ধর্ম্ম ও সমাজ – কাজী মোতাহার হোসেন (১৯২৯)
“শিখা” পত্রিকায় (থার্ড ইয়ারে) ১৯২৯ সালে কাজী মোতাহার হোসেনের এই লেখাটা ছাপা হইছিল।
কাজী মোতাহার হোসেন এবং শিখা-পত্রিকার ব্যাপারে একটা কমন মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং হইতেছে যে, উনারা বাংলাদেশের সেক্যুলার আন্দোলনের লোক ছিলেন। মানে, এইভাবে দেখাটা উনাদের বলাবলির জায়গাটারে ন্যারো কইরা দেখারই একটা ঘটনা। উনারা যেইটা করতে চাইতেছিলেন, ‘আধুনিক-চিন্তা’র লগে এনকাউন্টার করতে রাজি হইছিলেন বাঙালি-মুসলমান পরিচয়ের জায়গা থিকা, যাচাই-বাছাই কইরা এর কট্টুক নেয়া যায়, কট্টুক বাতিল করা যায় – এর একটা চেষ্টা উনাদের মধ্যে ছিল। যেইটা বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল ‘বঙ্গদর্শনে’, একটা ইন্ডিয়ান-থটের জায়গা থিকা ইউরোপিয়ান-থটরে এনকাউন্টার করতে চাইতেছিলেন।
মুশকিল হইলো, পরে জিনিসটা আর একইরকম থাকে নাই। বাংলাদেশের এখনকার ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের লগে কাজী মোতাহার হোসেনের এই কথা-বার্তার একটা মেজর ডিফরেন্সের জায়গা হইতেছে, মোতাহার হোসেন ধরে নিতেছেন যে, জ্ঞান-বুদ্ধি এবং ধর্ম সমাজের মানুশের ঘটনা, সমাজের মানুশদের ভিতর দিয়া এইটা তৈরি হইতে হয়, একটা বোঝাপড়ার ভিতর দিয়া চেইঞ্জও হয়। আর এখনকার ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারাজিমের জায়গাতে সমাজের মানুশরা হইতেছে ‘পশ্চাদপদ’ ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’, এদেরকে ‘মানুশ’ বানাইতে হবে আগে! মোতাহার হোসেনের কোর কনসার্ন হইতেছে সমাজে ব্যক্তি-মানুশের ফ্রিডম, আর এখনকার সেক্যুলারিজম মনে করে ফ্রিডমের যেই জায়গাটা আছে সমাজের মানুশ সেইখানে যাওয়ার জন্য এনাফ ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ হইতে পারতেছে না!
এখন মনে হইতে পারে, এইরকম জায়গায় যে যাওয়া যায়, এর আলামত তো কাজী মোতাহার হোসেনের লেখাতেই আছে! উনি তো ধর্মরে ব্যক্তির জায়গাতে রাখতে বলছেন, সৌল-সার্চিংয়ের ঘটনা বানাইছেন! আর এইটারে উনার আর্গুমেন্টের একমাত্র পয়েন্ট বানায়া ফেলার কারণেই ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের জায়গা থিকা দেখাটা সম্ভব হয়। যেইখানে আমরা দেখি যে, ধর্মের জায়গাতে উনি এইটারে নিছেন একটা ‘অ্যাড-অন’ হিসাবে। উনি বলতেছেন, ধর্ম ব্যক্তির ও সমাজের ফ্রিডমের জায়গায় কোন বাধা না, বরং অতীতে যখনই সমাজে এইরকম বাধাগুলা আসছে ধর্ম আইসা মানুশরে বাঁচাইছে। এখন বরং রিচুয়ালগুলারে ‘ধর্ম’ হিসাবে নেয়ার কারণে এই সমস্যাটা তৈরি হইতেছে। এইটা অবশ্যই সেক্যুলার একটা জায়গারে এক্সপ্লোর করে, কিন্তু ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের জায়গাটাতে আটকায়া থাকার ঘটনা আসলে না।
আমরা মনে করি, শিখা-পত্রিকা বা কাজী মোতাহার হোসেনদের লেখা-পত্র’রে এইরকম ন্যারো সেক্যুলারিজমের জায়গা থিকা দেখার আরো দুইটা কারণ আছে। এক হইতেছে, উনাদের সোশ্যাল-ক্লাস; শিখা-পত্রিকায় যারাই লিখছেন, তারা সবাই ছিলেন ‘উচ্চ-শিক্ষিত’ লোকজন; যদিও নবাব আবদুল লতিফদের “মুসলিম লিটারারি সোসাইটির” চাইতে আলাদা ছিল উনাদের ক্লাস, কিন্তু একই কারণে পুরানা ক্লাস-সিস্টেমের জায়গাতে একটা ডিপার্চারও ছিল সেইটা। কিন্তু ক্লাস হিসাবে এমার্জিং এলিট, এবং বলা যায় ঢাকা শহরের মিডল-ক্লাসের বুনিয়াদ ছিল এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘শিখা’ পত্রিকা। যার ফলে, এই যে চেহারাটা দাঁড়াইছে এখন (বা প্রিসাইজলি ১৯৬০-৯০’র সময়ে) ঢাকার মিডলক্লাসের, সেইটারে অই সময়ের উপর প্রজেকশন করা যায়।
সেকেন্ড হইলো, যেইটা খুব স্পষ্ট, সেইটা হইতেছে ভাষার গোলামি। এইটা টের পাইবেন, কলকাতা যেহেতু তখনো সেন্টার, অই ভাষা-সাহিত্যের জায়গা থিকা উনারা বাইর হইতে পারেন নাই, অইটারে স্ট্যান্ডার্ড ধইরা নিয়াই আলাপ করছেন, নত হইছেন, জাস্ট একটা জায়গা-ই চাইছেন মুসলমানদের লাইগা এবং ঢাকার লাইগা যে, ‘মনে রেখো, আমিও ছিলাম!’
তো, কাজী মোতাহার হোসনের এই লেখাটারে অই সময় এবং সময়ের সোশিও-পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’টা মাথায় রাইখা পড়লে, উনার লেন-দেনের জায়গাটারে, ব্যালেন্স করতে চাওয়ার ইচ্ছাটারে, আমরা আরো ভালোভাবে খেয়াল করতে পারবো হয়তো।
এডিটর, বাছবিচার
……………………..
পৃথিবীর অগণিত প্রতিষ্ঠানের কোনটিই প্রয়োজন ব্যতিরেকে স্থাপিত হয় নাই। আমাদের ধর্ম ও সমাজও প্রয়োজনের তাড়নায় জন্মলাভ করিয়াছে।
সমাজের প্রয়োজনীয়তা অতি সহজেই চোখে পড়ে। আত্মরক্ষা একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ক্রমবিকাশবাদের ইহাই মূল সূত্র। যখন কোটি কোটি লোক আত্মরক্ষার জন্য ব্যয় হয়, তখন প্রত্যেকে অন্যের মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া আপন আপন স্বার্থ সিদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করিলে কি মহামারী কান্ড উপস্থিত হইতে পারে, সে চিত্র স্মরণ করিলেই, সমাজ বন্ধন এবং নীতির আবশ্যকতা পরিস্কার উপলদ্ধি করা যায়। বাস্তবিক জন্মাবধি অন্যের সাহায্য ব্যতিরেকে জীবন ধারণ করা অসম্ভব। সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করাকে মানুষের একটা মৌলিক বৃত্তি বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। সমাজের প্রথম অবস্থায়, শারীরিক বলে শ্রেষ্ঠ হইলেই লোকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রাপ্ত হইত, কারণ তখন শারীরিক বলের দ্বারাই অন্যের উপর নিজের ইচ্ছা ও প্রভুত্ব চালানো সম্ভবপর ছিল। কিন্তু অস্ত্র উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বলের অসুবিধা অনেকটা দূর হইয়াছে। তখন বাধ্য হইয়া লোকে সংঘবদ্ধ হইয়া পরস্পরের সুবিধার জন্য কতকগুলি নিয়ম পালন করিতে স্বীকৃত হয়। এই নিয়মগুলিই সামাজিক নিয়ম। পরস্পরে বিশ্বাস, আদান প্রদান, উপকার-প্রত্যুপকার, বিবাহ বন্ধনে পবিত্রতা রক্ষণ, সত্যবাদিতা, ক্ষমা, আত্মসম্মান বোধ প্রভৃতি সদগুণ সামাজিক প্রয়োজন হইতেই উদ্ভূত হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে right is Mightই আদিম নিয়ম। যখন সকলের শক্তি প্রায় সমান হইয়া উঠে, তখন বিজ্ঞেরা Right is might নীতির আদর্শ প্রচার করিতে বাধ্য হন। আজও পৃথিবীতে সমাজে সমাজে বা জাতিতে জাতিতে যে দ্বন্দ্ব ঘটিতেছে, তাহাতে সৰ্ব্বদাই কাৰ্যতঃ চণ্ড-নীতিই অনুসৃত হইতেছে। প্রবল স্বভাবতঃ দুর্বলের উপর অত্যাচার করিলেও সৰ্ব্বদা তাহার মনে ভয় থাকে, দুর্বলেরা সংঘবদ্ধ হইয়া কিম্বা অন্য উপায়ে অধিক প্রবল হইয়া উঠিলে তাহাকে পাল্টা নির্যাতন সহ্য করিতে হইবে। সে যাহা হউক, এই ভয় এবং পরিণাম দর্শিতাই নীতি বা সাধু বুদ্ধির জনক। সুতরাং সামাজিক প্রয়োজন হইতে উদ্ভূত এই নীতি জ্ঞানকে ধর্মের অন্তর্গত বলিয়া নির্দেশ করা যায় না।
এমন প্রশ্ন হইতে পারে, ধৰ্ম্ম হইতে যদি নীতিকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়, তবে ধৰ্ম্মের কি অবশিষ্ট থাকে এবং তাহার প্রয়োজনই বা কি? অবশ্য একরূপ ব্যাপকভাবে ধরিলে যাহার যে স্বভাব সেই তাহার—যেমন আগুনের ধৰ্ম্ম দাহন করা, মস্তিষ্কের ধর্ম চিন্তা করা ইত্যাদি। এ হিসাবে বলিতে হয়, স্বভাবতঃ যাহা ঘটিয়াছে, তাহাই ধৰ্ম্ম অনুসারে ঘটিতেছে—ইহাতে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা বা তদ্রপ কোনো প্রশ্নই উঠিতে পারে না। কিন্তু ধর্মের প্রচলিত অর্থ ইহা নয়। অনেক সময় বলা হইয়া থাকে, একাগ্র সাধনাই ধর্ম। যে কোনো বিষয় যদি মানুষের মনকে অন্য সমুদয় বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া তাহার চিন্তা ও কৰ্ম্মের গতি একমুখী করিতে পারে, তবে সেইটিই তাহার ধৰ্ম্ম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কবির সৌন্দর্য চর্চাই ধৰ্ম্ম, ছাত্রের অধ্যয়নই ধৰ্ম্ম, রাজার প্রজা পালনই ধর্ম্ম ইত্যাদি। কিন্তু ধর্ম্মের প্রকৃত অর্থ ইহাও নহে। তবে ধৰ্ম্ম কি?
মানুষের মনে অসীম জিজ্ঞাসার উদয় হয়, আমি কে? কোথায় ছিলাম? কোথায় চলিতেছি? কেন চলিতেছি? অমির পরিণাম কি? এ জগতের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি? কোথায় তার বাসস্থান? সমুদয় ধৰ্ম্মের মূলে এই সব জিজ্ঞাসা এবং ইহার উত্তর। এ সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা দর্শন শাস্ত্রের কাজ। এখানে ধৰ্ম্ম ও দর্শন একীভূত হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু পরে ভিতরে দর্শনের অতিরিক্ত আরও কিছু আছে। ধৰ্ম্মের সহিত হৃদয়ের গভীর আশা এবং কোন শক্তিমান নিয়ামক পুরুষের অস্তিত্বে প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকাতেই ইহার দর্শন ভাগ শুধু মনের বিলাস মাত্রে পর্যবসিত না হইয়া প্রাণের স্পর্শে স্পন্দিত হইয়া উঠে। ধর্মের বিশিষ্ট রঙ মিশ্রিত না থাকিলে দর্শন কোনও দিন এত অধিক সমাদৃত হইত কিনা সন্দেহ। মানুষের কোন প্রয়োজনে দর্শনের ভিতর ধৰ্ম্মের বীজ নিহিত থাকে। সেই কথাটিই এখন একটু পরিষ্কার করিয়া বলিতে চেষ্টা করিব। মানুষ যখন বুঝিতে পারে, সে কত ক্ষুদ্র, জগতের নানা ঘটনা ও শক্তি পুঞ্জের সম্মুখে সে সামান্য তৃণের ন্যায় কাতর ও শক্তিহীন, যখন তাহার অন্তরের আকুল বাসনা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হইয়া যায়, তাহার সন্তান পরিজন ও প্রিয়াস্পদ মৃত্যু মুখে পতিত হয়—যখন সে প্রবলের অত্যাচারে জরিত হইয়া কাহারও নিকট কোন প্রতিকার পায় না, চারিদিকে কেবলই ছলনা, কৃতঘ্নতা ও নৈরাশ্যের ছায়া দেখিতে পায়, তখন স্বভাবতঃই এক সর্বশক্তিমান, দয়াময় জগৎ কারণে বিশ্বাস এবং পরলোকে তাহার ন্যায়বিচার ও দণ্ড পুরস্কারে আস্থা স্থাপনই তাহার একমাত্র সম্বল হয়। এই সান্ত্বনাটুকু না থাকিলে মানুষের জীবন অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িত।