Main menu

বাংলাদেশে এপলিটিকালিটির নয়া সুরত

আমি বলতে চাই, যে এপলিটিকাল বর্গটিকে আমরা বিভিন্ন বলায় লেখায় খোচায় নির্দেশ করতে চাই, তার অন্তত তিনটা ভেরাইটি আছে। এদের চেহারা আলাদা, কিন্তু ফলাফল একই। মানে অরাজনৈতিক কেটাগরিটারে আপনারা যেভাবে বোঝেন, সেইভাবে বুঝতে থাকলে দেশের পলিটিকাল অচলায়তনটারে ঠিকভাবে থিওরাইজ করতে পারবেন না। অর্থাৎ যারা ‘আই হেইট পলিটিক্স’ বলে কেবল তারাই এপলিটিকাল হইলে একটা হোল জেনারেশনের পলিটিকাল নিউট্রালাইজেশন এত এফেক্টিভলি ঘটতে পারে না। আমি এপলিটিকাল হিসাবে তাদেরকেও ইন্ডিকেট করতে চাই যারা নানান পলিটিকাল তৎপরতার ভিতর দিয়া আল্টিমেটলি একটা শূন্য ফলাফলেই নিয়ে যায়। এখন একটা অবজেক্টিভ পলিটিকাল প্লেইনে যদি আমি এই এপলিটিকালদের প্লট করি, তাইলে পাওয়ারের নিরিখে এরা, প্রেডিক্টেবলি, পাওয়াররে সার্ভ করে। অর্থাৎ বর্তমান বাকশালেরে।

এই তিনটা ভেরাইটির একটা তো ট্রেডিশনাল ‘আই হেইট পলিটিক্স’ গ্রুপ। যাদেরকে সহজেই চেনা যায়। এই গ্রুপটা বর্তমানে ডেমোক্রেটিক টাইমটার চেয়ে লেস ভিজিবল। মানে এখন এমন ক অক্ষর গোমাংস ধরনের এপলিটিকাল থাকাটা লেস ফ্যাশনেবল হইতে পারছে। ফলেই এই গ্রুপটারই দুইটা ফ্যাকশন এক ধরনের পলিটিকাল এসথেটিক্সের ভেতর নিজেদের রিলোকেট করছে। এস্থেটিক্স নিয়ে পলিটিক্সের কথা আমি বলতেছি না, আমি বলতেছি এস্থেটিক্সের একটা সার্টেইন রূপের কথা, যেইখানে পলিটিক্স ইটসেলফ একটা এস্থেটিক অব্জেক্ট হিসাবে ট্রিটেড হয়। যেইটা আসলে এস্থেটিক্সের ঘটনা, এবং এস্থেটিক্সের এই ব্রাঞ্চ এর প্রকল্প হচ্ছে পলিটিক্সের এস্থেটিসাইজেশন। অর্থাৎ যেইটা ডিভয়েড অব রিয়েল পলিটিক। রিয়েল পলিটিক বলতে যেই পলিটিক্সএর ডাইনামিকস দিয়ে পাবলিক লাইফ ডমিনেটেড হইতেছে সেইটা ইটসেল্ফ এবং সেইটারে কার্যকরভাবে বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী ইন্টারভিন করতে পারা এই তিনটার কম্বাইনিং ও একই সাথে আলাদা আলাদা কিন্তু ওভারল্যাপিং ইন্টেলেকচুয়াল এফোর্টরে বুঝাইতেছি। আমার আর্গুমেন্ট হইতেছে আপনি যদি রিয়েল পলিটিকের ভেতর না থাকেন আপনি এপলিটিকালই।

তো এই পলিটিকাল এস্থেটিক্সের দুইটা ধারা আমি দেখতে পাই, যেই দুইটা ধারায় পুরাতন এপলিটিকাল গ্রুপটা ভাগ হইয়া নিজেদের পলিটিকাল হিসাবে তুইলা ধরতেছে। তেরোর শাহবাগ এবং আঠারোর ভোটচুরির পর এদের এপলিটিকাল আদি আর্কিটাইপটা কমপ্লিটলি আউট অব ফ্যাশন হইয়া যাওয়ায় এক ধরনের পলিটিকালি কনশাস এমন ইমেজ তৈরির মেকানিজমে ঢুকতে হইছে। এদের বেশিরভাগই জেন জি, অনেকগুলো মিলেনিয়াল আছে। অর্থাৎ এপলিটিকাল আদি গ্রুপটা ইডিওলজিকালি ছত্রভঙ্গ হইয়া যাওয়ায় এরা খুব নেচারালি এই দুইটা ধারার একটায় নিজেদের আবিষ্কার করছে; মানে এদের কাছে এইটাই পলিটিক্স। কিন্তু এদের এই পলিটিক্স যেহেতু রিয়েল পলিটিকরে ডিসরিগার্ড করে, ফলে রিয়েল পলিটিক একটা স্থিতাবস্থার ভেতর ঢুইকা যায়, যা কিনা পর্যায়ক্রমে পাওয়াররে সার্ভ করে। ফলে এদেরকে, ইন ইফেক্ট, যদি পাওয়ারভুক্ত গোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত না করি, অন্তত, এপলিটিকাল গ্রুপ হিসাবে ইন্ডিকেট করা লাগে।

এইখানে আরও বইলা রাখা দরকার, তেরো এবং আঠারো না ঘটলে নব্য এপলিটিকাল ধারাগুলির পোলাপানরা যে নেসেসারিলি নিজেদের আদি এপলিটিকাল গ্রুপটাতেই বিলং করতো, তা না। মানে আমি বলতে চাইতেছি আদি, ডিরেক্ট এপলিটিকাল গ্রুপটা তার ডোন্ট কেয়ার পলিটিক্সের আবেদন হারায় ফেলায়, যে পলিটিকাল এস্থেটিক্সের দুইটা ধারা ইমার্জ করছে সেইটা এজ এন এস্থেটিক নানান পটেনশিয়ালের পোলাপাইনরেই অ্যাপিল কইরা থাকতে পারে। কিন্তু এর ইমার্জেন্স যে একটা এপলিটিকাল গ্রুপের সাপ্লিমেন্ট হিসাবে হইছে(নট টু সে দ্যাট আদি গ্রুপটা এখন আর নাই, ওইটাও আছে), এবং এখনো একটা এপলিটিকাল সাইকেলরে পার্পেচুয়েট করতেছে, ওইটা হইলো আমার কনসার্নের জায়গা।
Continue reading

আর্টের স্বরূপ – গোলাম মোস্তফা (১৯২৬)

[লেখক-সাহিত্যিক হিসাবে কবি গোলাম মোস্তফা’র (১৮৯৭ – ১৯৬২) তেমন কোন নাম-ডাক-পরিচয় বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজে এখন আর তেমন একটা নাই। ইন ফ্যাক্ট উনি মারা যাওয়ার পর থিকা, এবং পাকিস্তান-আমল শেষ হওয়ার পরে উনার নাম নেয়ার প্রাকটিস নাই। উনারে বরং অনেকে উনারে চিনতে পারেন পাপেটিয়ান মুস্তফা মনোয়ারের বাপ হিসাবে। এমনিতে উনার “বিশ্বনবী” বাংলা-ভাষায় সিরাতের বইগুলার মধ্যে ওয়ান অফ দ্য বেস্ট, যেইখানে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের ঘটনাগুলাই উনি মেনশন করেন নাই, তার নিজের কিছু আলাপ-আলোচনাও তৈরি করছেন। উনার কবিতা পুরাপুরি ইরিলিভেন্ট হয়া উঠলেও উনার গদ্যগুলা যে খুবই পাওয়ারফুল জিনিস ছিল, সেইটা আমার ধারণা, এখনো টের পাওয়া যাইতে পারে।

মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে, ১৯৬২ সালে, “আমার চিন্তাধারা” নামে বইয়ে উনার নন-ফিকশন লেখাগুলা উনি একসাথে কইরা ছাপাইছিলেন। উনার লেখাগুলারে দুইটা চ্যাপ্টারে ভাগ করছিলেন – পাকিস্তানের আগে ও পাকিস্তানের পরে। উনার লেখালেখি-তে ইসলাম সবসময় একটা সেন্টার পয়েন্ট হিসাবে ছিল। পলিটিকালি পুব-পাকিস্তান যে সম্ভব হয়া উঠছিল তার পিছনে গোলাম মোস্তফা’র সাহিত্যিক কন্ট্রিবিউশন আছে। আইডিয়া হিসাবে জায়গাটারে যারা কন্সট্রাক্ট করতেছিলেন বাংলা-ভাষার ভিতরে, উনিও তাদের মধ্যে একজন। যার ফলে পলিটিকাল পাকিস্তানের প্রতি উনাদের এক রকমের রেসপন্সিবিলিটি ছিল। যেইটা সাহিত্যের জায়গা থিকা উনারা ড্রাইভ করার কোশিশ করছেন, কিন্তু ইতিহাস তো সাক্ষী তো দেয় যে, উনারা পলিটিকাল জায়গাটাতে ফেইল করছিলেন; কিন্তু একইসাথে আজকের বাংলাদেশের যে সাহিত্যিক-আইডেন্টিটি, সেই বেইজটাও তৈরি করছিলেন।

এই পলিটিকাল কারণেই গোলাম মোস্তফার নাম নেয়াটা হারাম না হইলেও কিছুটা তো মাকরুহ-ই আসলে। তো, এইখানে আমার কথা হইতেছে যে, গোলাম মোস্তফার নন-ফিকশন লেখাগুলার রিলিভেন্স এখনো আছে, একটা সময়ের সাহিত্যিক-চিন্তা হিসাবে। উদাহারণ হিসাবে এই লেখাটা পড়তে পারেন।

ই.হা.]

আধুনিক সাহিত্যে ‘আর্টের’ আলোচনা প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়। গল্পে, উপন্যাসে, কাব্যে, কবিতায়, চিত্রে, নাটকে, সঙ্গীতে— আর্ট এমন ভাবেই প্রভাব বিস্তার করিয়া বসিয়াছে যে, তাহাকে এড়াইয়া ঐ সব বিষয়ে কোনো কথা বলা আজকাল একরূপ অসম্ভব ব্যাপার। সাহিত্যের বাজারে যাঁহারা বিকিকিনি করেন, তাঁহারাও এ-সম্বন্ধে খুবই সজাগ। তাই দেখিতে পাই, কোনো একখানি উপন্যাস বা কাব্য প্রকাশিত হইলে সেখানি আর্টের দিক দিয়া সার্থক হইল, কিংবা ‘একেবারে মাটি হইয়া গেল’, মাসিক সাহিত্যের সমালোচক সে কথা উল্লেখ করিতে ভুলেন না। কেননা এ কথা তাঁহার বেশ ভালো রকমই জানা আছে যে, ঐ শ্রেণীর কোনো পুস্তক-সমালোচনায় আর্টের উল্লেখ না করিলে সমালোচনা বা সমালোচকের মূল্য বাড়ে না। যে কোনো একখানা উপন্যাস বাহির হইলেই তাহার বিজ্ঞাপনে লেখা হইয়া থাকে– “আর্টে ও মনস্তত্বে অনুপম”, “ফরাসী আর্টের নিপুণ নিদর্শন” ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ আর্ট লইয়া তর্ক-বিতর্কও নিতান্ত কম হয় না। কেহ বলেন- “Art for art’s sake”, কেহ বলেন — “আর্ট ধর্মনীতি বা সভ্যতার কোনে৷ তোয়াক্ক৷ বাখে না।” কেহবা বলেন “গুরু মহাশয়-গীরি করা আর্টের কাজ নয়,”—এইরূপ ধরনের অনেক কথাই শুনা যায়।

বস্তুতঃ আর্ট সম্বন্ধে অনেকের ধারণাই পরিচ্ছন্ন নয়। বর্তমান প্রবন্ধে আমি তাই আর্ট সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করিব।

আর্ট কী?

এই প্রশ্নের উত্তর আর্ট-প্রেমিকগণ যতো সহজ মনে করিয়া বসিয়া আছেন, প্রকৃতপক্ষে কিন্তু ততো সহজ নয়। আর্টবাদী হয়তো এক কথায় ইহার উত্তর দিবেন– ‘সৌন্দর্য সৃষ্টিই আর্ট। কিন্তু এ উত্তরে মোটেই সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। আর্ট যদি সৌন্দর্য সৃষ্টিই হয়, তবে সৌন্দর্য জিনিসটা কি? সেটা তো আমাকে আগে বুঝিতে হইবে। কাজেই আর্ট কি, এই প্রশ্নের পূর্বে সৌন্দর্য কি, ইহাই সর্বাগ্রে আমাদিগকে মীমাংসা করিতে হইবে ।

সৌন্দর্য কি? Continue reading

ফিকশন: বিষাদ সিন্ধু [শর্ট ভার্সন]- মীর মোশারফ হোসেন (পার্ট ৯)

১৯. “হায় হাসান! হায় হাসান!”

মারওয়ান্ নগরপ্রান্তভাগে যে স্থানে পূর্বে শিবির নির্মাণ করিয়াছিলেন, সেই স্থানে পুনরায় সৈন্যাবাস রচনা করিয়া যুদ্ধের আয়োজন করিতে লাগিলেন! কিন্তু যে পরিমাণ সৈন্য দামেস্ক হইতে ক্রমে ক্রমে আসিয়াছে, তাহার সহায়ে হোসেনের তরবারি-সম্মুখে যাইতে কিছুতেই সাহসী হইলেন না। দামেস্ক হইতে আর কোনও সংবাদ আসিতেছে না। এমরানকে কহিলেন, “ভাই এমরান! আমি ছদ্মবেশে যে সকল সন্ধান, যে সকল গুপ্তবিবরণ নগরের প্রতি ঘরে ঘরে যাইয়া প্রায় প্রতিদিন জানিয়া আসিতেছি, ওত্‌বে অলীদ আমার সেই কার্য করিবেন। আমি কয়েক দিনের জন্য দামেস্কে যাইতেছি।” এই বলিয়া মারওয়ান দামেস্কে যাত্রা করিলেন।

নিয়মিত সময়ে মারওয়ান্ দামেস্কে যাইয়াই-জায়েদা ও মায়মুনার বিচার শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। সময় মত এজিদের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, মদিনার উপস্থিত বিবরণ সমুদয় এজিদের গোচর করিয়া পুনরায় মদিনাগমনের কথা পাড়িলেন। প্রধানমন্ত্রী হামান্ যুদ্ধে অমত প্রকাশ করিয়া কয়েক দিন মারওয়ান্‌কে মদিনা-গমনে ক্ষান্ত রাখিলেন।

সভামণ্ডপে সকলেই উপস্থিত আছেন। মারওয়ানকে সম্বোধন করিয়া এজিদ্ বলিতে লাগিলেন, “মারওয়ান্! একটি নরসিংহকে বধ করা হইয়াছে মাত্র কিন্তু তত্তুল্য আরো একটি সিংহ বর্তমান। এ সমুদয়কে শেষ করিতে না পারিলে আমার মনের আশা কখনোই পূর্ণ হইবে না। হোসেনের রোষাগ্নি ও কাসেমের ক্রোধবহ্নি হইতে রক্ষা পাওয়া সহজ কথা নহে। সে ক্রোধানল সম্যক্ প্রকারেই এক্ষণে আমাদের শিরে পড়িয়া আমাদিগকে দগ্ধীভূত করিবে। পূর্ব হইতেই সে আগুন নিবারণের চেষ্টা করা কর্তব্য। যত শীঘ্র হয়, হাসান-হোসেনের বংশ বিনাশে যাত্রা কর।”

এই সকল কথা শুনিয়া প্রধানমন্ত্রী হামান গাত্রোত্থানপূর্বক করজোড়ে বলিতে লাগিলেন, “রাজাজ্ঞা আমার শিরোধার্য! কিন্তু আমার কয়েকটি কথা আছে। অভয়দান করিলে মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি।”

এজিদ্ বলিলেন, “তোমার কথাতেই তো কয়েক দিন অপেক্ষা করিয়াছি।”

হামান বলিলেন, “বাদশা নামদার! হাসান আপনার মনোবেদনার কারণ-যে হাসান আপনার শত্রু,-সে তো আর ইহজগতে নাই! তবে প্রতিশোধের বাকি আছে কি? বাদশাহ নামদার! জগৎ কয় দিনের? সুখ কয় মুহূর্তের? নিরপেক্ষভাবে একবার ভাবিয়া দেখুন দেখি, হাসান কি আপনার শত্রু? একটি ভালবাসা জিনিসের দুইটি গ্রাহক হইলে পরস্পর জাতক্রোধ আসিয়া উপস্থিত হয়, তাহা আমি স্বীকার করি। কিন্তু সে ঘটনায় হাসানের অপরাধ কি, সে মীমাংসা স্বয়ং জয়নাবই করিয়াছে। তাহার শাস্তিও হইল। অধিক হইয়াছে। এক্ষণে হোসেনের প্রাণ বধ করা, কি হাসান-পুত্রের প্রাণ হরণ করা মানুষের কার্য নহে। মদিনার আবালবৃদ্ধ এমন কি পশু-পক্ষীরাও “হায় হাসান! হায় হাসান!” করিয়া কাঁদিতেছে। এই দুঃখের সময় কি অনাথা-পতিহীনা স্ত্রীগণের প্রতি কোন প্রকার অত্যাচার করিতে আছে? শত্রু বিনাশের পর শত্রুপরিবার আপন পরিবার মধ্যে পরিগণিত, – ইহাই রাজনীতি এবং ইহাই রাজপদ্ধতি। এই অকিঞ্চিৎকর অস্থায়ী জগতের প্রতি অকিঞ্চিৎরূপে দৃষ্টিপাত করাই কর্তব্য।”

এজিদ্ নিস্তব্ধভাবে মনোনিবেশপূর্বক শুনিতেছিলেন। দুষ্ট মারওয়ান রোষভরে বলিতে লাগিলেন, “বৃদ্ধ হইলে মানুষের যে বুদ্ধিশক্তির বৈলক্ষণ্য ঘটে, তাহা সত্য। ইহাতে যে একটু সন্দেহ ছিল, তাহা আজ আমাদের প্রধান উজিরের কথায় একেবারে দূর হইল। এক ভ্রাতা শত্রু, দ্বিতীয় ভ্রাতা মিত্র-ইহা কি কখনো সম্ভবে? কোন্ পাগলে একথা না বুঝিবে? সময় পাইলেই তাহারা প্রতিশোধ লইবে। এই উপযুক্ত সময়ে যদি উহাদিগকে একেবারে সমূলে বিনাশ না করা যায়, তবে কোন-না-কোন সময়ে আমাদিগকে ইহার ফল ভুগিতেই হইবে। পরকাল ভাবিয়া, জগতের অস্থায়িত্ব বুঝিয়া, নশ্বর মানবশরীর চিরস্থায়ী নহে স্মরণ করিয়া, রাজ্যবিস্তারে বিমুখ, শত্রু দমনে শৈথিল্য, পাপভয়ে রাজকার্যে ক্ষান্ত হওয়া নিতান্তই মূঢ়তার কার্য।”

হামানকে সম্বোধন করিয়া এজিদ্ বলিলেন, “মারওয়ান্ যাহা বলিতেছেন, তাহাই যুক্তিসঙ্গত। আমি আপনার মতের পোষকতা করিতে পারিলাম না। যত বিলম্ব, ততই অমঙ্গল। এই যুদ্ধের প্রধান নায়কই মারওয়ান্। মারওয়ানের মতই আমার মনোনীত। শত্রুকে অবসর দিতে নাই, দিবও না। মারওয়ান্! যে পরিমাণ সৈন্য মদিনায় প্রেরিত হইয়াছে, আমি তাহার আর চতুর্গুণ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া এখানে রাখিয়াছি। যাহা তোমার ইচ্ছা হয়, লইয়া মদিনায় যাত্রা কর।”

Continue reading

অসুখের দিন (শেষ কিস্তি)

This entry is part 8 of 8 in the series অসুখের দিন

[ব্যর্থ এক সার্জারি নিয়ে ভোগান্তির কাহিনি এটা। যার মূল পর্ব শুরু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, এখনো চলমান। এখন একটা সিনেমাটিক ক্লাইমেক্সে দাঁড়ায়া আছে। তবে সেই গল্পে দুর্ধর্ষ কোনো অ্যাখ্যান নাই, বিরাট কোনো বাঁক-বদল নাই। অনেক বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস আছে। কিন্তু এ গল্প আমার খুবই কাছের, আমার বর্তমান। আমার স্বজনদের জন্য পরীক্ষার, আমাকে ভালোবাসার। সেই গল্পটা আমার বন্ধুদের জানাতে চাই, অন্তত এক অধ্যায়ের সমাপ্তির আগে আগে। … অবশ্য পুরো গল্পটা এভাবে শেয়ার করা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। এখন পর্যন্ত সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বদলে দেওয়া।]

কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।। কিস্তি ৫ ।। কিস্তি ৬ ।। কিস্তি ৭ ।।

রমজানে বাসার কেউ নয়টার আগে ঘুম থেকে উঠে না। এমন দিনে সকাল ছয়টায় সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে। গজ-তুলা দিয়ে পেটে চেপে ধরেছি। দুলাভাই ও নিশান ফোনে ব্যস্ত। কিছুক্ষণের মধ্যে পরিচিত সব ড্রাইভারকে তারা ফোন দিয়ে ফেলল। গতকাল আমাকে বাসায় নিয়ে আসছিল কাছের একজন ড্রাইভার। উনাকে প্রথম ফোন দেয়া হয়। কিন্তু কেউ ধরছে না। হয়তো সেহেরি খেয়ে তারাও একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠবে অথবা রাতে ট্রিপ ছিল।

বাসা থেকে অটোরিকশায় গেলে মূল সড়কের দুরত্ব মিনিট দশেক। এ এলাকায় আমরা এসেছি বছর তিনেক। এর মধ্যে রাস্তার অবস্থা দিনদিন এত খারাপ হয়েছে যে, কেউই ভাবতে পারছে না অটোরিকশায় মূল সড়ক পর্যন্ত গিয়ে উবার ধরব। আমার অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক বা কতটা রক্ত হারাচ্ছি বা ঝাঁকুনিতে কী হতে পারে আমাদের ধারণা নাই। এর মধ্যে দুইবার টয়লেটের বেগ নিয়ে কমোডে বসলাম। পেটে চাপ পড়ছে। পেট চেপে ধরে ভয়ে ভয়ে বসে আছি।

ঘণ্টা দু-এক পর একটা ফোনে রেসপন্স পাওয়া গেল। বাবু নামে এক ড্রাইভার, উনি নিজে আসতে না পারলেও অনেকবার আমাদের গাড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন। আজকেও একজনকে পাঠাবেন বললেন। ওই দিকে, রক্তে গজ-তুলা ভিজে গেছে। সোহেল নিচে নেমে বড় এক ব্যান্ডেল তুলা নিয়ে এলো। গজ পাওয়া গেল না। নিপুণ দ্রুত জায়গাটা পরিষ্কার করে তুলা ও টেপ দিয়ে মুড়ে দিলো। নয়টার দিকে গাড়ি আসতে ব্যাগ গুছিয়ে আমি, সোহেল আর নিশান রওয়ানা দিলাম।

সেই রমজান অর্থাৎ, ২০২২ সালের এপ্রিলজুড়ে ঢাকা শহর তুমুল ট্রাফিক জ্যামে ভুগেছে। বিমানবন্দর থেকে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতাল তক পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো লাগল। সামনের সিটে সোহেল, পেছনে আমার পাশে নিশান ঘুমাচ্ছে। আমার চোখে ঘুম নাই, নানা চিন্তা ভর করছে। টাকা-পয়সার একটা ভাবনা ছিল। লাখ খানেকের মধ্যে হলে চালিয়ে নিতে পারব। যে অবস্থা, তাতে বাসায় আপাতত ফেরা হবে বলে মনে হচ্ছিল না। হাসপাতালে থাকতে হবে। তবে গাড়িতে উঠতে উঠতে নিশান আশ্বস্ত করে বলল, তার কার্ড থেকে হাজার চল্লিশেক টাকা আমাকে দেবে, বাকিটা আমি দিলে চলবে। টাকা তো জোগাড় হবে, কিন্তু এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, আসলে আমার হয়েছেটা কী? কখনো কি সুস্থ হতে পারবো? বারবার পেটের দিকে হাত চলে যাচ্ছিল। যতটা সম্ভব আরামের সঙ্গে বসার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ খুবই আবেগী হয়ে উঠলাম। খুব কান্না পেল। আগের দিন বাচ্চার জন্ডিসের চিকিৎসায় হাসপাতালে গিয়ে উঠেছে আমার বউ। মানে, আমরা তিনজন এখন কোনো না কোনোভাবে হাসপাতালে। মেসেজে পুরো বিষয়টা অফিসে জানালাম। গাড়ি তখন বনানী পার হচ্ছিল।
Continue reading

বই থেকে: একটি নীল বোতাম – হুমায়ূন আহমেদ

This entry is part 12 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

[হুমায়ূন আহমেদের এই ফিকশনটা ছাপানোর পারমিশন আমাদের নাই, কাকলী প্রকাশনী থিকা ছাপানো উনার “গল্প সমগ্র” বই থিকা এই গল্পটা বাছাই করা হইছে। বইয়ের স্ক্যান কপি অনলাইনে এভেইলেবল। কপিরাইট সংক্রান্ত কোন অভিযোগ আসলে পোস্ট’টা মুছে দিতে রাজি আছি আমরা।

এমনিতে হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প নিয়া আলাপ কমই, এর একটা বড় কারণ মেবি কোন বাছাই না থাকা। যে কোন রাইটারেরই সব গল্প-উপন্যাসই তার সেরা-লেখা হওয়ার কোন কারণ নাই; বা কোন ক্রাইটেরিয়ার বেসিসে আমার সেরা বইলা ধরে নিতেছি, সেইটাও একটা ঘটনা। তবে অইসব বিচারে না গিয়াও বলা যায়, এইটা হুমায়ূন আহমেদের সিগনেচার একটা গল্প।

তো, গল্পটা পড়তে পারেন আবার।]

 

বারান্দায় এশার বাবা বসেছিলেন।
হাঁটু পর্যন্ত তোলা লুঙ্গি, গায়ে নীল রঙের গেঞ্জি। এই জিনিস কোথায় পাওয়া যায় কে জানে? কী সুন্দর মানিয়েছে তাঁকে! ভদ্রলোকের গায়ের রঙ ধবধবে শাদা। আকাশি রঙের গেঞ্জিতে তাঁর গায়ের রঙ ফুটে বেরুচ্ছে। সব মিলিয়ে সুখী-সুখী একটা ছবি। নীল রঙটাই বোধহয় সুখের। কিংবা কে জানে ভদ্রলোকের চেহারাটাই বোধহয় সুখী-সুখী। কালো রঙের গেঞ্জিতেও তাঁকে হয়তো সুখী দেখাবে।

তিনি আমাকে দেখতে পাননি। আমি ইচ্ছা করেই গেটে একটু শব্দ করলাম। তিনি আমাকে দেখলেন। সুন্দর করে হাসলেন। ভরাট গলায় বললেন, ‘আরে রঞ্জু, তুমি? কী খবর? ভালো আছ?’

“জি ভালো।
‘গরম কি রকম পড়ছে বল দেখি?’
“খুব গরম।’
“আমার তো ইচ্ছা করছে চৌবাচ্চায় গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকি।’ তিনি তাঁর পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘বসো। তোমার কাছ থেকে দেশের খবরা-খবর কিছু শুনি।’
‘আমার কাছে কোনো খবরা-খবর নেই চাচা।’
‘না থাকলে বানিয়ে বানিয়ে বলো। বর্তমানে চালু গুজব কী?’

আমি বসলাম তাঁর পাশে। এশার বাবার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এ বাড়িতে এসে শুনি এশা নেই – মামার বাড়ি গেছে। রাতে ফিরবে না। তার মামার বাড়ি চাক। প্রায়ই সে সেখানে যায়। আমার খানিকটা মন খারাপ হয়। কিন্তু এশার বাবার সঙ্গে কথা বললে আমার মন খারাপ ভাবটা কেটে যায়।

এই যে এখন বসলাম উনার পাশে— এখন যদি শুনি এশা বাসায় নেই, মামার বাড়ি গিয়েছে— আমার খারাপ লাগবে না।
‘তারপর রঞ্জু নতুন কোনো গুজবের কথা তাহলে জান না?’
‘জি না।’
‘বল কী তুমি! শহর ভর্তি গুজব। আমি তো ঘরে বসে কত কি শুনি। চা খাবে?’
‘জি না।’
‘খাও এক কাপ । তোমার সঙ্গে আমিও খাব। তুমি আরাম করে বস। আমি চায়ের কথা বলে আসি।’
“আপনাকে বলতে হবে না, আমি বলে আসছি। এশা কি বাসায় নেই?’
“আছে। বাসাতেই আছে।’ বলেই তিনি চায়ের কথা বলতে উঠে গেলেন।

কী চমৎকার তাঁর এই ভদ্রতা! আমি কে? কেউ না। অতি সামান্য একজন। একটা এ্যাড ফার্মে কাজ করি। অল্প যে ক’টা টাকা পাই তার প্রতিটির হিসাব আমার আছে। আর এঁরা? আমারা ধারণা, এদের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ান আমার চেয়ে বেশি টাকা পায়। নিতান্ত ভাগ্যক্রমে এঁদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে এ-বাড়িতে এসেছিলাম।

প্রথম দিনেই এশার কী সহজ সুন্দর ব্যবহার! যেন সে অনেকদিন থেকেই আমাকে চেনে। সেদিন কেমন হাসিমুখে বলল, ‘আপনি তো বেশ লম্বা। আসুন একটা কাজ করে দিন। চেয়ারে দাঁড়ান, দাঁড়িয়ে খুব উঁচুতে একটা পেরেক লাগিয়ে দিন।

আমি বললাম, ‘এত উঁচুতে পেরেক দিয়ে কী করবেন?’

‘আজ বলব না। আরেকদিন এসে দেখে যাবেন।’ Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →