁ বেহারে বিদ্রোহী হইয়াছিলেন। ফতেচাঁদ এই অবসরে তার সহিত মিশেন। এই বিদ্রোহের ফল বাঙ্গালার ইতিহাসপাঠকের অবহিত নাই। গড়িয়ার যুদ্ধে সরফরাজ নিহত হন, এবং আলিবর্দ্দী, বাঙ্গালা, বেহার ও উড়িষ্যার শাসনদণ্ড গ্রহণ করেন।
Continue reading

ইমরুল হাসানের কবিতা

।। ইশতেহার ।। গরিব কবিতা ।। কবি ।। বাবুই পাখির জন্য এলিজি ।। পুলিশ ভ্যান ।। লাইকের সমস্যা ।। জিয়ল মাছ ।। একটা মিছা কথার মতন ।। জহির রায়হান ।। ঘোড়ার ডিম ।। ছবির মতো সুন্দর ।। সকাল ।। কবিতা ও ববিতা ।।

……………..

ইশতেহার

ভয় পাবেন।
চুপ থাকবেন।
চিল্লানোটারে প্রতিবাদ করা মনে করবেন না।
চিন্তা করবেন।
চিন্তা করাটারে কাজ করার অল্টারনেটিভ ভাববেন না।
যা কিছু নাই, সেইসব জিনিস থাকতে পারে বইলা
যা কিছু আছে, তারা নাই হয়া যায় না।
যা কিছু আছে, তারা আমাদের কোন না কোন
না-থাকাই।
হাসবেন, হাসতে পারাটা ভালো।
কানবেন, কানতে পারাটা আরো ভালো।
তারপরে চুপ থাকবেন।
কথা বলবেন।
আপনার ইচ্ছাটাই আপনি না।
আপনার ইচ্ছার খরগোশটারে আদর করবেন।
রাগ উঠলে চিল্লাইবেন।
তারপরে পাঁজরের বাঁকা হাড়টার মতন, বাঁইকা থাকবেন।
চুপ থাকবেন।
বাজে ড্রাগস নিয়েন না।
মদ খাইবেন, তবে ভালোটা।
কবিতা লিখতে ইচ্ছা হইলে, লিখবেন।
কবিতা লেখাটারে প্রতিবাদ করা মনে কইরেন না।
কবিতাটা যেন থাকলো, এইরকম ভাববেন না।
হারায়া যাওয়া সব কবিতাই গ্রেট না।
মারা যাওয়া সব কবিই যেমন অমর না।
ডরাইবেন।
ডরাইতে থাকবেন।
চুপ থাকবেন।
তারপরে কথা বলবেন।
মিহি সরিষার দানার মতো পিছলায়া যাবেন।
সিস্টেমে ঢুইকা সিস্টেমরে বদলায়া দিবেন,
এইরকম একটা ভাব-এ থাকতে থাকতে
সিস্টেমের বেনিফিটগুলা নিবেন।
তারপরে বলবেন, সিস্টেমরে আমি চুদি না!
যেমন প্রতিবাদী হন, এইরকম উদাস হইবেন।
নিয়মিত বিরতিতে, তবে সবসময় না।
সময়রে যাইতে দিবেন।
সময়রে তো আপনি ধইরা রাখতে পারবেন না।
কাশি আসলে কাশি দিবেন।
হাই তুলবেন।
ঘুমাইবেন।
স্বপ্ন দেখবেন।
স্বপ্ন দেখবেন, কবিতা লিখতেছেন।
কিন্তু টের পাইবেন, কিছুই হইতেছে না।
কেউ আপনার কথা শুনতেছে না।
কেউ আপনার কথা শুনতেছে বইলাই কথা বইলেন না।
চুপ থাকবেন।
ডরাইবেন।
ডরটা হইতেছে কোর; কারে ডরাইবেন – ভাববেন।
ভাবতে পারাটা একটা কাজ, কিন্তু কাজ করার অল্টারনেটিভ না।
ঘুইরা বেড়াইবেন।
পড়াশোনা করবেন।
চাকরি করবেন।
অফিস থিকা ফিইরা সন্ধ্যাবেলা একলা লেখার টেবিলে বসবেন।
লেখা না আসলে, বইসা থাকবেন।
সময়রে যাইতে দিবেন।
সময়রে তো আপনি ধইরা রাখতে পারবেন না।
কোন কিছু ভাল্লাগতেছে না বইলা প্রেম করা শুরু কইরা দিয়েন না।
প্রেম ছাড়াও কবিতা লেখা পসিবল।
বাঁইচা থাকা পসিবল।
যদি প্রেম চইলাই আসে, তারে ফিরায়া দিয়েন না।
আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকারে নিয়া বেশি কবিতা লিখবেন না।
প্রেম নিয়া কবিতা লিখতে পারাটাই প্রেম না।
বাঁইচা থাকাটা লাইফ না-ও হইতে পারে অনেক সময়,
তবে মইরা যাওয়াটাই লাইফ না।
যে আপনারে মাইরা ফেলতে পারে, সে-ই আপনারে বাঁচাইতে পারে না, সবসময়।
৫৭ ধারা বইলা একটা আইন আছে বইলা কথা বলা নিষিদ্ধ না।
কথা বলবেন।
একটা ৫৭ ধারা আছে বইলাই আপনারে কথা বলা লাগবে – এইটা জরুরি না।
আমার বলা কথাগুলাই আমি না।
আমি বইলা যে কন্সট্রাকশনটা করতেছেন, তারে ডরাইবেন।
ভয় পাইবেন।
চুপ থাকবেন।
তারপরে আবার কথা বলবেন।
মনে রাখবেন, আপনার যদি বলার মতন কিছু থাকে,
সেইটা অন্য কেউই বলতে পারবে না।
লাইফরে আর্টের ইকো বানাইয়েন না।
আর্টরে ভাইবেন না যে, এইটারে হইতে হবে জীবনের আয়না।
আপনি একটা আপনি না হওয়ার জন্য তড়পাইয়েন না।
আপনি নিজে একটা আপনি হয়া উইঠেন না।
আপনার কথা বলাটাই আপনারে বাঁচায়া রাখবে না।
আপনার কথা বলাটাই আপনারে মাইরা ফেলবে না।
যদি মাইরাই ফেলে, বুঝবেন, এটলিস্ট একটা কথা কইতে পারছেন আপনি।
একটা কথা বলার লাইগা অনেক অনেক কথা গিইলা ফেলতে হবে আপনারে।
অনেক অনেক কথা বলার পরে টের পাইবেন,
কিছু একটা বলতে চাইতেছিলাম আমি আপনারে।
হয়তো বলতে পারছি, (তবে আমার মনেহয় আমি) হয়তো পারি নাই।

Continue reading

চিপকোর ফজিলত

ইকোফেমিনিজম নিয়া আলাপ শুরু হয় চুয়াত্তরের দিকে। ফ্রকোয়া দুবোন এই টার্ম বাজারে ছাড়েন। ইকোফেমিনিজমের সেন্ট্রাল আলাপটা নারীর সাথে পরিবেশরে জড়ায়ে আগায়। এর প্রথম কথাটা হইতেছে, পরিবেশ বিপর্যস্ত হইলে নারী ভুগবে বেশি। মানে ভিক্টিমের জায়গায় মাইয়া। আর পরিবেশরে যে বিপর্যস্ত করে সে হইল পোলা। দ্বিতীয় কথা হইল মাইয়াগোর হক যারা মাইরা খায় তারাও পোলা। সুতরাং, পরিবেশের লগে নারী এইভাবে পোলাসূত্রে জড়িত হইয়া যায়। দুনিয়া তো পোলাদের! আর্থ মানে জমিজমার মালিকদের দিকে তাকান। কারা মালিক? পোলা আর মাইয়ার রেশিও হিসাব করেন। ইকোফেমিনিষ্ট তাত্ত্বিকদের হিসাব হইতেছে, পরিবেশের এক্সপ্লয়টেশন, নারীর এক্সপ্লয়টেশনের লগে হুবুহু মিলে। পোলারা দুনিয়ারে তো রেইপই করতেছে; দুনিয়ার ভাও না বুইঝা যথেচ্ছ চইষা বেড়ানো- রেইপ তো। আবার দেখেন বিভিন্ন তান্ত্রিক-মিথিক রেফারেন্সে দুনিয়া হইল নারী; উর্বর ও ফলনশীল যেহেতু। দুনিয়ার সাথে নারীর এই নানাবিধ সংযোগ স্ট্রাইকিং। সুতরাং তাত্ত্বিকেরা মনে করসেন, ফেমিনিজমের ইকোফেমিনিজম হইয়া ওঠা জরুরী।

কিন্তু, নব্বুইয়ের দশকে আসতে আসতে ইকোফেমিনিষ্ট ডিসকোর্স ম্লান হইতে শুরু করলো। ওয়াঙ্গারি মাথাইরা বলা শুরু করলেন, এই ডিসকোর্স ইনক্লুসিভ না। এইখানে নারী ও পুরুষের বাইনারী দিয়া পরিবেশের ডাইনামিক্স কেপচার করার চেষ্টা করা হইছে। ভিক্টিম হিসাবে কেবল নারী এইখানে ফোকাসে আছে। সেই নারীও আবার মনোলিথিক; মানে নারীদের নিজেদের মইধ্যে যে পার্থক্য তাও এইখানে ইগনোর করা হইতেছে। শেষমেশ মাইরা কাইটা যা থাকে, তা কেবলই শ্বেতাঙ্গ নারী। মানে শোষকের ভিক্টিম তো শুধু নারী না! কালোরাও; গরীবরাও; শ্রমিকরাও। দুনিয়াও ইহাদের বেতিরেকে নয়; সহই। পরিবেশরে রক্ষা করা মানে এইসবই রক্ষা করা। ফেমিনিজম মানেও শুধুই সাদা নারীদের অধিকার লাভের বা, জমির মালিকানা লাভের মহড়া নয়। ফেমিনিজম হইল, নেসেসারিলি, একটা ভাইরাল হইয়া যাওয়া পুরুষীয় বাস্তবরে চ্যালেঞ্জ করার দার্শনিক-রাজনৈতিক পাটাতন।

এই জায়গায় চিপকো কেমনে কন্ট্রিবিউট করে খেয়াল করেন।

চুয়াত্তরেই, উত্তরাখণ্ডের, রেনি গ্রামের সাতাইশ জন নারী তাদের এলাকার জঙ্গলরে সরকারী ধ্বংসযজ্ঞ হইতে বাচাইতে, জঙ্গলের গাছের লগে হাতে হাত ধইরা চিপকাইয়া গেলেন। উনাদের বার্তা সহজ, গাছ কাটতে হইলে, আমাদেরকেও কাটতে হইবে। উত্তরাখণ্ডের কৃষিভিত্তিক সোমাজে মাইয়ারাই মূলত কৃষিজীবি ছিলেন। তারা এই জঙ্গল থেকে লাকড়ি পাইতেন, গবাদি পশুর খাদ্য পাইতেন, সেচের জলও পাইতেন। তারা এর আগে দেখছিলেন যে, সরকারী ও বেসরকারীভাবে গাছ কাটার ফলে পার্শ্ববর্তী নদীর পানিও শুকায় যাইতেছে। এই মাইয়ারা কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই জানতে পারছিলেন কীভাবে নদী, জঙ্গল, মানুষ, পশুপাখি একটা আরেকটার উপর নির্ভরশীল। তাই তারা গাছের লগে চিপকাইয়া গিয়া দেখাইলেন, আমরা তো এমনেই চিপকাইয়া আছি জঙ্গলের লগে; একটু দেখেন, দেখার চেষ্টা করেন। এর নাম হইল চিপকো আন্দোলন।

Continue reading

মইশখাইল্যা বিয়ের গান

বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় নিজস্ব বিয়ের গান আছে, যেইগুলা তাদের আঞ্চলিকতারে ছাড়ায়া সার্বজনীন হইতে পারে নাই অতটা (সিলেটি একটা বিয়ের গান ইদানীং ভাইরাল হইছে যদিও; কিন্তু সেইটাই এনাফ না)। সার্বজনীন হইতে পারাটা যে খুব মহৎ কিছু তা না, স্বাতন্ত্র্য ধইরা রাখাটা দরকার বইলা মনে হয়।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় বিয়েতে মিশ্র গানের একটা ট্রাডিশন চালু আছে।

তো, কী ধরনের গান মহেশখালীর বিয়েতে গাওয়া হয় সেইটা বলার আগে মহেশখালীর বিয়ের গানের ধরণটা বইলা রাখলে বোধ হয় ভালো হয়।

এই গান গুলা খালি গলায় মানে কোন ইন্সট্রুমেন্ট ছাড়া শুধু মাইক্রোফোন দিয়া গাওয়া হয়। এক বা দুই হাজার টাকায় গান গাওয়ার লাইগা শিল্পীদের ভাড়ায় আনা হয়। সাধারণত বর পক্ষের লোকেরাই গানের আয়োজন কইরা থাকেন। এক বা দুইদিন পর্যন্ত গানের আসর চলতে পারে। একটা নিয়ম হইতেছে এইখানে বিয়ে হয় দিনের বেলায়। ফলে বিয়ের আগের রাতে রাতভর শিল্পী বিয়ের গান গায়। বিয়ের দিনও বরযাত্রার গাড়িতে কইরা মাইকে গান গাইতে গাইতে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করাটা নিয়ম। এইটা এই অঞ্চলের একটা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতির অংশ হয়া আছে। অনেক সময় এমনও হয় যে, মাইক নিয়া গান গাইতে গাইতে বউ আনতে যায় নাই বইলা কনে পক্ষ কন্যা সম্প্রদান করতে রাজী হয় নাই। বরপক্ষকে আবার মাইক আর শিল্পী নিয়া গিয়া বউ আনতে হইছে।

বিয়ের গানের দুইটা বিরোধী পক্ষও এইখানে দেখা যায়। এক হইলো মোল্লা গ্রুপ, যারা বিয়ের গান বন্ধ করার পক্ষে। সামাজিকভাবে তারা এই গান বন্ধ করার লাইগা জনমত তৈরি করার চেষ্টা করে, কিন্তু জোর কইরা বলতে পারে না যে বন্ধ করতেই হইব। কারণ এই জনপদের বিশাল একটা অংশ এই গানরে নিজেদের সংস্কৃতি বইলাই মাইনা নিছে।

দ্বিতীয় পক্ষ হইলো রুচিশীল উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি। এরা বন্ধ করতে বলে না ঠিক, কিন্তু নিজেদের বিয়েতে এই গানের আয়োজন তারা করে না। এইটাকে নিম্নরুচির অশিক্ষিতদের কাজকারবার বইলাই মনে করে।  ফলে এই দুই শ্রেণির লোক যত বাড়তে থাকবে ‘মইশখাইল্ল্যা বিয়ের গান’ ততই নাই হয়া যাইতে থাকবে। সেইটা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিপর্যয় হয়া দেখা যাবে কিনা সেইটা শিউর না; কিন্তু স্বাতন্ত্র্য বইলা যেই একটা ব্যাপার সেইটা আর থাকবে না।

তো, মহেশখালী বিয়ের গান দিয়া খুবই সমৃদ্ধ একটা অঞ্চল বলা যায়। কেবল নিজস্ব আঞ্চলিক গান বা কেবল বিয়ের গান দিয়াই ভরপুর না, এর লগে প্রচুর পরিমাণে সাবকন্টিনেন্টের ক্লাসিকাল মিউজিক এইখানে গ্রহণ করা হইছে। বিশেষ কইরা উর্দু গজল, ওস্তাদ মেহেদী হাসান আর ম্যাডাম নুর জেহানের; পঞ্চাশ থিকা আশি দশকের লতা মঙ্গেশকার, মান্না দে, শামসাদ বেগমের হিন্দি গান। বাংলা গানের মধ্যে আব্দুল আলীম, মনির খান, অনুপ ঘোষাল, তালাত মাহমুদ, কনক চাপা সহ আরো অনেকের গান। চাটগাঁইয়া গানের মধ্যে আব্দুল গফুর হালী, আমান উল্লাহ গায়েন আর বুলবুল আক্তার উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও একটা হিন্দুদের শ্যামা সঙ্গীত আছে কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা আর কুমার সানুর গাওয়া, আমার স্বাদ না মিটিলো আশা না পুরিলো, সকলি ফুরায়ে যায় মা..’।

বিয়ের এই গান গুলা মূলত চার ভাগে বিভক্ত। এক হইলো ‘অঁলা’। অঁলা এক প্রকার চাটগাঁইয়া  মোর্চা সংগীত; এমনভাবে এই গীতের সূর সেট করা হইছে যেন ঘন্টার পর ঘন্টা বানায়া বানায়া গাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন ‘অঁলা’র উৎপত্তি চাটগাঁইয়া পুথি সাহিত্য থিকা হয়া থাকতে পারে। একটা জনপ্রিয় লাইন আছে এমন, ‘ফইরেঘোনা বিলের মাঝে তোতার ঝাঁক বইস্যে, সোনামিয়া দোলা তোতা মাইত্তু গেইয়্যে রে মোর হায় হায় রে…’

দ্বিতীয় হইতেছে, ‘চেয়ার’। এই শব্দটা আসছে শায়েরী থেকে। বিশেষ কইরা উর্দু গজল/শায়ের আর হিন্দি গান গুলা এই পর্যায়ে পড়ে।

তৃতীয় ঘরনা হইতেছে পুরানা বাংলা আর আঞ্চলিক গান।

চতুর্থ হইলো, বিয়ে কেন্দ্রিক বেশকিছু গান। যেইগুলা একান্তই এই অঞ্চলের। এইগুলা গায় বিশেষ কইরা বউ আনতে যাওয়ার মুহূর্তে, যাওয়ার পথে আর বউ নিয়া চইলা আসার সময়। যেমনঃ ‘দোলার মা দোয়া করো, দুনো হাত তুলিয়া, আজিয়া ফইরেঘোনার আরফাত দোলার বিয়া’,  ‘ভাবী চোখে কাজল,ওঠে পালিশ দিয়ে লাল গরি, ধীরে ধীরে চলো রে স্বামীর বাড়ি..’ ‘নায়রী নাইয়র হলো শেষ, এইবার চলো নিজের দেশ’ (এইটা যদিও মৃত্যু বিষয়ক গফুর হালির গান, তবুও এর ভাব, কনের স্বামীর বাড়ির দিকে যে যাত্রা, তার সাথেও মিলে যায়) Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →