বঙ্গদর্শন পত্রিকার সাত নাম্বার বছরে, ৮১ নাম্বার সংখ্যায়, বাংলা ১২৮৫ সালের পৌষ মাসে এই লেখাটা ছাপা হইছিল। মানে, ১৪৩/১৪৪ বছর আগের লেখা এইটা।
এইখানে দুইটা জিনিসরে হাইলাইট করতে চাইতেছি আমরা। এক হইলো, অইকালেও “বিসিএস পরীক্ষা” ইর্ম্পটেন্ট একটা ঘটনা ছিল। পরীক্ষা কেমনে নেয়া হইতো, কেমনে নেয়া উচিত – এই নিয়া আলাপ। ফার্স্ট কথা হইতেছে, চাকরির জন্য পরীক্ষা নেয়া ভালো; জাত দেইখা, বংশ দেইখা, বাপ-মা দেইখা চাকরি দেয়ার চাইতে। কারণ চাকরি করতে গেলে কিছু জিনিস জানা লাগে যেইটা শিখতে পারার কিছু ব্যাপার আছে, সেইগুলা যেই ভাবেই হোক, যাচাই-বাছাই করতে পারাটা দরকার। আর সেই যাচাই-বাছাই যদি ভালো না হয়, ক্ষতি যতোটা না সরকারের, তার চে বেশি দেশের মানুশের।… এই কথাগুলা এখনো সত্যি।
সেকেন্ড জিনিস হইলো, এর ভাষা। এইটা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষা। এরপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা, সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষাও আমরা পার হয়া আসছি, গত ১০০/১৫০ বছরে। এই লেখা পড়া যায়, কিন্তু কেউ লেখতে পারার কথা না আর। ‘সাহিত্য’ করার লাইগা লেখা তো যায়-ই, কিন্তু খুব বেশি দরকার না পড়লে কেউ ইন্টারেস্টেড হয়া পড়ার কথা না। কারণ এইটা না যে, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা মুজতবা আলী মারা গেছেন, বরং সমাজের মানুশের কাজকাম, চলাফেরার লগে এর ডিসট্যান্স এতোটাই বাড়ছে যে, অনেক দূরের জিনিস লাগে। এইটা ভাষার হারায়া যাওয়া না, পুরান একটা ভঙ্গিমার বরং ধীরে ধীরে ইরিলিভেন্ট হয়া উঠার। একটা সময়ের ভাষা আরেকটা সময়ে গিয়া দূরের জিনিস হয়া উঠবেই, এই সাহিত্যের সমস্যা না, ভাষার সমস্যা না; বরং এইটাই ঘটে, ঘটতেছে, সবসময়।
তো, মাঝে-মধ্যে দূরের দেশে ঘুরতে যাইতে চাই তো আমরা; এইরকম ভাষার ভিতর ট্রাভেল করতে পারেন একটা, বিষয়ের ভিতরেও; যে, হায় হায়, তখনো বিসিএস নিয়া আর্টিকেল লিখতো বঙ্কিমচন্দ্ররা। 🙂
…………………………
বিবাহ উপলক্ষে যেরূপ কুলপরিচয়ের প্রয়োজন হয়, পূৰ্ব্বে চাকুরী উপলক্ষেও সেইরূপ প্রয়োজন হইত। তৎকালে বিশ্বাস ছিল যে, কর্ম্মদক্ষতা কেবল সৎকুলেই সম্ভব, অসৎকুলে দুর্লভ। সে বিশ্বাসের বিশেষ হেতুও ছিল; তৎকালে শিক্ষা কুলগত ছিল, এক্ষণে আর তাহা নাই, এক্ষণে শিক্ষা সকলকুলেই সম্ভব, কার্যদক্ষতাও কাজেই সকল কুলেই পাওয়া যাইতে পারে। কাজেই কাৰ্যদক্ষ ব্যক্তি নির্ব্বাচন করা কিছু কঠিন হইয়াছে।
যোগ্য ব্যক্তিকে কার্য্যে নিযুক্ত করা যে অতি কঠিন তাহা সকলের সংস্কার নাই। সাধারণতঃ বিশ্বাস আছে যে, উপযুক্ত ব্যক্তিরাই কার্য্যে নিযুক্ত হইয়া থাকেন, কিন্তু যাহারা কিঞ্চিৎ বিশেষ জানেন, তাহাদের মত স্বতন্ত্র। এইজন্য ইংলণ্ড দেশের একজন প্রধান ব্যক্তি আপনাকে মন্ত্রিত্বপদে নিযুক্ত হইবার সন্তাবনা বুঝিয়া আপন কর্ত্তব্যকার্য্যের তালিকায় লিখিয়াছিলেন যে, আমি মন্ত্রী হইয়া কেবল যোগ্যলোককেই রাজকার্য্যে নিযুক্ত করিব। তিনি জানিতেন যে এইটি বড় সহজ নহে, ইহার নিমিত্ত বিশেষ প্রতিজ্ঞা আবশ্যক। অযোগ্য ব্যক্তির অনুরোধের জয়পতাকা তুলিয়া সর্ব্বদাই সর্ব্বত্র দাড়াইয়া থাকে, তাহাদের উল্লঙ্ঘন করা অতি কঠিন । এই জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে কার্য্যে নিযুক্ত করা হয় না।
ইদানীং বিজ্ঞরাজপুরুষেরা অনুরোধের মূলোচ্ছেদ করিবার নিমিত্ত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে সহজে নিরাকরণ করিবার নিমিত্ত এক উপায় উদ্ভাবন করিয়াছেন, তাহা পরীক্ষা। পরীক্ষা এক্ষণে সকল রাজ্যেই প্রচলিত হইয়া উঠিয়াছে। আমাদের দেশেও প্রায় ৩২ বৎসর হইল কতকাংশে আরম্ভ হইয়াছে।
পরীক্ষা দিয়া চাকুরী করা এক্ষণকার নিয়ম। যাহারা পরীক্ষা দিতে অসমর্থ অথচ চাকুরীর লোভ রাখে, কেবল তাহারাই পরীক্ষার বিদ্বেষী হওয়া সম্ভব। যদি আর কেহ ইহার বিদ্বেষী গান, তাহা হইলে হেতু অনুসন্ধান করা আবশ্যক।
উমেদার ব্যতীত সত্যই অনেক লোকে এই নিয়মের বিরোধী দেখা যায়; তাহারা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন যে, উপযুক্ত কর্ম্মচারী নির্ব্বাচন করিতে গেলে পরীক্ষাই তাহার একমাত্র উপায়। অথচ আবার চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করেন, “ভাল! পূর্ব্বকালের ডেপুটি মাজিষ্ট্রেট অপেক্ষা এক্ষণকার ডেপুটি মাজিষ্ট্রেটরা অযোগ্য কেন? পূর্ব্বেও তাহাদের পরীক্ষা ছিল এক্ষণেও ত সেই পরীক্ষা আছে।” আবার বলেন “উকীলদের পরীক্ষা পূর্ব্বে ছিল এখনও আছে, তবে পূর্ব্বকালের উকীল অপেক্ষা এক্ষণকার উকীলেরা ভাল কেন?”
এ কথার প্রথমেই আপত্তি হইতে পারে যে, এক্ষণকার ডেপুটি মাজিষ্ট্রেটরা যে অপেক্ষাকৃত অযোগ্য, অথবা এক্ষণকার উকীলেরা যে অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত তাহার প্রমাণ কি? প্রমাণ পুরাতন লোক, এই প্রস্তাবলেখক তাহার মধ্যে একজন। যাহারা উভয় সময়ের কর্ম্মচারী দেখিয়াছে, তাহাদের প্রমাণ গ্রহণ না করিলে আর প্রমাণ নাই। তাহাদের প্রমাণ যদি গ্রহণ করা যায়, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয় যে পরীক্ষাসত্ত্বেও এক্ষণকার ডেপুটি মাজিষ্ট্রেটগণ অযোগ্য। পরীক্ষা সত্ত্বেও যদি এরূপ হয় তবে পরীক্ষার প্রয়োজন? যোগ্যব্যক্তি নির্ব্বাচন করিবার নিমিত্ত পরীক্ষা যে একমাত্র উপায় অথবা বিশেষ উপায় তবে তাহা মিথ্যা হইল? অন্যদেশে পরীক্ষাদ্বারা যোগ্য লোক নির্ব্বাচন হইতেছে, অন্ততঃ কতকাংশে হইতেছে, কিন্তু আমাদের দেশে তাহার বিপরীত ফল কেন হয় তদন্ত করা আবশ্যক।
পূর্ব্বে যৎকালে আমাদের দেশে উপযুক্ত ব্যক্তি বড় পাওয়া যাইত না, তখন গবর্ণমেণ্ট উপযুক্ত লোক সংগ্রহ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন; আর এক্ষণে যোগ্যলোক বাঙ্গালার সর্বত্র শত শত পাওয়া যায়, অথচ যোগ্যলোক রাজকার্যে নিযুক্ত হয় না, ইহার হেতু কি? এই কথা লইয়া বাঙ্গালিরা মধ্যে মধ্যে গোপনে আন্দোলন করিয়া থাকেন। অনেকের বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, গবর্ণমেন্ট এক্ষণে ইচ্ছাপূৰ্ব্বক অনুপযুক্ত লােক নিযুক্ত করেন, তাহাদের মধ্যে কয়েক বৎসর অবধি একটা কথা রটিয়াছে যে ডিসরেলি সাহেব যখন ইংলণ্ডের রাজমন্ত্রিপদে নিযুক্ত ছিলেন,সেই সময় একবার তথায় কথা উপস্থিত হয় যে ইলংন্ড হইতে আর অধিক (covenanted servant) কবনান্টেড সারবান্ট পাঠাইবার প্ৰয়োজন নাই, এই সনদি সাহেবদের বেতনে ভারতবর্ষের অনর্থক অনেক অর্থব্যয় হইতেছে। বিশেষ ডেপুটি মাজিষ্ট্রেটদের মধ্যে যেরূপ উপযুক্ত ব্যক্তি দেখিতে পাওয়া যায়, এক্ষণে অনায়াসে অধিকাংশ কার্য তাহাদের উপর নির্ভর করা যাইতে পারে। ডিসরেলি সাহেব তাহাতে ভাবিলেন সনদি চাকরেরা বেতনদ্বারা ভারতের অনেক টাকা ইংলণ্ডে আনিতেছে, তাহাদের সংখ্যা কম হইলে ইংলণ্ডের অর্থাগম কম হইবে। অতএব এই আশঙ্কায় ডিসরেলি সাহেব গোপনে নিষেধ করেন যে, আর যেন বিশেষ উপযুক্ত বাঙ্গালিকে উচ্চপদ না দেওয়া হয়, তবে এখানে সেখানে দুই একটি ভাল লোককে কৰ্ম্ম দিলে ক্ষতি নাই বরং না দিলে নিন্দা হইবে। অনভিজ্ঞ বাঙ্গালিমহলে এরূপ অমূলক কথা রটিবে তাহার আর আশ্চর্য্য কি? নিত্য যাহা হয়, তাহার সামান্য ব্যতিক্রম দেখিলে যে বাঙ্গালিরা দেবতাদের দোষারোপ করে সে বাঙ্গালির লােক, নির্বাচন সম্বন্ধে সামান্য ব্যতিক্রম দেখিলে যে ডিসরেলি সাহেবকে বা ইংরেজরাজশাসনকে দোষারোপ করিবে ইহার আর আশ্চৰ্য্য কি? “যদি গোপন অনুমতি সম্বন্ধে তাহাদের এতদূর বিশ্বাস যে তাহারা অনায়াসে বলিয়া থাকেন “যদি গোপন নিষেধ না থাকিবে তবে ব্যবসাদারেরা বা জমীদারগণ যে শ্রেণীর লোকদের কুড়ি কি পচিশ টাকায় চাকর রাখেন এক্ষণে সেই শ্রেণীর লোকদের গবর্ণমেন্ট চারিশত পাঁচশত বেতন দিয়া কেন রাখিতেছেন।” আমরা স্বীকার করি ঐ শ্রেণীর লোক এক্ষণে ডেপুটি মাজিষ্ট্রেটের মধ্যে অনেক দেখা যায় বটে, কিন্তু তাহার হেতু গবর্ণমেন্টের কোন কুঅভিসন্ধি নহে, গবর্ণমেন্ট নিরপেক্ষ হইয়া কেবল পরীক্ষা দ্বারা সেই সকল লোক নিযুক্ত করিয়াছেন। যদি তাহাতে অনুপযুক্ত ব্যক্তি নিযুক্ত হইয়া থাকে তবে সে দোষ পরীক্ষার। তাহার পরিচয় সংক্ষেপে দেওয়া যাইতেছে। যোগ্য লোক নির্ব্বাচনের জন্য পরীক্ষাই সর্বোৎকৃষ্ট উপায় সন্দেহ নাই কিন্তু উপযোগী পরীক্ষা এপর্য্যন্ত উদ্ভাবিত হয় নাই। এই জন্য ভুল হইতেছে এবং অনেক দিন পর্য্যন্ত এই ভুল চলিবে। Continue reading →