এলিস মুনরো’র ইন্টারভিউ (সিলেক্টেড অংশ)
এলিস মুনরো’র এই ইন্টারভিউ’র বইটাসহ ইন্টারভিউ সিরিজের ১৮টা বই কিনতে এই লিংকে ক্লিক করেন। কিনতে পারেন রকমারি থিকাও।
…………………
এলিস মুনরোকে আমি ভালবাসি
যেকোনো লেখকই তার নিজের মতো লেখকদের খুইজা বেড়াইতে থাকে৷ আমার যখন ফিকশন লেখার ইচ্ছা জন্মাইতে থাকে, তখনোই মুনরোর কিছু গল্প পড়তে পারছিলাম। উনারে মনে হইছিল নিজের মনের মতো লেখক। মানে গল্প নিয়া আমার যা যা ইচ্ছা ও বোঝাপড়া, তার অনেককিছু পাইছিলাম এলিস মুনরোর গল্পগুলাতে। এইজন্য এলিস মুনরোর সাক্ষাতকার অনুবাদ করতে পারাটা আমার জন্য বড় একটা ঘটনাই ছিল। এই সাক্ষাতকারে মুনরো নিজের লাইফ নিয়া অনেক কথা বলছেন, কথা বলছেন লেখালেখির সাথে তার এতোদিনের সম্পর্ক নিয়াও।
একজন লেখকের লেখাপত্র বুঝার জন্য ওর জীবন নিয়া জানা অনিবার্য কিছু না। কিন্তু কখনো কখনো এইগুলা আমাদের গল্পের বোঝাপড়ায় কাজে লাগতে পারে। মুনরোর ক্ষেত্রে কথাটা একটু বেশি খাটে। কারণ মুনরোর গল্পগুলা খুবই মিমেটিক, কাফকা বা বোর্হেসের মতো না৷ উনার গল্পে কাহিনী ইম্পর্টেন্ট। কাহিনী নিজেই রিডারের লগে কথা কইতে থাকে।
নিজের অভিজ্ঞতা আর আশেপাশের জগত নিয়াই বেশি লেখছেন মুনরো। এইজন্য অন্টারিওর আশেপাশের এলাকাগুলা তার গল্পে খুবই ইম্পর্টেন্ট। মুনরোরে অনেকে ফকনারের মতো রিজিওনাল লেখকও বলেন।
এই অভিজ্ঞতার উপর একটু বেশি নির্ভরশীলতার কারণেই হয়তো উনার গল্পে একই চরিত্ররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুইরা ফিইরা আসে। যেমন কয়েকটা গল্পের মধ্যেই থাকে একই লাইব্রেরিয়ানের ক্যারেক্টার। আবার মুনরোর গল্পে প্লেস খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা ব্যাপার৷ উনি একজায়গায় বলছিলেন মফস্বলের প্রান্তিক মানুষদের নিয়াই উনার বেশিরভাগ গল্প লেখা৷ মুনরোর নিজের লাইফের বেশিরভাগ সময়ও থাকছেন অন্টারিওর এক মফস্বলে। এইসব ল্যান্ডস্কেপ আর মানুষেরা তার গল্পের পরতে পরতে আছে।
এইসব কিছুর জন্যই উনার গল্পে অটোবায়োগ্রাফিক্যাল উপাদান বেশি৷ তবে কোন লেখারে শুধুমাত্র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল হিসেবে পড়ার যে ঝামেলা, সেটার কথাও উল্লেখ করছেন উনি এই সাক্ষাতকারে৷ আসলে যেকোনো ভালো লেখাই তো খালি অভিজ্ঞতার অনুকরন না, বরং অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মাত্রাজ্ঞান, এস্থেটিক সেন্স, লিটারারি সেন্সসহ আরো অনেককিছুর মিশ্রন।
কেউ কেউ উনারে তুলনা করেন চেখভের সাথে। এক অর্থে এটা সত্যি। যে কেউই উনার গল্পে চেখভিয়ান জিনিসপাতি খুইজা পাবেন। মুনরোর ক্যারেক্টারগুলার মধ্যে যে আইরনির হদিস পাওয়া যায় মাঝেমাঝে, সেটা অনেকসময় চেখভের কথাই মনে করায়া দেয়৷ তবে আমার মনে হয় মুনরো গল্পে অনেক ডিটেইলস দিতে পছন্দ করেন, উনার গল্পে মানুষের লাইফের একটা বৃহৎ ক্যানভাস থাকে, যেখানে চেখভ তুলনামূলক বেশি কৌশলী আর মিনিমালিস্ট৷ এইজন্য মুনরো গল্পে সিম্বল বা খুব সূক্ষ্ম জিনিসগুলা হাজির করেন না সবসময়, পুরা গল্পটারেই একটা কন্টিনিউয়াস লাইফের অংশ আকারে হাজির করেন।
মুনরোরে নিয়া আরো অনেককিছুই বলা যায়। উনারে নিয়া কইতে গেলে আমি কিঞ্চিত আবেগীও হইয়া পড়ি। অনেকদিন ধইরাই উনার গল্পগুলার সাথে বাইচা আছি। যেকোনো কিছু পড়া আসলে একটা রিফ্লেক্সিভ প্রক্রিয়া। লেখা অথবা অনুবাদও তাই৷ সুতরাং, এখানে আমিই শুধু অনুবাদটা করি নাই, এই অনুবাদটাও আমারে করছে।
তাসনিম রিফাত
…………………………..
ইন্টারভিউয়ারঃ আপনি কি কখনো কোন লেখা পাবলিশ হওয়ার পরেও এডিট করছেন? যেমন ধরেন , প্রস্ত ওর মইরা যাওয়ার কিছুদিন আগে ‘রিমেম্ব্রান্স অফ থিংস পাস্ট’ বইয়ের প্রথম ভলিউমটা আবার লেখছিলেন।
মুনরোঃ হ্যাঁ, করি। সাধারণ আর সহজে বুঝা যায় এমন লেখাগুলা হেনরি জেমস রিরাইট করে সেগুলারে ধোঁয়াটে আর কঠিন কইরা তুলতেন। আমিও এই ধরনের কাজ করতেছি রিসেন্টলি। আমার ‘ক্যারিড অ্যাওয়ে’ গল্পটা ১৯৯১ সালের বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরির সংকলনে জায়গা পাইছিল। গল্পটা কেমন হইছে সেটা দেখার জন্য আমি সংকলন থেকে আবার পড়তেছিলাম। আর একটা প্যারাগ্রাফ খুইজা পাইছিলাম যেটায় কিছু ঝামেলা আছে মনে হইছিল। প্যারাগ্রাফটা খুবই ছোট ছিল, মেইবি দুইটা বাক্যের মাত্র, কিন্তু গল্পটার জন্য খুবই ইম্পর্টেন্ট। আমি একটা কলম নিয়া ওই সংকলনের মার্জিনেই জিনিসটারে রিরাইট করছিলাম, যাতে পরে বইতে প্যারাগ্রাফটা ঠিক ভাবে লেখা যায়। আমি যখনই এমনে কোন গল্প রিভিশন দিতে যাই, তখনই কোন না কোন ঝামেলা খুইজা পাই। এটা সম্ভবত হয় লেখার সময় যে রিদমটা থাকে, এডিটের সময় ওই রিদমটায় আর না থাকার কারণে। কারণ একটা সম্পূর্ণ লেখা আপনি অনেক শ্রম দিয়া লেখেন, এডিটের সময় ক্ষুদ্র একটা অংশে মনোযোগ দেন মাত্র। আমি সাধারণত লেখার সময়ই দেখি কোনো অংশ ঠিকঠাক ভাবে আছে কিনা, কোনো জায়গায় ঝামেলা বাঁধলে সেটা ঠিক কইরা নেই। কিন্তু সব শেষ কইরা যখন আমি গল্পটা আবার পড়তে যাই, তখনোই ব্যাপারটা সমস্যাজনক লাগে ৷ তো আমি এইসব জিনিস নিয়া কখনোই খুব নিশ্চিত হইতে পারি না ৷ হয়তো লেখালেখির ক্ষেত্রে এই ধরনের অভ্যাসগুলা বাদ দিলেই ভালো হয়।
ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে একবার বলছিলেন যে আপনে লেখার মাঝামাঝি সময়ে কাউরে নিজের কাজগুলা দেখান না।
মুনরোঃ হ্যাঁ, এটা সত্য। কোন লেখা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কাউরে সেটা দেখাই না।
ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে সম্পাদকদের উপর কতটুক ভরসা রাখেন?
মুনরোঃ দ্যা নিউ ইয়র্কারে কাজ করার ক্ষেত্রেই আমার প্রথম সিরিয়াস এডিটিং নিয়া অভিজ্ঞতা হইছিল। এর আগে আমি শুধু পান্ডুলিপি বানানোর সময় সম্পাদকদের কাছ থেকে টুকটাক পরামর্শ নিতাম। সম্পাদনার সময় কি কি করা যায়, তা নিয়া সম্পাদক আর লেখকের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা দরকার। যেমন, আমার এক এডিটর ছিল যে ভাবতো উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের (একজন আম্রিকান লেখক) গল্পগুলা কিছু হয় নাই, কিন্তু আমার কাছে এই কথার কোন গুরুত্ব নাই। একজন সম্পাদকের অবশ্যই চোখা নজর থাকা উচিত, যাতে আমি তারে বিশ্বাস করতে পারি। আমার নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক ছিল চিফ ম্যাকগ্রাথ। উনিই ছিলেন আমার প্রথম এডিটর। খুবই জোস একটা লোক। আমি মাঝেমাঝে অবাক হইয়া যাইতাম, আমি যেসব কাজ করতে চাইতাম লেখায়, সেগুলা একটা লোক কেমনে এমন গভীরভাবে বুঝতে পারে। সবসময় যে উনি আমার লেখা ইডিট করতেন সেটা না, মাঝেমাঝে অনেক পথও দেখাইতেন। আমি আমার ‘দ্যা টার্কিশ সিজন’ নামে একটা গল্প রিরাইট করছিলাম, যেটার পুরান ভার্সনটা উনি আগেই পড়ছিলেন। আমি ভাবছিলাম নয়া ভার্সনটা নর্মালিই নিবেন উনি। কিন্তু উনি আমারে বললেন, ‘নতুন ভার্সনে কিছু জিনিস আছে যেগুলা আমার পছন্দ, আর পুরানোটায়ও কিছু জিনিস আমার ভাল্লাগছে। আমরা তো আরেকবার দেখতে পারি গল্পটা?’ উনি কখনোই কিছু বদলানোর জন্য জোর দিতেন না, কিছু অপশন দেখাইতেন আরকি। তো, এইভাবে আমরা গল্পটা নিয়া আবার বসছিলাম আর মেবি আরো বেটার একটা আউটপুট পাইছিলাম।
…………………………..